Saturday, October 29th, 2016
জেলখানার চিঠি!
October 29th, 2016 at 8:10 pm
জেলখানার চিঠি!

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছ তুমি, ভাল থাক এই দোয়া করি। তুমি কি জানো বন্ধু তোমার ভাল যতটা চাই নিজের ভাল ততোটা চাইলে আল্লাহ্ হয়তো কিছু টা ভাল আমাকেও রাখত। তোমার কথা যতবার চিন্তা করি, ততবার আল্লাহর নাম নিলে জান্নাত হাসিল করে ফেলতাম। সেদিন একজন আমাকে বলল যাকে আপনি এতো সুন্দর করে চিঠি লিখেন তার সাথে আপনার কি সম্পর্ক কখনো চিন্তা করেছেন? আমি বললাম না চিন্তা করিনি, করতে চাইও না। জীবন যেমন যাচ্ছে যাক, এত ভেবে কি হবে! রোজ চিঠির উছিলায় তাকে মনের সুখ-দুঃখ খুলে বলি এই বেশ ভাল।

বন্ধু আজ আমেরিকার আরেকটি জটিল বিষয় নিয়ে লিখব। যদিও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মতামত দিয়েছে মানুষের জীবনের ঘটনা লিখতে। কেস স্টাডি লিখতে গেলে অনেক সময় পরিবারের অনুমতি নিতে হয় কারণ এই পরিবারগুলি তো আমাদের সাথে কাজ করে। আজকের বিষয় আমেরিকার জেলখানা নিয়ে। পরের চিঠিতে চেষ্টা করব আরেক কেস স্টাডি লিখতে।

যা বলছিলাম, জেলখানা নিয়ে কথা বলব এইবার! বন্ধু তুমি কি ভাবছ জেলখানা নিয়ে কেউ চিঠি লিখে! জেলখানার ভিতর থেকে কয়েদীরা হয়ত চিঠি লিখে, না বন্ধু আমারও কিছু লিখার আছে। মানবাধিকার কর্মী হিসাবে আমেরিকায় কাজ করতে গিয়ে কত কিছুর সাক্ষী হয়ে আছি, না লিখলে সেই কথা লোকে জানবে কি করে? আমেরিকা লোকসংখ্যা পুরা দুনিয়ার ৫% আর আমেরিকায় জেল এর সংখ্যা পুরা দুনিয়ার ২৫% মানে ৫ টাইম বেশী। চায়নার থেকেও বেশী!

চায়না বললাম এই কারণে যে চায়নার জনসংখ্যা ১.৩৭৫ বিলিয়ন (২০১৩র হিসাব অনুযায়ী), অপর দিকে আমেরিকার জনসংখ্যা ২০১৪র হিসাব অনুযায়ী ৩১৮.৯ মিলিয়ন। চায়নায় বিলিয়ন মানুষ বেশী হওয়ার পরেও আমেরিকার থেকে কম জেল। আমেরিকায় সবচে বেশী মানুষ জেল খাটে ড্রাগ নেওয়া বা ডিল করার জন্য। রিগান ও বুশের সময় থেকে ওয়ার এগেইনস্ট ড্রাগস- মানে ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নীতিতে মানুষ কে জেলে পাঠানো শুরু হয়। বুশ ঘোষণা দিয়ে বলে ড্রাগের বিরুধে যুদ্ধ শুরু হল, এবার পুলিশের জন্য পদ বাড়াও, নতুন জেল বানাও, সব ধরে জেলে ঢুকাও।

১৯৮৫ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত এক জরিপে দেখা গেছে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশী মানুষ জেলে যায়। প্রতি ১ লাখে জেলে যায় ৪৯০ জন। ইউকে ২য় সারিতে প্রতি এক লাখে ১৭৫ জন। ৩য় সারিতে আছে পর্তুগাল, প্রতি এক লাখে ১৩৬ জন। আমেরিকায় অপরাধ অনুযায়ী ১ম সারিতে ড্রাগ, ২য় সারিতে আছে ডাকাতি এবং ৩য় সারিতে আছে যৌন নির্যাতন ও হয়রানি। ৭৬.৬ শতাংশ মানুষ জেল থেকে বের হবার পর আবার জেল এ ফেরত আসে মানে গ্রেফতার হয়।

বন্ধু সব শুনে মনে হয় ক্রাইম নীচে নিতে সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে এত জেল আর এত কয়েদি! উহু বন্ধু, আসলে তা না! সব হল ব্যবসা! আমেরিকার জেল ব্যবস্থার বড় একটি অংশ প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি। প্রাইভেট জেলের মুনাফা প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার। ২০০২ থেকে আজ পর্যন্ত এদের ব্যবস্থায় কখনো মন্দা ভাব আসেনি, বরং চড়েছে। কয়েদি অনুপাতে দেখা যায়, ৪০% কাল মানুষ, আর ২০% সাদা আর বাকিরা অন্যান্য বর্ণের মানুষ। পুরা কয়েদিদের মধ্যে প্রতি বছর ২ মিলিয়ন মানুষ জেল যায় যারা মানসিক রোগী, হয় তারা ঘরহীন মানুষ অথবা ড্রাগ নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পরে। কিছুদিন পূর্বে সিনেটর ফ্রাংলিন মানসিক রুগীদের জেল এ না পাঠিয়ে হাসপাতাল বা কাউন্সেলিং এর জন্য পাঠাতে একটি বিল নিয়ে আসেন।

জর্জ মাসুন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ডন বউদ্রস একটি জরিপ সম্পন্ন করেছেন, ঠিক কি অপরাধে মানুষ কে সাজা দিয়ে জেল এ পাঠানো হয়, সাজাপ্রাপ্তদের সংখ্যা কত! এরকম আরও জরিপ ও প্রচারণা চলছে যার মাধ্যমে জানা যায় কয়েদিদের শ্রম ও এর মাধ্যমে অর্জিত মুনাফা কত কম। কয়েদিদের শ্রমের মুল্য এত কম যে তাকে আধুনিক গোলামি ব্যবস্থা বলেও আখ্যায়িত করা যায়। তাদের পুরোদিন কাজের জন্য হয়তো ১ বা ১.৫০ ডলার দেওয়া হয়। কোনো কোনো জেল এ কয়েদিদের একবেলা খাওয়ার বাজেট ১.৫০ ডলার। আরেক ধরণের জেল আছে যাকে বলা হয় ইমিগ্রেশন ডিটেইনশন, যেখানে শুধুমাত্র কাগজপত্রবিহী্ন অভিবাসী বা বর্ডার ক্রসারদের রাখা হয়। এই সেক্টরে প্রাইভেটাজেশন বেশি, সমগ্র আমেরিকায় প্রতি দিন ৩৪০,০০০ কাগজপত্র বিহীন মানুষ কে বন্দী রাখা হয়। এই সংখ্যাও নীচে যায় না তাই তাদের লাভ ও ঠিক থাকে। অনেক খারাপ ব্যবহারের কাহিনী আমরা শুনতে পাই এই ডিটেইনশন সেক্টর থেকে। এখানেও অনেক আন্দোলনের পর গত ২ মাস পূর্বে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট প্রাইভেট ডিটেইনশন বন্ধ করার হুকুম দিয়েছে, কিন্তু সরকারি গুলো চলবে।

আমি আজ জেল নিয়ে কথা এমনিতেই বলছি না! গত ৯ ই সেপ্টেম্বর আর্টিকা জেলখানার কয়েদীদের আন্দোলনের ৪৫ বছর পূর্তির দিন উপলক্ষে আমেরিকার জেল কয়েদিরা স্ট্রাইক শুরু করে। সারা আমেরিকার কারাবন্দীরা ব্যক্তি সম্মানের দাবীতে, থাকার পরিবেশ উন্নত করা, নির্জন কারাবাস বন্ধ, স্বাস্থ্যকর খাবার আর ভাল চিকিৎসার দাবী করে স্ট্রাইক শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত এই স্ট্রাইক চলছে, বলা হচ্ছে এটা আমেরিকার স্মরণ কালের বড় স্ট্রাইক। বড় বড় কর্পোরেট মিডিয়া এই খবর দেখাচ্ছে না। প্রোগ্রেসিভ মিডিয়া ও ডেমোক্রেসি নাও এর মত মিডিয়া গুলো এই স্ট্রাইকের নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে।

new-york-letter

বন্ধু তোমাকে কি বলেছিলাম আমি সিয়াটলে একটি সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সম্মেলনটি ছিল ‘এএপিআই বিহাইন্ড দি বার’। আমার বস যখন আমাকে প্রথম বলল কাজি তোমাকেও যেতে হবে, আমি অত শত না বুঝেই হ্যাঁ বলেছি। সম্মেলন এর প্রথম দিন বুঝলাম এই গ্রুপ এশিয়ান প্যাসেফিক আইল্যান্ড’র মানুষ, যারা জেলে আছে তাদের ইনসাফের জন্য কাজ করে। অনেক মুক্তি পাওয়া কয়েদিরাও আছে যারা জেলের ভিতরের অবস্থা উন্নতিকরন ও পিছনে ফেলে আসা সাথীদের জন্য কাজ করছে। পরিচিতি পর্বে সবাই নিজের গল্পে বলল কি কারণে তারা এই সম্মেলনে এসেছে। সবার কাহিনীতে নিজের বা আপনজনের জেল কাহিনী জড়িত, কিছু কিছু ক্রিমিনাল জাস্টিস লয়্যারকেও দেখলাম এই ভাবেই সম্পৃক্ত হওয়ার কাহিনী বলতে। আমার পালা আসার পূর্বে চিন্তায় পরে গেলাম আমি কি বলব। আমাকে যখন বলতে বলল, তখন আমি বললাম আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ জেলে নেই কিন্তু গত অক্টোবর মাস থেকে আমরা ইমিগ্রশন জেল অনশনকে সাপোর্ট করে আসছি। এই অনশন চলাকালে প্রতিদিন ১০ থেকে ৭০ জন কয়েদি ভাইয়ের ফোন কল রিসিভ করেছি।

আমি কোনো দিন তাদের দেখি নাই শুধু নাম জানি আর কণ্ঠস্বর শুনেছি। তবু আমি জানি নির্জন কারাবাস কেমন কষ্টকর, কত কম খাবার দেয়া হয় তাদের, নিরাপত্তা কর্মীদের আচরণ কেমন, কত বর্ডার ক্রস করে এসেছে, কতদিন জেলে আছে, যদি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয় তবে কি হবে তাদের অবস্থা। আমি বললাম গত মাসে ও গত সপ্তাহে এই মানুষগুলি দুই দফায় ফেরত পাঠানো হল আমি টিভি নিউজে তাদের দেখেই চিনতে পারি। এই কণ্ঠস্বর গুলি এত চেনা এত আপন যে সামনা সামনি দেখা না হয়েও বলতে পারি এরা কারা। এই দুনিয়াই কিছু সম্পর্ক রক্তের নয়, আত্মার! এরা আমার আত্মার আত্মীয়। তারপর বললাম মতিনের কথা, শাহিনা আপার ছেলে। যাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে দিয়েছে ৩০ বছরের জন্য। আমি তার আপন কেউ না, তবু মতিন আমাদের ছেলে।

পরেরদিন আমাদেরকে নিয়ে গেল মনরো কারেকশন সেন্টার পরিদর্শন করাতে। কোনদিন ভাবিনি জেলের ভিতর যাব। গয়না খুলে, মোবাইল ব্যাগ জমা দিয়ে, শূন্য হাতে ভিতরে গেলাম। একটির পর একটি ইলেকট্রিক গেইট পার হয়ে অবশেষে জেলের ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে ৫ জন ভিয়েতনামি ও থাইল্যান্ডের কারাবন্দী তাদের কাহিনী তুলে ধরল। বেশির ভাগ ডাকাতির কেস, একেকজনের সাজা ৩০ থেকে ৪০ বছর, ডাকাতি বা ছোটছোট অপরাধের এই রকম সাজা কিশোর বয়স থেকে তারা খাটছে, সাজা শেষ হলে এই দেশ থেকে তাদের বহিস্কার করা হবে। দুইশ’র উপরে ভিয়েতনামি বন্দীকে বহিস্কার করা হয়েছে যারা নিজ দেশে ফেরত গিয়ে মহাসঙ্কটে পড়েছে।

এইসব মানুষ রিফিউজি হয়ে এসেছিল। এমন কোন দেশে জন্মেছিল যেখানে ইংলিশ ছাড়া আর কোন ভাষা জানে না। এদের মধ্যে সবাই গ্রীন কার্ড বা সিটিজেন, শুধু মাত্র ইমিগ্রেন্ট রেসিডেন্ট বা সিটিজেন হওয়ার কারণে এদের বহিস্কার করা হয়েছে বা হবে। এদের মধ্যে অনেকে জেলে বসেই পড়াশুনা করছেন, নিজেদের অধিকারের লড়াই করছেন। এই সুত্র ধরেই আমাদের সাথে তাদের প্যানেল আলোচনা হয়। ৩ ঘণ্টা ভিতরে থেকে বাইরে এসে একটা কথাই মনে হল, আমরা চাইলেই বাইরে আসতে পারলাম কিন্তু এরা জীবনের ত্রিশ বছর অন্তরীন থেকেও বন্দী। সাদা মানুষরা অপরাধ করলে লগু পাপে এমন গুরুদণ্ড হয় না।

বন্ধু ভিতরে গিয়ে মনে হয়েছিল মানবজীবন ধন্য আজ মানবাধিকার কর্মী বলেই এই মানুষগুলির গল্প এত কাছে বসে শোনার ভাগ্য হল। বন্ধু তোমাকে খুব মনে পড়েছিল, মনে হয়েছিল যদি তুমিও থাকতে তবে এই বিরল অভিজ্ঞতার সময় ভাল লাগত। জীবনের সকল দুঃখ, আনন্দ, সকল সৌন্দর্য তোমাকে পাশে নিয়ে উপভোগ করতে চাই। বন্ধু সবচেয়ে বড় কথা আমার জীবন জুড়ে তুমি, প্রতিটি চিন্তায় তুমি, কিন্তু নিষ্ঠুর সত্য হল তোমার জীবনে আমার কোন অস্তিত্ব নেই।

ভাল থাক বন্ধু ভাল থাকুক আমার দেশ ও দেশের মানুষেরা।

ইতি
তোমার বন্ধু যাকে কোনো নামেই ডকোনা

Kazi Fouziaলেখক: মানবাধিকার কর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি