Tuesday, August 2nd, 2016
খুনির জবানবন্দী
August 2nd, 2016 at 2:01 pm
খুনির জবানবন্দী

রিক্সা ধরেছি দারোগা মোড়ে। পলিথিনটা ঠিকমত গায়ে জড়িয়ে দম ফেলার চেষ্টা করলাম।

‘ব্যাটা, কুন্ঠে য্যাবা কহনি তো?’ রিক্সাওয়ালা শফিক চাচা পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন।

‘চাচা, ঘাটে চলেন।’ জবাব দিই আমি।

ছোট্ট মফস্বল শহরের প্রায় সকলেই চেনাজানা। তাদের সকলকেই ‘আপনি’ এবং মধ্যবয়সী হলে চাচা সমন্ধ করি। ঢাকার মত রিক্সাওয়ালাকে ‘তুমি’ বলার সুযোগ নেই এখানে। করলে সেটা বেশ ‘বড়সড়’ অপমানজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

দুদিন ধরে এখানে ‘ক্যাটস এন্ড ডগস’  টাইপের বৃষ্টি। এক সেকেন্ডের জন্যেও থামেনি কুকুর বিড়ালের ঝগড়া। আর সেটাই বাগড়া হয়ে দাড়িয়ে সকল কাজে। বাসা থেকে বের হতে পারিনি এতটুকুও। এ ক’দিনের পুরোটা সময় কেটেছে বৃষ্টিতে ঘরে বসে।

হঠাৎ কলেজের দেয়ালে ওয়াল রাইটিংটা চোখে পড়লো। ‘একটি সুন্দর সকালের জন্য আমাদের সংগ্রাম।’ লেখাটা রনি রহমানের। আলকাতরায় গোটা গোটা হরফে বাংলা লেখা। নিচে ছোট করে ইংরেজীতে দুটো আর।

রনি আর আমি খুব ভাল বন্ধু ছিলাম। সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ নিয়ে দিনভর আলোচনা চলত আমাদের। এই শহরটা বদলানোর স্বপ্ন ছিল রনির। আর তাই শহরের অসংখ্য দেয়ালে সেসব স্বপ্নের- সংগ্রামের বাণী লিখেছিল ও। সেই স্বপ্নে সংগ্রামে সঙ্গী হয়েছিলাম আমিও।

গাঁ কাটা দিয়ে উঠল হঠাৎ।

ও ডাকছে।

‘এদিকে আয়।’

 

বৃষ্টিটা জোরেই নামল। রনি বৃষ্টি পছন্দ করত খুব। বৃষ্টি দেখলেই নেমে পড়ত হঠাৎ। কোথা থেকে আরো কয়েকজন জুটিয়ে নিত। বল না থাকলেও স্যান্ডেলকে ফুটবল বানিয়ে ফেলত। দারুণ সব ভাবনা ওর, হিংসে করার মত।

দমটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে। রিক্সার হুড ছেড়ে বের করে আনলাম মাথাটা। চোখে মুখে একটু পানি লাগুক, শান্ত হতে হবে।

চোখের সামনে সব ভেসে উঠছে স্পষ্ট হয়ে। মোড়ের কোনে একতলা অসম্পূর্ণ টিনের বাড়ি, বকুলের চায়ের স্টল, মহানন্দার পাড় আর ছটফটে রনি।

টিনের চালে বৃষ্টি, বাড়ির আঙ্গিনায় বৃষ্টি, নদীর জলে বৃষ্টি। হ্যা এরকম একটি বৃষ্টির দিনেই তো!

আমি কারো জন্মদিনেই কোন উপহার দিইনি কখনো। ওকে দিয়েছিলাম, একটা বই। সুনীলের লেখা। তারপর সেই বইটা নিয়ে পাঠচক্র হয়েছিল ১১ দিনের। অকল্পনীয় সব ভুল পয়েন্ট নোট করেছিল, ওর ক্ষুরধার বিশ্লেষণে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আর গোপনেই হয়েছিল ঈর্ষা।

কলেজের বাংলা বিভাগের তরু স্যার বলেছিলেন, ‘রনির কনাকড়ি গুণও তোমার মধ্যে নাই। কি করে খাবা?’ আমি জবাব দিইনি। গাঁ জ্বলে উঠেছিল।

শ্বাসকষ্টটা বেড়ে গেছে আজ। দমটা বন্ধ হয়ে আসছে। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইছে খুব। তবু বাতাসের অভাব মনে হচ্ছে।

ঘাটের দেড়গোড়ায় নেমে পড়েছি। এগোতে থাকি। শূণ্য ঘাট। নৌকার দেখা নেই। বাঁশের খুটি ধরে দাঁড়ালাম। পড়ে যাব মনে হচ্ছে। থরথর করে কাঁপছে দেহটা!

রনির দেহটাও থরথর করে কাঁপছিল। এমনই এক বৃষ্টির দিনে স্কুলের জলেপূর্ণ মাঠে জলের নিচে চেপে ধরেছিলাম ওকে। ও বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। ওর দৃঢ বিশ্বাস ছিল- অন্তত আমার হাতে মরবে না সে।

 

তুফান আসছে। মহানন্দার জল ঘুরছে। বারবার থরথর কেঁপে উঠছে দেহটা আমার। আর পারছি না। জলের ডাকে এগিয়ে যাই।

জল ঘুরছে। জলের মাঝেই ও ডাকছে।

‘আয় আয় আয় আয়।’

 

লেখক- সংবাদকর্মী

 

নিউজনেক্সটবিড ডটকম/এসপিকে


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা