Sunday, December 6th, 2020
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ধাপ্পার অভিযোগ ভারতীয় লেখকের!
December 6th, 2020 at 6:21 pm
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জুড়ি বোর্ডের সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসীম উদ্দিন নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “কাগজেপত্রে যেটা আছে, সেটা দেখেই আমরা পুরস্কার দিয়েছি।”
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ধাপ্পার অভিযোগ ভারতীয় লেখকের!

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

ফের প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এবার জুড়ি বোর্ডকে ধোঁকা দিয়ে ভারতীয় লেখকের নাম অনুল্লেখ রেখে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগের পুরস্কার নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছে নিউজনেক্সটবিডি। যৌথভাবে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হওয়া ‘ন ডরাই’ সিনেমার প্রযোজক মাহবুব উর রহমানকে পুরস্কারটি দেওয়া হবে।

যদিও মাহবুব এবং জুরি বোর্ডের দাবি, এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে চলচ্চিত্রটির অফিসিয়াল ট্রেইলার, হলে প্রদর্শিত সংস্করণ এবং উইকিপিডিয়ায় লেখক হিসেবে ওপার বাংলার সুপরিচিত চিত্রনাট্যকার শ্যামল সেনগুপ্তের নাম দেখা গেছে।

ইসলাম প্রবর্তকের স্ত্রীর নামে প্রধান চরিত্রের নামকরণের কারণে মুক্তির সময় সিনেমাটির বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ যখন প্রতিবাদ ভাংচুর থেকে শুরু করে হাইকোর্টের রুল অবধি গড়িয়েছিল, তখনও লেখক হিসেবে শ্যামলের নামই সর্বত্র উচ্চারিত হয়েছে।

তবুও প্রযোজক মাহবুব কিভাবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই ভারতীয়। সরকার বৃহস্পতিবার এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার ঘোষণার পর সেদিন রাতেই নিউজনেক্সটবিডি-র সাথে দীর্ঘ আলাপ হয় তাঁর।

শ্যামল বলেন, “এটা নিয়ে আমি কোনো ঝামেলা তৈরী করতে চাই না। তবে আমার কাছে ঘটনাটি খুবই অগ্রহণযোগ্য লাগছে। এটা কি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মর্যাদা নষ্ট করবে না? খোদ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে পুরস্কারটি হাতে তুলে দেবেন, সেখানে এমন ধোঁকাবাজি পুরো দেশের সম্মানের জন্যই ক্ষতিকর।”

“বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের যে জুরি বোর্ড, তারা কি কোনো কিছুর খোঁজ রাখেন না?” এমন প্রশ্নও তোলেন কলকাতার অন্তহীন (২০০৯), অপরাজিতা তুমি (২০১২) বা বুনো হাঁসের (২০১৪) মতো আলোচিত চলচ্চিত্রের এই চিত্রনাট্যকার।

তিনি বলেন, “তাদের শৈথিল্য দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। সিনেমাটি যদি বেশী আলোচিত না হতো, তাহলেও না হয় বুঝতাম তারা এ সম্পর্কে জানতেন না। যেখানে এত জায়গায় আমার নাম আছে, তারা কী করে এমনটা করলেন?”

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জুড়ি বোর্ডের সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসীম উদ্দিন নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন,  “কাগজেপত্রে যেটা আছে, সেটা দেখেই আমরা পুরস্কার দিয়েছি।”

“জুড়ি বোর্ডের কাছে যে প্রস্তাবণা গিয়েছে, সেখানে চিত্রনাট্যকার হিসেবে ওনার (মাহবুব) নামই দেওয়া হয়েছে। সেন্সর সনদেও তাঁর নাম আছে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা কাগজপত্রের বাইরে যেতে পারি না,” বলেন তিনি।

“দেশের চলচ্চিত্রের ‘জাতীয়’ মান কেমন হওয়া উচিত তা এই পুরস্কারের মধ্য দিয়েই দৃষ্টান্ত আকারে প্রতিষ্ঠা পায়,” উল্লেখ করে চলচ্চিত্র সংগঠক ও গবেষক বেলায়াত হোসেন মামুন নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “আসল চিত্রনাট্যকারে বদলে প্রযোজকের নাম দেওয়ার মতো ঘটনা সত্যিই যদি ঘটে থাকে তবে তা খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার। এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল।”

“মানহীন চলচ্চিত্রকে অথবা ভুল লোককে পুরস্কৃত করার মানে হলো দেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে নিয়ে পরিহাস করা। এ ধরনের ঘটনায় জাতীয় পুরস্কার জাতির কাছে জাতীয় ‘তিরস্কার’ বলে প্রতিভাত হয়,” বলেন ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের এই সাধারণ সম্পাদক। 

ন ডরাইয়ের সুবাদে ২০১৯ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক নির্বাচিত হওয়া তানিম রহমান অংশু নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “এই বিষয়গুলো পুরোপুরি প্রযোজকের আওতাধীন। তিনিই শ্যামল সেনগুপ্তকে চিত্রনাট্যের কাজে সম্পৃক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্যও প্রযোজনা সংস্থা স্টার সিনেপ্লেক্সের পক্ষ থেকেই সব ধরণের মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়েছিল। এগুলো একদমই তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।”

গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরী হওয়ার পর সিনেমাটির সাথে যুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শ্যামলের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর প্রযোজকই ভালো বলতে পারবেন।

জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর চলচ্চিত্রটির ফেসবুক পেইজে এই ছবিটি প্রকাশ করা হয়। 

অভিযুক্ত প্রযোজকের ভাষ্য

“পুরস্কারটি আসলে আমার প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। তাই সেখানে আমার নাম এসেছে,” জানিয়ে খোদ মাহবুব নিউজনেক্সটবিডিকে বলেন, “তিনিও (শ্যামল) আমাদের অংশ ছিলেন। একসাথে দলগতভাবেই কাজটি আমরা করেছি।”

“আসলে মূল গল্পটা আমার তৈরী করা। চিত্রনাট্যের কাজও এখানে (বাংলাদেশে) আমরাই করেছি। তবে তিনি যেহেতু অভিজ্ঞ, পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর সাহায্য নিয়েছি,” যোগ করেন তিনি।

“শ্যামল সেনগুপ্ত শুধু ‘ডক্টরিন’ (তাত্ত্বিক সহায়তা) করেছিলেন। তিনি খুবই প্রবীন লেখক। যে কারণে শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকেই সিনেমার ‘ক্রেডিট লাইনে’ লেখক হিসেবে তাঁর নাম দিয়েছিলেন আমাদের প্রযোজক,” মাহবুবের সাথে আলাপে এ তথ্য পাওয়ার কথা জানান অংশু।

জুরি বোর্ডের সদস্য সচিবও বলেন, “ন ডরাই সিনেমাটি কক্সবাজারের এক ‘সার্ফার মেয়ের জীবনের সত্য কাহিনী অবলম্বণে চট্টগ্রামের ভাষায় তৈরী। আর তিনিও (মাহবুব) চট্টগ্রামের মানুষ, যার কক্সবাজারে নিয়মিত যাওয়া-আসা আছে। কলকাতার কোনো মানুষের পক্ষে সেখানকার এই গল্প বা ভাষা জানা সম্ভব নয়। যে কারণে আমার মনে হয় না অভিযোগটা সত্য।”

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘বৃহন্নলা’সিনেমাটির কাহিনী পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ছোটগল্প ‘গাছটি বলেছিল’ থেকে নেওয়া হলেও নির্মাতা মুরাদ পারভেজ গল্পকার হিসেবে নিজের নাম দিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ গল্প ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেলেও পরে তা বাতিল করা হয়।

হতবাক শ্যামল সেনগুপ্ত

ঘটনার পরম্পরায় হতবাক শ্যামল বলেন, “এর আগে প্রকাশ্যে এমন পুকুরচুরি দেখিনি আমি। রুহেল (মাহবুব উর রহমানের ডাকনাম) বাংলাদেশে অনেক ক্ষমতাধর মানুষ। সিনেমার বড় পরিবেশক-প্রদর্শক এবং খুবই সম্ভাবনাময় প্রযোজক। সে কেন এমন ভয়ানক কাণ্ড ঘটাবে?”

প্রযোজনা সংস্থার পক্ষে দুইজন বাংলাদেশি সার্বিক সহায়তা করলেও “রুহেল গল্প বা চিত্রনাট্যের একটি শব্দও লেখেনি” উল্লেখ করে শ্যামল বলেন, “প্রভাবশালী হলে যা খুশি করা যায়- এমন বিপদজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক উদাহরণ সৃষ্টি করা হলো।”

তাঁর দাবি, ২০১৬ সালে প্রথমে তাঁকে শুধু গল্পটি লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন তিন মাস বসে তিনি যে গল্পটি লিখছিলেন, সহ-প্রযোজকের খোঁজে সেটা ভারতের গোয়ার চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ফিল্ম বাজারে’ জমা দেওয়ার পর তাঁকে চিত্রনাট্য তৈরীর কাজে নিয়োজিত করা হয়।

ওই বছরের শেষের দিকে কক্সবাজারে গিয়ে টানা ছয়দিন ছিলেন তিনি। প্রযোজকের পক্ষ থেকে তাঁকে সেখানকার আলোচিত নারী সার্ফার নাসিমার গল্প নিয়ে তৈরী বিভিন্ন প্রামান্যচিত্র ও কক্সবাজার বিষয়ক কিছু বই সরবরাহ করা হয়। দেশে ফিরে এক বছর ধরে চিত্রনাট্যটি তৈরী করেন তিনি। পরবর্তীতে দৃশ্যায়ণ, এমনকি সিনেমা মুক্তির সংবাদটিও তাঁকে দেওয়া হয়নি।

ছবি মুক্তির পর আইএমডিবির ওয়েবসাইটে ন ডরাই সিনেমার গল্পকার হিসেবে প্রযোজকের নাম দেখে চমকে ওঠেন শ্যামল। তিনি বলেন, “এমনিতে রুহেল খুবই ভদ্রলোক, সৌমদর্শন, অমায়িক তাঁর ব্যবহার। সে এই কাজ করবে তা আমি ভাবতেও পারিনি। সেটাও না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু তাই বলে এমন হাস্যকর মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতীয় পুরস্কার নিতে হবে!”

ন ডরাই এবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছয়টি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কার ঘোষনার পর প্রযোজকের সাথে মুঠোফোনে কথা হওয়ার কথা জানিয়ে শ্যামল বলেন, “সে আমাকে বলছে, বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কারের নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশীর মনোনীত হওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে চিত্রনাট্য বিভাগে তারা আবেদন করলো কেন?”

এর আগে ২০১৭ সালের ‘ঢাকা অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘সেরা সম্পাদক’ হিসেবে ভারতীয় নাগরিক মো. কালামের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের ‘নিয়তি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক হিসেবে এমন একজনের নাম ঘোষণা করা হয়, যে সেই ছবিতে কাজই করেননি।

“বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যে কোনো ব্যক্তির ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এতে দেশের ও দেশের সংস্কৃতির মান সম্মানই বৃদ্ধি পাবে,” দাবি করে বেলায়াত হোসেন মামুন বলেন, “জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বা করে চলেছে তাতে আমাদের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির উৎকর্ষের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই না।”


সর্বশেষ

আরও খবর

উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে খুশি না হয়ে, উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির


জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মারা গেছেন


ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব

ডিআরইউর নতুন সভাপতি মিঠু, সাধারণ সম্পাদক হাসিব


ওমিক্রন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

ওমিক্রন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ; সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার


নির্বাচনী সহিংসতায় ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু

নির্বাচনী সহিংসতায় ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু


আবার রক্তক্ষরণ হলে খালেদা জিয়ার মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে

আবার রক্তক্ষরণ হলে খালেদা জিয়ার মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে


নটরডেম ছাত্রের মৃত্যু: তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ডিএসসিসির

নটরডেম ছাত্রের মৃত্যু: তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ডিএসসিসির


সোনার বাংলা গড়তে রাষ্ট্রপতির ঐক্যের ডাক

সোনার বাংলা গড়তে রাষ্ট্রপতির ঐক্যের ডাক


আগামী বছর দেশে টিকা উৎপাদন শুরু হতে পারে: সালমান এফ রহমান

আগামী বছর দেশে টিকা উৎপাদন শুরু হতে পারে: সালমান এফ রহমান


মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পেল বঙ্গভ্যাক্স

মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পেল বঙ্গভ্যাক্স