Monday, December 26th, 2016
ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও যুদ্ধাস্ত্রে গারো সংস্কৃতি
December 26th, 2016 at 11:37 am
ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও যুদ্ধাস্ত্রে গারো সংস্কৃতি

থিওফিল নকরেক

গারোদের নিজস্ব তৈরি ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিচ্ছদে রয়েছে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। নিজের চাষের তুলা দিয়ে সূতা কেটে তারা ঘরের মধ্যে কাপড় বুনিয়ে ব্যবহার করে থাকেন।  গারো নারীরা ঐতিহ্যবাহী দকমান্দা ব্যবহার করতে পছন্দ করে থাকেন। দকমান্দার সঙ্গে টপ্স পরিধান করে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গারো যুবতীরা যখন হেঁটে যায় তখন মনোরম দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঝুম চাষে দকমান্দা ও দকসারি ব্যবহার সুবিধাজনক। রঙিন কাপড় গারো মহিলাদের পছন্দ। গারো পুরুষেরা ধূতি ও লেংটি পরিধান করতো। বর্তমানে বাঙালি সমাজের সঙ্গে চলাফেরার ফলে পেন্ট সার্ট, স্যুট কোট ব্যবহার করতে শিখেছে। গারোদের অলংকার তাদের স্বকীয়তা প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে অলংকারের ব্যবহার অনেক পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরা অলংকার ব্যবহার করত। গারো পুরুষেরা বিশেষভাবে কানে ছিদ্র করে নাতাপসি ও নাদিলেং পরিধান করত। পশুর হাড় ও দাঁত ছাড়াও লোহার তৈরি অলংকার ব্যবহার করেন। রূপার তৈরি অলংকারই গারোদের বেশি ব্যবহার করতে দেখা যায়। তারা নিজের প্রতাপ-প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যও অলংকার ব্যবহার করে থাকেন।

গারোদের প্রাচীন ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, তারা নিজের প্রতিপত্তি প্রকাশের জন্য ও টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতো। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দলাদলি মারামারি অনেক সময় লেগে থাকত। এক স্থান থেকে অন্যস্থানে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে খাদ্যের সন্ধানে তাদের বিচরণ করতে হয়েছে। চলার পথে বিভিন্ন শত্রু, বনের হিংস্র জীব-জন্তু যেমন বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, সরীসৃপ, কুমীর ইত্যাদি মোকাবেলা করা তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী ছিল। অনেক সময় তারা যুদ্ধে জিতেছে আবার অনেক সময় তারা হেরেছে। পরাজিত শত্রুকে তারা বধ করেছে আবার নিজেরাও শেষ হয়ে গেছে কখনো। খাবারের জন্য বন্য প্রাণি শিকার করা তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ ও পশু-পাখি শিকারের জন্য যুদ্ধ অস্ত্র বেশিরভাগ সময়ে ব্যবহার করতে হয়েছে। একেক অস্ত্রের ব্যবহার একেক ধরনের হয়ে থাকে। নিম্নে গারোদের পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও যুদ্ধঅস্ত্রের বিবরণ আলোচনা করা হলো-

গারোদের পোশাক-পরিচ্ছদ

দকমান্দা
গারোদের পোশাক পরিচ্ছদ আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই দকমান্দার কথা বলতে হয়। গারো মহিলাদের প্রধান পরিধেয় কাপড় হলো দকমান্দা। মহিলারা কোমরে পেঁচিয়ে এই পোশাক পরিধান করে। গারোরা সূতা কেটে নিজেরা তৈরি করে দকমান্দা। রং বে-রঙের দকমান্দা তৈরি করে তারা বাজারজাত করে থাকে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, খয়েরি ইত্যাদি রঙ গারো রমণীদের পছন্দ। বাড়িতে ব্যবহার ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে, বিয়ে, পার্বণ ইত্যাদিতে বাহারি রঙের দকমান্দা পরা গারো মহিলাদের পছন্দ। বিভিন্ন পার্বণ ও অনুষ্ঠানে নৃত্যের সময় অবশ্যই দকমান্দা ব্যবহার করে থাকে। দকমান্দার গায়ে বিভিন্ন নকশা আঁকা থাকে। দকমান্দার গায়ে কোণ আকারে নকশা থাকে যাকে চোখের মতো দেখা যায়। এধরনের চোখ বিশিষ্ট নকশাকে ঈশ্বরের বা দেবতার চোখ মনে করেন গারোরা। বর্তমানে দকমান্দার পাশাপাশি প্রচলিত সেলোয়ার কামিজ, শাড়ি পরার প্রচলন হয়ে গেছে। দেশের অন্যান্য লোকদের মতোই এখন তারা দেশিয় পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যদিও কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে এখনো নিজস্ব পোশাক পরিচ্ছদ ব্যবহার সর্বাধিক দেখা যায়।

দকসারি
দকসারি গারোদের ঘরে ব্যবহারের পোশাক। দকমান্দার মতোই দকসারি পেঁচিয়ে কোমড়ে পরিধান করে। দকসারি অতি সাধারণ করে নকশা করা থাকে। মাঠে কাজ করার জন্য দকসারি খুবই উপযোগী। বিভিন্ন রঙের দকসারি পরে গারো মহিলারা যখন দল বেঁধে কাজ করে তখন দেখতে খুব সুন্দর লাগে।

গান্দো
গারো পুরুষেরা গান্দো ব্যবহার করে থাকে। আদি গারোরা নেংটি ব্যবহার করতো পরিধানের বস্ত্র হিসেবে। কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানে মার্জিত পোশাক হিসেবে গান্দো ব্যবহার করে। বিভিন্ন রঙের গান্দো নিজেরা তৈরি করে পরে। গারো পুরুষদের দেহের উপরে অংশে কোনো পোশাক থাকে না। উপরের অংশে কোনো কাপড় না থাকলেও তার সম্মান কোনো অংশে কম হবে না।

নেংটি
নেংটি গারো পুরুষদের ব্যবহৃত পোশাক। পূর্বে চার আঙুল প্রস্থ কাপড় সামনে থেকে পিছনের দিকে পেঁচিয়ে পড়তো গারো পুরুষেরা। যুগের পরিবর্তনের পাশাপাশি নেংটি পড়ার প্রচলন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আধুনিক গারো পুরুষেরা অন্যান্য সকলের মতো প্যান্ট, সার্ট, কোট, ব্লেজার, গেঞ্জি ও লুঙ্গি ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে বিশ্বায়নের হাওয়া লেগে গেছে।

খুতুপ
খুতুপ বা পাগড়ি গারো পুরুষেরা মাথা রক্ষার জন্য ব্যবহার করে থাকে। খুতুপ আবার অলংকার হিসাবেও গারোরা ব্যবহার করে। কোনো সম্মাননীয় ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক হিসাবে খুতুপ পরানো হয়। সাধারণত সাদা ধুতি দিয়ে পেঁচিয়ে অতি নিখুঁতভাবে খুতুপ তৈরি করা হয়। কামাল বা সম্মাননীয় চ্রাকে আনুষ্ঠানিকভাবে খুতুপ পরানোর রেওয়াজ আছে। আবার যে নক্রম হিসেবে মনোনীত হন তাকেও সম্মাননীয় প্রতীক হিসাবে খুতুপ পরানো হয়। খুতুপ যেমন পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হয় আবার অলংকার হিসেবেও এর ব্যবহার হয়।

ধুতি
ধুতি গারোদের সবচেয়ে মার্জিত পোষাক। কোনো বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে ধুতি পরে উপস্থিত হতে পছন্দ করেন গারো পুরুষেরা। তাদের ছোট ধুতি পড়ার পাশাপাশি লম্বা মাটি ঠেকিয়ে ধুতি পরার প্রচলন আছে। তবে ধুতির ব্যবহার অন্য উদ্দেশ্যেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কোনো গারো পুরুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সম্মানে সাদা ধুতি নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের ধারণা এই সাদা ধুতি প্রদানের মাধ্যমে তাকে শেষ শ্রদ্ধা প্রদান করা হয়। বিবাহের সময় পাত্র বা পাত্রীর মামা যাকে চ্রা নির্ধারণ করে তার জন্য উপহার হিসেবে ধুতি প্রদান এখনো বহুল প্রচলিত রেওয়াজ। তাই বলা যায় যে ধুতি এখনো গারোদের সম্মানের প্রতীক।

গারোদের অলংকার
গারোদের মধ্যে অলংকারের ব্যবহার অনেক পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরা অলংকার ব্যবহার করত। গারো পুরুষেরা বিশেষভাবে কানে ছিদ্র করে নাতাপসি ও নাদিলেং পরিধান করত। পশুর হাড়, দাঁত ছাড়াও লোহার তৈরি অলংকার গারোরা ব্যবহার করে। রূপার তৈরি অলংকারই গারোদের বেশি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তারা নিজের প্রতাপ-প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যও অলংকার ব্যবহার করে থাকে। নিম্নে গারোদের ব্যবহার্য্য বিভিন্ন অলংকারের বিবরণ দেয়া হলো-

রিপ্পক
রিপ্পক গারোদের গলার হার বা মালা। গারোরা গলা ভর্তি পুঁতির রিপ্পক ব্যবহার করে থাকে। তাদের মর্যাদা ও সমাজে অবস্থান বোঝানোর জন্য রিপ্পক পরিধান করে থাকে। মহিলারা দলে দলে পুতিঁর মালা পরে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে। আজকাল শহরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হলে নাচের সময় বেশি এই রিপ্পক ব্যবহার করতে দেখা যায়।

নাদিলেং
গারোদের কানের ব্যবহার্য রূপার তৈরি অলংকার নাদিলেং দুলের মতো কানে পরিধান করে থাকে। নাদিলেং মেয়েদের জন্য আকর্ষণীয় অলংকার। প্রতিটি রমণী নাদিলেং পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পূজা-পার্বণে যেতে ও অংশগ্রহণ করতে পছন্দ করে। নাদিলেং রমণীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পরে থাকে। বিভিন্ন বাহারি নাদিলেং তারা ব্যবহার করে।

নাতাপ্সি
নাতাপ্সি কানের অলংকার। নাদিলেং এর মতো এটাও কানে পরিধান করে সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করে। গারোরা কানের নিচে এবং উপরের দিকে নাতাপ্সি পরিধান করে। নাতাপসি পরিধান করার ফলে অনেক রমনীর কানের ছিদ্র বড় হয়ে ঝুলে যায়। তার পরও তারা মনে করে নাতাপ্সি সমাজে সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক।

রিক্মাৎচু
রিক্মাৎচু গারোদের খুবই আকর্ষণীয় অলংকার। সারি সারি পুতি ও একধরনের ছিদ্র যুক্ত চিকন পাইপ যাবতীয় দিয়ে সূতা দিয়ে তৈরি করা হয় রিক্মাৎচু। রিক্মাৎচু সাধারণত দশ বারটি সারি সারি থাকে। গলার দিকে যে অংশ থাকে সেটা সাধারণত লোহার পাত দিয়ে তৈরি হয়। তবে অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তিরা রূপা দিয়ে রিক্মাৎচুর গোরা তৈরি করে। রিক্মাৎচু পরিধান করলে একজন গারো মহিলাকে আকর্ষণীয় দেখায়। রিক্মাৎচুর ব্যবহার তাই খুবই জনপ্রিয়। নৃত্যের সময় বর্তমানে রিক্মাৎচু বাড়তি আকর্ষণীয় হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

জাক্সান
জাকসান গারোদের পিতলের তৈরি বিশেষ অলংকার। সাধারণত হাতে ও পায়ে এই অলংকার পরিধান করা হয়। প্রায় এক আঙুল মোটা চুরির মতো দেখতে। তবে জাক্সান কিছুটা ডিম্বাকৃতির মতো ও সামান্য নৌকার মতো বাঁকা থাকে।

থাংকা সরা
গারোদের অতিমূল্যবান অলংকার হলো থাংকা সরা। রূপার টাকা দিয়ে তৈরি গলার এবং কোমরের অলংকারকে থাংকা সরা বলা হয়। একেক জন একেক ধরনের থাংকা সরা অলংকার তৈরি করে থাকে। যাদের বেশি টাকা আছে তারা বেশি পরিমাণ টাকা দিয়ে ভারী অলংকার তৈরি করে থাকে। থাংকা সরা সমৃদ্ধি এবং মর্যাদার প্রতীক। সাধারণত সামর্থবানেরাই এই অলংকার ব্যবহার করে থাকে। ইচ্ছা থাকলেও অনেকে ব্যবহার করতে পারে না অতিরিক্ত মূল্য থাকায়। ধোবাউড়া উপজেলার ভুইয়াপাড়া গ্রামে এখনো মহিলারা থাংকা সরা ব্যবহার করেন। তারা মর্যাদার প্রতীক হিসাবে এই অলংকারের ব্যবহারকে মনে করেন।

দো’মি
গারোদের অলংকারের মধ্যে দো’মি অতিসাধারণ। কিন্তু সম্মানের দিক দিয়ে অত্যন্ত উঁচুমানের। মোরগের লেজের পালক দিয়ে দো’মি তৈরি করা হয়। খাসি মোরগের লেজের পালক কয়েকটি একত্র করে সাজিয়ে বেঁধে সুন্দর করে বেঁধে দো’মি তৈরি করা হয়। একজন সম্মানীয় ব্যক্তির মাথার মুকুটের চূড়ায় দো’মি পিছনের দিকে সেঁটে দেয়া হলে তাকে রাজার মতো দেখতে লাগে। একজন সমাজের কামাল বা অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তিকে দো’মি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। দো’মি বিভিন্ন নৃত্যের সময়ও রমণীরা ব্যবহার করে থাকে সৌন্দর্য্যরে প্রতীক হিসেবে।

খুতুপ
গারোদের খুতুপ বা পাগড়ি অত্যন্ত সম্মাননীয় অলংকার। সাদা ধপধপে ধুতি দিয়ে খুতুপ বানানো হয়। গ্রাম প্রধান বা নক্মাকে সাধারণত খুতুপ পরানো হয়। এছাড়াও যিনি কামাল হন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের তাকেও খুতুপ প্রদান করা হয়। দৈনন্দিন ব্যবহারের খুতুপ অতি সাধারণ থাকে। কিন্তু যদি সং নক্মা বা কামাল পরিধান করেন তখন তা অতি কারুকার্যময় খুতুপ করে প্রদান করা হয়।

সাংগং
সাংগং (চুড়ি) গারো মহিলারা হাতে পড়ে থাকেন। সাংগং তৈরি হয় তামা, রূপা বা সোনা দিয়ে। মহিলারা বিভিন্ন বৈচিত্র্যের সাংগং ব্যবাহর করে থাকেন। গারো রমণীরা উভয় হাতেই সাংগং ব্যবহার করে থাকেন। বর্তমানে বাজারের সহজলভ্য অন্যান্য দেশি চুড়ির ব্যবহারও তারা করছেন। যুবতীরা বেশি ব্যবহার করেন এই চুড়ি। বিশেষভাবে বিয়ের সময় বাহারি রকমের চুড়ি ব্যবহার করে থাকেন। আজকাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দামী সাংগং পরতে দেখা যায়। বিশেষভাবে বিয়ের সময় স্বর্ণ দিয়ে তৈরি সাংগং ব্যবহার করছে অবস্থাসম্পন্ন গারো রমণীরা।

গারোদের যুদ্ধঅস্ত্র

মিল্লাম
গারোদের প্রধান অস্ত্র মিল্লাম। লোহার তৈরি মিল্লাম দু’ধারী প্রায় আড়াই ফুট দীর্ঘ অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র। তার হাতলসহ দৈর্ঘ্য তিন ফুট হয়। একজন বলশালী লোক মিল্লাম দিয়ে অনায়াশে শত্রু বধ করতে পারে। মিল্লাম চালনা শিখতে প্রাথমিকভাবে কলা গাছ ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন কৌশলে মিল্লাম ব্যবহার করে গারোরা শত্রুপক্ষ ঘায়েল অনায়াসে করতে পারত। যুদ্ধে যার যত বেশি শক্তি সে তত বেশি এই অস্ত্রের ব্যবহার করতে পারত। মিল্লাম পশু বলি দেবার কাজেও ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন দেবতার নামে যখন কোনো মানত করা পশু বলি দিতে হয় তখন এই মিল্লাম ব্যবহার করা হয়। মিল্লাম গারো নৃত্য পরিবেশনের সময়ও ব্যবহার করা হয়। বিশেষভাবে গ্রিকা নৃত্য মিল্লাম-স্ফী দিয়ে পরিবেশন করা হয়। গারোদের বীরত্বের অন্যতম প্রতীক এই মিল্লাম।

স্ফি
স্ফি মূলত ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মিল্লাম নিয়ে যুদ্ধের সময় আত্মরক্ষার জন্য ঢাল হিসাবে স্ফি ব্যবহার হয়। স্ফি বেত দিয়ে তৈরি অত্যন্ত মজবুত অস্ত্র। স্ফি সাধারণত দৈর্ঘ্য ৩ ফুট এবং প্রস্থ ২ ফুট হয়। ধারালো মিল্লাম দিয়ে বা কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে সহজে স্ফি ভেদ করা যায় না। বেত ও বাঁশ দিয়ে এমন কৌশলে সারি সারি বেত সাজিয়ে তৈরি করা হয় যা দেখতেও খুব সুন্দর।

মংরেং
মংরেং এক প্রকার ধারালো দা। বিশেষ কায়দায় বাঁকা করে বানানো দা। মংরেং দিয়ে সহজে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। পশু শিকারেও মংরেং ব্যবহার করা হয়। গোরার দিকে বাকা বলে কাটার জন্য খুব সুবিধাজনক অস্ত্র।

যাত্থা
যাত্থা এক প্রকার বর্শা। লোহা দিয়ে তৈরি প্রায় এক ফুট লম্বা দু’ধারী অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র। আছারী হিসেবে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বাঁশের হাতল প্রায় ৬-৭ ফুট লম্বা থাকে। যাথ্থা দূর থেকে শত্রু আক্রমণ করতে সুবিধা হয়। শিকারের জন্যও খুবই উত্তম অস্ত্র যাৎতা। অনেক দূর থেকেই শিকার ধরা যায়। অনেকে যুদ্ধের সময় কয়েকটি যাত্থা নিয়ে যেতেন। যাতে একটি ছুঁড়ে দিয়ে আক্রমণ করে অন্যটি হাতের কাছে রাখতে পারেন। বিশেষ কায়দায় বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকার করার জন্য অত্যন্ত সহায়ক অস্ত্র।

মান্দি আত্তি
গারোদের ব্যবহৃত বিশেষ দা। এই দা বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ভারী কাজের উপযুক্ত করে। একপাশে ধারালো ও দায়ের মাথা কাটা থাকে। এই দা অত্যন্ত মজবুত প্রকৃতির। এই দা দিয়ে সহজেই শত্রুপক্ষকে আঘাত করা যায়। অত্যন্ত মজবুত বিধায় এটা দিয়ে যুদ্ধ করার জন্য সুবিধাজনক। প্রতিপক্ষকে আঘাত করার পাশাপাশি এই দা দিয়ে গাছ কাটা যায় সহজেই। মোটামুটি বড় গাছ কেটে লাঠি তৈরি করে আক্রমণ করতে সুবিধা হয়। তাই এই মান্দি আত্তির ব্যবহার এখনো ঘরে ঘরে দেখা যায়। ঝুম চাষের সময় এই মান্দি আত্তি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার হয়। জঙ্গল পরিস্কারের জন্যও এর ব্যবহার সুবিধাজনক। গারোরা কোথাও গেলে এই মান্দি আত্তি সঙ্গে নিয়ে যায়। এই নিয়ে যাওয়াকে গারোরা বলে মিগ্গিদি বা সহচর। গারোদের বিশ্বাস এই দা থাকলে মিমাং বা শয়তান-ভূত-প্রেত তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

ওয়াচক
গারোদের ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি যুদ্ধ অস্ত্র। মূলত বাঁশ কেটে এর একমাথা চোখা করে ধারালো করা হয়। কোনো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য এই বিশেষ অস্ত্র খুবই কার্যকর। কোনো সুবিধাজনক স্থানে আড়ালে থেকে শত্রুর আগমন পথের দিকে ওয়াচক ছুঁড়তে থাকলে কোন শত্রু ত্রি-সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিপক্ষ ওয়াচককে ভয় করে থাকে। কারণ চোরা গুপ্তা হামলার জন্য এই ওয়াচক অত্যন্ত সুবিধাজনক। সাধারণত আত্মরক্ষার কাজে বেশি ওয়াচকের ব্যবহার হয়ে থাকে। ওয়াচক তৈরি করে কোনো গোপন স্থানে রাখা হয় পূর্ব থেকেই। নিজ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এই ব্যবস্থা রাখা। শতশত ওয়াচক ব্যবহার করে ব্রিটিশদের গারোরা সর্বদা তৎপর রেখেছিল। এই ওয়াচকের ভয়ে ব্রিটিশ সৈন্যরা গারো এলাকায় প্রবেশ করতে সাহস পায়নি। ওয়াচক দিয়ে বন্য প্রাণী শিকার করতেও কার্যকর। কোনো লক্ষিত জন্তুর দিকে ছুঁড়ে তাকে সহজেই বধ করা যায়।

রংথি
রংথি হলো পাথরের তৈরি অস্ত্র। প্রস্তুর যুগে একমাত্র পাথরই ছিল মানুষের ব্যবহারের অস্ত্র। কালের পরিক্রমায় এই পাথর গারোদেরও মূল্যবান যুদ্ধ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় অঢেল পাথর পাওয়া যেত। সহজলভ্য অস্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার সুবিধাজনক ছিল। পাথরকে কেটে বা ভেঙে বিশেষ কায়দায় ধার দেয়া হতো। ধারালো অংশ দিয়ে কোনো শত্রুকে আঘাত করলে তার আর রক্ষা ছিল না। অন্যান্য অস্ত্রের মতো পশু শিকারেও রংথির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ছিল।

বাত্তুল
বাত্তুল হলো রশি দিয়ে পাথর আটকিয়ে লক্ষ বস্তুতে ছুঁড়ে আক্রমণ করার অস্ত্র। ছোট ছোট পাথর সামান্য গোলাকার তৈরি করে রশি দিয়ে দূর লক্ষ বস্তুকে আক্রমণ করা সম্ভব ছিল। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিপক্ষকে দূরবর্তী স্থান থেকেই মোকাবেলা করা সম্ভব বিধায় এর ব্যবহারও জনপ্রিয় ছিল।

ওয়াজল
ওয়াজল বাঁশের তৈরি এক প্রকার যুদ্ধ অস্ত্র। লম্বা বাঁশ কেটে মাথা চোখা করে ধারালো করা হয়। পাহাড়ি পথে গোপন আস্তানা থেকে ওয়াজল দিয়ে আক্রমণ করা সুবিধা আছে। ওয়াজল অনেকটা ওয়াচকের মতো। ওয়াচক ছোট করে তৈরি করা হয় আর ওয়াজল অপেক্ষাকৃত লম্বা থাকে।

গারো সমাজ অতি প্রচীন সভ্য-সমাজ। তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়েছে যুগে যুগে কালে কালে। বহু পথ পরিক্রমায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার সংস্কৃতির যেমন পরিবর্তন ঘটেছে তেমনি পোষাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও যুদ্ধ অস্ত্রেরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আজকাল অনেক পোষাক ব্যবহার করতে পারে না শহুরে জীবনে। কর্মক্ষেত্রে নানা প্রতিকুলতার জন্য পোষাক ব্যবহারে অনীহা দেখা যায়। গারো অলংকারও আগের মতো বন-পাহাড়-ঝরনা কেন্দ্রিক জীবনের মতো ব্যবহৃত হয় না। সমতলবাসীর সঙ্গে মিলে মিশে বৃহত্তর সমাজের অনুকরণে অলংকারাদি ব্যবহার করছে। যুদ্ধঅস্ত্র এখন অনেকটা বাৎসরিক উৎসবাদিতে ব্যবহার হয়। বনের পশু শিকার যেমন নেই তেমনি নিরাপত্তার জন্য এইসব ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। গারো সংস্কৃতির এই মূল্যবান উপকরণ ও উপাদানগুলো সংরক্ষণ করা গেলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি যেমন সমৃদ্ধ হতো তেমনি গারো সম্প্রদায় নিজের সংস্কৃতি চর্চা ও সংরক্ষণে স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতো।

গ্রন্থপঞ্জি
১. থিওফিল নকরেক, গারো সংস্কৃতির জীবনবাদ পর্যালোচনা, নন্দিতা প্রকাশ, অমর একুশে গ্রন্থমেলা -২০১৫।
২. সুভাষ জেংচাম, গারোদের সমাজ ও সংস্কৃতি, সূচীপত্র, ২০১০ খ্রিস্টাব্দ।

লেখক: গবেষক

সম্পাদনা: মাহতাব শফি


সর্বশেষ

আরও খবর

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের জামিন মঞ্জুর

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের জামিন মঞ্জুর


একদিনেই সড়কে ঝড়ল ১৯ প্রাণ

একদিনেই সড়কে ঝড়ল ১৯ প্রাণ


শাহবাগে মশাল মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক ৩

শাহবাগে মশাল মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক ৩


গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা

গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা


করোনায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩২৭

করোনায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩২৭


নামাজ পড়ানোর সময় সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু

নামাজ পড়ানোর সময় সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু


ভাষার বৈচিত্র্য ধরে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ভাষার বৈচিত্র্য ধরে রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


করোনায় আরও জনের ১৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৯১

করোনায় আরও জনের ১৫ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৯১


৩ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কেকেআরে সাকিব

৩ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কেকেআরে সাকিব


খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর