Thursday, August 18th, 2016
জেএমবি’র স্লিপার সেল, এনকাউন্টারই কি একমাত্র সমাধান?
August 18th, 2016 at 10:12 am
জেএমবি’র স্লিপার সেল, এনকাউন্টারই কি একমাত্র সমাধান?

জসীম আহমেদ: পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর হামলার পর ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) সামরিক বাহিনীর ৩০ সদস্যের সমন্বয়ে ৫১ স্পেশাল এ্যাকশন গ্রুপ নামে একটি চৌকস বাহিনী গঠন করে, যাদেরকে ট্রেনিং দেয় আমেরিকান আর্মি। পাকিস্থানি সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই- তায়্যেবা গুরুদাসপুরের হামলাটি নিয়ন্ত্রণ করেছিলো। পাকিস্থান ভিত্তিক সংস্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিয়ন্ত্রিত স্লিপার সেলের জঙ্গি আক্রমণে জর্জরিত ভারত স্লিপার সেল নির্মুলে এখন অনেক দুর এগিয়েছে। এনএসজির কঠোর ভুমিকা, উপুর্যপুরি অপারেশন আর এনকাউন্টারে জঙ্গি হত্যা তাদের এনে দিয়েছে সাফল্য।

স্লিপার সেল কি? আর এরা কিভাবে এবং কেন কাজ করে তা খোঁজে যেটুকু তথ্য জানা গেছে তা হচ্ছে, এমন একটি গোপন গোষ্ঠী যারা অনেক দিন ঘাপটি মেরে থাকে এবং হঠাৎ করেই তার নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে অপারেশন পরিচালনা করে আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। নিয়ন্ত্রক থেকে দৃশ্যত বা অদৃশ্য মুনাফার আশায়। মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর স্লিপার সেলের সদস্যরা মূলত কাজ করে পরকালের লোভে। স্লিপার সেলের সদস্যরা সাধারণত অন্য কোন পেশায় যুক্ত থাকে। ফলে হাতেনাতে ধরা পড়ার আগে তারা সন্দেহের বাইরে থাকে। এমনকি দল বেঁধে অপারেশন পরিচালনা করলেও একই দলের অপরাপর সদস্যের সাথে পূর্ব পরিচয় থাকেনা বা স্বল্প সময়ের পরিচয় হয়। সেলের মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা সাধারণত দেশি নেতার দেখাই পায়না, নিয়ন্ত্রকতো অনেক দুরের কথা।

স্লিপার সেল সাধারনত একেবারে নির্মুল করা যায়না। কয়েকটি সেলকে দমন করলে নতুন নতুন সেল তৈরি হয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য জোরদার হলে এবং উপুর্যপুরি অপারেশনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে দমন করা সম্ভব। পুনরায় সংগঠিত হতে সময় লাগে। বিভিন্ন দেশে টাকা বা লোভনীয় প্রস্তাবে স্লিপার সেল নিয়োগ করা হতো একসময়। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকরি স্লিপার সেল হচ্ছে যারা আপাত কোন বিনিময় নেয়না। এক্ষেত্রে মুসলিম জঙ্গিরা স্লিপার সেলে যোগ দিচ্ছে পরকালের লোভে, যেটি সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে একযোগে বোমা হামলা করে জামিয়াতুল মোজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) স্লিপার সেল তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার পর শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার ও ফাঁসি কার্যকর করে আপাত দমন করা হয়েছিলো।

কিন্তু জঙ্গি শেষ হয়ে গেছে ভেবে গোয়েন্দা বাহিনীগুলোর তথ্য সংগ্রহের শিথিলতা ও আইন শৃংখলা বাহিনীর আত্মতুষ্টিতে ভোগায় বিগত বছরগুলোতে আবারো তারা সংগঠিত হয়ে ভয়ঙ্করভাবে ফিরে এসেছে, যার ফলশ্রুতি গুলশান হামলা বলে ধারণা করা হয়। গুলশান হামলার পর সারেদেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও এর সাফল্য আপাতত: দেখা গেলেও জঙ্গিগোষ্ঠী ও তার স্লীপার সেল কি একেবারে নির্মুল সম্ভব হবে? এ জন্য কি সমন্বিত কর্মকৌশল নির্ধারণ হয়েছে? নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী প্রধান একটি পত্রিকাকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কোনো কর্মকৌশল নির্ধারণ হয়নি। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং অন্যদের কার কী দায়িত্ব, কর্মপরিচালনার পদ্ধতি কী হবে, তাও নির্ধারণ করা হয়নি। কিছুদিন যাবত বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিবর্গ বলে আসছেন মোসাদ ও আইএসআই বাংলাদেশ সরকারকে উৎখাত করতে কাজ করছে। তাদের মদদে এদেশে জঙ্গি হামলা হচ্ছে। এ তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে মোসাদ ও আএসআই বাংলাদেশের জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ধরে নেয়া যায়। দুর থেকে স্লিপার সেল নিয়ন্ত্রনে মোসাদ ও আইএসআই এর সক্ষমতা কি তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে কয়েকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিলে।

২০১৩ সালে পাটনায় নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী জনসভায় সংঘটিত বোমা হামলার ঘটনায় আটক সন্দেহভাজন ইমতিয়াজ আলিকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন নামের একটি স্লিপার সেলের জড়িত থাকার বিষয়টি, যেটি নিয়ন্ত্রিত হয়েছিলো অন্য দেশ থেকে। ঐ হামলার লক্ষ্য ছিলো যত বেশী সংখ্যক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আতঙ্কিত করা যায়। স্লিপার সেল বা স্লিপার এজেন্টদের কর্মকাণ্ড ভারতে অনেক বছর ধরেই চলছিলো এবং নিয়ন্ত্রক হিসেবে আইএসআইকে সন্দেহ করা হচ্ছিলো।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ কোন কোন ক্ষেত্রে সিআইএ, এমআই৬ এর চেয়েও এগিয়ে বলে ধারণা করা হয়। সিআইএ’র প্রোটেকশন থাকায় লন্ডনে দুটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও মিউনিখ গণহত্যার মুল পরিকল্পনাকারী, ফোর্স-১৭ এর প্রধান আবু হাসান সালামিকে অন্যান্য সঙ্গীসহ বৈরুতে বোমা হামলায় উড়িয়ে দেয় মোসাদের স্লিপার এজেন্ট। মিউনিখ হত্যার পর সুরক্ষিত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অপারেশন রেথ অফ গড নামে যে হত্যাযজ্ঞ চালায় তাতে মোসাদের তথ্য সংগ্রহ, নিখুঁত অপারেশন ও ক্লু বিহীন হত্যাকাণ্ডের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডগুলোতেও মোসাদ তাদের স্লিপার এজেন্টদের ব্যবহার করেছিল।

কথিত আছে সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস মোসাদের সৃষ্ঠি। আইএস’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আবু বকর আল বাগদাদী ইসরাইলি ছিলেন এবং তিনি ছিলেন মোসাদের এজেন্ট ইলিয়ট সিমন। আইএসের ট্রেনিংও মোসাদ দিয়েছে। আর বাংলাদেশের জঙ্গি গ্রুপের একটি অংশ আইএস’র অনুসারী বলে খবরে প্রকাশ। মিউনিখ গল্পের পর বিশ্ব অনেক এগিয়েছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে মোসাদও। মোসাদের ট্রেনিং পাওয়া আইএস ও দেশে দেশে স্লিপার সেলের মাধ্যমে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি, তুর্কি সহ কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক হামলাগুলো একই পদ্ধতির বলে বিশ্লেসকরা বলছেন।

বাংলাদেশের স্লিপার সেলের সাথে মোসাদের জড়িত থাকার কথা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা যখন বলছেন, তখন তারা নিশ্চয়ই এমন ভয়ঙ্কর বাহিনী মোসাদের তৎপরতা মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন? সেই প্রস্তুতি কি আদৌ নিচ্ছে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা? অথবা আইএসআই’র তৎপরতা মোকাবেলার সামর্থ অর্জন- যে আইএসআই অস্থির করে রাখে ‘র’ এর মত একটি অগ্রসর ও আধুনিক সংস্থা? দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন বলছেন জঙ্গিরা গোয়েন্দা জালে আছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে কয়টা সেলকে তারা জালের আওতায় আনতে পেরেছেন? নতুন নতুন সেল গঠন ঠেকানোর কি পরিকল্পনা আছে? যাদেরকে আটক করা হচ্ছে তাদের জামিনে বের হয়ে গিয়ে আবার নতুন সেল গঠন প্রতিরোধের পরিকল্পনা কি? নাকি ধরে ধরে এনকাউন্টারে হত্যাই হবে এর একমাত্র সমাধান?

সম্পাদনা: সাইফুল ইসলাম

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ