Saturday, September 3rd, 2016
কাসেমনামা 
September 3rd, 2016 at 10:41 pm
কাসেমনামা 

ঢাকা: একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হলো ছয় জনের। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে শনিবার রাতে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

কে এই মীর কাসেম:

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘খান সাহেব’, ‘বাঙাল খান’ এমন নামে পরিচিত ছিলেন মীর কাসেম আলী। জামায়াত নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিত্তশালীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী একজন বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী। জামায়াত-শিবিরের অর্থের প্রধান জোগানদাতাও তাকেই বলা হয়। নামে-বেনামে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক এই জামায়াত নেতা। মূলত অর্থবিত্তের কারণেই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে রয়েছে তার ব্যাপক প্রভাব।

মীর কাসেম আলীর বেড়ে ওঠা:

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামে  ১৯৫২ সালে মীর কাসেম আলীর জন্ম। তার বাবা তৈয়ব আলী চাকরী করতেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে। চার ভাইয়ের মধ্যে মীর কাসেম দ্বিতীয়। মীর কাসেমকে এলাকার মানুষ মিন্টু নামেই চেনে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন চট্টগ্রামে। ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র থাকাকালে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি হন তিনি।

একাত্তরে মীর কাসেমের কর্ম: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াত পক্ষ নেয় পাকিস্তানের। রাজাকার অর্ডিন্যান্স জারির পর জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রসংঘের নেতাদের নিজ নিজ জেলার আলবদর বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন। এভাবে মীর কাসেম আলী চট্টগ্রাম জেলার প্রধান হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে তার নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সভাপতি হিসেবে তিনি তার ভাষণে বলেন, গ্রামগঞ্জে প্রতিটি এলাকায় খুঁজে খুঁজে পাকিস্তানবিরোধীদের শেষ চিহ্নটি মুছে ফেলতে হবে।

মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে তিনি সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি ‘মহামায়া ভবন’ দখল করে বানান টর্চার সেল। ‘ডালিম হোটেল’ নামে পরিচিত ওই টর্চার সেলে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হতো।

স্বাধীনতাযুদ্ধের পর তার কর্ম:

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মীর কাসেম ঢাকায় আসেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে-না-যেতেই মুক্তিযোদ্ধাদের রোষানলে পড়ার ভয়ে চলে যান লন্ডনে। সেখান থেকে সৌদি আরব। সৌদিতে থাকাকালীন সেখানকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে ফিরে আসেন মীর কাসেম।

মীর কাসেমের নেতৃত্বেই ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে ছাত্রশিবির নামে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি হন শিবিরের প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি। এরপর মীর কাসেমকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কারণে ১৯৮০ সালে তিনি রাবেতা আল ইসলামীর এ দেশীয় পরিচালক হন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর টাকায় আস্তে আস্তে গড়ে তোলেন ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা ট্রাস্ট ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস। জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের আয় ও কর্মসংস্থানের বড় উৎস হয়ে দাঁড়ায় এসব প্রতিষ্ঠান। সঙ্গে সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে বাড়তে থাকে তার আধিপত্য।

মীর কাসেমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:

১. মো. ওমর-উল ইসলাম চৌধুরীকে আটক ও নির্যাতন (৮ নভেম্বর)

২. লুৎফুর রহমান ফারুককে আটক ও নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ (১৯ নভেম্বর)

৩. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে আটক ও নির্যাতন (২২ বা ২৩ নভেম্বর)

৪. সাইফুদ্দিন খানকে আটক ও নির্যাতন (২৪ নভেম্বর)

৫. আব্দুল জব্বার মেম্বারকে আটক ও নির্যাতন (২৫ নভেম্বর)

৬. হারুন-অর-রশিদ খানকে আটক ও নির্যাতন (২৮ নভেম্বর)

৭. মো. সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ তিনজনকে আটক ও নির্যাতন (২৭ নভেম্বর)

৮. নুরুল কুদ্দুসসহ চারজনকে আটক ও নির্যাতন (২৯ নভেম্বর)

৯. সৈয়দ মো. এমরানসহ ছয়জনকে আটক ও নির্যাতন (২৯ নভেম্বর)

১০. মো. জাকারিয়াসহ চারজনকে আটক ও নির্যাতন (২৯ নভেম্বর)

১১. জসিমসহ ছয়জনকে আটক, নির্যাতন ও হত্যা (একাত্তরের ঈদের পরদিন)

১২. রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে নির্যাতন ও হত্যা (নভেম্বর মাসের যে কোনও দিন)

১৩. সুনীল কান্তি বর্ধনকে আটক ও নির্যাতন (নভেম্বর মাসের শেষে)

১৪. নাসিরউদ্দিন চৌধুরীকে আটক ও নির্যাতন (নভেম্বর মাসের শেষে)

যে অভিযোগে ফাঁসি:

অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার(রিভিউ) আবেদন খারিজ করে গত ৩০ আগস্ট আদেশ দেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার(এসকে)সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ ১নং বিচার কক্ষে জনাকীর্ন আদালতে এই রায় দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা ছিলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

ওই দিনই ২৯ পৃষ্ঠার রিভিউর রায় প্রকাশ করেন আদালত।সন্ধায় রায়ের অনুলিপি সুপ্রিমকোর্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ থেকে কারাগারসহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় পাঠানো হয় এবং ৩১ আগস্ট রায় মীর কাসেম আলীকে পড়ে শুনানো হয়।

প্রতিবেদন-ময়ূখ ইসলাম, সম্পাদনা- জাহিদুল ইসলাম


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার


অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর

অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর