Wednesday, December 28th, 2016
জঙ্গি আতঙ্কের বছর
December 28th, 2016 at 8:09 am
জঙ্গি আতঙ্কের বছর

প্রীতম সাহা সুদীপ, ঢাকা: জঙ্গি উত্থানের ঘটনায় ভয়, আতঙ্ক আর শঙ্কায় কেটেছে বিদায়ী বছর (২০১৬)। জঙ্গি হামলা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ঘটে যাওয়া হামলায়। ওই ঘটনার পরই জিম্মি সংকটের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারে দেশবাসী। আতঙ্ক ও শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা জাতি।

ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঈদ-উল-ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার চেষ্টা করে জঙ্গিরা। এই দুই হামলার পর নড়েচড়ে বসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অনুসন্ধানে তারা জানতে পারেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি অংশ, যারা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিল তারাই এসব হামলা চালাচ্ছে। জেএমবির ওই অংশের (নব্য জেএমবি) সমন্বয় করছে তামিম চৌধুরী নামে একজন কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশের নাগরিক।

এরপরই শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গি বিরোধী অভিযান। রাজধানীর কল্যাণপুর, রূপনগর, আজিমপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে নব্য জেএমবির মূলহোতা তামিম, অর্থদাতা, সমন্বয়কসহ অনেক নেতাকর্মী মারা যায় এবং গ্রেফতার হয় বেশকয়েকজন।

গুলশান হামলা
ঢাকার বাতাসে তখন ঈদের আমেজ। নয় দিনের দীর্ঘ ছুটি পেয়ে নাড়ির টানে মানুষ শহর ছেড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ঢাকার স্বাভাবিক চাপ কমে গিয়েছিল অনেকটাই। শপিং মলগুলোয় চলছিলো শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা। ঠিক এমন সময়ই জাতির জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। দিনটি ছিল শুক্রবার। রাত সাড়ে আটটার দিকে হঠাৎ করেই গুলশান-২ এর হলি আর্টিজান বেকারি নামের স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে অস্ত্রধারী ৮/১০ জন যুবক, যাদের বয়স ২২ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। তারা রেস্টুরেন্টের সবাইকে জিম্মি ঘোষণা করে। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান শুরু করে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তি আহত হয়। এরপরের ঘটনা পুরোটাই রক্তাক্ত, জঙ্গিরা একে একে ২০ জন জিম্মিকে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি, একজন ভারতীয়, ৯ ইতালীয় এবং সাতজন জাপানি নাগরিক। প্রায় ১২ ঘন্টার ওই ‘জিম্মি সংকট’ শেষ হয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ দিয়ে।

অভিযানে পাঁচ জঙ্গি ও রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। নিহত জঙ্গিরা হলেন- নিব্রাস ইসলাম, মীর সামি মোবাশ্বির, রোহান ইমতিয়াজ, রাইয়ান মিনহাজ ও আন্দালিব আহমেদ। পরে আক্রান্ত হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয় হাসনাত করিম, তাহমিদ খানসহ ৩২ জিম্মিকে।

শোলাকিয়া হামলা
গুলশান হামলার আতঙ্ক থেকে বের হয়ে মানুষ যখন ঈদের আমেজ উপভোগের প্রস্তুতি নিয়েছে, ঠিক সেই সময় ঈদের দিন সকালে (৭ জুলাই, বৃহস্পতিবার) কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে হামলা চালায় জঙ্গিরা। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। শোলাকিয়া মাঠের অদূরে শহরের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে মুফতি মোহাম্মদ আলী জামে মসজিদের মোড়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম ও আনছারুল ইসলাম নামে দুই পুলিশ সদস্য, এক হামলাকারী ও এক নারী নিহত হন। হামলায় পুলিশের আরও ৬ সদস্য গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল ও একটি চাপাতি উদ্ধার এবং আহত অবস্থায় দুই সন্ত্রাসীসহ তিনজনকে আটক করা হয়।

কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান
গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের তাজ মঞ্জিল নামের ছয়তলা ভবনের ৫ তলায় জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায়। ২৬ জুলাই ভোররাতে ওই আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের সোয়াট ইউনিট। সঙ্গে সহায়তায় ছিল ডিবি, থানা পুলিশও। সোয়াট বাহিনীর নেতৃত্বে ‘অপারেশন স্টর্ম টোয়েন্টি সিক্স’ নামে মূল অভিযান চলে ভোর ৫টা ৫১ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা। অভিযানে গোলাগুলিতে নয় জঙ্গি নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে হাসান নামে একজনকে আটক করা হয়।

গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তামিমের মৃত্যু
নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার ‘দেওয়ান বাড়িতে’ ২৭ আগস্ট শনিবার সকালে ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ নামে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই অভিযানে গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরীসহ তিনজন নিহত হয়।

রূপনগরে সামরিক প্রশিক্ষক ‘মেজর মুরাদ’ নিহত
মিরপুরের রূপনগরের ৩৩ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় ২ সেপ্টেম্বর পুলিশের অভিযানে গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার সামরিক প্রশিক্ষক মেজর মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে ওমর নিহত হয়। তার আসল নাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের চাঁন্দপুরে।

লালবাগে অভিযানে পুলিশের উপর জঙ্গিদের হামলা
আজিমপুরের লালবাগে ২০৯/৫ ছয়তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশের অভিযানের সময় হামলা করে বসে জঙ্গিরা। এতে পুলিশের ৫ সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থলে আত্মহত্যা করে পুরুষ জঙ্গি তানভীর কাদেরী। তার বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের পশ্চিম বাটকামারি গ্রামে। বাবার নাম আবদুল বাতেন কাদেরী।

সেখান থেকে আহত অবস্থায় তিন নারী জঙ্গিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা হলেন, গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি (২৫), তানভির কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজার (৩৫) এবং জামান ওরফে বাসারুজ্জামানের স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৩)। এছাড়া আরো তিন শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে জঙ্গি বিরোধী অভিযান
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক অভিযানে ৮ অক্টোবর শনিবার সারাদিনে গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতারাসহ ১২ জঙ্গি নিহত হয়। এর মধ্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) হাড়িনাল পশ্চিমপাড়া লেবুবাগানে ২ জন ও নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় অভিযানে ৭ জঙ্গি নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে রাইফেল, পিস্তল ও চাপাতিসহ বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। আর টাঙ্গাইলে র্যা বের সঙ্গে পৃথক অভিযানে ২ জঙ্গি নিহত হয়।

নব্য জেএমবির নেতা সারওয়ার জাহানের মৃত্যু
একই রাতে (৮ অক্টোবর) সাভারের আশুলিয়ায় র্যা বের অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন নব্য জেএমবি নেতা আবদুর রহমান ওরফে নাজমুল ওরফে সারওয়ার জাহান (৪০)। পরে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান। পরে আশুলিয়ার বসুন্ধরা বাইপাইল এলাকার মৃধা বাড়ি থেকে সারওয়ারের পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করে র্যা ব। তাদের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা, একটি অস্ত্র, গুলি, মোবাইল জ্যামার, ধারালো অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।

তখন র্যা ব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিহত সারওয়ার জাহানই নব্য জেএমবির প্রধান শাইখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। তার বাসা থেকে জেএমবির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া যায়। তার নেতৃত্বে ২৫টিরও বেশি হামলা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের দেশি-বিদেশি বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন সহস্রাধিক।

দক্ষিণখানের আশকোনায় অভিযান ‘রিপল ২৪’
দক্ষিণখানের আশকোনার সূর্যভিলা নামের একটি বাড়িতে ২৩ ডিসেম্বর শুক্রবার জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায় পুলিশ। পরে রাত দুইটার দিকে বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকালে ওই বাসা থেকে রূপনগরে নিহত জঙ্গি জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ও তার মেয়ে এবং জঙ্গি মুসার স্ত্রী তৃষা ও তার সন্তান আত্মসমর্পণ করে।

কিন্তু ভেতরে রয়ে যান জঙ্গি সুমনের স্ত্রী, জঙ্গি ইকবালের সাত বছরের মেয়ে এবং তানভীর কাদেরীর ১৪ বছরের ছেলে আফিফ। তাদের কাছে আত্মঘাতী বা সুইসাইডাল ভেস্টসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক আছে বলে জানতে পারে পুলিশ। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাদের অসংখ্যবার আত্মসমর্পণের আহবান জানায় পুলিশ। কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত না করলে ভেতরে টিয়ারসেল নিক্ষেপ করা হয়।

এক পর্যায়ে দরজা খুলে ওই নারী জঙ্গি সাত বছরের মেয়েটিকে নিয়ে বের হয়। তারা পার্কিংয়ের দিকে এগিয়ে আসে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে আবারো আত্মসমর্পণ করতে বলেন। কিন্তু তিনি বাম হাতে শিশুটিকে এগিয়ে ধরে, ডান হাত উপরে তোলার ভঙ্গি করে হাত নামিয়ে কোমরে রাখা বিস্ফোরকে চাপ দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই নারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয় পুলিশ। তখনো জঙ্গি তানভীরের কিশোর ছেলে ভেতরেই অবস্থান করছিলো। সে আত্মসমর্পণ না করায় পুলিশ তাকে নিস্তেজ করতে গ্যাস ছোঁড়ে। একপর্যায়ে সে ভেতর থেকে গুলি করে ও গ্রেনেড ছোঁড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। এ সময় ওই কিশোরের মৃত্যু হয়।

সম্পাদনা: প্রণব


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর


সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের

সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের


করোনায় আরও ৩৭ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৬৯৫

করোনায় আরও ৩৭ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৬৯৫


পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা

পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা


দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী

দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী


করোনায় আরও ২২ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২৩৮১

করোনায় আরও ২২ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২৩৮১


‘করোনা মোকাবেলায় দেশকে লাল, সবুজ ও হলুদ জোনে ভাগ করা হবে’

‘করোনা মোকাবেলায় দেশকে লাল, সবুজ ও হলুদ জোনে ভাগ করা হবে’


এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%

এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%


বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি


এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী

এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী