Thursday, October 13th, 2016
‘কলম্বাস ডিসকভার আমেরিকা!’
October 13th, 2016 at 2:07 pm
‘কলম্বাস ডিসকভার আমেরিকা!’

কাজি ফৌজিয়া:

When your people came to our land, it was not with open arms, but with Bibles and guns and disease. You took out land. You killed us with your guns and disease, then had the arrogance to call us godless savages. If there is a Heaven and it is filled with Christians, than Hell is the place for me. — Anonymous

প্রিয়বন্ধু, 

কেমন আছ তুমি? আমি ভালো থাকি আর না থাকি, দোয়া করি, সবসময় তুমি ভালো থাকো। ইদানীং নস্টালজিয়ায় ভুগি। কেমন যেন টান অনুভব করি পেছনে ফেরার। কিন্তু ফিরে যেতে চাইলেই তো যাওয়া যায় না, কিছু রাস্তা আছে ওয়ানওয়ে। আমি সেই রাস্তা ধরে অনেক অনেক দূর চলে এসেছি। আমার সামনে শুধু একটাই অপশন, সামনে যাওয়া। তুমিই বলো, এমন জীবন কি কেউ চায়? গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত শীত বসন্ত একরকম লাগে। কোনও বৈচিত্র্য নেই, আনন্দ নেই। শুধু লড়াই- সংগ্রামের জীবন। আরে আমি তোমাকে কী কারণে দুঃখের কথা শোনাচ্ছি?

আমেরিকায় আজ ফেডারেল হলিডে, কলম্বাস ডে। এ বিষয়ে আজ তোমাকে কিছু বলতে চাই। জানি, আমার কথা অনেক মানুষ পছন্দ করে না। তিতা কথা হজম করাই তো কঠিন, পছন্দ তো আরও দূরের কথা। তুমিই বলো বন্ধু, মানুষ বেজার হবে বা খুশি হবে, তা ভেবে কি উচিতকথা বলা ছেড়ে দেব?

ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, কলম্বাস ডিসকভার আমেরিকা। দুনিয়াতে এরচে বড় মিথ্যা আর নেই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের এও শিখিয়েছে, কলম্বাস যখন আমেরিকায় পা রাখেন, তখন নাকি এ দেশে রেড ইন্ডিয়ানরা ছিল! ১৪৯২ সালে কলম্বাস এ দেশে এসে প্রথম যে মানুষটিকে দেখেন, তাকে তিনি ইন্ডিয়ান ভেবে নেন। কারণ তিনি আমেরিকার ভূখণ্ডে পৌঁছানোর পর ভেবেছিলেন এটা ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ান ওসিয়ান দিয়ে যেতে যেতে এ মাটি চোখে পড়ে আর এ মাটিতে অবতরণ করে এটাকে ইন্ডিয়া ভেবে নেন।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া হিসাব মতে, সে সময় আমেরিকায় দশটি গোত্রের ৭০-১০০ মিলিয়ন আদিবাসী মানুষ বসবাস করতো। তুমিই বলো বন্ধু, কিভাবে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থায় জুড়ে দিলাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছে? আমাদের নেতানেত্রীরা পাঠ্যপুস্তক থেকে কে কার নাম বাদ দেবে, সেই তালে থাকে। তাদের উচিত, এসব কলোনিজম মিথ্যার বেসাতি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উপড়ে ফেলা।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, কলম্বাস ২০-৭০ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করে। আদিবাসীদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের ভূমি থেকে তাড়াতে তাড়াতে নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরে আটকে ফেলে। ১৮৩০ সালে তারা জনপ্রিয় পাঁচটি গোত্রকে আমেরিকা থেকে বের করে দেয়ার আইন পাস করে, যার নাম ছিল ইন্ডিয়ান সিটিজেনশীপ অ্যাক্ট। এখানেই শেষ নয়, তুলা চাষ করার জন্য এক লাখ আদিবাসীকে উচ্ছেদ করে তাদের বাধ্য করে সাউদার্ন স্টেট থেকে বর্তমান ওকলাহামা আসতে। লম্বা এই বিপদজনক পথ পাড়ি দিতে গিয়ে চার হাজার আদিবাসী ক্ষুধা ও রোগে ভুগে মারা যায়। একশো বছরের মতো ক্ষমতা দখলের লড়াই চলে। আদিবাসীদে বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ানরা এমন কোনো কূটচাল নেই, যা চালেনি। তারা একবার আদিবাসীদের উপহার হিসাবে কম্বল বিতরণ করে, যার ভেতর গুটি বসন্তের জীবাণু ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইউরোপিয়ানরা আসার আগে আদিবাসীরা নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ভালো করেই জানতো। ইউরোপিয়ানদের সাথে আসা রোগবালাইয়ের চিকিৎসা তারা জানত না বলে বহু আদিবাসী ডাইরিয়া, কলেরা, গুটিবসন্ত, টাইফয়েড রোগে মারা যায়। 

১৭৭৫ এ তারা আদিবাসীদের ধ্বংস করতে আরও মারাত্মক সিদ্বান্ত নেয়। ম্যাসাচুসেটস এর কিং জর্জ ঘোষণা দেন, যে কোনও উপায়ে আদিবাসীদের ধ্বংস করো। তিনি আরও ঘোষণা দেন, বয়স্ক আদিবাসী হত্যা করলে ৫০ পাউন্ড, মহিলাদের মারলে ২৫ পাউন্ড এবং বাচ্চাদের মারলে ২০ পাউন্ড পুরস্কার পাওয়া যাবে। সূত্র মতে, স্লেবারির আগে এটা ছিল আমেরিকার সর্ববৃহৎ ও প্রথম গণহত্যা।

নিজেদের ভূমিরক্ষা ও অধিকার আদায়ের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯২৪ সালে ইউএস কংগ্রেস পাস করে আদিবাসীরা দৈত্ব নাগরিকত্ব পাবে। এর অর্থ নিজেদের সত্তা বজায় রেখে তারা আমেরিকার নাগরিক হবে, কিন্তু ভোট দিতে পারবে না। ১৯৬৫ সালে সিভিল রাইটস মুভমেন্ট বা নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কালো মানুষেরা আদিবাসীদের ভোটের অধিকার আদায় করে, ১৯৬৮ সালে তা কার্যকর হয়। ২০১০ সালের একটি আদম শুমারি অনুযায়ী, আমেরিকার আদিবাসী সংখ্যা এখন চার লাখের একটু বেশি। এবার বোঝো, কি পরিমান আদিবাসী খতম করে আমেরিকার জন্ম হয়। যে জাতির জন্ম হয় এত বড় হত্যাযজ্ঞ দিয়ে, তারা এখন পুরো দুনিয়ার ওপর রাজত্ব করছে। ২০১২ সালে ইহুদি এক মহিলা আমেরিকার ট্রেন স্টেশন ও বাস স্টেশনে বিজ্ঞাপন লাগায়, সাপোর্ট ইজরাইল ডোন্ট সাপোর্ট সাভেজ। এর প্রতিবাদে আমরা সাভেজরা একটি আলোচনার আয়োজন করেছিলাম। আলোচনায় আমার সাথে বক্তা হিসাবে একজন কবি অংশগ্রহণ করেন—তার নাম মার্ক গঞ্জালেস। তিনি একটা কবিতা পাঠ করেন, সেটা ছিল এরকম, হেই কলম্বাস, ইউ নেভার ডিসকভার আমেরিকা। হোয়েন ৭০ মিলিয়ন পিপল লিভ দি ল্যান্ড নো বডি কেন ডিসকভার দি ল্যান্ড…। পুরোপুরি মনে নেই, কিছুটা এমনই ছিল।

আজ কলম্বাস ডে’র ছুটিতে এ বিষয়ে না লিখে পারলাম না। আমাদের মুভমেন্ট লোকজন এ দিনকে নাম দেয়, ইন্ডিজিনেস ডে। আরও একটি কারণ অবশ্য ছিল এ বিষয় নিয়ে লেখার, অনেক দিন পর আবার আদিবাসীরা তাদের অধিকারের জন্য গর্জে উঠেছে। নর্থ ডেকোটা পাইপ লাইন নিয়ে যে লড়াই চলছে, তা তো তোমার অজানা নয়। আদিবাসীরা তাদের ল্যান্ডে নিজেদের সক্রিয়তা বজায় রেখে চলছিল। তারা নিজেদের আইন আর পরিবেশ রক্ষা করে আমেরিকার নাগরিক আইন মেনে চলে। নর্থ ডেকোটাতে একটি তেল কোম্পানি ১১৭২ মাইলের পাইপ বসানোর কাজ শুরু করে, যার মাধ্যমে তারা দৈনিক ৫৭০০০০ ব্যরেল তেল বাক্যটা তেলক্ষেত্র থেকে নর্থ ডেকোটা হয়ে ইলিনয় নিয়ে যাবে। পথে মিজুরি নদীর ওপর দিয়ে পাইপ লাইন যাবে। যখন নদীর ওপর কাজ শুরু হবে, সিওক্স নামে একটি উপজাতির চার হাজারের লোক কাজে বাধা দেয়। তাদের বক্তব্য, এ লাইন তাদের পরিবেশ ও নদীর জন্য ক্ষতিকর। তাদের উপাসনার জন্য মিজুরির পানি পবিত্র, তা তারা নষ্ট হতে দেবে না।

সরকার প্রথমে আর্মি পাঠায়। কিন্তু সারা দেশ থেকে উপজাতিদের সাপোর্টে লোকজন জমা হতে থাকে, এমনকি আমাজন থেকে মানুষ এসে নদী পাহারা দিতে শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে বিচার বিভাগ রুল জারি করে আপাতত কাজ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু কেউ জানে না, তা কতদিন বন্ধ থাকবে। কর্পোরেশনের লোকজন রুল ওঠানোর চেষ্টা করছে। এদিকে ঠাণ্ডা বেশি পড়লে সাপোর্ট করতে আসা লোকজন কতদিন টিকতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আমার পরিচিত কয়েকজন ওখানে গেছে। কিন্তু সাপোর্ট করার ইচ্ছা থাকলেও আমি যেতে পারিনি। দোয়া করি, আদিবাসীদের পরিবেশ রক্ষার লড়াই যেন সফল হয়।

দুনিয়া বদলাচ্ছে। আমাদের সময় আমরা যা মেনে নিয়েছি, এখনকার ছেলেমেয়েরা তা মানবে না। তাই হয়ত অনেক ছেলেমেয়েকে বলতে শুনি, আজ কিলার কলম্বাস ডে। ফেসবুকে ছবি শেয়ার দেখি, ফাক কলম্বাস। গান্ধীকে নিয়েও বদলানো সুর শোনা যাচ্ছে। গান্ধী বর্ণবাদ সমর্থন করতেন, উঁচু সম্প্রদায়কে সমর্থন করতেন, আরও কত কী। ঘানার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন করে তাদের ক্যাম্পাস থেকে গান্ধীমূর্তি অপসারণ করে।

তাই বলি বন্ধু, পরিবর্তনের হাওয়া কখন যে কার অহঙ্কার ধূলিসাৎ করে দেয়, কেউ জানে না। আমেরিকা যদি সময় থাকতে নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, যদি ট্রাম্পের মতো মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়, তবে আমাদের আরেক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।

ওহ! বন্ধু দেখ, কথা বলতে বলতে আমি আরেক বিষয়ে চলে এসেছি। গতকাল ছিল দ্বিতীয় ডিবেট। কথার মারপ্যাঁচে ফেলার প্রতিযোগিতা। আমার চোখে একজনও ভালো নয়, তাই আমি এসব দেখি না। ট্রাম্প রোজ কিছু না কিছু করে আলোচনায় থাকে। মিডিয়া মজা করতে করতে একটা লোককে চূড়ান্ত লক্ষ্যের কাছে নিয়ে এসেছে। এখন দেখা যাক, নভেম্বর কী হয়!

বন্ধু, সকালে সিটি হলে শুনানি। হেইট ক্রাইম নিয়ে সিটি কাউন্সিল রেজুলোশন পাস করবে। আমাকেও বক্তব্য দিতে হবে কাল। খুব সকালে উঠে দৌড় দিতে হবে। এ নিয়ে পরের বার লিখব। ততক্ষণ ভালো থাকো তুমি। ভালো থাকুক দেশ ও দেশের মানুষেরা। তোমার পৃথিবী ভ্রমণ শুভ হউক, এ কামনায় আজকের মতো বিদায়।

ইতি

তোমার বন্ধু, যাকে কোনো নামেই ডাকো না


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি