Thursday, June 9th, 2016
স্বাস্থ্যসেবা মানেই ডাক্তার নয়
June 9th, 2016 at 2:13 pm
স্বাস্থ্যসেবা মানেই ডাক্তার নয়

গুলজার হোসেন

সম্ভবত আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রী বাংলাদেশের সেইসব সাধারণ মানুষদের মত করেই চিন্তা করেন, যারা ভাবেন চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যখাত মানেই ডাক্তার। এটা একটা অতি সরলীকৃত চিন্তা। সরলীকৃত চিন্তা মানেই ‘সরল চিন্তা’ না। এটা সব সময় ভাল বিষয় না। ‘গভীরভাবে ভাবার পরিশ্রমটুকু করলাম না’ এই ভাবনা থেকেও এই চিন্তার উৎপত্তি। কোন বিষয় নিয়ে জানবার অনাগ্রহ থেকেও এটা হয়। কারণ জানাজানিটাও কারো কারো কাছে অহেতুক পরিশ্রম।

কাউকে জোর করে ‘দ্বিতীয় ঈশ্বর’ বানানো যায় না। ডাক্তাররা এই বুর্জোয়া সমাজ থেকেই আসে। তাদের অর্ডার দিয়ে অন্য গ্রহ থেকে আনানো হয়নি। এটা মনে রাখলে ভাল।

আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এবং কতিপয় নীতিনির্ধারকরা এখনো হাসাপাতাল সংস্কৃতির আদি পর্বে বাস করছেন। হাসপাতাল সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয় মিশনারিজদের হাতে। যদিও উপমহাদেশের  ইতিহাসে সম্রাট অশোকের সময়ে হাসপাতালের মতো বিশেষ সেবাকেন্দ্র দেখা যায় যেখানে কলিংগ যুদ্ধে আহতরা সেবা পেতেন। তবে সেটা পূর্ণতা পায়নি ধারাবাহিকতার অভাবে। সেই হিসেবে মিশনারিজদেরকেই অগ্রপথিক ধরতে হবে। তাদের হাসপাতাল চর্চায় একটি স্পিরিচুয়াল দিক ছিল। সেখানে ডাক্তার ও নার্সই সব। আর আছেন ঈশ্বর। ভাস্কো দা গা মার পথ বেয়ে একই জাহাজে আসা মসলা হাতে ব্যাবসায়ী আর বাইবেল হাতের মিশনারিজদের উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন। সে কথায় বিস্তারিত গেলাম না।

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডাক্তারের বাইরেও অনেক কিছু আছে। রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, খাবার সরবরাহ, ফার্মেসি, ওয়ার্ডবয়, আয়া, সর্বোপরি অবকাঠামোগত সুবিধা প্রভৃতি এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে, এটা অনেকেই চিন্তায় রাখেন না।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নেই এটা বিরাট অসুবিধা। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ যে নেই, নার্স নেই, আয়া ওয়ার্ড বয় নেই, এক্সরে মেশিন নেই সেটা নিয়ে ভাবনা খুব সামান্য। আমি একটি উপজেলা হেলথ কম্পলেকসের খবর জানি যেখানে ডাক্তার পোস্টেড আছেন ১৫ জন। সেখানকার এক্স রে মেশিন ১৫ বছর যাবত নষ্ট। মাঝে মাঝে ঠিক হয়। এখানে ডাক্তারির নামে নারায়নগিরি করা যেতে পারে, প্রকৃত চিকিৎসা সম্ভব না। এটা একটা উদাহরণ মাত্র।

হাসপাতালের স্পিরিচুয়াল দিকটি নিয়ে আলোচনা করতে আমরা খুব ভালবাসি।  কথায় কথায় বলি ডাক্তার হলো ‘বৈদ্য রূপী নারায়ন’, ‘দ্বিতীয় ঈশ্বর’ ইত্যাদি। কিন্তু এই আমরাই এই নারায়নকে ‘ঠূটো জগন্নাথ’ বানিয়ে রেখেছি।

একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাদানকারী ডাক্তাররা হলো সবচেয়ে নিরীহ সত্তা। ঔষধাগারে তার কর্তৃত্ব নেই, ওয়ার্ডবয়রা লোকাল মাস্তানের চেয়েও ভয়ংকর। বংশ পরম্পরায় এরা আবার চাকরি করে। ফলে সিন্ডিকেট মেইনটেইন করা তার কর্তব্য। এরকম আরো হাজারো সমস্যা আছে। এগুলো যত্ন করে বহাল রেখে আমাদের নীতিনির্ধারকরা ডাক্তারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন। কারণ এটা অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক। আর সাধারণ মানুষও এটা পছন্দ করে।

যাই হোক স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার জন্য সকাল বিকেল বহির্বিভাগ চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দশটি হাসপাতালে এটা চালু হচ্ছে। এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। তবে সেটা যদি হয় স্রেফ ডাক্তার বসিয়ে রাখা তাহলে সেটা স্টান্টবাজি ছাড়া আর কিছু হবে না। যদি রক্ত পরীক্ষা, এক্স রে, ইসিজির জন্য আবার সকালে আসতে হয় তাহলে সেটা বাড়তি হয়রানি ছাড়া আর কি? মন্ত্রী কি পারবেন সবাইকেই দুই বেলা সার্ভিস দেয়ার জন্য প্রস্তুত করতে?

এক্ষেত্রে আমার কিছু প্রস্তাব আছে। বৈকালিক আউটডোরের ভিজিট সকালের চেয়ে বেশি নিতে হবে। এর একাংশ পাবেন ডাক্তাররা। পরীক্ষা নিরীক্ষাও বিকেলে চালু থাকবে। সংশ্লিষ্ট সকলেই ইউজার ফি পাবেন পদ অনুসারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে রোল মডেল হতে পারে। একেক্টি সরকারি হাসপাতালে যে পরিমান রোগী হয়, যে পরিমান পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় এর একাংশ যদি ইউজার ফি হিসেবে ঠিকমত বন্টন করা হয় তাহলে কেউ সেধে প্রায়ভেট প্র‍্যাক্টিসে যাবে না। আমি লিখে দিতে পারি। উপরন্তু হাসপাতালে তাদের ইনভলভমেন্ট বাড়বে। রোগীরাও সার্ভিস পাবে।

কাউকে জোর করে ‘দ্বিতীয় ঈশ্বর’ বানানো যায় না। ডাক্তাররা এই বুর্জোয়া সমাজ থেকেই আসে। তাদের অর্ডার দিয়ে অন্য গ্রহ থেকে আনানো হয়নি। এটা মনে রাখলে ভাল।

লেখক: চিকিৎসক ও লেখক

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসজি


সর্বশেষ

আরও খবর

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান


গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?