Tuesday, September 27th, 2016
ছোট গল্প: জনৈকা প্রান্তিক বেশ্যার ডেরায়
September 27th, 2016 at 2:12 pm
ছোট গল্প: জনৈকা প্রান্তিক বেশ্যার ডেরায়

বরিশাল এসেছি আজ দু’দিন। কাক আর কুকুরের অবাধে বাসযোগ্য সময়ে রিক্সাওয়ালা আমাকে বান্দ রোডের একটি আবাসিক হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়েছেন। আগামী সাত দিন আমি এই শহরে থাকবো। আমি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা; দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এ উন্নয়ন সংস্থার প্রথম প্রকল্প এটি, ভাগ্যচক্রে আমিও তাদের পাঠানো প্রথম কর্মকর্তা।

এর আগে আমি ও আমার সংস্থা দেশের উত্তরাঞ্চলে মাতৃমৃত্যু ও শিশু খাদ্যগুণ নিয়ে কাজ করেছি। আমরা অনেক আশায় ছিলাম আমাদের চলমান প্রকল্পের মেয়াদ নিয়ে আবার ফান্ড আসবে, আমরা উত্তর থেকে দক্ষিণ অব্দি প্রসারিত করবো আমাদের কাজ, কিন্তু ফান্ড কালেকশনের প্রতিযোগিতার এই বাজারে আমাদের থেকে আরও আধুনিক প্রজেক্ট জমা পড়ায় দাতা সংস্থা সাফ জানিয়ে দিয়েছে এই প্রকল্পে আর একটি ডলারও তারা খরচ করবে না; সাথে যুক্ত করেছে- যদি পুরাতন কোনো সংস্থা থেকে নতুন কোনো প্রজেক্ট আসে এবং সেগুলো ফলপ্রসূ মনে হয় তবেই আমাদের আবার এক সাথে কাজ করার সুযোগ আসবে।

অফিসের বস আহমেদ ইউসুফ চৌধুরী সবাইকে নতুন আইডিয়া দিতে বলেছিলেন, যার আইডিয়া থেকে ফান্ড আসবে তাকে কমিশন দেওয়া হবে এমন লোভনীয় প্রস্তাবেও আমরা কিছুই করতে পারলাম না। কারো আইডিয়াই আহমেদ ইউসুফ চৌধুরীর মনে ধরে নাই। চৌধুরী ভাই বার বার বলেছিলেন ‘it’s an era of idea’

আর আমার আইডিয়া শুনে চৌধুরী ভাই বলেছিলেন, ‘Mister, it’s an era of idea, not ideology!’

নতুন আইডিয়া এসেছে, আমরা ফান্ড পেয়েছি এবং দেশের দক্ষিন অঞ্চলের পতিতাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এটাই আমাদের নতুন প্রকল্প। পতিতাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার আইডিয়া কিন্তু চৌধুরী ভাইয়ের মাথা থেকেই এসেছিলো। জিনিয়াস কাকে বলে! আমরা বাঙালীর পকেট থেকে টাকা খসাতে পারিনা আর তিনি পশ্চিমাদের পকেট থেকে ডলার খসান।

প্রথমদিন কেটে গেছে পতিতালয় খুঁজে পেতে। যে হোটেলে উঠেছি, তার রুম সার্ভিসে কাজ করা ছেলেটিকে বললাম একটা পতিতালয়ের খবর দিতে। হাসিমাখা মুখে কিছুক্ষন বাদে সে কয়েকটা ছবি নিয়ে ফেরত এসে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘স্যার হোমডেলিভারী- র‍্যাব, পুলিশ, চিতা, কোবরা, ইমান, আমল কোনো সমস্যা নাই।’ অনেক কষ্টে আমার কাজটা তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। সব শুনে সে বলছে, ‘তবুও স্যার, লাগলে কইবেন, আদা ঘন্টায় আপনার রুমে হাজির কইরা দিমু।’

আজ সকাল থেকে কাজ শুরু করেছি লঞ্চঘাটের কিং ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে। শুধু মাত্র একজনের সাথে কথা বলতে পেরেছি, বাকিরা লাঞ্চ আওয়ারের বিরতিতে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছে। সকালে যার সাথে কথা বলেছি তার নাম নিশী। তবে আসল নাম কি না, তা নিয়ে আমার মধ্যে সংশয় আছে। ভয়ও আছে- তথ্যের যদি যাচাই বাছাই হয়! আমি আবার প্রশ্ন করলাম আপনার নাম কি শুধুই নিশী? চমৎকার উত্তর পেয়েছি- ‘ হুনেন মিয়া ভাই, মা ছাড়া আমাগো আসল নাম কেউ যানে না।’

সকালের সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আবার ফিরে এসেছি কিং ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে। সরু গলির মধ্যে আলোহীন নীরবতা যে মনে কোন অপরাধবোধ জন্ম দিতে পারে, সে ধারণা ছিলো না। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে সিঁড়ির হাতল ধরে উঠে যেতে হবে। সব মিলিয়ে পাঁচটি ছোট কামরা, যে লঞ্চে এসেছিলাম তার সিংগেল কেবিনের মতন। একটা ছোট হলরুমে আমাকে বসানো হয়েছে। রুমে থাকা দুইজন আমাকে বারবার দূর থেকে মেপে যাচ্ছে, এইরুম হচ্ছে মালখানা; সন্মানিত কাস্টমারগন এখান থেকেই তাদের যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

এমন মালখানায় আমি আগে যে যাইনি, তাতো নয়। করমাইকেল কলেজের শেষ দিকে একবার গিয়েছিলাম, তবে সেই যাওয়া ও এই আসার বিস্তর ফারাক। আজ আমি বাবু, তখন বাবুমশাই ছিলাম। বেশ্যা আর বাবু ছাড়া নাকি এই আধুনিক নগর সভ্যতায় আর কিছু নাকি নাই। আমি ভাবি, আমি আসলে কোনটা? নিজেকে ও চৌধুরী ভাইকে দু’টাই মনে হয়।

যাই হোক ওদের গায়ের বাসনা ভরা ঘিঞ্জিরুমে টিভিতে গান হচ্ছে-

‘বাবু আমার রশিক মশাই
চাইট্টা খায় যে গাল
বুড়া বয়সে বাবু মশাই
বড়ই বেশামাল’

একজন এসে সালাম দিলো, আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিলাম। যে দু’জন আমাকে এতক্ষন দেখছিলেন তাদের একজন আওয়াজ দিলেন শরমের কিছু নাই ভাইজান, আমাগো মতনই, একই দেখতে আপনাদের মা, বোইন, বউ। কথাটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও পরক্ষনে ভাবলাম, ঠিকই তো আছে! কাঠামোগত মিল তো আমি অস্বীকার করতে পারিনা।

আমি মাথা নিচু করেই রেখেছি, ব্যাগ থেকে নোট খাতা ও কলম বের করে রেডি হচ্ছি পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি, কেউ আসছে-

-আসসালামুআলাইকুম ভাইজান, আইয়া পড়ছেন?

-জ্বি আপা।

সেই দুজনের আর একজন আবার প্রশ্ন করলেন,

-আপা কি মন থেইক্কা কইলেন ভাইজান?

-জ্বি আপা।

আমি মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম এবার। যাই হোক এবার আমার প্রশ্ন করার পালা, আমি ছোট করে নোট খাতায় নোট লিখলাম ‘প্রান্তিক বেশ্যার ডেরায়’

-আপনার নামটা বলেন
– উন্মে কুলসুম সুমাইয়া।
-কেমন আছেন?
– আছি আর কি।

সেই দু’জন এখনো এখানেই বসে আছেন। ফিসফিস করে কথা বলছেন, তা আমি শুনতে পাচ্ছি। কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তরে একজন অন্যজনকে বলছে, চব্বিশ ঘন্টা ড্যাশের উপরে থাকলে বুঝতেন কেমন আছি। আমিতো বাবু, তাই তাদের প্রচলিত ও বহুল ব্যবহারিত শব্দটি লিখতে হোঁচট খেলাম।

– কত দিন ধরে এই পেশায় আছেন?
– জ্বে আইজ চাইর বছর।
– পরিবারে কে কে আছে?
– বাপ, মা, দুই ভাই, তিন বোন, আর দাদি। আমি বাদে ৮ জন, ভাইজান।
– শরীর ভালো?
– চব্বিশ ঘন্টা চিত ওইয়া হুইয়া থাহার কাম, ভাল মন্দ চিন্তা পরে কইরা কইতে পারমু।

আমি তাকে জানালাম এগুলো আমাকে লিখতে হবে যদি একটু সুন্দর করে উত্তর পাওয়া যায় তবে আমার লেখার জন্য ভাল হবে।
সে বললো- ‘আচ্ছা লেখেন ভাইজান, সুমাইয়া মন্দ আছে, জন্মের পড় থেকেই সুমাইয়া মন্দ আছে, হ্যায় ভাল থাকতে চায়, তয় তা আর হয় না।’
– এই প্রফেশনে কি কি সমস্যা?
– বুঝিনাই ভাইজান।
– এই পেশায় কি কি সমস্যা?
– এই ধরেন হোটেল মালিক থানায় টাকা না দিয়া আমাগো পাঠায় দারোগার কাছে, নেতার আসে, হোটেল মালিক সমিতির লোকজন আসে, ঘাটশ্রমিক এর সভাপতি আসে তার পোলাও আসে, এত মানুষ আসে, সবার কাম ফ্রি! আপনে কন, এই বাজারে ফ্রির চল আছে না কি? কই, আমার চাউল ডাইল আটা লবন কিছুই তো ফ্রি না! আরে ফ্রি তে দিলে তো বিয়া করতাম, বাচ্চার মা হইতাম, মানষেরে বিলাইতাম না।

সুমাইয়ার চোখে মুখে কি অদ্ভুত এক ক্রোধ আমাকে আতঙ্কিত করে ফেলেছে আমি আস্তে করে বললাম, জ্বি আপা। আর কি কি সমস্যা?
– সমস্যার শ্যাষ নাই ভাইজান, এই হেদিন আমাগো গ্রামের এক পোলা আইয়া দেখে আমি এই হোটেলে। তিনশো টাকার কাম ফ্রিতে কইরা দিলাম, এখন গ্রামে গেলেই হুমকি দেয়, টাকা চায়, শুইতে চায় ফ্রি তে, আবার ভয় দেখায় মানসেরে কইয়া দিবে! এইডা ক্যামন কতা? হে যে খানকীপাড়ায় আইলো, তাতে ইজ্জ্বত গেলো না? খালি মাগীর ইজ্জ্বত গেলো?

– এইবার আপনার মানসিকক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন করি
– মানসিক স্বাস্থ্য জিনিশটা ঠিক বুঝতে পারি নাই ভাইজান।
– মানে হচ্ছে আপনার মনের স্বাস্থ্য।
– মনের আবার স্বাস্থ্য আছে না কি ভাইজান, আইজ শুনলাম।
– ঘুরতে যান কোথাও?
– যাইতো, দারোগার বাসায়, মালিক টাকা না দিলে দারোগা যারে খুশি তারে বাসায় লইয়া যায়।
– অন্য কোথাও?
– জ্বে না, ভাইজান।
– গান শুনেন?
– এই রুমে আইসা যা চলে তাই দেখি এই আর কি।
– সিনেমা দেখেন?
– না।

সেই দুজনের একজন একবার উঁচু স্বরে বলে উঠলো, ‘আরে দ্যাখেতো! নিজের ব্লুফিল্ম দেখে ভাইজান, এই সিনেমার মধ্যে কোনো এ্যাডভাটাইজ নাই ভাইজান!’

বাকিরা হেসে দিলেও আমি অনেক কষ্টে নিজেকে ভাইজান বানিয়ে রাখি।

– বাড়িতে যোগাযোগ করেন?
– নাহ, শুধু মায়ের লগে কথাকই মালিকের মোবাইল দিয়া মাসে একবার টাকা দেওনের সময়।
– দৈনিক ইনকাম কেমন হয়?
– ৩০০ টাকা, যে কজন কেলাইন্ট পাওয়া যায়, ইংরাজীতে কেলাইন্ট কয় না ভাইজান?
– জ্বি।
– অন্য কোন আয় আছে?
– সামনের এক রেট পেছনের হাই রেট, ঐ টাকা কিছু কিছু হাতে থাকে।
– আমি অন্য আয় বলতে জমিজমা পারিবার আয় বুঝিয়েছি।
– পাগল আপনে? হেইয়া থাকলে ক্যাডা শখ কইরা বেশ্যা হইতে চায়? এইটা যে গাইল, সবাই যানে কিন্তু!
– শারীরিক সমস্যা আছে কি কোন?
– ব্যাথা ভাইজান, রাইতে সবাই কাতরায় ব্যাথার যন্ত্রনায়। অনেকে রাইতে কান্দে, একবার এক ছেড়ি তো ফ্যানের লগে নিজেরে ঝুলাইয়া দিলো, ব্যাথা ভাইজান। বুঝবেন না। ব্যাথার যন্ত্রনায় মাঝে মাঝে ভাবি, আল্লাহতালা শরীরে যদি আর দুই একটা ফুটা বাড়াইয়া দিতেন, দুইটা ফুটা দিয়া এতগুলা মানষের পেট চালান যায় না।

দুনিয়ার প্রাচীন কোনো নির্বাক চলচ্চিত্রের চিরস্থায়ী নির্বাক চরিত্র হয়ে যাই আমি। আর লিখতে পারি না। বিদায় নিয়ে ফিরে আসি; মনে বিস্বাদ না কি আনন্দ বুঝতে পারছি না। কানে সুমাইয়ার ইচ্ছারা বেজেই চলেছে- মনে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কোন এক শহুরে নারী কবিতা পড়ছে, ‘হে ঈশ্বর আরো কিছু ফুটো বাড়িয়ে দাও’

ফিরে এসেছি হোটেলে, কিছু হচ্ছে না, শহরটা দেখার ইচ্ছাও নষ্ট হয়ে গেছে, হোমডেলিভারী ছেলেটিকে ডাক দিলাম, সে খালি হাতে রুমে এসেছে। আবার পাঠালাম, ‘যাও, সেই ছবিগুলো নিয়ে আসো।’

ছেলেটা হেসে দিলো মনে হচ্ছে আমাকে বলছে; বাবু আর বাবুমশাই জীবন কম তো দেখলাম না!

rana-monirul

লেখক: মনিরুল ইমলাম রানা (সাংবাদিক ও গীতিকার)


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা