Wednesday, April 10th, 2019
চোখের জলে বীরের বিদায়
April 10th, 2019 at 10:14 am
চোখের জলে বীরের বিদায়

বাড়ির আঙিনার এক কোণে বছর তিনেক আগে যত্ন করে একটি শিমুল গাছ লাগিয়েছিলেন সোহেল রানা। ছুটিতে বাড়িতে এলেই তার যত্ন পেতো গাছটি। সেই শিমুল ছায়াতেই সমাহিত হয়েছেন বনানীর অগ্নিবীর সোহেল।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় যখন দাফনের জন্য সোহেল রানার মরদেহ কবরে নামানো হচ্ছিল, তখন কেঁদে ওঠে আকাশটাও। অঝোর ধারার বৃষ্টি একাকার করে দেয় মা-বাবা, ভাই-বোন আর স্বজনদের চোখের জল।

এর আগে সোহেল রানার মরদেহ আনা হবে, এই খবরে সকাল থেকেই বাড়িতে ঢল নামে শোকাহত হাজারো মানুষের। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনসহ শোকাহত জনতার ব্যাকুল প্রতীক্ষা! নিজের জীবন দিয়ে অন্যদের জীবন বাঁচানো মানুষটিকে শেষ বিদায়ের সময় একনজর দেখে, একটু ছুঁয়ে দেখতে চান তারা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে বিকাল ৫টায় যমুনা নামের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানার মরদেহ পৌঁছায় কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে। ঢাকা থেকে বাড়ি পর্যন্ত সোহেলের মরদেহের সঙ্গে ছিলেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মিন্টু, ভগ্নিপতি জসিমউদ্দিন ও ছোট ভাই উজ্জ্বল মিয়া।

অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিথর দেহে কফিনবন্দি সোহেলকে বাড়ির আঙিনায় নিয়ে রাখার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সোহেলের মা, বাবা, ভাইবোন ও স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। ছেলের কফিন আঁকড়ে মা হালিমা খাতুনের বিলাপ, ছোট দুই ভাই রুবেল ও দেলোয়ারের কান্না, বড় বোন সেলিনার আহাজারি আর নির্বাক বাবা নূরুল ইসলামের বোবা কান্না ছুঁয়ে যায় সবাইকে। সোহেলকে দেখতে আসা অন্যদের চোখেও তখন জল। সেখান থেকে বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে সোহেল রানার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় চৌগাংগা পুরান বাজার সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা সংলগ্ন খোলা মাঠে। সেখানে ৫টা ৪০ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় সোহেলের দ্বিতীয় ও শেষ জানাজা। জানাজার আগে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানান তাদের অগ্নিবীরকে। সোহেল রানার জন্য দোয়া চেয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন চাচা রতন মিয়া। জানাজায় জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. দুলাল মিয়া, ইটনা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চৌধুরী কামরুল হাসানসহ কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে সন্ধ্যা ৬টায় বাড়ির আঙিনায় সোহেল রানার নিজের লাগানো শিমুল গাছের নিচে খনন করা কবরে সমাহিত করা হয় অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনদানকারী এই ‘রিয়েল হিরোকে’।

জানাজায় অংশ নেয়ার আগে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, সোহেল রানা একজন বীর। তিনি বনানী এফআর ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অনেককে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন যে, কর্তব্যের কাছে তিনি কত বড়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সোহেল রানার পরিবারকে নগদ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে সরকারি তরফ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, সোহেল রানার মৃত্যুতে মহামান্য প্রেসিডেন্ট ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পৃথক শোক প্রকাশ করেছেন। সোহেল রানা তার জীবন উৎসর্গ করে তিনি যে নজির স্থাপন করে গেছেন, সেটা সবার মাঝে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার) বলেন, সোহেল রানা মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিয়ে জাতীয় বীরের পরিচয় দিয়েছেন। এই জন্য আমি বাংলাদেশ পুলিশ ও কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে স্যালুট জানাই। এর আগে মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টায় ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরে সোহেল রানার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সকালে কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানাকে সম্মান জানানো হয়। বিউগলের সুর বাজিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পতাকায় মোড়ানো সোহেল রানার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ফায়ার সার্ভিসের চৌকস দল। গত ২৮শে মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকা পড়াদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। তারপর থেকে সিএমএইচে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রেখে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত শুক্রবার (৫ই এপ্রিল) সন্ধ্যায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়।

কিন্তু চিকিৎসকদের প্রাণান্ত চেষ্টা আর দেশবাসীর অফুরান প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। সোমবার (৮ই এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফায়ার ফাইটার সোহেল রানা। পরে সোমবার সন্ধ্যায় নিহত সোহেল রানার মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে সোহেল রানাকে বহনকারী সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। রাতে মরদেহ রাখা হয় রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) মর্চুয়ারিতে।

সহকর্মীদের শ্রদ্ধা:
ওদিকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, সকাল ১১টার দিকে লাশবাহী গাড়িটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তরে আসে তখন শোক ছুঁয়ে যায় সবাইকে। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহেল রানার স্বজন ও সহকর্মীরা। সোয়া ১১টায় ফায়ার সার্ভিসের ফুলবাড়িয়ার সদর দপ্তরে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার আগে সেখানে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সোহেল রানার ভাই উজ্জ্বল। লাশবাহী গাড়ি থেকে যখন কফিনটি নামানো হয় তখন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কমলা রঙের পতাকা দিয়ে ঢাকা সোহেল রানার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন তার ভাই উজ্জ্বল।

এ সময় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন। তখন তাদের চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ছিল। জানাজা শুরুর আগে সবার উদ্দেশ্যে উজ্জ্বল বলেন, আমার ভাই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমার ভাই সব সময় দায়িত্ববান ছিলেন। এমন ছিল, যে প্রত্যেক সময় কোনো কাজের দায়িত্ব থাকলে সেটি মন দিয়ে করতেন। অন্যের কাজে সব সময় আগ্রহ দেখাতেন। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন।

আপনারা আমার ভাইকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার ভাই যেন জান্নাতবাসী হয় এজন্য দোয়া করবেন। ফায়ারম্যান সোহেল রানার পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তাদের পরিবারে সোহেল রানা একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। আমাদের ফায়ার সার্ভিস তো বটেই, আমরাও সবাই লক্ষ্য রাখবো, তার পরিবারে যদি উপযুক্ত কেউ থাকে তার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। সোহেল রানার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। দেশকে ভালোবাসতেন। তার প্রমাণ তিনি রেখে গেছেন।

সোহেল রানাকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিএমএইচে ভর্তি থেকে আরম্ভ করে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসায় কোনো রকমের ত্রুটি ছিল না।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন, সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান, পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইব্রাহীম খান, এনটিএমসির ডিজি জিয়াউল আহসান প্রমুখ।


সর্বশেষ

আরও খবর

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ


করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার