Monday, October 14th, 2019
ঠগীদের সাথে বসবাস
October 14th, 2019 at 3:41 pm
ঠগীদের সাথে বসবাস

মাসকাওয়াথ আহসান:

বুয়েটের ছাত্র আবরারের হত্যার খবরটি যখন এলো; তখন জনমানুষের মাঝে একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিলো। পরিবারের কেউ হত্যার স্বীকার হলে ঠিক যেমন প্রতিক্রিয়া হয়; তেমনি একটি প্রতিক্রিয়া ছিলো সেটি।

এরপর আবরারের শব ব্যবচ্ছেদে এগিয়ে এলো আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। তাদের চোখে আবরার হয়ে উঠলো শিবির কর্মী। বাংলাদেশ-ভারত সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে আবরারের লেখা ফেসবুক স্টেটাসটিতে সে কী কী ভুল তথ্য লিখেছিল তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ আসতে শুরু করলো।

আওয়ামী লীগের সমর্থকরা টাইম মেশিনে চড়িয়ে অতীতের হত্যাযজ্ঞ প্রদর্শন করতে; শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিবির ও ছাত্রদলের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর পেপার-কাটিং-এ ভরিয়ে তুললো ফেসবুক।

টাইম মেশিন মেথডে অতীতের বিএনপি-জামায়াতের অপকর্মের আলাপ দিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমানের অপকর্ম ঢাকার ক্লিশে প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হলো ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিহত আবরারের মুখখানি বার বার ভেসে ওঠায়।

আবরারের মা শোক প্রকাশের সময় জানান, তাদের পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের সমর্থক; আবরারের বাবাও সে কথা বললেন। এলাকার সাংসদ আবরারের শোকাহত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এসে রায় দিলেন, আবরারের শরীরে আওয়ামী লীগের রক্ত।

আবরারের শরীরে আওয়ামী লীগের রক্ত হলে; এই হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় ছাত্রলীগের খুনীদের রক্ত জামাতের অবশ্যই; এটা প্রমাণ করতে আওয়ামিডিয়া খুনীদের ডিএনএ পরীক্ষা করতে পৌঁছে গেলো তাদের বাবা-মায়ের কাছে। দশজন খুনীর মধ্যে তিনজনের অভিভাবকের ডিএনএ পরীক্ষা করে মিডিয়ার ডাক্তার রায় দিলো এরা বিএনপি-জামায়াতের রক্ত। এই অবিশুদ্ধ রক্ত অত্যন্ত বিশুদ্ধ আওয়ামী রক্তে প্রবেশ করায় ক্ষমতাসীনদের এতো দুর্নাম হচ্ছে; এমনি একটি হাহাকারের ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে গেলো।

আবরার ফাহাদ

বিএনপি-জামায়াতের সোশ্যাল মিডিয়া ডাক্তারেরা তখন একজন হিন্দুধর্মী খুনীর ডিএনএ পরীক্ষা করে রায় দিলো এটা শিবসেনার রক্ত; যা মিশেছে আওয়ামী লীগের রক্তে। এই নিয়ে বিবাদ শুরু হলো তুরস্কের এরদোয়ান ভক্তদের সঙ্গে ভারতের মোদি ভক্তদের। এরদোয়ানের ভক্তরা, আবরারকে ওয়ার অন টেররে নিহত শহীদ প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠলো। মোদি ভক্তরা আবরারকে হোলি আর্টিজান হামলার জঙ্গি নির্বাসের সঙ্গে তুলনা করে এরদোয়ান ভক্তদের দাবীকে বাস্তব করে তোলার চেষ্টা করলো।

বিএনপি হাজির হয়ে গেলো, আবরারকে ভারত বিরোধী প্রথম শহীদ ঘোষণা নিয়ে। ছাত্রশিবির-ছাত্রদল নেমে গেলো পথে শোক মিছিল নিয়ে। আবরারকে হত্যাকারী ছাত্রলীগও আবরারের স্মরণেই অভাবনীয় এক শোক মিছিল করে বিশ্বরেকর্ড করলো।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকা; আর বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতায় ফিরে আসার নিয়ত ইঁদুর লড়াইয়ের মাঝে হারিয়ে যেতে থাকলো আবরারের নৃশংসভাবে নিহত হবার শোক।

বুয়েট প্রশাসন বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলো। যাদের ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়ালেখা করে; যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা আছে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে; ছাত্র-পরিষদ আছে; শুধু নেই দলীয় লেজুড়বৃত্তির খুনোখুনির রাজনীতি; সেই নিজেদের সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করা অভিভাবকেরা, বুয়েটে দলীয় লেজুড়বৃত্তির কথিত ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। এই কান্নার পক্ষে কোন যুক্তি না পেয়েও বলে উঠলো, পৃথিবীর অন্যকোথাও এরকম ছাত্র-রাজনীতি দরকার নাই; শুধু বাংলাদেশে অবশ্যই দরকার আছে।

এই যে আবরারের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যারা প্রথম ধাক্কায় ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্মে বিভাজিত হয়ে প্রতিবাদ করছিলেন; কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে ভারতে শত্রু খুঁজছিলেন, কেউ কেউ তুরস্কে শত্রু খুঁজছেন; তাদের জানা প্রয়োজন শত্রু দেশের মধ্যেই; দেশের সম্পদ লুন্ঠন ও পাচার করা ঠগীদের মাঝে বসবাস করে। বাংলাদেশের কিশোর-তরুণের রক্ত-মাংসের কারবারের আসল লক্ষ্য লুন্ঠন চালিয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত এরা দুটি ঠগী গ্যাং; কেবল প্রতিপক্ষ নিধন আর নিরাপরাধ মানুষের জীবনকে জিম্মি করে; বাংলাদেশের সম্পদ লুন্ঠন করে উন্নত বিশ্বে সম্পদ আর সেকেন্ড হোম গড়ে তোলার ছল-চাতুরি এদের প্রতিদিনের জীবন।

বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হত্যার মাস্টার মাইন্ড বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা; আর বর্তমানে সংঘটিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হত্যার মাস্টার মাইন্ড আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। জনগণ হিন্দু-মুসলমান, ভারত-তুরস্ক ইত্যাদি নানা অপ্রয়োজনীয় চিন্তা শিবিরে আচ্ছন্ন থাকায়; দেশের আসল শত্রু মাস্টারমাইন্ডেরা তাদের হত্যা ও লুন্ঠনের আদিমতা টিকিয়ে রাখতে পারছে।

তাই যে কোন হত্যাকাণ্ডের পর লাশের ব্যবচ্ছেদ করে লাশটিকে হিন্দু-মুসলমান-নাস্তিক ইত্যাদি লেন্সে না দেখে; মানুষ হিসেবে মানুষের মুখের দিকে তাকাতে শিখতে হবে। ওটা আসলে বাংলাদেশের সন্তানের মুখমণ্ডল। বাংলাদেশের সম্ভাবনার মৃত্যু।

Bangladesh writer
লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ

রাঙ্গা-ভাষার পাতকূয়া প্রদাহ


মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!

মুক্তচিন্তা প্রকাশের ভীতি কাটাবে লিট ফেস্ট!


মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক

মুক্তিযোদ্ধা বাদল-খোকার চলে যাওয়াঃ মিলনই মৌলিক


ক্যাসিনো অনেস্টি

ক্যাসিনো অনেস্টি


পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ

পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ


এই কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিন!

এই কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিন!


ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ

ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ


অপকর্মের উৎস মাদরাসা!

অপকর্মের উৎস মাদরাসা!


যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের

যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের


কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই

কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই