Monday, January 2nd, 2017
টাম্পাকো শ্রমিকদের কান্নার বছর
January 2nd, 2017 at 12:51 pm
টাম্পাকো শ্রমিকদের কান্নার বছর

প্রীতম সাহা সুদীপ, ঢাকা

টাম্পাকো লিমিটেড দেশের একটি স্বনামধন্য ফয়েলস ফ্যাক্টরি, যাদের সেবা গ্রহণ করতো নামিদামি অনেকগুলো বহুজাতিক কোম্পানি। কারখানাটি ছিল চারশ পরিবারের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। বিদায়ী বছরের (২০১৬) আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল টঙ্গীর ওই ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড।

বিধ্বস্ত ট্যাম্পাকো কারখানার দুমড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ

দিনটি ছিল ১০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ভোর ছয়টা। রাতে কর্মরত শ্রমিকরা শিফট শেষ করে কারাখানা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর মর্নিং শিফটের লোকেরা কাজে যোগ দিতে কারখানায় ঢুকছিলেন। পুরো কারখানা অন্ধকার। আগের দিন থেকেই গ্যাস লিকেজ হচ্ছিলো, তাই বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ, এরপরই আগুন লেগে যায় কারখানাটিতে, ধসে পড়ে ফ্যাক্টরির একাংশ।

টাম্পাকোর ওই দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩৯ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা। এখনো নিঁখোজ রয়েছেন একজন আর ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন ৪০ জন। উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে ৩১ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও অপর ৮ জনের পরিচয় এখনো মেলেনি। পরিচয়হীন ওই ৮টি লাশ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

ওই ঘটনায় কারখানাটির মালিক ও বিএনপির সাবেক এমপি মকবুল আহমেদ লেচু মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টঙ্গি মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পর থেকেই পলাতক ছিলেন মকবুল মিয়া। ঘটনার আড়াই মাস পর ৩০ নভেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন মকবুলসহ ৬ আসামি।

তখন আদালত কারখানার মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেনকে অস্থায়ী জামিন প্রদান করেন এবং বাকিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তারা হলেন, মকবুল হোসেনের ছেলে টাম্পাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ তানভীর আহমেদ, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফি সামি ওরফে আলমগীর হোসেন, মহাব্যবস্থাপক সফিকুর রহমান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনির হোসেন ওরফে মনিরুজ্জামান ও ব্যবস্থাপক হানিফ ওরফে আবু হানিফ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা টঙ্গী মডেল থানার এসআই সুমন ভক্ত নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে জানান, ‘টাম্পাকোর ওই ঘটনায় নিহত ৩৯ জনের লাশ ও কংকাল উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে ৩১ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও অপর ৮ জনের পরিচয় মেলেনি। সব মিলিয়ে নয় জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। নয়জনের স্বজনরাই এখন ওই ৮ লাশের দাবি করছেন।’

তিনি বলেন, ‘কয়েকটি ধাপে পুলিশের সিআইডি’র ফরেনসিক বিভাগ ডিএনএ পরীক্ষা করছেন। ডিএনএ টেস্টের জন্য ২১ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ ৯ জনের পরিবারের দু’জন করে মোট ১৮ স্বজনের কাছ থেকে নমুনা রেফারেন্স রক্ত ও লালা নেওয়া হয়েছে।’

টাম্পাকোতে দুর্ঘটনার পর আহত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় নিউজনেক্সটবিডি ডটকমের। তারা বলেন, টাম্পাকো কারখানাটি চারশ পরিবারের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। এটি পুনরায় চালু না হলে এই মানুষগুলোকে না খেয়ে মরতে হবে। কারণ যারা কারখানাটিতে চাকরি করতেন তাদের বেশিরভাগই ২০-৩০ বছর ধরে এখানেই কাজ করছেন। কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও বয়স বেশি হওয়ায় এখন আর তারা অন্য কোথাও কাজ পাবেন না। তাছাড়া টাম্পাকোতে তাদের যে বেতন দেয়া হতো সেই পরিমান পারিশ্রমিকও কেউ দেবে না।

মনোয়ার হোসেন নিজের জীবনের দীর্ঘ ২০বছর কাটিয়ে দিয়েছেন টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের সঙ্গে। ওই দুর্ঘটনায় তার দুই পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ১৬ জুন টাম্পাকোতে চাকরি শুরু করি। সর্বশেষে ওই কারাখানা মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করতাম। এমন দুর্ঘটনা ঘটে যাবে কখনো ভাবতেও পারিনি।’

‘যে টাকা বেতন পেতাম তা দিয়ে পুরো সংসার চালিয়ে সঞ্চয়ের কোন সুযোগ ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমিই। এখন আমার পরিবার কিভাবে চলবে, তিন মেয়ের কি হবে?’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ার।

ওই দিনের ঘটনা জানতে চাইলে মনোয়ারের কান্না আরো বেড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমার মর্নিং শিফট ছিল। সকালে কারখানায় গিয়ে দেখি ভেতরে পুরো অন্ধকার। তাই লাঞ্চবক্সটা রেখে আবার বাইরে আসি। শিফট ইনচার্জকে জিজ্ঞেস করি বিদ্যুৎ নেই কেন। তিনি বলেন, গ্যাস লিকেজ, তাই বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তখনই হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর আর আমার কিছু মনে নেই।’

উদ্ধারকার্যে নিবেদিতপ্রাণ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স- ১

মনোয়ারের মতোই আরেক হতভাগ্য শ্রমিক জীবন হাওলাদার। ১৯৯৯ সালের ১ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে টাম্পাকো লিমিটেডে অপারেটর হিসেবে কাজ করেছেন। দুর্ঘটনার আগের দিন জীবন টাম্পাকোতে নাইট শিফটে কাজ করেছেন। পরদিন সকালেও তিনি কারখানাতেই ছিলেন। তার সামনেই শিফট ইনচার্জ সুভাস দাস গ্যাস অফিসে টেলিফোন করে কারখানার গ্যাস লিকেজের কথা জানায়। ঠিক সে সময় বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটে, সুভাস ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা এই শ্রমিক নিউজনেক্সটবিডি ডটকমকে বলেন, ‘শব্দটা শোনার পর পুরো কারখানা কেঁপে উঠে। আমার মনে হয় ভূমিকম্প হয়েছে, যার কারণে আমি প্রাণ বাঁচাতে টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেই। কিছুক্ষণ পর অন্যদের দৌড়ঝাঁপ দেখে বুঝতে পারি যে আগুন লেগেছে। তখন কারখানা থেকে খুব কষ্ট করে বেরিয়ে আসি।’

সম্পাদনা: মাহতাব শফি


সর্বশেষ

আরও খবর

নটরডেম ছাত্রের মৃত্যু: তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ডিএসসিসির

নটরডেম ছাত্রের মৃত্যু: তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন ডিএসসিসির


সোনার বাংলা গড়তে রাষ্ট্রপতির ঐক্যের ডাক

সোনার বাংলা গড়তে রাষ্ট্রপতির ঐক্যের ডাক


আগামী বছর দেশে টিকা উৎপাদন শুরু হতে পারে: সালমান এফ রহমান

আগামী বছর দেশে টিকা উৎপাদন শুরু হতে পারে: সালমান এফ রহমান


মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পেল বঙ্গভ্যাক্স

মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পেল বঙ্গভ্যাক্স


সশস্ত্র বাহিনী দিবসে শিখা অনির্বাণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

সশস্ত্র বাহিনী দিবসে শিখা অনির্বাণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা


মুশফিককে বিসিবির কারণ দর্শানোর নোটিশ

মুশফিককে বিসিবির কারণ দর্শানোর নোটিশ


আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেন মেয়র জাহাঙ্গীর

আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেন মেয়র জাহাঙ্গীর


জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়া: মির্জা ফখরুল

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খালেদা জিয়া: মির্জা ফখরুল


এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২ ডিসেম্বর

এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২ ডিসেম্বর


বিএনপি যত খুশি গালি দিক, কিছু করার নেই: আইনমন্ত্রী

বিএনপি যত খুশি গালি দিক, কিছু করার নেই: আইনমন্ত্রী