Monday, August 15th, 2016
ছফা’র শেখ মুজিবুর রহমান
August 15th, 2016 at 12:12 pm
ছফা’র শেখ মুজিবুর রহমান

বিধুনন জাঁ সিপাই, ঢাকা: আচ্ছা, শেখ মুজিব কি বাঙালি জাতি ও বাঙলার জনগনের কাছে একজন মহান শহীদ? যিনি সপরিবারে ঘৃন্য গুপ্তঘাতকের হাতে প্রান হারিয়েছেন বটে, কিন্তু বাঙলার ইতিহাস পরম আদরে এই মহান সন্তানের রুধির-রঞ্জিত স্মৃতি লাল নিশানের মত উর্ধ্বে তুলে ধরে নিরবধিকাল এই জাতির সামনে চলার প্রেরনার উৎসস্থল হয়ে বিরাজ করবে? জাতির সংকট মুহূর্তে বিমূর্ততার অন্তরাল ভেদ করে তেজীয়ান প্রেমবান মুজিব আবির্ভূত হয়ে করাঙুল প্রসারিত করে সংকট ত্রানের পথ নির্দেশ করবেন? লক্ষ প্রদীপ জ্বালা স্তুতি নিনাদিত উৎসবমঞ্চের বেদীতলে সপরিবারে যার মৃতদেহ ঢাকা পড়ে রইল, রাজপথে শোকের মাতম উঠল না, ক্রন্দনধ্বনি আকাশে বিঁধল না, কোথাও বিদ্রোহ-বিক্ষোভের ঢেউ জলস্তম্ভের মত ফুলে ফুলে জেগে উঠল না। এ কেমন মৃত্যু, এ কেমন পরিনতি শেখ মুজিবের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের! সব চুপচাপ নিস্তব্ধ! তা হলে কি ধরে নিতে হবে বাঙলাদেশের মানুষ যারা তার কথায় হাত উঠাত, দর্শন মাত্রই জয়ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করত, তার এমন করুন, এমন ভয়ংকর মৃত্যু দেখেও ‘বাঁচা গেল’ বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। ইতিহাসের অন্যান্য প্রতারক ভিলেনদের ভাগ্যেও সচরাচর যা ঘটে থাকে শেখ মুজিবের ভাগ্যেও তাই কি ঘটেছে?

উপরের প্রশ্নগুলি মহাত্মা আহমদ ছফা তার “শেখ মুজিবুর রহমান১-২” শিরোনামের দুইটি প্রবন্ধে আমাদের সামনে পেশ করেছেন অনেকটা উত্তর দেবার ছলেই। ছফা তার প্রশ্নগুলির জবাবের জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকেন নাই। প্রবন্ধ দুটির অলি-গলি হয়ে রাজপথে এলেই দেখা মিলবে এক কিংবদন্তী মহানায়কের। যার পরিচয় দিয়েছেন আহমদ ছফা এই বলে, ‘বাঙলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান এ দুটো যমজ শব্দ’।

বাঙালির প্রানের সন্তান শেখ মুজিব, যিনি পুত্র হয়ে পিতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন প্রত্যেক বাঙালীদের জাতিসত্ত্বার মানসে। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, শেখ মুজিবুর রহমান কেবল ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের একটা ভূখন্ডের সৃষ্টি করেছেন। ভারতের সাথেও বাঙলার একটা অংশ আছে। তাদের নেতা শেখ মুজিব কেন? তারা কেন শেখ মুজিব কে কেন তাদের পূজিনীয় করে রাখবে?

হ্যাঁ, এটা সত্য যে, বাঙলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে আছে রাজনীতির কাঁটাতারের বেড়ায়। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আপন করে পেতে গেলেই সেই কাঁটা বিঁধে বুকে, রক্তক্ষরণে সয়লাভ হয়ে যায় বাঙলার জমিন। কিন্তু রবিন্দ্রনাথ পূজিত হয়ে আছেন বাঙালীর অন্তরকক্ষে। রবিন্দ্রনাথকে আমাদের অর্জন করতে হয়েছে একটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান আমলে, মুসলমানী করন নীতিমালায় আমরা দেখেছি নজরুলের কবিতার সংশোধন করা হয়েছিল সচেতন প্রক্রিয়ায়- যেমন, ‘নবনবীনের গাহিয়া গান/ সজিব করিল মহাশশ্মান’। ‘মহাশশ্মান’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়েছিল ‘গোরস্থান’ এ। পাকিস্তানীদের এহেন ইসলাম প্রক্রিয়ায় রবিন্দ্রনাথ কে আমাদের জন্য হারাম ঘোষনা করলেন পাকিস্তানী প্রভুগন। এবং এটা অবশ্যই সর্বজন স্বীকৃত, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রবিন্দ্রনাথ কে আমরা হাছিল করেছি রাজনৈতিক ভাবে। পশ্চিমবংগ কিম্বা দুনিয়ার অন্য কোথাও বাঙলিদের এহেনও তরিকায় রবি ঠাকুরকে অর্জন করতে হয় নি।

রবিন্দ্রনাথ যেমন স্থান, কাল, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা দ্বারা নির্নীত হয় না; শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি কাঁটাতার, আইন, পাসপোর্ট দ্বারা নির্ধারিত নেতা নন। রবিঠাকুরকে আপন করতে যেমনি প্রয়োজন হৃদয়ের নিরব শব্দ শোনার আকাঙ্ক্ষা তেমনি শেখ মুজিব কে বুঝতে দরকার জাতিসত্ত্বার রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের ঐতিহাসিক পদযাত্রায়  অংশ নেয়ার সাহস থাকা। বাঙলি তার এই সংগ্রাম মুখর অভিযাত্রায় হাজারো সূর্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন। বঙ্গমাতার রত্নগর্ভে অসীম সাহসের দৃঢ়তা নিয়ে জন্মেছে লক্ষ বীর সেনানী। এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস বাঙালির জানা নাই বলে, তারা শেখ মুজিবের জন্মকে অস্বাভাবিক মনে করেন। আদতে সত্যি কথা হল, শেখ মুজিবুর রহমান হলেন চিরায়ত সংগ্রামী বাঙালিদের ধারাবাহিকয়তায় জন্ম নেয়া এক মহাপুরুষ। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার জন্মপথ ধরে বাঙলা, বাঙালি এবং বাঙলা ভাষা এই ত্রি নদীর মিলন মোহনায় যে পদ্ম ফুটেছে তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ শেখ মুজিবের পূর্বে কিম্বা সমকালীন সময়ে আমরা আরো অনেক মহান নেতার আবির্ভাব দেখেছি, বাঙালি মুক্তির নানা মন্ত্রে তারা আমাদের উদ্ভাসিত করেছেন, তাদের দৃঢ়তা আমাদের কে শিখিয়েছে লড়াই সংগ্রামে টিকে থাকার কৌশল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম কোন বাঙালি যিনি বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

একটা স্বাধীন রাষ্ট্রভূমি প্রয়োজন যে কোন জাতিসত্ত্বার চরম উৎকর্ষতার জন্যে। বাঙালির চরম ও পরম বিকাশের জন্যে তাই প্রয়োজন ছিল একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার যা কিনা একটা অভিন্ন স্বপ্নের মাধ্যমে, নিপীড়িত প্রান্তিক মানুষ তাদের স্ব স্ব জাতিগত আচরণ এবং দার্শনিক চর্চার মাধ্যমে উদ্ভাসিত করবে এই ভূলোক। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিক্তিতে সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট হয়ে ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে যে বিভক্তি হয় এই উপমহাদেশে, তাকে ভুল প্রমান করে বাঙলি যে স্বরাজ স্থাপন করেছে তার শিকড় বাঙালি রাজনৈতিক মানসে এবং তার মহীরুহ শেখ মুজিবুর রহমান। আহমদ ছফা’র ভাষায়-‘বস্তুত বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতাঞ্জলি নয়, বলাকা নয়, সোনার তরী নয়। তা হল ‘আর দাবায়ে রাখবার পারবা না’। সহস্রাধিক বছরের পরাধীন জীবনের অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে এই উচ্চারণের মাধ্যমে গোটা জাতির চিত্রালোকের তিনি এমন একটা অনমনীয় আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করেছিলেন যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরাট এক প্রেরনা হিসেবে কাজ করেছে। এই গৌরব শেখ মুজিবকে অবশ্যই দিতে হবে’।

আমরা আমাদের কথা শেষ করে এনেছি। শেখ মুজিবুর রহমান একটা মহাকাব্য, এমন বটবৃক্ষকে একটা লেখায় শেষ করা সম্ভব না। আমরা আহমদ ছফা’র ‘শেখ মুজিবুর রহমান-২’ প্রবন্ধের সাথে শেষযাত্রা করছি-

‘শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর বাঙলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের রুপকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে, জনগনের মধ্যে কোন উত্থান শক্তি নেই, স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল্যবোধগুলো একে একে ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে। জনজীবন এবং সমাজজীবন অপরাধের ভারে জর্জরিত এবং কলুষিত। জাতিকে ধর্মের আলখেল্লা পরিয়ে দিয়ে এমন এক বিপরীত মেরুতে ঠেলে দেয়া হয়েছে সেখান থেকে উদ্ধারের আশা একেবারে অসম্ভব না হলেও সুদূর পরাহত হয়ে উঠেছে’।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/বিজাঁসি/এসকেএস


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা