Tuesday, August 6th, 2019
তোমার আসল শত্রুকে চিনে নাও
August 6th, 2019 at 10:14 pm
তোমার আসল শত্রুকে চিনে নাও

মাসকাওয়াথআহসান:

তালুকদার নতুন এপার্টমেন্টে আসার পর গোছগাছ করছে। তার স্ত্রী বিড় বিড় করে বলে, পারো না তো কিছুই শুধু শুধু কাজ বাড়ানোর দরকার কী! চুপ করে বসো এক জায়গায়। তালুকদার বকা খেয়ে একটু পাশের ফ্ল্যাটে প্রতিবেশী কে তা দেখতে যায়। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দাঁড়ায় চক্রবর্তী। তার মাঝেও একটা তীব্র কৌতুহল কাজ করছিলো কে নতুন প্রতিবেশী হয়ে এলো তা জানার।

–আসুন আসুন ভেতরে আসুন।

প্রথম দেখায় দুজনের বেশ আলাপ জমে যায়। এক পর্যায়ে চক্রবর্তী গিন্নি এসে জানিয়ে দেয়, আজ আমাদের বাসায় আপনাদের সবার নেমন্তন্ন।

ঘর গোছানোর দিনে এমন নেমন্তন্নের খবর পেয়ে তালুকদারের স্ত্রী খুশি হয়ে ভাবে, যাক ভালো প্রতিবেশী পাওয়া গেছে।

এরপরের দিনগুলো উভয় প্রতিবেশীর একরকম স্বর্গসুখে কাটতে থাকে। দুই বাসার দুটি কিশোরির ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তালুকদার আর চক্রবর্তী পরিবারের বন্ধুত্বের গল্প লিখে চক্রবর্তীর ভাগ্নি ইউরোপের সেক্যুলার বৃত্তে বেশ নাম ডাক করে ফেলে। তার অনুরোধে উভয় পরিবারকে ফটোসেশান করতে হয়। তালুকদার গিন্নি নামাজ পড়ছে একপাশে; আরেকপাশে চক্রবর্তী গিন্নি পূজা করছে; এই ছবিটি সেকুলার এওয়ার্ড জিতে যায়।

তালুকদার আর চক্রবর্তী ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়ে যায়। সেইখানে ইসলামিক স্টেট (আই এস) বনাম হিন্দু স্টেটের (এইচ এস) পাগল বাতাস বইতে থাকে। বিভিন্ন ইস্যুতে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের বিষ ছড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু অসুখি মানুষ। যখনই হাতে কোন কাজ থাকে না; আই এস আর এইচ এস-এর কাল্পনিক উন্মাদনা আক্রান্ত হয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষের বিষ ছড়ায় তারা। এরা তালুকদার আর চক্রবর্তীকে টাইমমেশিনে চড়িয়ে ইতিহাসের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার নানা দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস চুলকে ঘা করে দেয়া পদ্ধতিতে ফেসবুকের পরিবেশ ধীরে ধীরে তালুকদার আর চক্রবর্তীর মনকে বিষিয়ে তোলে।

ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোর সরকারগুলোর সুশাসন দেবার মুরোদ নেই। ফলে তাদেরকেও জাতীয়তাবাদের মানসিক উন্মাদনা তৈরি করে টিকে থাকতে হয়। ফলে ‘ষড়যন্ত্র’ ‘ষড়যন্ত্র’ বলে চেঁচিয়ে তারা পাড়া মাথায় তুলতে থাকে। চারিদিকে সন্দেহ আর সংশয়ের পরিবেশ তৈরি করে। প্রতিটি দিন ভীতির খবর সৃষ্টি করে পরের দিনটিকে আরো ভীতিপ্রদ করে তুলতে থাকে দেশগুলোর সরকার সমর্থকেরা। এসব দেখে তালুকদার আর চক্রবর্তী রীতিমত প্যারানয়ায় ভুগতে শুরু করে।

তালুকদার মাঝে মাঝে রাস্তায় গিয়ে দেখে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেলো কীনা। কিন্তু দেখে সব কিছু একইভাবে চলছে; শ্রমজীবী মানুষ; যাদেরকে প্রতি বেলার খাবারের জন্য শরীর খাটিয়ে কাজ করতে হয়; তারা কেউ থেমে নেই। কেবল চর্বিওয়ালা লোকগুলোর চোখে মুখে টেনশান।

তালুকদার গিন্নি আর চক্রবর্তী গিন্নি অফিস আর বাসা সামলাতে এতো ব্যস্ত; যে তারা ফেসবুকে চলতে থাকা ইসলামিক স্টেট আর হিন্দু স্টেটের কাবাডি খেলা অনুসরণ করতে পারেনি। দুজনের মেয়ে দুটিও ঠিক বুঝতে পারে না; কী নিয়ে এমন গরম গরম ভাব ফেসবুকে। ওসব এড়িয়ে হোয়াটস এপ, ইন্সটাগ্রামে থাকে তারা। পচা মুসলমান আর পচা হিন্দুদের কুঁচকুঁচানি খুবই আউটডেটেড মনে হয় তাদের কাছে।

ফেসবুকে তালুকদার গিন্নির এক স্কুল ফ্রেন্ড এসে ইনবক্সে খোঁচা দেয়, দিদির সঙ্গে গলাগলিতে আমার কথা ভুলেই গেছিস নাকি!

তালুকদার গিন্নি মেসেজটা সিন করে রেখে দেয়। চক্রবর্তী গিন্নিও বন্ধুদের এরকম খোঁচা শুনে চুপ করে থাকে। তাদের দুজনের হাতেই খেজুরে আলাপের সময় নেই; আর জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে; আনন্দে দিনগুলো কাটানো। সুতরাং উদ্দেশ্যহীন হতাশ মানুষের উস্কানিতে পা দেবার পাত্রী তারা নন।

তবে তালুকদার সাহেব ফেসবুকের কাল্পনিক ইসলামিক স্টেটের উস্কানিতে খানিকটা প্রভাবিত। আর চক্রবর্তী বাবু কাল্পনিক হিন্দু স্টেটের উস্কানিতে খানিকটা তাপিত। দুজনের মধ্যেই এইবার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক টাইপের মনোভাব।

গত একশো বছরে অসংখ্য তালুকদার ও চক্রবর্তী মনে মনে ভেবেছে, ‘এইবার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক’; কিন্তু ঘোড়ার ডিম হয়েছে। সেই ঘোড়ার ডিম সামনের দিক থেকে নাকি পেছনের দিক থেকে ভাঙ্গা যায়; সে কষ্টকল্পনার মাতমে লাখ লাখ মানুষ কষ্ট পেয়েছে; কত রক্ত-কত অশ্রু-কত বিয়োগ বেদনা; তবু ঘোড়ার ডিমের নেশা এ উপমহাদেশটাকে ছাড়ে না।

তালুকদার তার গিন্নির সামনে চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা কমানোর ব্যাপারটা কুঁচকুঁচ করে বলার চেষ্টা করে। চক্রবর্তীও তার গিন্নির সামনে তালুকদার পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা কমানোর ব্যাপারটা কুঁচকুঁচ করে বলার চেষ্টা করে। দুজনের স্ত্রীই বলে, মেয়ে দুটোর বন্ধুত্বের কথা, নিজেদের প্রতিদিনের জীবন একটু গল্প-আড্ডায় সুন্দর করে কাটানোর কথা।

এরপর তালুকদার আর চক্রবর্তী দুজনেরই প্রবল জ্বর হয়। ডাক্তার দুজনকেই ডেঙ্গি ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেয়। প্যারাসিটামল খেয়ে খেয়ে দুজনের জীবন তেতো হয়ে যায়। মৃত্যুভয় দুজনকেই জেঁকে বসে। দুজনেরই কানের কাছে এডিস মশারা এসে যেন ফিস ফিস করে বলে, সময় এসেছে; তোমার আসল শত্রুকে চিনে নাও।

মাসকাওয়াথ আহসান
মাসকাওয়াথ আহসান: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

এএফসি কাপে দুরন্ত জয় পেল আবাহনী

এএফসি কাপে দুরন্ত জয় পেল আবাহনী


গ্রেনেড হামলার আপিল শুনানি এ বছরেই শুরু হবে: আইনমন্ত্রী

গ্রেনেড হামলার আপিল শুনানি এ বছরেই শুরু হবে: আইনমন্ত্রী


আমি মরলে খালেদা জিয়া শোক দেবে, সেটাও তৈরি ছিল: প্রধানমন্ত্রী

আমি মরলে খালেদা জিয়া শোক দেবে, সেটাও তৈরি ছিল: প্রধানমন্ত্রী


আবারও বিয়ে করলেন ‘দ্য রক’

আবারও বিয়ে করলেন ‘দ্য রক’


অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত না করায় ধর্ষণ বাড়ছে: হাইকোর্ট

অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত না করায় ধর্ষণ বাড়ছে: হাইকোর্ট


নবম ওয়েজ বোর্ড: রায় সাংবাদিকদের পক্ষে

নবম ওয়েজ বোর্ড: রায় সাংবাদিকদের পক্ষে


লেদারল্যান্ডের ঢোল

লেদারল্যান্ডের ঢোল


১ বছর নিষিদ্ধ হলেন শেহজাদ

১ বছর নিষিদ্ধ হলেন শেহজাদ


আবারো বাড়ল সোনার দাম

আবারো বাড়ল সোনার দাম


নবম ওয়েজ বোর্ডের বিষয়ে আপিলের আদেশ মঙ্গলবার

নবম ওয়েজ বোর্ডের বিষয়ে আপিলের আদেশ মঙ্গলবার