Wednesday, February 24th, 2021
গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা
February 24th, 2021 at 2:36 am
গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মারা যাওয়ার ৬০ ঘন্টা পরে পরিবারের মামলা

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের চাপ্রাশির হাটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ ভিডিও করার সময় গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক মো. বোরহান উদ্দিন মুজাক্কিরেরমৃত্যুর ঠিক ৬০ ঘন্টা পর অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে তাঁর পরিবার। 

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জাহিদুল রনি নিউজনেক্সটবিডিকে জানান, নিহতের পিতা নুরুল হুদা মোহাম্মদ নোয়াব আলী মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টায় তাঁর থানায় এই  মামলা দায়ের করেন। এতে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

মুজাক্কিরের মেঝ ভাই ফখরুদ্দিন মুফাচ্ছির নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “আমরা (পরিবারের সদস্যরা) কেউ ঘটনাস্থলে ছিলাম না এবং তাঁকে কে বা কোন পক্ষ গুলি করেছে তা আমাদের কেউ বলেনি, আমরাও কেউকে জিজ্ঞেস করিনি। এক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা নিরপেক্ষ। যে কারণে মামলায় কারো নাম বা আসামির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।”

“হত্যাকাণ্ডে  জড়িতদের পরিচয় ও সংখ্যা পুলিশকেই তদন্ত করে বের করতে হবে,” দাবি করে তিনি বলেন, “সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় বেড়িয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”  

চাপ্রাশির হাটের পূর্ব বাজারে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সহোদর ও বসুরহাটের পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং দলটির নোয়াখালী জেলার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও কোম্পানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে শুক্রবার বিকালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এমনটা উল্লেখ করে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “এ সময় মুজাক্কির ভিডিও ধারণ করতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে।”

গুলিবিদ্ধ প্রথমে মুজাক্কিরকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিলে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাত পৌনে ১১টায় মারা যান তিনি। রবিবার রাতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

“কোম্পানিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি থাকার কারণে সোমবার আমরা মামলা করতে থানায় যেতে পারিনি,” উল্লেখ করে ফখরুদ্দিন বলেন, “কোনো দল বা পক্ষ চিনি না, কারো ইন্ধন বুঝিনা। আমরা শুধু চাই যে সন্ত্রাসী মুজাক্কিরকে গুলি করে হত্যা করেছে তাঁকে পুলিশ ধরে এনে বিচারকের কাঠগড়ায় পেশ করুক। তাঁর ফাঁসি হোক।”

থমথমে কোম্পানীগঞ্জ, কমেনি উত্তেজনা

শুক্রবারের সংঘর্ষ ও শনিবার মুজাক্কিরের মৃত্যুর জেরে কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌর এলাকা এবং আশেপাশের ইউনিয়নে এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিগত তিন-চারদিনের তূলণায় উত্তেজনা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি জানিয়ে ওসি জাহিদুল নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে আজও (মঙ্গলবার) দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। আমরা কাউকেই করতে দেইনি।”

“তবে সোমবারের তূলণায় উত্তেজনা কম থাকায় ১৪৪ ধারা জারির প্রয়োজন হয়নি। মৌখিকভাবে বুঝিয়েই দুই পক্ষকে বিরত রাখতে পেরেছি আমরা।” পুনরায় যান চলাচল চালু হওয়ার পাশাপাশি দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মুজাক্কির হত্যার জন্য পরস্পরকে দায়ি করে কাদের এবং বাদল পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় সোমবার ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল প্রশাসন। এর আগে শনি এবং রবিবারও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। 

এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে বিগত কয়েকমাস ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে উল্লেখ করে কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তবিবুর রহমান টিপু নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “এরই ধারাবাহিকতায় এসব ঘটনা ঘটছে। আশেপাশের জেলা-উপজেলা থেকে আসা বহিরাগত সন্ত্রাসীদের আনাগোনাও দেখা গেছে।”

গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক একদিন আগে নিহত মুজাক্কির সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলেন, “কোম্পানীগঞ্জে যেকোনো সময় অপ্রতিকার ঘটনা ঘটতে পারে। প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষভাবে অবস্থান নেওয়া।”

প্রসঙ্গত, চাপ্রাশির হাটের সংঘর্ষে নয়জন গুলিবিদ্ধসহ দুইপক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও ১০-১২ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়েছিল। এরপরই  পুরো উপজেলা জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

স্তম্ভিত সাংবাদিকরা, সারাদেশে প্রতিবাদ

“নিহত মুজাক্কির খুবই সম্ভাবনাময় একজন সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর এমন মৃত্যুতে আমরা স্তম্ভিত,” নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতা টিপু। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বুধবার মানবন্ধন কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের দাবি জানাবে কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাব, উল্লেখ করেন তিনি।

মুজাক্কির অনলাইন পোর্টাল বার্তা বাজার ডটকম ও দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর হত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানাতে মঙ্গলবার ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ করার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আবু জাফর।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচি শেষে নিউজনেক্সটবিডিকে তিনি বলেন, “সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় বড় বড় সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও মুখ খোলা উচিত। আমরা দেখি এ জাতীয় ঘটনায় তারা সব সময় নিশ্চুপ থাকেন। কোনো ধরণের প্রতিবাদ করেন না।”

“স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। হাতে গোনা কয়েকটির বিচার হলেও বাকি সাংবাদিক হত্যার বিচার এখনও হয়নি। আমরা চাই, মোজাক্কির হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচারের ধারা প্রতিষ্ঠিত হোক। এটা না হওয়া পর্যন্ত বিএমএসএফ রাজপথে থাকবে,” বলেন তিনি।

ব্যবস্থা নেবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন,কোম্পানীগঞ্জের ঘটনায় খোদ নেত্রীই (আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন বলে আমাদের বলেছেন। আজও তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, বিষয়টি আমার উপর ছেড়ে দেন।”

“তবে কোনো পক্ষ যাতে আর ফেসবুক লাইভে না আসে বা কোনো সংঘাতে না জড়ায়, এমন কিছু নির্দেশনাও তিনি দিয়েছেন। দু’পক্ষকেই তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জেলা কমিটির পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দেওয়া হবে। যার মূল কথা হচ্ছে- সবাইকে শান্ত থাকতে হবে,” বলেন তিনি।

“কোম্পানীগঞ্জের কলহ কোনো আদর্শিক সংগ্রাম নয়, মূলত দেনা-পাওনার সংগ্রাম। অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক নয়, স্রেফ আধিপাত্য বিস্তারের সংঘাত হয়েছে বলেই আমি মনে করি। যার জন্য তরতাজা একটা ছেলের প্রাণ গেল,” যোগ করেন এই রাজনীতিবিদ।  

“কোম্পানীগঞ্জে এখন যা হচ্ছে, তা হলো আওয়ামী লীগ নিধন। এখানে ত্যাগী আওয়ামীলীগ নেতাদের কোনো দাম নেই, সর্বত্র হাইব্রিডদের জয়জয়কার,” দাবি করে বাদল নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “নেত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরও দুইবার ফেসবুক লাইভে এসেছেন কাদের মির্জা। আওয়ামী লীগ বিরোধি বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই মাঠে নেমেছেন।”

নিহত মুজাক্কিরকে নিজের সমর্থক উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “আমার সমর্থক হওয়ার কারণে জেলা ছাত্রলীগের পদ না পেয়ে অভিমান করে রাজনীতি ছেড়ে সাংবাদিকতায় সক্রিয় হয়েছিল সে। কাদের মির্জার লোকজন তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে।”

কাদেরের মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি।তবে মুজাক্কিরের মৃত্যুর পর ফেসবুকে তিনি বলেছিলেন, “তিনি একজন ভালো সাংবাদিক ছিলেন। সংঘর্ষের ছবি তুলতে গেলে বাদলের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে।”

মুজাক্কির এক সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁর পরিবারও স্বীকার করেছে।

পাঁচ মামলায় এখনও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ

গত শুক্রবারের সংঘর্ষ ও তৎপরবর্তী ঘটনায়  মঙ্গলবারের মুজাক্কির হত্যা মামলাসহ এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি মামলা হয়েছে।

সংঘর্ষের পর ওই দিন রাতেই কাদের মির্জার অনুসারী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ছারওয়ার বাদী হয়ে ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয়ের আরো ৫০-৬০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পরদিন রাতে বাদল ৬৪৪ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন।  সংঘর্ষের ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশও অজ্ঞাতনামা সাতশ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।  

এছাড়া রবিবার বসুরহাট পৌর এলাকায় গাছের গুড়ি ফেলে যান চলাচলে প্রতিবন্ধতা তৈরী পাশাপাশি ককটেল বিস্ফোরণের দায়ে ৬০ জনকে আসামি করে সোমবার আরো একটি মামলা করেছে পুলিশ, নিউজনেক্সটবিডিকে জানিয়েছেন ওসি। তবে “এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি,” বলেন তিনি।

বাজার পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে চাপ্রাশির হাটের সংঘর্ষের ভিডিও তারা সংগ্রহের কথা উল্লেখ করে ওসি জানান, কারা গুলি করেছিল সেটি পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ

আরও খবর

বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে ৪ জন নিহত

বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে ৪ জন নিহত


হাসপাতালের বেডে সুইসাইড নোট রেখে করোনা রোগীর আত্মহত্যা

হাসপাতালের বেডে সুইসাইড নোট রেখে করোনা রোগীর আত্মহত্যা


করোনা নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের কবিতা

করোনা নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের কবিতা


আলেমদের ওপর জুলুম আল্লাহ বরদাশত করবেন না: বাবুনগরী

আলেমদের ওপর জুলুম আল্লাহ বরদাশত করবেন না: বাবুনগরী


সকালে কন্যা সন্তানের জন্ম, বিকালেই করোনায় মায়ের মৃত্যু

সকালে কন্যা সন্তানের জন্ম, বিকালেই করোনায় মায়ের মৃত্যু


করোনায় দেশে একদিনে শতাধিক মৃত্যুর রেকর্ড

করোনায় দেশে একদিনে শতাধিক মৃত্যুর রেকর্ড


প্রধানমন্ত্রীপরিচয়ে তাজউদ্দীন ইন্দিরার সমর্থন আদায় করেন যেভাবে!

প্রধানমন্ত্রীপরিচয়ে তাজউদ্দীন ইন্দিরার সমর্থন আদায় করেন যেভাবে!


করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০ হাজার

করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০ হাজার


জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই জরিমানা

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই জরিমানা


লকডাউনের নামে সরকার ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে: ফখরুল

লকডাউনের নামে সরকার ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে: ফখরুল