Monday, June 13th, 2016
কে বলতে পারে, তার সত্তা দেখা দিবে না?
June 13th, 2016 at 10:59 pm
কে বলতে পারে, তার সত্তা দেখা দিবে না?

সৌম্য রহমান: এটি লেখার সময় বিশেষ আবেগ বা স্মৃতিকাতরতা আমাকে নাড়া দেয়নি; বেশ নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহ মানসিকাবস্থায় আমি নানার সম্পর্কে লিখতে পেরেছি। তার সন্তানদের ক্ষেত্রে বিষয়টি হয়তো সেরকম হবে না। নানাভাই, ইত্তেফাকের ‘সন্ধানী’- ছ’ফুট লম্বা ও গমগমে কন্ঠস্বরের ভারি চরিত্রের মানুষ, তার ছয় সন্তানকে রীতিমতো আগলে রাখতেন; ধরা যাক কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা নিমন্ত্রণে আমার মা, খালা বা মামার দেরি হচ্ছে, ধরা যাক রাত ১১টা হয়ে যাচ্ছে- নানার ক্রমাগত ফোন এবং ‘কই তোরা?’ বলে এক হাঁক- যা উপেক্ষা করা পরিবারের কারো পক্ষেই সম্ভব ছিলো না।

এই হাঁক প্রায়ই আমার সেলফোনেও ভেসে আসতো। বাসায় না আসা পর্যন্ত তিনি স্থির হতেন না (নানারা এবং ছোটো খালা আমাদের ঠিক নিচের ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন); একবার তার কক্ষে উকি দিয়ে বা একটা ফোন করে তাকে আশ্বস্ত করতে হতো। তার জামাতারাও মেজাজি কন্ঠের ‘কোথায় তোরা/তুমি’র আওতাভুক্ত ছিলেন। বাড়িতেও যেমন, কর্মক্ষেত্রেও সেরকম ছিলেন বলে জানি। সাধারণত কাউকে তোয়াজ করে কথা বলতেন না, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দু-নম্বর স্বভাবের- উচ্চ বা নিম্নপদস্থ, নেতা বা অনুসারী- লোকদের ধমক, ধারালো কথা ও মেজাজ দিয়ে চাবকে দিতেন। প্রচণ্ড সৎ ছিলেন- প্রায় ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবন, কিন্তু সোজাপথে যেটুক আর্থিক স্বচ্ছলতা স্বাভাবিক, তার ততখানিই ছিলো।

1491375_416493351886200_2119783019908757253_o

তার সততাকেন্দ্রিক বেশ কিছু ঘটনার কথা জানি- কয়েকটি গতো কয়েক বছরের মধ্যে নিজেরই দেখা- যেগুলো বাঙালির সাম্প্রতিক পতনোন্মুখ মানসের প্রেক্ষাপটে রূপকথার মতো মনে হয়। একটা উল্লেখ না করলেই নয়। ২০১১ এর দিকে- আমি তখন আণ্ডারগ্র্যাড দ্বিতীয় বর্ষ- একবার নানার গাড়িতে বসে তার পরিচিত কোনো একজন তাকে একটা কাজের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা সেধেছিলেন (প্রেসক্লাব থেকে বাড়ি ফেরার সময় নানা প্রায় প্রতিদিনই নানারকম মানুষজনকে লিফট দিতেন)।

নানা ওই মানুষটিকে তৎক্ষণাৎ- তখন রাত সাড়ে দশটার বেশি- মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে বের করে দিলেন। বাংলাদেশে যৌবন থেকেই সাংবাদিকতাকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করেন এমন মানুষ অসংখ্য, আর আমার নানা ৭০ বছর বয়সেও- যখন তিনি ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক- চলেছেন রিকশায়। শরীর সায় দিচ্ছিলো না ব’লে তার ৭১তম বছরে জোর করে সেকণ্ডহ্যাণ্ড গাড়িটি কেনানো হয়। হিসেবি মানুষও ছিলেন বটে; তবে কোনো কোনো সময় একটু বাড়াবাড়িই করতেন- বোধহয় স্বভাব-বাম ছিলেন বলেই।

12006699_455626827972852_4969474820057353103_o

নানা এবং তার অগ্রজ আহমেদুর রহমান (ষাটের দশকের ইত্তেফাকের ‘ভীমরুল’, ৬৪’র দাঙ্গাকালে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ ইশতেহারের রচয়িতা ও ছায়ানটের পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের একজন) সাংবাদিকতা শুরু করেন ষাটের শুরুর পর্যায়ে- যখন বাঙালি মুসলমানেরা বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা, সাংবাদিকতাসহ বৌদ্ধিক প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করছিলেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের তারকাতুল্যদের সান্নিধ্যে তাঁরা এসেছিলেন, একই সঙ্গে নিজেদের সৃষ্টি ও মননের প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন। আহমেদুর রহমানের অন্যতম সেরা লেখাগুলো যখন প্রকাশিত হচ্ছিলো এবং তিনি মনন ও সৃষ্টিচেতনার উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছিলেন, তখন ৬৭’তে কায়রোয় বিমান দূর্ঘটনায় তার আকস্মিক প্রাণাবসান ঘটে।

নানাভাই তখনও ইত্তেফাকে আসেননি, এবং সংবাদজগতেও খুব বেশিদিন হয়নি তার; এমনাবস্থায় তিনি পুরো পরিবারের হাল ধরেন। ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ জীবনে এ কারণে তাকে বেশ কিছু বড়ো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো, যার কিছু কিছু আমি গত কয়েক বছরে শুনি। ৭০’ ও ৮০’- এ দু’টো দশক ছিলো নানার সাংবাদিকতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময়কাল। আগেই লিখেছি, তাদের সময়ের স্টাইল মেনে তিনিও ছদ্মনামে লিখতেন, বোধকরি সে কারণে তার সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মগুলোর কাছে তিনি স্বল্পপরিচিত রয়ে গেছেন।

নানার লেখা কলামের অনেকগুলো দুটো বইয়ে সংকলিত- ‘ঘরে বাইরে’ (এ নামে তিনি কলাম লিখতেন) আর ‘দারিদ্র্য ও মানবতা’। অনেক বছর মফস্বল সম্পাদক থাকবার কারণে কি-না এ কলামগুলোর একটি বড়ো অংশ গ্রামীণ জীবন, ঘটনাবলি ও গ্রামীণ সমস্যা নিয়ে। কিছু লেখা ছিলো শহুরে মূল্যবোধ ও সুবিধাবাদী নাগরিক চরিত্রের বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। আমি তার লেখা পড়ার সময় প্রায়ই উপলব্ধি করি যে এগুলো সরলার্থে সাংবাদিকসূলভ লেখা নয়; বরং একজন চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক ও সমালোচকের ছায়া দেখি।

11415471_416434211892114_8879612316757450267_o

নানার লেখা অনেক কলামকেই সংহত বা ‘ক্লাসিক্যাল’ ধারার প্রবন্ধ বললে অত্যুক্তি হবে না। লেখার একটি বিশেষ স্টাইল ছিলো তার- সাধারণত একটি ঘটনা বা রম্য বা কবিতার পংক্তি বা ধাক্কা দেয়ার মতো কোনো লাইন দিয়ে তিনি শুরু করতেন। একই কলামে লেখার ধরনে থাকতো বহুমাত্রা- প্রবাহ কখনো ধীর ও উদাস, তারপর খুব দ্রুতই হয়ে উঠতো ধারালো ও শ্লেষাত্মক। এবং ছিলো ষাটদশকি বিশেষ ভাষিক প্রকাশভঙ্গি।

পারিবারিকভাবে তিনটি বৈশিষ্ট্য আমরা তার নাতিরা সকলেই কমবেশি পেয়েছি- কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল গুণ, চিন্তায় ভারীত্ব ও স্বভাবাভিজাত্যবোধ এবং মেজাজ ও কোমলতায় মেশানো চরিত্র। এই শেষেরটির কারণে নানাকে বেশ বর্ণিল মনে হতো; ড্রাগনের মতো মেজাজ ছিলো তার আগেই বলেছি- কিন্তু সম্ভবত সেটি ছিলো বাহ্যিক খোলস মাত্র। অস্বীকার করার উপায় নেই যে তার এই ভারিক্কি চারিত্র্য একধরনের অভেদ্য দেয়াল তৈরি করেছিলো, ফলে তিনি সহজে নিজের অভিব্যক্তিগুলো পরিবারের কাছে প্রকাশ করতেন না (শেষ কয়েক বছর অবশ্য তিনি আমার মা’র কাছে নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করতেন অকপটে)।

ছোটো দুই নাতি শেষের বছরগুলোতে ছিলো তার অন্যতম প্রিয়; এদের সান্নিধ্যে অনেকসময়েই তার ভেতরের অনেকটা শিশুর মতোই নরম মানুষটি দেখা দিতো। গত ১০ বছর ধরে একটা বিষয় ছিলো বাধা- প্রায় প্রতিদিন তিনি তার ছেলেমেয়েদের- সকলকে না পারলেও অধিকাংশকে- একবার করে ফোন করছেন। তাদের খবর নিচ্ছেন। আমাদের বাসায় প্রতিরাতে ফোন করতেন (যদিও তার ফ্ল্যাটের ঠিক উপরেই আমরা থাকতাম) তিনটি বিষয় জানার জন্য- ‘কেমন আসো তুমি?’, ‘কোনো অসুবিধা আছে নি?’, ‘কোনো অসুবিধা নাই তো?’। এক বছর হয়ে গেলো তার দৈহিক প্রস্থানের-  এই প্রশ্নগুলো এখনো আমার কানে বাজতে থাকে যখন তখন। তার অভ্যন্তর ছিলো গাম্ভীর্য, সারল্য ও কোমলতার মিশ্রণ।

ফলে আমি তাকে বুঝতে পারতাম এবং একইসঙ্গে পারতাম না। নানার অতীত পূর্ণ দারিদ্র্য, ট্রাজেডি ও আয়রনিতে, কিন্তু তিনি একই সময়ে ছিলেন মেধাবী, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং জাগতিক বিষয়াবলিতে কিছুটা খেয়ালি। হতে পারে আপাতভাবে এ জটিল মানস তার আশপাশে একরকম বহু তৈরি করে রাখতো, যা সকলের পক্ষে ভেদ করা সম্ভব হতো না।

নানার সারল্য ও সততার সুযোগ অনেকেই নিয়ে পেশাগতভাবে লাভবান হয়েছে, যদিও তাতে তার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে শেষ ৫-৭ বছরে নানা অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। একটা বিশেষ বয়সের পরপর সম্ভবত নানা বুঝতে পেরেছিলেন যে এখন আর পেরোনোর কিছু নেই; এখন থেমে যেতে হবে, সরে আসতে হবে। এই বোধ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে-অন্তত আমি দেখি-বিরল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের বিকার সাধারণত বাড়তে থাকে। বোধহয় এটাও আরেকটা কারণ ছিলো- পরিপার্শ্ব ও কর্মক্ষেত্রে কনিষ্ঠাসমান মেরুদণ্ডের মানুষজনের ভীরে নানা ক্লান্ত-পীড়িত হয়ে পড়েছিলেন। তাকে আমি দেখেছি ভোরে বিছানায় হেলান দিয়ে চা পান ও পত্রিকা পড়তে; রোদ গাঢ় হলে বারান্দার চেয়ারে এসে বসতেন, মানুষজন দেখতেন, ভাবতেন (আমার মা ছিলেন তার সেসব ভাবনার প্রথম শ্রোতা)। এটা তার ভালো লাগতো। কিছুক্ষণ ঘুমোতেন, এরপর দুপুরের আহার, এরপর প্রেসক্লাব। শেষ তিনমাস বাদে এইভাবে চলেছে এর আগের ৫-৬ বছরের প্রতিদিন।

তার প্রতিটি নাতি/নাতনি কিছু জিনিস শুরু থেকে পেয়েছে- নিউজপ্রিন্ট প্যাড (শৈশবে আমি এই প্যাড লেখার আগে খুঁজতাম। নানার লেখার ইউনিক ধরন ছিলো- একধার থেকে পাতার সমান্তরালে লিখতেন না, লিখতেন নিউজপ্রিন্টের মাঝবরাবর- ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে অল্প কয়েক লাইন।), ‘ইত্তেফাক’ ছাপ দেয়া যেকোনো কলম এবং প্রতিরাতে ফেরার সময় আনা চকোলেট/মিষ্টি/বিস্কিট/চিপস। বারো নাতি-নাতনির কেউ বাদ যায়নি, সিগারেটের পাশাপাশি এই একটা অভ্যাসের কোনো অন্যথা গত ২০ বছরে একটি রাতেও হতে দেখিনি। কোনোরাতে আনতে ভুলে গেলে- আবার ফেরত গিয়েছেন দোকানে। ভোরে চলবে না, রাতেই তার দেয়া চাই- এমনকি একটা লজেন্স হলেও। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াবস্থায়ও বহুদিন ভোরে তার বাসায় গিয়ে গতরাতের আনা চিপস/মিষ্টির প্যাকেট উধাও করে দিয়েছি।

তার বাসায় ঘরটির কোনো পরিবর্তন হয়নি, আলমিরাতে শার্ট-প্যান্ট, তাকের উপর তার জিনিশপত্র-ওষুধ আর বারান্দার চেয়ার- যেখানে যা ছিলো তা সেখানেই আছে, যেনো রাতে তিনি ফিরলেই হাতের কাছে সব পান। এটা প্রতীকী, কিন্তু এর থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্তপ্রবাহ। মানুষের দৈহিক প্রস্থান কেবল একটি ঘটনামাত্র বলে আমার মনে হয়; কিন্তু জীবনপ্রবাহ অসীম।

পারিবারিক রক্তের ব্যাটন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই রক্তের বৈশিষ্ট্যগুলো সনাক্ত করতে পারা। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার প্রস্থানের পর দুঃখবোধ বা হাহাকার করিনি (যদিও আবেগাপ্লুত হওয়া থেকে বিরত থাকা ছিলো কঠিন), কারণ বাস্তবতা হলো তার বা তার অগ্রজ বা সামগ্রিকভাবে তার পূর্বসুরিরা আমাদের শরীরে ভিন্নভাবে উপস্থিত। হয়তো ছ’ফুট লম্বা সেই মানুষটিকে আর দেখা যাবে না, কিন্তু আমাদের কারোর রূপে তার/তাদের সত্তা যে দেখা দিবে না- তা কে বলতে পারে?

লেখক: সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের দৌহিত্র(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)

 


সর্বশেষ

আরও খবর

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট