Sunday, June 5th, 2016
টোকন ঠাকুরের ‘রাজপুত্তুর’ ও সুমনা সিদ্দিকীর ‘মাধো’
June 5th, 2016 at 9:26 pm
টোকন ঠাকুরের ‘রাজপুত্তুর’ ও সুমনা সিদ্দিকীর ‘মাধো’

প্রবন্ধন: জুনায়েদ হালিম ও শরীফ সিরাজ

অনুবন্ধন: সেলিম মোজাহার

ঢাকা: পরিচালক টোকন ঠাকুরের ‘রাজপুত্তুর’ (২০১৬) আমাদের ছবির দর্শককে হোঁচট দেবে। ৫৪ মিনিটের এই ছবিটি আমাদের আহ্বান জানাবে চেনা চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতার বাইরে দাঁড়াতে। ছবি বানাবার পথ-পন্থা তো সব বেলাতেই এক: ছবি-তোলা, ছবি-সম্পাদনা, সংলাপ-শব্দ-সঙ্গীত যোগ করা, রঙ-সংশোধন করা [কালার কারেকশন], শিরোনামাবলি যোগ করা, অন্ত-নামাবলি যোগ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সব কিছু মিলে আস্ত যে জিনিসটা গড়ে ওঠে তাকে বলি ‘ছবি’।

‘আর এই গড়ে ওঠার পথক্রমার নাম ছবিভাষা’

Rajputtur 4

আমরা দেখি, কেবল আখ্যান বা গল্প বা ছবির বিষয়-তফাতে নয় ছবি থেকে ছবি আলাদা হয়ে ওঠে ছবিভাষার তফাতেও। ছবির আসল কাজটা তো বুনন-কলারই কাজ। সেই বুননকলার বা ছবিভাষার স্বাতন্ত্র্যে টোকনের ‘রাজপুত্তুর’ আমাদের ছবির ভূমিতে আলাদা জায়গা করে নেবে ও পরীক্ষা করে দেখার অনুপ্রেরণা দেবে, আগামীর তরুণ চলচ্চিত্রকারদের।

হরেক উপকরণের ব্যবহারে; ব্যবহৃত উপকরণের নাটকীয় বর্ণালিতে; পোশাকে, সাজে ও সজ্জায়; শব্দে ও সঙ্গীতে; অধুনা-চিত্রভাষে [এনিমেশন] সবার ওপর, এসবের সু-সমন্বয়ে চিত্রভাষার [ইমেজের] এক অভিনব ব্যঞ্জনায় টোকন আমাদের ডেকে নিয়ে যেতে পারেন। গল্প বলার চেনা, প্রথাগত কৌশলটি পরিহার করেছেন তিনি। আখ্যানের সারল্য কিংবা রৈখিকতার এ অনুপস্থিতি দর্শক হিসেবে আমাদের উপভোগের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয় রীতিমতো [পরে এ-বিষয়ে বলা হবে]। কিন্তু গাঁথা চিত্রসমূহের পরিণতি, পারিপাট্য, স্বচ্ছতা ছবিটিকে এমন এক সৌন্দর্য দিয়েছে; যা কেবলি এক হজমযোগ্য, সুখদ গল্প কিংবা নীতি-আখ্যান আমাদের দিতে পারতো না। এটা বেশি বলা হবে না যে, অঙ্গ ও অন্তর উভয় বিবেচনাতেই ছবিটি আমাদের চেনা সাধারণ-বয়ানের [সিম্পল-ন্যারেটিভ] ধারাকে অতিক্রম করে। গল্প বলার যে-ভঙ্গিটি টোকন গ্রহণ করেছেন তা প্রথাগত নয়। বিশেষত ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাথের নির্মাণে একই ছবিতে এত বিচিত্রমুখি নিরীক্ষার সাহস দুঃসাহস-ই।

‘বিশেষত ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাথের নির্মাণে একই ছবিতে এত বিচিত্রমুখি নিরীক্ষার সাহস দুঃসাহসই’

Rajputtur

‘রাজপুত্তুর’ ছবির গল্পগাঁথন অ-ধারাবাহিক। অ-ধারাবাহিক সঙ্গত কারণেই। রবীন্দ্রনাথের একক কোনো গল্প-কবিতা-নাটক-রচনার কাহিনিসার এ ছবির শরীরে নেই। রবীন্দ্ররচনার অনেকগুলো শিশুচরিত্র নানা জায়গা থেকে উঠে এসে একটি মালায় জায়গা পেতে চেয়েছে এখানে। মালা গাঁথায় কেবল এক রকম ফুলেরই ব্যবহার হয় তা তো নয়। বিচিত্র ফুলের সমাহারে মালা বর্ণিল হয়। কিন্তু ‘সমাহার’ শব্দে সাম্যের ব্যাপারও রয়েছে যা দাবি জানায় ‘সুষমতা’ কি ‘সুষমঞ্জসতা’র। ‘রাজপুত্তুর’ সেই সুষমঞ্জসতা তৈরি করতে পেরেছে কি না যদি জানতে চাওয়া হয়, উত্তর হবে তার প্রয়োজন হয়নি। একটু আগেই বলেছিলাম ‘রাজপুত্তুর’ ছবির গল্পগাঁথন অ-ধারাবাহিক কারণ, স্বপ্ন বা কল্পনা বা ভাবনা বা চিন্তা কখনোই ধারাবাহিক নয়। রবীন্দ্রনাথ নন এক বৃদ্ধ গল্প লিখিয়ে, ছবি আঁকিয়ের নিঃসঙ্গ বার্ধক্যে তাঁরই গড়া নানা শিশুচরিত্র [এমনকি কেউ বড়ো হয়ে যাওয়া তাও হয়তো কল্পনাতেই] নানা স্মৃতি, কথা, ঈর্ষা, প্রেম, অনুযোগ, অভিমান নিয়ে আসে-যায় তাঁর কাছে। তাই এ গল্পে ধারাবাহিকতাই পর্যবসিত হতে পারতো পরম অ-ধারাবাহিক ব্যাপারে [অযৌক্তিক বলে]। আখ্যানের আপাত বিচ্ছিন্নতার ব্যাকরণ তাই আমাদের কাছে উল্লম্ফন ঠেকে না।

ইমেজ তৈরিতে টোকন এমন কিছু নিরীক্ষা এনে দিয়েছেন এ-ছবিতে, যা আমাদের প্রথাগত নন্দন-ভাবনাকে বিহ্বল করে। ফাঁকা মাঠে ঘরের আদল বসিয়ে জানলার এপার-ওপার আমাদের একটুও অসম্ভব মনে হয় না। কালো এক ছাতা-পঙ্খিরাজের দুরন্ত খুরের শব্দে নিশ্চিত সচকিত হই আমরা। অপহৃত কন্যাশিশুটি ছুটে এসে জানায় যখন, ‘আমাকে হরণ করা হয়েছে’ আমরা বরং বিশ্বাসেই বিমুগ্ধ হই। নিরীক্ষা প্রসঙ্গেই বলতে হয় এনিমেশনের ব্যবহার নিয়ে। সনাতন শিশুদের যেসব পৌরাণিক গল্পগাথার ভিতর দিয়ে মনোগঠনের চেষ্টা হতো তার সাথে বর্তমানের নাগরিক-শিশুর অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ পরিচালককে এমন নিরীক্ষণে উদ্বুদ্ধ করছে। এ সঙ্গতটি চমকপ্রদ। এখন যে, চ্যানেল খুললেই দেখা যায় এনিমেটেড লিটল কৃষ্ণা, বাল হনুমান, মুগলি, ফ্রগ প্রিন্স … নাগরিক শিশুর ধ্রুপদী পুরাণের অভিজ্ঞতা… এনিমেটেড-ই তো। তবে, এটা মানতে হবে যে, এই নিরীক্ষাটি সব ক্ষেত্রে সুযুক্ত মনে হয়নি কিংবা, এটি গল্পের স্থান-কাল বাস্তবতাকে সংহত রাখতে পারেনি।

‘তবে, এটা মানতে হবে যে, এই নিরীক্ষাটি সব ক্ষেত্রে সুযুক্ত মনে হয়নি কিংবা, এটি গল্পের স্থান-কাল বাস্তবতাকে সংহত রাখতে পারেনি’

Rajputtur 2

‘রাজপুত্তুর’ ছবিতে যোজিত সঙ্গীত কেবল ছবির প্রবাহকে মসৃণ ও সুখদ করেনি এটি ছবিতে ভিন্নতর মূল্য যুক্ত করেছে। নিশ্চিত বলা যাবে, নিখুঁত যোজনার সুর-সঙ্গীত এ ছবিতে নিজেই উপস্থিত হয়েছে স্বতন্ত্র স্বাদন নিয়ে। ছবির সম্পাদন ও রঙ-সংশোধন নিঃসন্দেহে নিখুঁত। উত্তর প্রযোজন দল [পোস্ট-প্রডাকশন টিম] এ-ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয়েছে। নামায়নে [টাইটেল] ব্যবহৃত অক্ষরবিন্যাস [টাইপোগ্রাফি]; বিস্তৃত নীলাকাশ-পটে শাদা মেঘমালায় ছবির উন্মোচন; উড়ে যাওয়া জানলায় যবনিকা ইত্যাদি আরও অসংখ্য যত্নশাসিত পরিচর্যা নজর এড়াবার নয়।

স্বপ্ন-বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন গতায়ত খানিকটা অতিরিক্ত উপকরণ-বিন্যাসী ঝোঁক শিশুদের অবাস্তবধর্মী মুক্তক্রীড় অভিনয় প্রেক্ষণবিন্দুর বিচ্যুতি [পয়েন্ট অব ভিউ ডিসর্ডার: মুন্সিগঞ্জের দৃশ্যে, বাড়ির বাইরে অসুস্থ সন্তানের বাবার সাথে গ্রাম্য নারীর দৃশ্যটি এটা বৃদ্ধ দাদুর অভিজ্ঞতাতীত দৃশ্য] এমন আরও কিছু বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে। সংলাপ-বাহুল্য, মুখ্য চরিত্রের [দাদু] একঘেয়ে বলন-চলন, অভিনয় নামক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে গুরুত্বে না নেয়া ইত্যাদি অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুল তৈরি করেনি বলা যাবে না।

তবে, ‘শেষত কী দাঁড়াইলো’ এবং ‘ইহা একটি আদৌ শিশুতোষ ছবি হইলো কি-না’ এমন দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি টোকনকে হতেই হচ্ছে। কারণ, ছবিটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিশুতোষ চলচ্চিত্র প্রকল্পের ছবি। আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর আগে এনে রাখি বরং। বিচার করি, এটা ছবি হয়েছে কি না। যে যে গুণের সমাহারে, একটি ছবি, ছবি হয়ে ওঠে; সে সে গুণের সমাহারে ‘রাজপুত্তুর’ ভালোভাবে পাশ করা ছবি। তবে শিশুতোষ ছবি হবার অনুদানীয় শর্তের [এমনকি সময়দৈর্ঘ্যও] বাইরে আমাদের দাঁড়াতেই হয়। চুক্তির শর্তাদি অনুপুঙ্খ মানার আয়োজন হলে, আমরা নতুন এক অভিজ্ঞতা হতে বঞ্চিতও হতে পারতাম। ওটুকুই বাঁচোয়া আমাদের সবার জন্যে শিল্প বানানো এতোটা স্বাধীনতা না পেলে শিল্পী তো আজ্ঞাবহ দাস। আর প্রথম প্রশ্নটি ‘শেষত কী দাঁড়াইলো’ উত্তর ছবিতেই দেয়া আছে ‘কিছুই না, কিছুই না, কিছুই না।’

‘শেষত কী দাঁড়াইলো’ উত্তর ছবিতেই দেয়া আছে ‘কিছুই না, কিছুই না, কিছুই না’

Rajputtur 3

ভারি কিছু হওয়ার কড়াকড়ি, বাড়াবাড়ি থেকে মুক্তির অসংখ্য জানলায় রবীন্দ্রনাথ জগতের শিশুকে ডেকেছেন হরদম। ‘সিনেমা’র নামে শিশুশিক্ষার গুরুদায়িত্ব নিয়ে নিলে বরং এই ছবিটি রবীন্দ্রদর্শনের দিক থেকেই ‘অ-শিশুতোষ’ হয়ে যেতো। সবশেষে, টোকনের ‘রাজপুত্তুর’ কেবলই একটা ছবি। কিংবা তা-ও নয়, ছবি ছবি খেলা। যে খেলার ক্ষমতা আছে ম্যাজিক সৃষ্টির। ‘রাজপুত্তুর’ তেমন এক ম্যাজিকের সম্ভাবনা অন্তত জাগিয়ে রাখলো আমাদের দুঃস্থ অভাবী সিনেমা সংসারে!

জেনেছিলাম, ভালো চিত্রনাট্য তিনি-ই লিখতে পারেন বেতারনাটক লেখায় দক্ষতা আছে যাঁর। অন্ধের সামনে খুঁটিনাটি সবকিছু দৃশ্যমান করে তোলার পারঙ্গমতা থাকা চাই। কিন্তু সিনেমার দর্শক যে অন্ধ নন। সিনেমার যাত্রাই তো নির্বাকতায়। সিনেমা যার আছে গভীর শব্দহীনতায় কোলাহল তৈরির ক্ষমতা। কথাটি প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা হলো। প্রসঙ্গটি হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছড়ার ছবি’র অন্তর্গত ‘মাধো’ যার অবলম্বনে পরিচালক সুমনা সিদ্দিকীর ৪২ মিনিটের সিনেমা মাধো [২০১৬]। পূর্বপ্রসঙ্গ ধরে বলি : এই সিনেমাটা চোখ বন্ধ করেও দেখা যায়। এন্তার অপ্রয়োজনীয় সংলাপ জানিয়ে দিতে উন্মুখ ঘটনাটা কী। সিনেমাটায় একটা সুন্দর গল্প বলার আগ্রহই পরিচালককে প্রলোভিত করেছে বেশি ছবি তোলার প্রেরণা দেখায়নি।

আমরা জানি ও মানি পূর্বলিখিত [সাহিত্য বা যে-কোনো রচনা] কোনো গল্প বা আখ্যানের সিনেমা বানানোয় পরিচালক দায়বদ্ধ নন মূলের প্রতি ভক্তিগদগদ থাকার। অনুসরণ আর অনুকরণের পার্থক্যটি জানা থাকলে এ নিয়ে বাক্যব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে না। দুটোই আলাদা নির্মাণ একে অপরের সম্পূরক হবার দায় নেই। আমরা আশ্বস্ত হই পরিচালক সুমনা সিদ্দিকী এবং তাঁর চিত্রনাট্যকার অলোক বসু রবীন্দ্রানুকরণ করেননি বলে। তাতে করে, তাঁদের নিজস্ব-নির্মাণের অহঙ্কার অটুট আছে। আমরাও উৎসাহী নই, রবীন্দ্র-‘মাধো’ আর সুমনা-‘মাধো’র তুলনায় যেতে। ‘মাধো’ রবীন্দ্রনাথের এতো কম পঠিত রচনা যে, সুমনা-অলোকের দর্শকেরা হয়তো তুলনার সুযোগই পাবেন না। কিন্তু, সুমনার ‘সিনেমা’ দেখে কারো মনে যদি এই যৌক্তিক খটকাটি জাগে, মাধোর ‘ফেরা’র একমাত্র তাড়না ‘কর্মহীন অলস বিকালে বটুর স্মৃতি মনে পড়িয়ে দেয়া এক গা-ঝাড়া কুকুর?’ তাঁরা একবার রবীন্দ্র-মাধোর শরণ নিতে পারেন। তাহলে বুঝতে পারবেন কখনও কখনও অনুসরণের চেয়ে অনুকরণই বড়ো রকমের নিস্তার।

‘অনুসরণ আর অনুকরণের পার্থক্যটি জানা থাকলে এ নিয়ে বাক্যব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে না’

Madhu

অনুকরণে দায়বদ্ধ নন পরিচালক তবু তাঁকে জানতে হতো: ‘প্রকৃতি ও কল’-এর কূটাভাস ‘মাধো’র প্রাণবীজ এই অনুল্লেখযোগ্য শিশুতোষ কবিতায় সযত্নে বুনে রাখা আছে তা। সুমনা-অলোককে ধরতে পেতে হতো ব্যাপারটি, অন্তত আখ্যানের কাঠামোটাকে যৌক্তিক রাখার দায়ে। মনে পড়ে, মহান গ্রিক সাহিত্যতাত্ত্বিকের সেই বিখ্যাত উক্তিটির কথা ‘অসম্ভাব্য বাস্তবের চেয়ে সম্ভাব্য অবাস্তব শিল্পের কাছে শ্রেয়।’ একদিকে [ইছামতি জুট]-মিল, যন্ত্র, অসন্তোষ, বিক্ষোভ, লে-অফ, অনিশ্চিতি; অন্যদিকে জমিদার, প্রভুকবলিত জীবন, বঞ্চনা অপমান শ্রেয়তর জায়গা কোথায়? রবীন্দ্রনাথের গল্পে অন্তত একটি প্রস্থানবিন্দু স্পষ্ট করা আছে: কারখানা বন্ধ, শ্রমিক অসন্তোষ যদিও আপসের সুযোগ আছে। অথচ মাধো ফিরছে তার শৈশবে, তার জন্মভিটায়; বিকল কল ফেলে প্রকৃতির শ্যামল ছায়ায় আপসহীন। এমন এক আপসহীনতাই তাকে একদিন মমতাময়ী মা, গোবেচারা বাবা, দুষ্টু-দুরন্ত বন্ধুরা, প্রিয়সহচর বটু [কুকুর] আর নিবিড় প্রকৃতির মায়া থেকে শহরে এনে ছেড়েছে। এটা এক শিশুমনের খেদ কিংবা ভয়। কিন্তু শহরে এসে পাওয়া গেলো আর এক হিংস্ত্র বাস্তবতার। শ্রেয়তর জায়গা কোথায়। ফিরে যাওয়া। অন্তত এখন সে আর শিশু নয়। আস্ত যৌবন। পরিপূর্ণ প্রতিরোধের শক্তি নিয়ে কারখানার আপসহীন শ্রমিকের নিজের বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথের এমনি ইঙ্গিত।

সুমনার ‘মাধো’তে কর্মহীন অলস বিকালে ইছামতি সাঁতরে পার হয়ে আসা এক ‘গা-ঝাড়া’ কুকুর যুবকের ফেলে আসা শৈশবকে এমনভাবে সামনে এনে দেয়, সহকর্মীর আনন্দ-সংবাদও তাকে আর আটকাতে পারে না। গল্পের সমাপ্তিতে দেখতে পাই, শৈশবের মাধোকে সঙ্গী করে যুবক মাধো ইছামতির তীর ধরে ফিরছে। খটকাটা তখনই দাঁড়ায়: এতোগুলো বছর গেলো, মায়ের মৃত্যু; বাবার মৃত্যু; অপহৃত বটু; শৈশবের সাথীরা; কোনো যন্ত্রণা, কোনো স্মৃতি, কোনো দায়, কোনো যুক্তিসঙ্গত পরিস্থিতি; কোনো ঘটনা তাকে ফেরাতে পারেনি ইছামতি মিলঘাটে বটুর মতো দেখতে এক হঠাৎ দেখা বাদামি কুকুর ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে তাকে তার জন্মভিটায়। আমাদের ধরে নিতে হচ্ছে আস্ত কৈশোর জুড়ে ‘মাধো’ বাদামি রঙের আর কোনো কুকুরই দেখেনি। কিংবা মুম্বাই-ঢাকাই ছবির অতিব্যবহৃত কাঠামো এতোদিন স্মৃতিভ্রষ্ট ছিলো সে হঠাৎ কী যে হলো সব মনে পড়ে গেলো তাই ফিরে এলো!

‘খটকাটা তখনই দাঁড়ায়: এতোগুলো বছর গেলো, মায়ের মৃত্যু; বাবার মৃত্যু; অপহৃত বটু; শৈশবের সাথীরা; কোনো যন্ত্রণা, কোনো স্মৃতি, কোনো দায়, কোনো যুক্তিসঙ্গত পরিস্থিতি; কোনো ঘটনা তাকে ফেরাতে পারেনি ইছামতি মিলঘাটে বটুর মতো দেখতে এক হঠাৎ দেখা বাদামি কুকুর ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে তাকে তার জন্মভিটায়’

বাক্যের পর বাক্য গেঁথে যেমন গল্প বাঁধা হয়। ফ্রেমের পর ফ্রেম গেঁথে ছবি বাঁধা হয়। কথার পর কথা কিংবা ফ্রেমের পর ফ্রেম আসে যুক্তির শৃঙ্খলা মেনে। তবে এ-কথাটি বুঝতে হলে শিল্পের যুক্তিবোধ কী ও কেমন সে-বিষয়ে জ্ঞানতা প্রয়োজন। শিল্পে যুক্তিহীনতাও তৈরি করে নিতে হয় যুক্তির সঙ্গতি মেনে। … ‘মাধো জমিদারপ্রভুভক্ত জগন্নাথ স্যাকরার ডানপিটে ছেলে। মাতৃস্নেহে তার মুক্ত জীবন। তার ভালো লাগে না টোলে যেতে, বাপের সাথে দোকানে বসতে। ভালো লাগে শুধু সঙ্গীদের সাথে অপার দুরন্তপনা। দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ পাড়া-প্রতিবেশির হামেশা নালিশ তবু মানা যায় কিন্তু জমিদারপুত্রের গায়ে হাত তোলা বটু বন্দী হলো জমিদারি বস্তায় ভরাহাটে মাধোকেও নাকে খত দেয়া হবে। প্রভুভক্ত বাবা জমিদারের রক্ষিদের হাতে তুলে দিতে ছেলেকে ঘরে বেঁধে রাখে। মায়ের মমতা গোপনে মুক্ত করে তাকে। এট্টুক মাধো গ্রাম ছাড়ে রীতিমতো বোচকা-পোটলা বেঁধে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবন আর ফেরেনি সে, অনেক বছর পর ইছামতি জুটমিলের ঘাটে এক আকস্মিক দৃশ্যে তার জাগরণ ঘটে, সব একসাথে, ধারাবাহিক ও নিটোলভাবে মনে পড়ে যায় তার। তার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। ঐ-ঘাট থেকে, ঐ-সময়, ঐ-অবস্থায়।

শিশুদের জন্যে বানাতে হবে সিনেমা পরিচালক খুব মনে রেখেছেন শর্তটি। তাই, সিনেমার শিরোনামাবলি শিশুতোষ হলো। সুন্দর চিত্র ধরতে জনহীন নিবিড়-সবুজ লোকেশন হলো। কিন্তু স্যাকরার গায়ে ধবধবে ধুতিও হলো; তার ছাতাখানাও কেনা হলো শুটিংয়ের দিন; তার ঘরের ভিতরের বেড়া রঙ মেখে চকচকে হলো; কী যেন বোঝাতে স্যাকরার ঘরে স্বস্তিকাও দেয়া হলো এখানে-ওখানে; আর তার বউটাও হলো এক্কেবারে নতুন [পালিশ করা]। স্যাকরা আর তার বউ, তাদের ছেলে আর ছেলের সঙ্গীরা ঈদের দিনের মতো নতুন নতুন জামা-কাপড় পেলো আর সবাই পেলো শহুরে আবৃত্তিকলায়-শীলিত প্রমিত সংলাপ।

‘চিত্রনাট্যকার গল্পবুননে স্বাধীনতা মেনেছেন [রবীন্দ্রানুগ থাকেননি]; আর নির্মাতা একে সত্যজিৎ ঘরানার ক্লাসিকতা দিতে প্রাণান্ত করেছেন’

Madhu Maznun

চিত্রনাট্যকার গল্পবুননে স্বাধীনতা মেনেছেন [রবীন্দ্রানুগ থাকেননি]; আর নির্মাতা একে সত্যজিৎ ঘরানার ক্লাসিকতা দিতে প্রাণান্ত করেছেন। কিন্তু আখ্যানের বিন্যাসে, সংলাপের ছটায়, ব্যবহৃত সংগীতে, দৃশ্যায়নের কৌশলে, স্থানায়নের [লোকেশন] উদ্বুদ্ধিতে সত্যবাবু হাজির থাকতে চেয়েছেন জোর করে পারেননি। কারণ, তাঁর অনুকারীকে জানতে হতো ঘন সবুজের সমারোহে আলোকের যথাসিদ্ধ নিয়ন্ত্রণ লাগে; প্রকৃতির [ব্যবহারে] নিজস্ব-চরিত্রের [মৌন] হাজিরা মানা লাগে; দৃশ্যদৈর্ঘ্যরে যুক্তি মানা লাগে; মানা লাগে ব্যবহৃত [টুকিটাকি] উপাদানরাশির যুক্তিটাও। অপ্রয়োজনীয় সংলাপের প্রাচুর্য [বর্তমান আলোচনার শুরুর সংকেত]; শব্দ-যোজনার দুর্বলতা; ক্লাইমেক্স তৈরির অকারণ আকাঙ্ক্ষা : জমিদার রক্ষিদের হাতে তুলে দিতে ছেলেকে দড়িতে বেঁধে জগন্নাথের নিরুপায় কান্না; কিংবা, ছেলের জন্যে মায়ের হাহাকার আর প্রভুভক্ত স্বামীর প্রতি ধিক্কার; কিংবা, দড়ি খুলে দিয়ে ধবধবে শাদা চাদরের বোঁচকা বেঁধে [এট্টুক] ছেলেকে অজানা গন্তব্যে পালাতে সাহায্য করা; কিংবা, বোঁচকা-কাঁধে মাধোর সবুজ অরণ্যের [লঙলঙ] ভ্যানিশিংয়ে মিলিয়ে যাওয়া [মনে হচ্ছিলো ছবির সমাপ্তি ঘটছে এখানে] ইত্যাদি ‘সিনেমা’টাকে ‘বাণিজ্যিক-ঢাকাই’ অথবা ‘টিভিনাটক’ হয়ে উঠতে বেশ সাহায্য করেছে।

রবীন্দ্রগল্পের সময়কে মনে হলো ঠিকঠাক ব্যবহৃত উপাদানে আনা গেলো না। সম্পাদক আন্তরিক হলে সময়ের মাত্রাগুলোও অন্তত ফুটতে পারতো যথাযথ রঙের বিন্যাসে, তাহলেও অন্তত, ডিজিটাল সিনেমার গা থেকে টিভি নাটকের তকমা সরানো যেতো। অথবা, নিটোল এক গল্প বলেই সিনেমাটা পার পেতে পারতো। যদি, মাধোর প্রস্থান আর ফেরার সম্পর্কটি বাঁধা যেতো যৌক্তিক কারণের ওপর শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে। রবীন্দ্র-গল্পের যুবক মাধোর আপসহীন চরিত্রটির প্রয়োজন ছিলো। মিলশ্রমিক মাধোকে তো পেলামই আমরা, শুধু তার ফিরে চলার বিশ্বাসযোগ্য যুক্তিটা পেলাম না। এই একটা মাত্র ‘ফ্লো’ থেকেও এ-ছবির মস্ত পতন। অপর সব চ্যুতি তো পরিচালকের মনকেও আহত করবে। আরেকটু ভালো প্রস্তুতির আক্ষেপ তাঁর থেকেই যাবে আজীবন। দুটি ছবি দর্শকনন্দিত হোক। আমাদের ছবি বলে কথা।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

নতুন মৌলিক গান “তুমি হারালে কোথায়?”

নতুন মৌলিক গান “তুমি হারালে কোথায়?”


করোনায় আক্রান্ত তাহসান

করোনায় আক্রান্ত তাহসান


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


গ্রেপ্তার হলেন বলিউড অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী

গ্রেপ্তার হলেন বলিউড অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী


সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব

সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব


বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বাংলার মুখ’

বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বাংলার মুখ’


হুট করেই বিয়ে পরীমনির, ৫ মাসেই ভাঙল সংসার!

হুট করেই বিয়ে পরীমনির, ৫ মাসেই ভাঙল সংসার!


এফডিসিতে ৫ গরু কোরবানি দিচ্ছেন পরীমনি

এফডিসিতে ৫ গরু কোরবানি দিচ্ছেন পরীমনি


করোনার মধ্যেই বিয়ে করলেন কর্নিয়া

করোনার মধ্যেই বিয়ে করলেন কর্নিয়া