Tuesday, July 12th, 2016
ক্ষণিকের স্মৃতি, মহাকালের আবেগ
July 12th, 2016 at 7:48 pm
ক্ষণিকের স্মৃতি, মহাকালের আবেগ

সার্জিল খান: 

পরিচয় পর্ব: প্রায় প্রতিটি উঠতি লেখকের জীবনেই অনেক সংগ্রাম, অবজ্ঞা, লাঞ্ছনা সহ্য করে তাদের লেখকী জীবন শুরু করতে হয়। আমিও তাদের দলের ব্যতিক্রম নই। ২০১৩ সাল। সে বছরই আমার প্রথম একক উপন্যাস প্রকাশিত হয় কোন এক নতুন প্রকাশনী থেকে। সে প্রকাশনী থেকেই ২০১৪ সালে বই বের করার আশ্বাস দেন সে প্রকাশনীর প্রকাশক। সেভাবেই এগুচ্ছিলাম। কিন্তু যখন পাণ্ডুলিপি জমা দেয়ার সময় চলে এলো ডিসেম্বরে, তখন সেই প্রকাশক বলে বসলেন টাকা ছাড়া তিনি বই প্রকাশ করবেন না। আমিও তার কথা দিয়ে কথা না রাখার মানসিকতায় স্তব্ধ হয়ে গেলেও তা প্রকাশ না করে সুন্দর করে চলে এলাম তার থেকে। তিনি যদি বই প্রকাশের জন্য পয়সা কড়ি খরচ করতেই বলতেন, তা তিনি আগে থেকেই বলতেন, শেষ মুহূর্তে এসে হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, এই শেষ মুহূর্তে কেউ আমার পাণ্ডুলিপি নিবে না, ঘুরে ফিরে তার কাছেই আসতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে তিনি এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কথা দিয়ে কথা না রাখা লোকেদের সাথে আমার কেন যেন দ্বিতীয়বার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে না। মোটামুটিভাবে বিদায় নিয়েই তাকে এড়িয়ে চলতে লাগলাম।

এদিকে আমার অবস্থা বেশ শোচনীয়। একদিকে মান সম্মান রাখার ভয়। প্রচ্ছদ করিয়ে নিয়েছিলাম মোর্শেদ মিশু ভাইকে দিয়ে। সবাই জেনেও গিয়েছে এ বছর আমার উপন্যাস আসবে। এদিকে এটাও সত্যি এরকম শেষ মুহূর্তে কোন প্রকাশকই আমার বই নিবেন না। এদিকে টাকা দিয়ে বই ছাপানোর পক্ষপাতীও আমি নই। নেহায়েত বাধ্য হয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে একজন সিনিয়র লেখিকা আপুকে বললাম, কোন একটি প্রকাশনী থেকে বই বের করার ব্যবস্থা করতে। তিনি হুম দেখি, কি করা যায় এরকম গড়িমসি করতে করতে একসময় আমার ফোন ধরা, মেসেজ সীন করাও বন্ধ করে দিলেন; সোজা কথায় আমাকে এড়িয়ে চললেন। ডিসেম্বরেরও শেষ দিক। শেষ পর্যন্ত হাবীব স্যারকে বলবো বলবো করেও বলিনি, কারণ স্যারের থেকে আমি ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কখনো কোন আবদার নিয়ে যাইনি। তাই যখন কোন উপায় না দেখে ভাবছি স্যারের কাছে যাবো কি যাবো না, তখন হঠাৎ করে শাহরীয়ার শরীফ ভাইয়ের কথা মনে পড়লো, উনাকে ফোন দিয়ে বললাম আমার দুরাবস্থার কথা। উনি জাগৃতি প্রকাশনীর দীপন ভাইয়ের সাথে কথা বলবেন বলে জানালেন। সন্ধ্যা বেলাতেই শাহরীয়ার ভাইয়ের মেসেজ এলো ফোনে। একটা নাম্বার। উনি সব বলে রেখেছেন, কালই যেন শাহবাগের আজীজ মার্কেটে দুপুর দুইটার পরে যাই পাণ্ডুলিপি নিয়ে।

বেশ কিছুদিন চাপে থাকলে মানুষের আনন্দ অনেকটা ডানা ঝাপটানো পাখির মতো হয়ে যায়। আমিও তেমনই বোধ করতে লাগলাম। শীতের রাত। অল্পতেই ঘুমিয়ে পড়ি, সেরাতে ঘুম আসলো না।

পরদিন নির্ধারিত সময়েই আজীজ মার্কেটে গিয়ে জাগৃতির অফিসের সামনে দাঁড়ালাম। ভেতর থেকে বন্ধ। ফোন দিয়ে বললাম, আমি সার্জিল, শাহরীয়ার ভাই আসতে বলেছিলেন। ভেতর থেকে কেউ একজন দরজা খুলে দিলেন। ভেতরে ঢুকলাম, তিনিও ঢুকলেন। ঢুকেই সরাসরি তার ডেস্কে বসে কাজ করা শুরু করে দিলেন। এই দৃশ্যর সাথে আমি আরো বেশ কয়েকবার পরিচিত হবো।

কিছুক্ষণ কাজ করার পর আমার দিকে চেয়ার ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন।

– আপনিই সার্জিল?
– জ্বি।
– আপনাকে আরেকটু বয়স্ক, ভারিক্কী মনে করেছিলাম। কিন্তু দেখি নেহায়েতই বাচ্চা ছেলে।
          এটুকু বলে তিনি মৃদু হাসলেন। আমিও তার সাথে সাঁয় মিলিয়ে হাসলাম।
– জ্বি, আমার বয়স খুব বেশি না। আমাকে তুমি ডাকতে পারেন।
– তা ডাকা যাবে। তো চা চলবে কি?
– জ্বি চলবে।
          তিনি ফোন দিয়ে চা আনাতে বললেন। কিছুক্ষণ পর চা চলে এলো। এই চায়ের সাথে আরো বহুবার আমার সাক্ষাৎ হবে। চা চলে আসার পর তিনি বেনসনের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করলেন। আমি চুমুক না দিয়ে বসে আছি। তিনি হয়তো ব্যাপারটা লক্ষ করলেন, সিগারেট মুখে নিয়ে বলতে লাগলেন,

– স্মোক করলে ধরান, কোন হেজিনেট ফীল করবেন না। ধরান।

          আমিও সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সিগারেটের সাথে চা খেতে লাগলাম। একটু পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

তো আপনার কি আগে কোন বই বের হয়েছিলো?
– জ্বি।
          এ বলে আমি তার দিকে রঞ্জিত জননী বইটা এগিয়ে দিলাম। তিনি কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখলেন।

– আচ্ছা আমি পরে পড়ে দেখবো। তা একটা প্রশ্ন করি, হঠাৎ করে প্রকাশনী চেঞ্জ করার প্রয়োজন পড়লো কেন?

আমি তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সবকিছুর শেষে তিনি পাণ্ডুলিপি চাইলেন। আমি পাণ্ডুলিপি বের করে দিলাম। তিনি পুরোটা ফাইল সময় নিয়ে পেজ সেটআপ দিলেন। ঘন্টাখানেক পরে তিনি বললেন, 

পুরো বইয়ের সাইজ হয় পাঁচ ফর্মা। এরপর তিনি একটা টাকার অঙ্ক বললেন, আমি বুঝতে পারলাম, তিনি কি বলতে চাইছেন। মনে মনে কিছুটা ক্ষোভ পেয়ে গেল। ছোট প্রকাশকেরা নাহয় টাকা চাইতে পারে, তাই বলে বড় প্রকাশকেরা চাইবে কেন? তাহলে ছোট প্রকাশক আর বড় প্রকাশকের মাঝে পার্থক্য থাকলো কি?
তার কথার অর্থ বুঝতে পেরে বললাম,

– ভাই, তাহলে মনে হয় আপনার সাথে এবার কাজ হচ্ছে না। কারণ আমি এ মুহুর্তে কোন ধরণের পয়সা কড়ি খরচ করার মতো অবস্থায় নেই। ভালো হয় আমি চলে যাই। তবে আমি পাণ্ডুলিপিটা রেখে গেলাম। আপনি পড়ে দেখবেন দয়া করে। যদি ভালো লাগে, আর আপনি মনে করেন, এটা ছাপালে আপনার কোন ক্ষতি হবে না, তাহলে যেকোন সময় আমাকে জানাতে পারেন। আমি অপেক্ষায় রইলাম।

– এ্যাজ ইওর উইশ।  

এ বলে সেদিনের মতো চলে এলাম। বাসায় বসে উদাস হয়ে বসে আছি। কারোর ফোন ধরছি না, ফেসবুকেও বসা হচ্ছে না, কারোর সাথে কথাও বলা হচ্ছে না। মোটামুটি ধরেই নিয়েছি এ বছর কোন বই বের হচ্ছে না আমার। তাই সবার থেকে মেলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দূরত্বে থাকবো বলেই সিদ্ধান্ত নিলাম।

কিছুদিন পর সন্ধ্যায় একটা ফোন কল আসলো আননোন নাম্বার থেকে। আননোন নাম্বারের কল রিসিভ করি না। বেশ কয়েকবার কল করার পর বিরক্তভরা কণ্ঠে কথা শুরু করলাম,

– হ্যালো-
– হ্যাঁ কে?
– সার্জিল, মন খারাপ।
– কে আপনি?
– আমি দীপন।
– ও দীপন ভাই, কেমন আছেন? বলেন।
– কি মন খারাপ কেন?
– মন খারাপ না। বলেন।
– কাল অফিসে আসতে পারবে দুইটার পর?
– জ্বি পারবো।
– তাহলে অফিসে চলে এসো। রাখি।

          পরদিন সময়মতো অফিসে গেলাম। অফিসে ঢোকার পর তিনি বললেন,

– লাঞ্চ করেছো?
– না। করে নিবো।
– চলো লাঞ্চ করে আসি।
– না থাক ভাইয়া, অন্য আরেকদিন।
– আমি লাঞ্চ করবো, তুমি ঘোরাঘুরি করবা, ব্যাপারটা ভালো লাগবে না আমার কাছে। চলো।
– আচ্ছা চলেন।

          এরপর আমরা গেলাম দ্বিতীয় তলার পেছনের দিকের হোটেল গুলোর দিকে। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে বসে পড়লাম। খেতে খেতে তিনি বললেন,

– তোমার লেখাটা পড়লাম।
– কেমন লাগলো?
– কেমন লাগলো তা বলবো না। তবে একটা ডিসিশান নিয়েছি।
– কি?
– তুমি বইটার জন্য কি রকম প্রমোটিং করতে পারবা?
– আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ প্রমোটটাই করবো।
– কিভাবে?
 আমার আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ফেসবুকের ফ্রেন্ড, ব্লগে পোস্ট দিয়ে যতটা সম্ভব করবো।
– এতে কেমন বিক্রি হতে পারে বইটা?
– একশো কপির মতো।
– আচ্ছা। তবে কথা এটাই রইলো, বইয়ের প্রমোটিংয়ের দিকে যেন কোন অযত্ন অবহেলা না হয়।
– সে দিক নিয়ে আপনি টেনশন ফ্রি থাকেন।  

খাওয়া দাওয়া শেষে সেদিনের মতো চলে এলাম। তিনি আর কোন কথা বললেন না। প্রচ্ছদটা তার বোধহয় ভালো লাগেনি। তাই প্রচ্ছদ নিয়ে কয়েকবার এডিটিং করতে বললেন, আমিও মিশু ভাইকে কয়েকবার প্রচ্ছদ নিয়ে কাজ করতে বললাম। শেষ পর্যন্ত একটা অবস্থায় গিয়ে পৌছালো। এরপর একেবারে নিশ্চুপ কাটলো কয়েকদিন। মেলা পর্যন্ত। মেলার প্রথম দিনে গিয়েই দেখি জাগৃতির স্টলে আমার বই ঠাই পেয়েছে। অনেকটা ক্ষন তাকিয়ে রইলাম স্টলের দিকে। এই বইটি ঘিরে কতই না অভিজ্ঞতা হল।

মেলা চললো মেলার মতো। আমি আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের মেলায় যেতে বলি, তারাও অনেকে যায়। কেউ বই নেড়েচেড়ে দেখে। কেউ কিনে কেউ কিনে না। ফেসবুকেও পোস্ট দেই, ফেসবুকের বন্ধু-বান্ধবদের যেতে বলি, কেউ যায়, কেউ যায় না, কেউ কিনবে কিনবে করেও কিনে না। আবার অপরিচিত কেউ এসে কিনে নিয়ে যায়। ভালোই লাগে। এভাবে দেখতে দেখতে মেলার শেষদিন চলে এলো। স্টলে থাকা রায়ান ভাই মারফত জানতে পারি, পরপার আড়াইশো কপির মতো চলে গিয়েছে। আমি রীতিমত অবাক। আমার মতো চুনোপুটি লেখকের বই এতগুলো কপি গেল কিভাবে? রায়ান ভাই আর আমি চা খেতে বাইরে বের হলাম। রায়ান ভাইয়ের তাড়া ছিলো বোধহয়, তিনি চা খেয়েই দ্রুত চলে গেলেন। আমি তখনো হাল্কাপাতলা নাস্তা করার জন্য বসে আছি। এমন সময় এজি ভাই, রণক ভাই চলে এলেন। সাথে সাথে বেশ কয়েকজন প্রকাশকও ছিলেন। ছিলেন দীপন ভাইও।

আমি ও সাথে আমার কয়েকজন লেখক ভাই বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আইস্ক্রীম খাচ্ছিলাম। প্রকাশকেরা খাওয়াচ্ছিলেন। যার যার বইয়ের প্রকাশকেরা পরবর্তী মেলার জন্য আগাম পাণ্ডুলিপির জন্য লেখায় হাত দিতে বললেন। সবার মুখেই বেশ হাসিখুশির ছাপ। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার রেসাল্ট দেয়ার পর ফার্স্ট, সেকেণ্ড, থার্ড বয়দের মুখে রেসাল্ট কার্ড নিতে যাওয়ার যে রকম আনন্দ হয়, তাদের মুখে সেরকম আনন্দ। সব প্রকাশকেরা যার যার কাঙ্ক্ষিত লেখকদের কাছে পাণ্ডুলিপি চেয়ে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে জাগৃতি প্রকাশনীর দীপন ভাই ফিরে এসে বললেন,

– সার্জিল আমাকে নেক্সট ইয়ার কি দিবা?
– পরপারের মতোই কি চান না কি ভিন্ন কিছু?
– একটু ডিফরেন্ট, ভৌতিক বা রহস্য টাইপের কিছু হলে ভালো হয়।
– কত দিনের মধ্যে চান?
– বাব্বাহ! তুমি কতদিনে পারবা?
– চারদিন।
– চারদিনে লেখা কোন বই কি ভালো হবে?
– পরপার সাড়ে তিন দিনে শেষ করেছিলাম রঞ্জিত জননী তিন বছরে।
– তোমার কি প্লট রেডি?
– জ্বি, প্লট আছে মাথায়।

আমি তাকে পুরো প্লট পড়ে শোনালাম। শুনে তিনি বললেন,

– ওকে, গো এহেড। তোমার কাহিনীগুলো একটু ভিন্ন ধাঁচের হয়, ভালো লাগে। এটাও মনে হয় ভালো হবে। 

আমিও পরীক্ষায় পাশ করা স্টুডেন্টদের মতো সেদিনের মতো মেলা থেকে বাড়ি ফিরলাম। পরপার সে বছর আড়াইশো কপির মতো বিক্রি হয়। এই পরপার লিখেই দীপন ভাইয়ের স্নেহতলে যেতে পেরেছিলাম, তার ভরসায় জায়গা করে নিতে পেরেছিলাম, পাঠকরাও এই পরপার পড়েই আমাকে সার্জিল নামে চিনেছে। এই পরপারের সাথেই জড়িয়ে আছে কত না স্মৃতি, কেবল মাত্র এই পরপার এর পাণ্ডুলিপিই মাত্র সাড়ে তিনদিনে শেষ করতে পেরেছিলাম, যা অন্য কোন লেখাই এত অল্প সময়ে শেষ করতে পারিনি। পরপারের কাহিনী নির্বাচনও ছিলো আমার প্রিয় ছোটখালার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। এই পরপার এর পাণ্ডুলিপি জমা দিতে গিয়েই আমি চিনেছি প্রকাশকদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু ব্যতিক্রম ধর্মী আচরণ, কাছের মানুষদের মেকী আচরণ। আবার এই পরপার উপন্যাসটি পড়েই প্রকাশকরাও আমাকে চিনেছেন। এক কথায়, পরপার আমার জীবনের এক তিক্তমধুর অধ্যায়।

স্নেহতলে যাওয়া: 

মেলা শেষ। লেখালেখির জন্য অখণ্ড অবসর। পড়াশোনার জন্যও তেমন চাপ নেই। রোযার ঈদের পর নতুন উপন্যাস লিখার জন্য ময়মনসিংহে চলে গেলাম। গিয়ে এক সপ্তাহের মাঝেই পুরো উপন্যাস নিয়ে ফিরলাম। ফিরেই দীপন ভাইকে মেইলে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম। এবার দীপন ভাই একটু মনঃক্ষুণ্ন হলেন বোধহয়। বলেই ফেললেন,

– এটা পড়ে পরপারের মতো ফিলিংস আসলো না।
– এটা যে ভৌতিক উপন্যাস।
– ঠিক আছে, তবে তোমার যে ধাঁচ, সে ধাঁচের সাথে গেলো না। আরো অনেক এডিট করতে হবে।      
– জ্বি আচ্ছা দিন, এডিট করেই জমা দিবো।  

দিনা দশেক গেল। এডিটেড কপি নিয়ে আবার গেলাম। তিনি আবারো মনঃক্ষুণ্ন হলেন। এবার যেন একটু বিরক্ত মাখা কণ্ঠেই বললেন,  

– এডিটও তো ঠিক মতো করোনি। গল্প আরো দুইটা কমিয়ে দুইটা ঢুকিয়েছো। আরো গল্প বাদ দিতে হবে। এটা তো এমন না যে কোন উপন্যাসের ফ্লোতে গল্প চলছে। এক একটা চ্যাপ্টার এক একটা ইন্ডভিজ্যুয়াল গল্প। তা তুমি এ্যাট্রাক্টিভ কোন কাহিনীর গল্প নিয়ে ঢুকিয়ে দেও।
– জ্বি আচ্ছা চেষ্টা করবো।  

এবার কয়েকমাস পরে গেলাম দীপন ভাইয়ের কাছে। এবার কিছুটা স্বস্তির পলক ফেললেন।  

-হ্যাঁ এবার চলে। কিন্তু কভারটা তেমন পছন্দ হলো না। আচ্ছা তুমি যাও, সবকিছু রেডী হলে তোমাকে জানাবো।  

এরপর কোন একটি কারণে হুট করে একদিন দীপন ভাই ফোন করে বলে বসলেন, তিনি আমার এই বইটি করবেন না। আমি রীতিমত হতভম্ব হয়ে গেলাম সবকিছু ঠিক ঠাক, এরমাঝে তিনি হঠাৎ করে বলছেন, এবার বই করবেন না। অনেক অনুরোধের পর তিনি আজিজ মার্কেটে একদিন দেখা করতে বললেন।  

যেদিন দেখা করতে যাওয়ার কথা, সেদিন আমি কিডনী বিকল হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পড়লাম। এক সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলাম। সেসময় লেখালেখির জগতের কোন লেখক ভাই-বন্ধু বা প্রকাশকেরা ফোন দিয়ে কোন খোঁজ খবর নেয়নি। শুধুমাত্র দীপন ভাই আর বর্ষাদুপুর প্রকাশনীর তন্ময় ভাইয়া ছাড়া। দীপন ভাই ফোন দিয়ে বললেন,  

– সার্জিল এখন কেমন আছো?
– আগের চেয়ে একটু সুস্থ।
– পুরোপুরি সুস্থ হলে অফিসে এসো। কথা আছে।
– জ্বি আচ্ছা।  

সুস্থ হয়ে পড়লাম। তবুও বাসায় বেডরেস্টে ছিলাম ডিসেম্বরের পুরোটা জুড়েই। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে জানুয়ারিতে প্রথম বাসা থেকে বেড়িয়েছি। শুক্রবার দুপুরের ঘটনা।   

তিনি আমার দিকে একটা প্রিন্টেড ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন,  

– প্রুফ দেখে নেও তো ঠিক আছে কি না?
    আমি অবাক হয়ে বললাম,
-আপনি না বলেছিলেন, আমার বই করবেন না। তা হঠাৎ আবার করবেন যে?  

এরপর তিনি সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললেন। একান্তই ব্যক্তিগত হওয়ায় ঘটনাটা শেয়ার করলাম না। কিছু কথা একান্তই গোপন থাক। সবশেষে তিনি বললেন,  

– তুমি ছোটভাই মানুষ, না বুঝে ভুল করেছো, বুঝলে তো আর করতে না। তবে ভবিষ্যতে শুধু আমার সাথেই না, কারোর সাথেই যেন ভুলটা না হয়।
-জ্বি আচ্ছে।  

এই বলে আমি প্রুফ কপি দেখতে লাগলাম। জুম্মা নামাজের আর কিছুক্ষণ বাকী। মেলার আছে আর অল্প কয়দিন, ব্যস্ততার কারণে তাই দিন রাত তাকে অফিসেই থাকতে হয়। নামাজে যাওয়ার জন্য দীপন ভাই রেডি হচ্ছিলেন। মাথায় টুপি দিতে দিতে বললেন,

– চলো নামাজ পড়ে আসি।

        আমার কাপড় পাক ছিল না। তাই লজ্জার সাথেই বললাম,

– দীপন ভাই, কাপড় ঠিক নাই। আপনি যান।

        তিনি মজা করে হাসির ছলে বললেন,

– বাঁচবা আর কয়দিন। কিছু আমল কামাও।

আমি লজ্জার হাসি দিয়ে প্রুফ দেখতে বসলাম। তিনি নামাজে চলে গেলেন।  

তার সাথে শেষ মেলাঃ  

দেখতে দেখতে ২০১৫ মেলা চলে এলো। মেলার আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ উত্তাল। সবার মনেই শঙ্কা। মেলা এবার ঠিকমতো হবে তো? সব কিছুর অবসান ঘটিয়ে মেলা হল। কিন্তু সেই মেলায় যেন প্রাণ নেই। সবার মনেই গুপ্ত ভয়। এই বুঝি কিছু অঘটন ঘটে গেলো। তবুও মেলায় যাওয়া আসা কমালাম না। প্রায় নিয়মিতই জয়দেবপুর থেকে মেলায় চলে আসতাম। আসলে মেলার সময় মেলায় না গেলে কেন যেন কোন কাজে মন বসাতে পারি না। দীপন ভাই এ নিয়ে বেশ সাবধান করতেন।

এরই মাঝে একদিন “অভিজিৎ রায়” নামের কোন এক ব্যক্তিকে হত্যার খবর পেলাম। তার পরিচয় তিনি নাকি মুক্তমনা। প্রায় সব ধর্মের মানুষদের উষ্কে দিয়ে তিনি দুটি কি যেন বই লিখেছেন। দীপন ভাইয়ের বন্ধু হওয়ার সুবাদে তার প্রকাশনী থেকে সেই দুটো বই নাকি প্রকাশিত হয়েছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকেই। বাংলাদেশের উগ্রতা কোন দিক দিয়েই শুভ কিছু বয়ে আনে না, কি সেটা কাউকে উষ্কে দিয়েই হোক কিংবা উষ্কানিতে কাউকে হত্যা করেই হোক। অভিজিৎ রায় নামের সেই ব্যক্তিটি প্রথমত ভুল করেছেন উষ্কে দিয়ে, আরেকদল উষ্কে যাওয়া লোক সেই উষ্কানিতে তাকে হত্যা করেও ভুল করেছে। দেশে আইন রয়েছে, আমাদের সবার সেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিৎ।। কিন্তু দুপক্ষের কেউই যেন তা মানতে নারাজ।

যাই হোক, সেই অভিজিৎ রায় নামের কোন এক স্বঘোষিত মুক্তমনা ব্যক্তিটির মৃত্যুর পর সেই ঘাতক দলেরা একটা প্রাথমিক তালিকা তৈরী করলো আরো কাদের কাদের তারা হত্যা করবে। সেই তালিকায় দীপন ভাইয়ের নাম বেশ উপরের দিকেই। সেই তালিকার কথা জানতে পেরে বেশ চমকেই গেলাম। এখানে দীপন ভাই কি করলেন? তার কাজ বই প্রকাশ করা। তিনি সেই বই প্রকাশই করেছেন। ঘাতকদের যুক্তি, “উষ্কানিমূলক বই প্রকাশের জন্য তাকে হত্যা করা হবে।” কেন এমনটা হবে? তিনি একজন প্রকাশক। একজন প্রকাশক হিসেবে তিনি অনেক ধরণের বই-ই প্রকাশ করেছেন। রম্য, গোয়েন্দা, সায়েন্স ফিকশন, রহস্য, হরর, সামাজিক, গবেষনামূলক, প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়া, কমিক্স, কৌতুক এমনকি উনি তো ধর্মীয় বইও প্রকাশ করেছেন, এবং তার হাতে এখনও বেশ কিছু ধর্মীয় বই, নবীজী (সাঃ) কে নিয়ে বই প্রকাশের কাজও তিনি করছিলেন দেখছিলাম, তাহলে এ নিয়ে ঘাতকদের যুক্তি কি হতে পারে?

সেই তালিকায় তার নাম আছে থাকার পর মেলার শেষ দিন তাকে বলে এসেছিলাম সাবধানে থাকতে। তার মুখে সেই চিরচেনা হাসি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন ভয় দান বেঁধেছিল। ভরসা দেয়ার জন্য বললাম,

– দীপন ভাই, আল্লাহ যেদিন আপনার মৃত্যু লিখে রেখেছেন, সেদিন কেউ আপনার মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না। আর যেদিন লিখে রাখেনি, সেদিন শত চেষ্টা করলেও আপনার জীবন কেউ নিতে পারবে না। তাই কাজ কর্ম ফেলে রেখে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। স্বাধীনভাবে বাঁচুন।

          তিনি স্মিত হাসলেন।
মেলার শেষ দিন। শেষ মুহূর্ত। সবাই তখন স্টল গোছাতে ব্যস্ত। এমন সময় রকমারি ডট কমের কোন একজন কর্মচারী লেখক, প্রকাশক সবাইকে ফুল দিচ্ছিলো। দীপন ভাইকেও সেই ফুল দেয়া হল। দীপন ভাই সেই ফুল ভাবীকে দিয়ে দিলেন। ভাবী বললেন, স্মৃতি হিসেবে ছবি তুলে রাখা দরকার। আশেপাশে কাউকে না পেয়ে আমাকেই ভাবী বললেন, “সার্জিল আমাদের ছবি তুলে দাও তো।”  আমি সেই ছবি তুলে দিলাম। তখনও জানতাম না যে এই ছবি এত তাড়াতাড়িই এত কঠিন স্মৃতি হয়ে থাকবে আমাদের জন্য।  

স্তব্ধতার সেই দিন; যেদিন শুনি দীপন ভাই আর নেই:

এর মাঝে দেখতে দেখতে বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। কিডনীর, লিভারের সমস্যা, হাই ব্লাড প্রেশার, ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়া, চোখের অপারেশন, অস্ট্রিওপোরেসিস নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছি। অসম্পূর্ণ উপন্যাস “অদেখা” তখনও লেখা শেষ হয়নি। ছোটগল্প সমগ্র “পাণ্ডুলিপি” কোন রকমে লিখে শেষ করলাম ঈদের আগেই। দীপন ভাইকে বললাম তিনি এটি প্রকাশ করতে চান কি না? তিনি ছোটগল্পে আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। বললেন, “একবারে যেন অদেখা উপন্যাসটিই তাকে দেই।” তার কথা মতো সেভাবেই ভাবতে লাগলাম।

এরমাঝে এলো সেই ৩১শে অক্টোবর। সেদিন সকালে আজিজে যাওয়ার কথা ছিলো দীপন ভাইয়ের অফিসে। আলসেমি করে যাইনি। ভাইয়ের মেসে ছিলাম, মেসেই থেকে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, থাক পরে যাবো। দুপুরে খেয়ে দেয়ে ভাত ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার হবু স্ত্রী তানিয়ার বারোটি মিসকল, একটা মেসেজ। সেখানে লেখা, “শুনেছো, দীপন ভাইকে কারা যেন মেরে ফেলেছে।” প্রথমে তার কথাকে গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু পরে যখন একের পর এক ফেসবুকে বন্ধুদের পোস্ট, অনলাইন নিউজ পোর্টালে তার মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন নিউজ দেখতে থাকলাম, তখনও নিশ্চিত হইনি। এরপর জাগৃতি প্রকাশনীরই আরেকজন লেখক বন্ধু সময় টেলিভিশনের এজি মাহমুদ ভাইকে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হলাম যে দীপন ভাই আর নেই।

সত্যিই এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তিনি নেই। মনে হচ্ছে ডিসেম্বরে আলসেমি করতে করতে আজিজ মার্কেটে আবারো যাবো। ক্ষুধার্থ পেটে দুটো ডিমচপ কিনবো। একটা আমার জন্য, একটা তার জন্য। জাগৃতি অফিসে ঢোকার পর ডিমচপ একটা এগিয়ে দিব। তিনি দুটোই আমাকে খেতে বলবেন। কিছুক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করার পর বলবেন, “চলো সার্জিল লাঞ্চ করে আসি।”

দ্বোতলার সিড়ির কাছের হোটেল গুলোতে বসবো দুজন। খাবার আসতে আসতে বাসার খোজ খবর নিবেন। ভাত বাড়তে বাড়তে বলবেন, “শরীরের যত্ন নেও, এত অল্প বয়সেই এত অসুখ বাধিয়েছো কেন? একটু রয়ে সয়ে চলো।”

লাঞ্চ শেষে অফিসে আবার বসবেন। লেবুর চা, সাথে সামনে রাখা বেনসনের প্যাকেট। আনলিমিটেড সিগারেট। কাজ শেষে চলে যাবার আগে আবার বলবেন ভালো থেকো। রীতিমত অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিল এ ঘটনাগুলো গত দু বছর যাবত জাগৃতি অফিসে দীপন ভাইয়ের সাথে।

আবারো হয়তো আজিজে যাবো, অথচ কাছের বড় ভাইয়ের মতো লোকটাকে আর পাবো না। যিনি হাসিমুখে আমার বিরক্তিগুলোকে সহ্য করতেন।

এজি মাহমুদ, কেতন শেখ, স্বকৃত নোমান, আসমার ওসমান, রেজা আহমদ আমার এতগুলো প্রিয় লেখক কাম বড় ভাইদের সাথে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন দীপন ভাই। আমরা সবাই যেন আমাদের জাগৃতি পরিবারের অভিভাবককে হারালাম।

এতসব প্রিয় লেখকদের বই এখন কে প্রকাশ করবে? ওরা কি এটাই চেয়েছিল, আমরা সবাই গুটিয়ে যাবো, কোণঠাসা হয়ে পড়বো?

কিছুই মানতে পারছি না। অনেক স্নেহ করতেন আমাকে। আমার প্রথম বইয়ের প্রকাশক ও সাহস প্রকাশনী যখন নতুন লেখক হিসেবে দূর দূর করে অপমান করেছিলো, তখন আমার লেখক জীবনের দুঃসময়ে তিনি পাশে এসে দাড়িয়েছিলেন বড় ভাই হিসেবে। পরপার, অস্পৃশ্য প্রকাশ করেছিলেন। আমার মতো ঠুনকো লেখকের উপরেও ভরসা করেছিলেন। আজিজ মার্কেটে চা খেতে খেতে এরকমই এক শীতের সময় বলেছিলেন, “তোমাকে দিয়ে হবে। অনেক বড় লেখক হবে।” লেখালেখি, সম্পাদনা নিয়ে, প্রকাশনা নিয়ে অনেক জ্ঞানই পেয়েছি তার থেকে।

দীপন ভাই, আপনি ছাড়া এই প্রকাশনা জগতটা হঠাতই কেমন যেন ফাকা ফাকা লাগছে? শাহবাগে গেলে আর কার অফিসে আড্ডা দেয়ার জন্য ফোন দিলে কে ফোনে বলবে দুইটার পর আসো। জাগৃতির অফিসে গেলে কার সাথে বসে আর পরামর্শ আলাপ করবো।

বুঝতে পারছি না, কি হচ্ছে এসব। মেধাবীরা কোথায় যাবে? ৭১’ এ ১৪ই ডিসেম্বরের মতো আজীবন কি দেশটাকে কি ওরা মেধা শূন্য করেই ছাড়বে?

দীপন ভাই, একদল কুৎসিত মনের মানুষদের জন্য হয়তো আজ আপনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আপনাকে ভালোবাসার জন্য মানুষের অভাবও নেই। দূর থেকে হয়তো আপনি ঠিকই তা দেখছেন। যেখানেই থাকুন খুব ভালো থাকুন। সত্যিই হয়তো এই দেশ ভালো মানুষদের প্রাপ্য না।

sarzil khanলেখক: সাহিত্যিক 


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা