Saturday, July 4th, 2020
গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!
July 4th, 2020 at 2:17 pm
গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

অম্লান দেওয়ান;

স্কুলে পড়ার সময় পাট নিয়ে রচনা লিখতে হতো। আমরা লিখতাম, পাটকে বলা হয় সোনালি আশ। পাট আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল। আমাদের দেশের ভূমি ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী..ইত্যাদি ইত্যাদি।

পরীাক্ষায় কমন একটি প্রশ্ন থাকতো: পাটকে সোনালী আশ কেন বলা হয়?

উত্তর ছিলো ঠোটস্থ : পাটের রং সোনালী এবং পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আমরা অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকি বলে পাটকে সোনালি আশ বলা হয়।

আজকের গনমাধ্যমে একটি সংবাদ দেখে স্কুলজীবনের ঘটনাটি মনে পড়লো। “ পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেল” শিরোনামের এ সংবাদে বলা হয়েছে: পাটের রাজধানী খ্যাত বাংলাদেশ থেকে নির্বাসনে যেতে বসেছে পাট। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সকল পাটকল বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিং-এ প্রধানমন্ত্রীর মূখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস এ তথ্য জানান। তিনি জানান প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এজন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। পাওনার ৫০ শতাংশ নগদ দেওয়া হবে। বাকি ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে সন্চয়পত্রের মাধ্যমে।

সংবাদ ব্রিফিং-এ মূখ্যসচিব একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপ্রবন হয়ে পড়েন। মন খারাপ করেন।

ঐতিহাসিকভাবে পাট ও পাটজাত দ্রব্য আমাদের অর্থনীতির বুনিয়াদ।১৯৫১ সালে পাটের বাজারকে কেন্দ্র করে নারায়নগন্জে গড়ে ওঠে আদমজী পাটকলের মতো বড় শিল্পকারখানা। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ছিলো পাটের সর্ম্পক। ছয়দফা তুলে ধরতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পাকিস্তানের অর্থনীতিতে পাটের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। ৭০ এর সাধারন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পাট শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭২-৭৩ সালে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসতো পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে। আশির দশকের শুরুতে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে যুক্ত হলে পাটের আধিপত্য কমতে থাকে। তার জায়গা নেয় পোশাক শিল্প।

তারপরও ১৯৮৭-৮৮ সাল পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের অর্ধেক আসতো পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। উৎপন্ন হয় প্রায় ৮৯ লাখ বেল পাট। দেশের প্রায় ৫০ লাখ কৃষক পাট চাষের সঙ্গে জড়িত। মোট রপ্তানি আয়ের ৩ থেকে ৪ ভাগ আসে পাট ও পাটজাত পন্য থেকে। উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল। কাচা পাটের ৯০ শতাংশ রপ্তানি হতো বাংলাদেশ থেকে। সরকারি বেসরকারি মিলে সারাদেশে মোট পাটকলের সংখ্যা ৩০৭ টি (সরকারি ২৫, বেসরকারি ২৮২)।

এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে পাট উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। পাট থেকে পোশাক, জুতা, ব্যাগসহ নানা পন্যসামগ্রী উৎপন্ন হয়। পাট পরিবেশবান্ধব। এটির ব্যবহার বহুমুখী। অন্যান্য অনেক আশের সঙ্গে এটি মেশানো যায়। এ আশ পচনশীল। পরিবেশের কোন ক্ষতি করে না। পাট থেকে সুতা, বস্তা, পর্দার কাপড়, কুশন, শাড়ি, কার্পেট ইত্যাদি তৈরি হয়। গরম কাপড় তৈরির জন্য উলের সঙ্গেও মেশানো যায় পাটের তৈরি সুতা। পাটের আশ থেকে প্রসাধনী, রং ইত্যাদি তৈরি হয়। কিন্তু গতকাল থেকে সোনালী আশের সোনালী যুগের অবসান হলো। দেশের সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিকরা তাদের পাওনা বুঝে নিয়ে ঘরে ফিরে যাবে। পাটকলগুলোর চাকা আর ঘুরবে না। পাটপন্যের উৎপাদন যাবে বন্ধ হয়ে।

ফ্রান্সের প্যারিসসহ ইউরোপের অনেক দেশে পাটজাত পন্যকেই প্রাধান্য দেয়। বেশি দাম দিয়ে পাটের তৈরি জিনিষপত্র কিনে। ওসব দেশের ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতেও দেখা মেলে বাংলাদেশের তৈরি পাটের পন্য। কারন তা পরিবেশবান্ধব।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাটশিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহন করে। পাট মন্ত্রনালয় সৃষ্টি করে। একজন মন্ত্রীকে এ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৬ মার্চকে পাট দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

গতবছর এ বিশেষ দিবসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাট শিল্প টেকসই করার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “পাট এমন একটি পণ্য যার কোন কিছুই ফেলনা নয়। অতএব এ খাতে লোকসান হবে কেন? আমি কোন লোকসানের কথা শুনতে চাই না। পাটশিল্পকে কিভাবে লাভজনক করতে হবে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। যারা হতাশাবাদী তাদের সঙ্গে অামি নেই। আমি সবসময় আশাবাদী…” ।

যে শিল্পকে ঘুরে দাড়ানোর আহবান জানিয়েছিলেন সে শিল্প নিজ হাতে বন্ধ করতে হলো। কী এমন হলো এক বছরের মধ্যে?

আসলে দেশের সম্ভাবনাময় এ শিল্প ধ্বংসের নেপথ্যে রয়েছে অনেক অজানা, অপ্রকাশিত কাহিনী। এ শিল্পের মূল চালিকাশিক্তি যে কৃষক তাদের দিকে মোটেও নজর দেওয়া হয়নি। পুরনো লক্কর ঝক্কর মেশিন দিয়ে চালানো হয়েছে কারখানাগুলো। এগুলো আধুনিক করার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন গেছে কমে। আর উৎপাদন খরচ গেছে বেড়ে। নেই প্রশিক্ষিত জনবল। নেই বাজারজাত করার মতো কৌশল। ফলাফল -লোকসান। বছরের পর বছর ধরে দেশের রাস্ট্রায়ত্ত পাটগুলো লোকসান দিয়ে আসছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২২ টি সরকারি পাটকল ৪০০ কোটি টাকার মতো লোকসান দিয়েছে।

কোন এক অদৃশ্য শক্তির স্বার্থে পাটকলগুলোকে পরিকল্পনা করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরা কারা? কারাই বা এর সুবিধাভোগী?

এ বিষয়ে গবেষনা করেছেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশী গবেষক ও অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাংলাদেশের পাটশিল্পের ধ্বংসের পেছনে বিশ্বব্যাংকের কারসাজি রয়েছে। ১৯৯৪ সালে বিশ্বব্যাংকের লোন নেয় বাংলাদেশ। তাদের ফর্মুলাতেই ২০০২ সালে দেশের সবচাইতে বড় পাটকল আদমজি বন্ধ করা হয়। বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়ে এক লাখ শ্রমিক কর্মচারি। আর একই সময় বিশ্বব্যাংক ভারতকে আর্থিক সহায়তা দেয় পাট শিল্পের উন্নয়নে। ২০০২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ভারতে গড়ে ওঠে পাট শিল্পের বড় বড় কারখানা। অার এর সবগুলোতে আর্থিক লোন সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ধারাবাহিকতায় পাটের বিশ্ববাজার দখল করে নেয় ভারত।

বাংলাদেশ যেসব দেশে কাচা পাট রপ্তানি করে তার শীর্ষে রয়েছে ভারত। ভারত বাংলাদেশ থেকে কাচা পাট কিনে। সেটা প্রক্রিয়াজাত করে। রপ্তানি করে। মুনাফা করে। ফলে বাংলাদেশ পাটের উৎপাদনে শীর্ষে থাকলেও বিশ্ববাজার দখল করে রেখেছে ভারত। গত বৃহস্পতিবার সরকারি পাটকল বন্ধ ঘোষনার মধ্য দিয়ে ভারতের একচ্ছত্র বাজার প্রতিষ্ঠিত হলো।

পাটের জায়গা দখল করবে পলিথিন। আর নতুন করে তৈরি পাট মন্ত্রনালয়, মন্ত্রী, পাট করপোরেশনের ভাগ্যে কী আছে তা এখনো অজানা। তবে অনুমান করা যায়…

অম্লান দেওয়ান

সর্বশেষ

আরও খবর

শেখ কামাল ‘সব্যসাচী কীর্তিমান বাঙালি তরুণ’

শেখ কামাল ‘সব্যসাচী কীর্তিমান বাঙালি তরুণ’


ওসিসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে সিনহার বোনের মামলা

ওসিসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে সিনহার বোনের মামলা


যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড় আইসায়াসের আঘাত, নিহত ৫

যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড় আইসায়াসের আঘাত, নিহত ৫


শেখ কামালের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ

শেখ কামালের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ


জুলাইয়ে ২৬০ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিটেন্স

জুলাইয়ে ২৬০ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিটেন্স


৫৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি, আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৩ হাজার

৫৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি, আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৩ হাজার


বিমানের কুয়েত ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল

বিমানের কুয়েত ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল


উন্নতি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি

উন্নতি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


আজ পবিত্র হজ

আজ পবিত্র হজ