Monday, October 24th, 2016
গল্পটা উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার এবং অসহায়তারও
October 24th, 2016 at 7:58 pm
গল্পটা উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার এবং অসহায়তারও

ওমর ফারুক: ভয়ে, উদ্বেগে নাকি উৎকণ্ঠায় কোন কারণে জানিনা, এতদিনেও কোন মানুষকে এমনভাবে এতটুকু হয়ে যেতে দেখিনি। শীতকালীন অবেলার বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা একজন মানুষ, একটু জায়গা পেলে যেরকম হাত-পা গুঁটিয়ে কুকুরের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে, মহিলার অবস্থাও তাই। মহিলাটি আমার পেছনের সিটের যাত্রী। সিটের উপর দু’পায়ের হাঁটু ভেঙে দু’হাত দিয়ে জাপটে ধরেছেন। মাথার ঘোমটা সামনের দিকে লম্বা করে বাড়িয়ে দেওয়া।

যশোর ছেড়ে আসা বাসটা ঢাকার দিকে রওনা হয়েছে ঘন্টা তিনের আগে। গোয়ালন্দ ঘাটে জ্যামে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা মধ্যদুপুর ছাড়িয়ে দু’টো ছুঁই ছুঁই করছে। আজকের রোদটা একটু বেশিই কড়া। যে গ্রামে আমার জন্ম সে গ্রামের লোকেরা এই ধরণের রোদকে বলে, শুঁটকি অথবা পাটখড়ি শুকানোর রোদ। আজকের রোদটা সত্যি সত্যি শুঁটকি শুকানোর মত।

জানালা দিয়ে উঁকি দিলে যতদূর দৃষ্টি যায়, বাসের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। সে সারি কবে নড়বে, বিধাতা ছাড়া আর কারো পক্ষে সেটা বলা সম্ভব নয়।ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসের যাত্রীদের তিতিবিরক্তি অবস্থা। সবাই শাপান্ত করছেন-ঠিক বোঝা যায় না, কার প্রতি এই শাপান্ত, ভাগ্যের প্রতি নাকি সরকারের প্রতি কে জানে! এখানেও যে আরেকটা পদ্মা সেতুর দরকার, এবং সেটা অচিরেই, এমন দরকারি মন্তব্যে সবাই একমত। সরকারের কান্ডজ্ঞানবোধ নিয়ে এঁরা নির্ভার নন। এমন দরকারি একটি কাজ ফেলে সরকার যদি আগডুম-বাগডুম প্রকল্পে মনোযোগী হয়, তাহলে সরকারের কান্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়! 

বাসের সবাই যখন নিজ নিজ অবস্থা নিয়ে কুপোকাত, তখনই প্রচার হয়ে গেল যে, আর সবার গন্তব্য ঢাকা হলেও আমার পেছনের মহিলাটির গন্তব্য ঢাকা নয়, বরং সৌদি আরব। সন্ধ্যায় ফ্লাইট, সাড়ে ৬ টায়। এতক্ষণ দেশ উদ্ধার করা মানুষগুলো দেশ ছেড়ে এবার বিদেশ নিয়ে পড়লেন। সবাই সবার সিট থেকে মাথা উঁচিয়ে দেখে নিলেন এক ঝলক, কোন সে হঠকারী আল্লাহ্‌র বান্দা, সময় সম্পর্কে যার এতটুকু দায়িত্বশীলতা নেই!

মহিলাটি যেন একজন দাগী আসামি। আর বাসের সবাই এক একজন ঝানু উকিল-প্রকাশ্যে একযোগে জেরা করার সুযোগ পেয়ে গেছেন সবাই।

‘আপনার ফ্লাইট সাড়ে ছ’টায় হলে আপনি কোন আক্কলে এখন বাইর হইসেন?’
‘আপনার তো আগের দিনই ঢাকায় থাকা উচিত ছিল’ 
‘আইজকে ভোরে রওনা দিলেও তো পারতেন’ 
‘কত টাকা দিয়ে বিমানের টিকিট কাটসেন?’
‘সাথে কে যাবে?’ 
‘ওখানে কি করেন?’ 

মহিলাটি নিরুত্তর। কোন প্রশ্নেরই জবাব নেই।

আজকের দিনের যত আলো সমস্তই যেন একজন খামোশ নিরুত্তর মহিলাকে এক বাস ভর্তি পরীক্ষকের সামনে শক্ত করে তুলে ধরবার জন্য পেয়াদাগিরি করছিল। মহিলাটির আর লুকোবার কোন জায়গা ছিল না। ঘড়িতে যখন দু’টো বেজে ২০ মিনিট, তখন বাসটি সামান্য একটুদূর এগিয়ে থেমে গেল। এদিকে মহিলার ফোন বেজেই চলেছে। সম্ভবত বাড়ি থেকে বার বার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বাসের সবাই মহিলাটির দুরবস্থার জন্য মুখে চুক চুক শব্দ তুলে নিজ নিজ জায়গায় ফিরে গেল।

আমি বাসের একমাত্র যাত্রী, কোন কথা না বলেই জেরা করার দৃশ্য দেখে গেলাম। আমি হাইকোর্ট নই, সুপ্রীম কোর্টও নই, উকিল তো নই-ই, কারো জীবনের ফায়সালা শোনানোর সাধ্য আমার নেই। আমি একজন সাইকোলজিস্ট। মানুষের মনসমুদ্রে ডুবুরীর মত ডুব দিয়ে তুলে আনি ভালোমন্দের এক একটি নির্যাস। আমি ধরার চেষ্টা করছি, কেমন লাগছে আমার পেছনের যাত্রীটির? কি চলছে তার মাথার ভেতর?  

এমন অনিশ্চয়তা নিয়ে কোন স্মৃতির জাবর কাটতে পারে একজন মানুষ? পথটা এত দীর্ঘ কেন? আজকেই জ্যামটা লাগতে হবে? এই দেশে এত জ্যাম কেন? সৌদিতে তো এত জ্যাম থাকে না? এত কম সময় হাতে নিয়েও তো সৌদিতে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি! এখন একটা মিরাকেল কি ঘটতে পারে না? আল্লাহ্‌ জ্যামটা ছাড়িয়ে দাও!

কাকে দোষারোপ করছেন তিনি? নিজের কান্ডজ্ঞানহীনতাকে নাকি এই বোবা খামোশিকে-যেটা চিবিয়ে খাচ্ছে ভেতরটাকে অথচ চিৎকার করে গোঙাতেও দিচ্ছে না?

অন্য আরেকজন মানুষের জুতা পড়ে তার অনুভূতিগুলো ধরার চেষ্টা করা সাইকোলজিস্টদের মজ্জাগত স্বভাব। এই মজ্জাগত স্বভাবটিই এখন আমার জন্য বুমেরাং হয়ে গেল। আমিও প্যানিক করা শুরু করে দিলাম। মাথার ভেতর অজস্র চিন্তা খাবি খাচ্ছে। যতই চেষ্টা করছি, বেত হাতে নিয়ে বদমেজাজি স্কুল মাস্টারের মত বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোকে ভয় দেখাতে, ততই তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠছে, বেশুমার বেসামাল হয়ে উঠছে। বেড়া যতই শক্ত এবং বুনিয়াদি হোক না কেন, ফাঁক পেলে ঝাঁক বেঁধে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে দুষ্টু ছেলের দল। এমন বেগতিক অবস্থা সামলানোর মত মানসিক স্থিরতা আমার ভেতর কোথায়?

পেছন থেকে আর কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনও আর বাজছে না। উকিলগুলোও নতুনভাবে কোন জেরা করছে না। সব শান্ত হয়ে গেছে। অশান্ত হয়ে আছে শুধু দু’জন। একজন প্রোটাগনিস্ট আর একজন এন্টাগনিস্ট। আমি এই ড্রামার একজন খুদে অবজারভার মাত্র।  ঘড়িতে তিনটা বেজে ১৩ মিনিট। এন্টাগনিস্ট সহায় হয়েছেন বোধ হয়। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। মহিলার অন্তঃকরণের উত্তেজনা আমিও নিজের ভেতর টের পাচ্ছি। প্রার্থনা করছি,এই যাত্রা যেন নিরবচ্ছিন্ন হয়।  ঘটুক আরেকটা মিরাকেল। বিমানে কোন সমস্যা দেখা দিক। দেরি হোক। ঢাকার রাস্তাগুলো স্বাভাবিক থাকুক। মহিলাটি পৌঁছে যাক বিমানবন্দরে।

ফেরি পার হতে সময় লাগলো আধা ঘন্টা। পাটুরিয়া ঘাট থেকে বাস ছাড়ল। ঘড়িতে সময় তিনটা ৪৫ মিনিট।  এখন চলতে থাকুক। হাতে সময় দুই ঘন্টা ৪৫ মিনিট। বুক ঢিব ঢিব করছে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছিল।  পাশের যাত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কি মনে হয়,উনি পৌঁছাতে পারবেন?’ ‘দেখা যাক’ আমার উত্তর।

বাসের ড্রাইভার আদাজল খেয়ে লেগেছেন। মাতাল হয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি হাঁকাচ্ছেন যেন। গাড়ির প্রচারের জন্য টিকিটে লেখা আছে, ‘সড়ক পথে বিমানের ছোঁয়া!’ তাই যেন হয়। একদিনের জন্যও যদি কতৃপক্ষ সেটা বিশ্বাস করে থাকে, তবে তাই হোক। যাত্রা বিরতি দিয়ে গাড়িতে তেল নেবার নিয়ম আছে। গাড়িসুদ্ধ সবাই ড্রাইভারকে থামতে নিষেধ করেছেন। ড্রাইভার মানবিকতার তোয়াজ করেন বোঝা গেল। সড়কপথে বিমান চালিয়েই গেলেন।

একজন অপরিচিতার উদ্বেগ সবার ভেতর কেমন করে যেন ছড়িয়ে গেল। সবাই অস্থির হয়ে উঠলেন। গাড়ি কেন আরো দ্রুতগতির বিমান হয়ে উঠছে না, এই প্রশ্ন সবার। আমি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি। পাশের যাত্রী পা নাচাচ্ছেন। তিনি অনেক কথা বলেছেন।  গলা শুকিয়ে গেছে। আমার পানির বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি গিললেন। কোন এক ফুরসতে আমি পেছনে তাকালাম। সেবারই প্রথম। একটা নিষ্পাপ মুখ। কি বেদাগ সেই চেহেরা! বুঝলাম,মহিলার উত্তেজনা সবার ভেতর ছড়িয়ে পড়াটা কোন মামুলি ইত্তেফাক নয়। এই আনজান মহিলা আমাদের নৈমিত্তিক অসহায়তার যূথবদ্ধ মুর্তিমুহুরি।

ঘড়িতে যখন পাঁচটা বেজে ৫০ মিনিট, তখন বিমান গাবতলীতে অবতরণ করেছে। হাতে সময় ৪০ মিনিট মাত্র! গাবতলী থেকে এয়ারপোর্ট ৪০ মিনিটে পৌঁছানো সম্ভব হবে কিনা কে জানে! কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন, একটা সিএনজি নিতে। যত শর্টকার্ট আছে সব দিয়ে যেন সিএনজি অলা নিয়ে যায়। সবাই নিজ নিজ ব্যাগ গোচ্ছাচ্ছে। আর একজন অপরিচিতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

মহিলাটিকে একজন সিএনজি ঠিক করে দিলেন। কেউ একজন লাগেজটা ভেতরে দিলেন। কেউ কেউ ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দিলেন সময়ের গুরুত্বের কথা। তার গাড়িও যেন বিমান হয়ে উঠে সেই আহ্বান জানালেন অনেকেই। আমার মাথায় তখন রবিঠাকুরের একটা গান বাজছে ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’।

দেশ ছাড়তে পারবেন তো তিনি ? দেশ ছাড়তে এমন ব্যাকুল কি কেউ ছিল কখনো ?

…সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায় …

omar-farukলেখক: ট্রেইনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ

আরও খবর

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার


সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আর নেই

সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আর নেই


৩ হত্যা মামলার আসামি আ.লিগের সাবেক এমপি রানা জামিনে মুক্ত

৩ হত্যা মামলার আসামি আ.লিগের সাবেক এমপি রানা জামিনে মুক্ত


কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি


খিলগাঁও-প্রগতি সরণিতে রিকশাচালকদের বিক্ষোভ, চরম দুর্ভোগ

খিলগাঁও-প্রগতি সরণিতে রিকশাচালকদের বিক্ষোভ, চরম দুর্ভোগ


রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১

রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১


সায়মাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে হারুনের জবানবন্দি

সায়মাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে হারুনের জবানবন্দি


উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের দাম মেনে নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের দাম মেনে নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী


ভারতের উত্তরপ্রদেশে বাস দুর্ঘটনায় নিহত ২৯

ভারতের উত্তরপ্রদেশে বাস দুর্ঘটনায় নিহত ২৯


লোভে পড়ে পুঁজিবাজারে সব টাকা বিনিয়োগ না করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

লোভে পড়ে পুঁজিবাজারে সব টাকা বিনিয়োগ না করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর