Sunday, August 14th, 2016
‘চলচ্চিত্রকার না হলে লেখক হতাম’
August 14th, 2016 at 5:25 pm
‘চলচ্চিত্রকার না হলে লেখক হতাম’

শাকেরা তাসনীম ইরা, ঢাকা:

আবু তারেক মাসুদ; বাংলাদেশী স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার।বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত নাম। ১৯৫৭ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তিনি।মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ। উপমহাদেশের খ্যাতিমান এই চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়।পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটর ডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন এবং দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের শেষ দিকে তিনি জীবনের প্রথম ‘আদম সুরত’ নামে একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ডকুমেন্টারিটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ও কর্মের উপর।

উপমাহদেশের খ্যাতিমান এই নির্মাতার চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম উপাদান ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় অণ্বেষা, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তার নির্মিত প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ (২০০২)। মুক্তিযুদ্ধ আশ্রিত এই নান্দনিক চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর ফোর্টনাইট সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল।

এছাড়া এডিবনার্গ, মন্ট্রিল, কায়রো উৎসবে মাটির ময়না প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি ২০০২ সালে মারাকেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করে। ২০০৩ সালে করাচি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরা ছবির পুরস্কার লাভ করে। ২০০৪ সালে ছবিটি ব্রিটেনের ডিরেক্টরস গিল্ড পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।এ ছবিটির মধ্য দিয়েই ইউরোপে প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রদর্শনী শুরু হয়।

তারেক মাসুদের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অর্ন্তযাত্রা’। এক প্রবাসী বাঙ্গালী নারী ও তার ছেলের স্বদেশ যাত্রার গল্প এটি। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রবাসী জীবনের দ্বন্দ্বিক সত্যের মূল খুঁজেতে দেখা গেছে পরিচালককে। এই চলচ্চিত্রটিও ২০০৬ সালের ঢাকা আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সেরা চলচ্চিত্র’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। একই বছরে দিল্লিতে আয়োজিত ‘এশিয়ান সিনেফ্যান’ উৎসবে বিচারকের দৃষ্টিতে সেরার খেতাব অর্জন করে।

২০০৫-০৬ সালে নির্মিত ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রটিও বিপুল দর্শক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ধর্মভিত্তিক জঙ্গিবাদ ছাড়াও এতে তিনি তুলে ধরেন তৈরী-পোশাক শিল্পের নারীশ্রমিক, ক্ষুদ্রঋণনির্ভর এনজিও কার্যক্রম এবং বিদেশে অভিবাসী শ্রমিকদের বঞ্চনার মতো বিষয়গুলোকে। ‘নরসুন্দর’ তার পরিচালিত একটি অন্যতম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তারেক মাসুদ এবং তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ মিলে ২০০৮ সালে এটি নির্মাণ করেন। তারেক মাসুদের বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত একটা পলিটিক্যাল থ্রিলার নরসুন্দর।

তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’। মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের উপর একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের অভিপ্রায়ে এদেশের একদল সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গ নেন। ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামের দলের এই সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। এই শিল্পীদের সাথে থেকে লেভিন প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তিনি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে পারেননি। দীর্ঘ দুই দশক পর ১৯৯০ সালে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ নিউইয়র্কে লেভিনের কাছ থেকে এই ফুটেজ সংগ্রহ করেন। লেভিনের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফুটেজের সাথে সংগৃহীত অন্যান্য উপাদান যোগ করে নির্মান করেন মুক্তির গান। এছাড়াও বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন তারেক মাসুদ। তার নির্মিত স্বল্পদৈঘ্য ছবিগুলো হলো- সোনার বেড়ি (১৯৮৫), সে (১৯৯৩), শিশু কথা (১৯৯৭), নিরাপত্তার নামে (১৯৯৯), বিপন্ন বিস্ময়, নিরপরাধ ঘুম, ‘সুব্রত সেনগুপ্ত ও সমকালীন বঙসমাজ’ এবং ‘ইউনিসন’ (এনিমেশন)। 

সমকালীন বিষয়াবলীর জোরালো উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন তারক মাসুদ। চিরকাল চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখা এই গুণী নির্মাতার মৃত্যুও হয়েছিল চলচ্চিত্রের কাজেই। ‘কাগজের ফুল’ নামক চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের লোকেশন নির্বাচন করে ফেরার পথে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্য হয় বাংলা চলচ্চিত্রের বিকল্প ধারার প্রবর্তক, উপমহাদেশের খ্যাতিমান এই চলচ্চিত্র নির্মাতার। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ২০১২ সালের বিভিন্ন সময়ে লেখা তার চলচ্চিত্র সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলোকে একত্র করে একটি বই প্রকাশিত হয় ‘চলচ্চিত্রযাত্রা’ নামে। বইটিতে ভূমিকা লিখেছেন তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। লেখক হবার একটা টান সবসময়ই তার মাঝে ছিল। যে কারণে তিনি বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্রকার না হলে লেখক হওয়ার চেষ্টা করতাম।’

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসটিই/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

নতুন মৌলিক গান “তুমি হারালে কোথায়?”

নতুন মৌলিক গান “তুমি হারালে কোথায়?”


করোনায় আক্রান্ত তাহসান

করোনায় আক্রান্ত তাহসান


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


গ্রেপ্তার হলেন বলিউড অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী

গ্রেপ্তার হলেন বলিউড অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী


সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব

সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব


বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বাংলার মুখ’

বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বাংলার মুখ’


হুট করেই বিয়ে পরীমনির, ৫ মাসেই ভাঙল সংসার!

হুট করেই বিয়ে পরীমনির, ৫ মাসেই ভাঙল সংসার!


এফডিসিতে ৫ গরু কোরবানি দিচ্ছেন পরীমনি

এফডিসিতে ৫ গরু কোরবানি দিচ্ছেন পরীমনি


করোনার মধ্যেই বিয়ে করলেন কর্নিয়া

করোনার মধ্যেই বিয়ে করলেন কর্নিয়া


ঐশ্বরিয়া-আরাধ্য করোনা নেগেটিভ, চিকিৎসাধীন অমিতাভ-অভিষেক

ঐশ্বরিয়া-আরাধ্য করোনা নেগেটিভ, চিকিৎসাধীন অমিতাভ-অভিষেক