Friday, June 3rd, 2016
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সঙ্গে বসবাস
June 3rd, 2016 at 8:39 pm
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সঙ্গে বসবাস

ঢাকা: ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে গত ২২ মে। প্রথম দিকে যতটা মনে হয়েছিল বিধ্বংসী পরবর্তীতে তার শক্তি কমে এসেছিল। ঘূর্ণিঝড়ের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে। আবার কি আমরা আইলা-সিডরের মতো কোনো প্রকৃতি প্রদত্ত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি কিনা না।

‘ঘূর্ণিঝড়ের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে’

সঠিক সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা ৫০ লাখ লোককে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি। বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে ততটা সহজ নয়। আগের চাইতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি ভাবে পাকা ঘর বাড়ির সংখ্যাও বেড়ে চলছে। যাদের নিজস্ব পাকা বাড়ি রয়েছে তারা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না।

‘যাদের নিজস্ব পাকা বাড়ি রয়েছে তারা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না’

Roanu aftermath in Kutubdia 3
আমাদের যে পরিমাণ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে তার সংখ্যা বৃদ্ধি করার প্রস্তাবনা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসছে। অতীতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রেগুলোর ব্যবহার এবং বর্তমানে সেগুলোর ব্যবহারের ধরন পাল্টাচ্ছে। অতীতে শুধু মানুষই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতো। বর্তমানের গবাদি পশু, দোকানের মালামাল অন্যান্য মূল্যবান ব্যবসায়ী আসবাবপত্রের নিরাপদ স্থান হিসেবেও ব্যবহার হতে দেখা যাচ্ছে। তাই ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো র বহুবিদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

‘অতীতে শুধু মানুষই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতো’

সাধারণ মানুষ তার বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ ফেলে নিজে শুধু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে রাজি হয় না। তাই আমি মনে করি এই বিষয়টিও আমাদের নজরে আনা দরকার। কিন্তু আমি যে বিষয়টি তুলে ধরতে চাচ্ছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের মানসিকতার যে পরিবর্তন এসেছে তারই একটি উদাহরণ তুলে ধরছি।

‘কিন্তু আমি যে বিষয়টি তুলে ধরতে চাচ্ছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন’

ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ বাংলাদেশের যে সকল স্থান গুলোতে আঘাত হেনেছে তার মধ্যে কুতুবদিয়া অন্যতম। কুতুবদিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদাপন্ন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দ্বীপটিতে প্রায় লক্ষ্যাধিক লোকের বসবাস। তারা সবসময়ই ঘুর্ণিঝড়ের সঙ্গে মোকাবিলা করে বেঁচে আছেন। এই দ্বীপটিতে মানুষের বসবাস বহু প্রাচীন কাল থেকে। প্লাবন ভূমিতে মানুষ যেমন যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। এই দ্বিপটিতে ১৯৯১ সালে ঘুর্ণিঝড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানী ঘটে। তাই যে কোনো ঘূর্ণিঝড় হলেই অন্যান্য বিপদাপন্ন স্থানগুলোর সঙ্গে কুতুবদিয়ার কথাও সবার আগে চলে আসে।

এই দ্বীপটিতে মানুষের বসবাস বহু প্রাচীন কাল থেকে। তারা সবসময়ই ঘুর্ণিঝড়ের সঙ্গে মোকাবিলা করে বেঁচে আছেন। 

Roanu aftermath in Kutubdia
এই দ্বীপটিতে বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে ঘূর্ণিঝড় থেকে কিছুটা পরিত্রাণের জন্য। কিন্তু  যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে সে বাঁধ তাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষার্থে যেমন সফল হয়েছে আবার তেমন ব্যর্থতার ঘটনাও কম নয়। সত্যি কথা বলতে কুতুবদিয়া রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধগুলোর যে ধরণ ও গুণমান তা কখনোই সঠিকভাবে দেখা হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা। এলাকাবাসী দেখেছেন প্রত্যেকটি ছোট বড় ঘুর্ণিঝড়ে কোনো না কোনো স্থানে বাঁধ পানির তোরে ভেঙ্গে যায়। এটি খুবই অপ্রত্যাশিত। এ থেকে বোঝা যায় কোথাও না কোথাও ত্রুটি রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ এর প্রভাবে এবার কুতুবদিয়ার বেশ কিছু স্থানের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

‘এলাকাবাসী দেখেছেন প্রত্যেকটি ছোট বড় ঘুর্ণিঝড়ে কোনো না কোনো স্থানে বাঁধ পানির তোরে ভেঙ্গে যায়’

এর ফলশ্রুতিতে তবলার চর, উত্তর ধুরং,আলী আকবর ডেইল, বড়গোপ সইয়দপাড়া, কাজীপাড়া,কৈয়ারবিল, মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণহানির ঘটনা তেমন হয়নি বলেই সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফলাও করে প্রচার হয়নি। কিন্তু যাদের ক্ষতি হয়েছে তারা মারাত্মতকভাবে ক্ষতিক্ষস্ত হয়েছেন। ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, গবাদিপশু, ফসলাদি এবং অন্যান্য বেঁচে থাকার অবলম্বন হারিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা হারিয়েছে মুল্যবান বই। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে ঝড়ের তাণ্ডবে।

‘প্রাণহানির ঘটনা তেমন হয়নি বলেই সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফলাও করে প্রচার হয়নি’

গবাদিপশুর তেমন বেশি ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বহু হাস, মুরগি মারা গেছে। তবে পত্র পত্রিকায় পাতাতে এ বিষয়গুলি সেভাবে আসেনি। কিন্তু সে এলাকার লোকজন জানে তারা কি হারিয়েছেন। ঝড়ের ঠিক পরপরেই আমার সেখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। কক্সবাজার থেকে আমি যে তথ্য পেয়েছিলাম তাতে আমাকে নিরুত্ত্রসাহিত করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল তেমন কিছু হয়নি ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া। আমি যখন কুতুবদিয়া পৌঁছালাম তখন দুপুর ১ টা। লোকজনের মধ্যে কেমন জানি একটু অলসিতা লক্ষ্য করলাম।মনে হয়েছিল তাদের উপর অনেক কঠিন কিছু বয়ে গেছে। আলী আকবর ডেইল এলাকায় যাবার পর আমার ধারনা পাল্টে গেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিক্ষস্ত হয়েছে।

‘কিন্তু সে এলাকার লোকজন জানে তারা কি হারিয়েছেন’

Roanu aftermath in Kutubdia 2যত্রতত্র হাঁস মুরগি মরে পড়ে আছে। প্রচুর গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। ছড়িয়ে ছিঁড়িয়ে পড়ে আছে শুটকির বস্তাগুলি। লক্ষ্য করলাম প্রত্যেক পরিবার নিরন্তন চেষ্টা করে চলছে ক্ষতিক্ষস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করার। প্রতিবেশীরাও একে অপরের সাহায্য এগিয়ে এসেছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা আমার মনে বেশি দাগ কেটেছে সেটা হলো, তারা একটিবারের জন্যও কেউ এসে বলেনি যে আমি সাহায্যপ্রার্থী। আমি কথা বলে জানতে পারলাম তারা রিলিপ নিতে আগ্রহী না। তারা চায় কুতুবদিয়া রক্ষা বাঁধের স্থায়ী সমাধান।

‘প্রতিবেশীরাও একে অপরের সাহায্য এগিয়ে এসেছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা আমার মনে বেশি দাগ কেটেছে সেটা হলো, তারা একটিবারের জন্যও কেউ এসে বলেনি যে আমি সাহায্যপ্রার্থী’

তারা তাদের আর্থিক অবস্থার পরির্বতন আনতে নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে যাবেন এবং তাদের ধারণা ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তার জন্য তারা সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা চাচ্ছে। এই সহায়তা অবশ্য তারা যে পেশায় নিয়জিত আছেন যেমন, সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ, লবন চাষ, শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরন জীবিকায় তারা যেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন তার জন্য আর্থিক অনুদান। আমার বিশ্বাস সরকার এবনফ বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের পাশে থাকবেন।

bracলেখক: এ এস এম মনিরুজ্জামান খান

ডিরেক্টর (ইনচার্জ)

সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ

আরও খবর

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…