Saturday, August 22nd, 2020
দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন
August 22nd, 2020 at 8:52 pm
দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

মাসকাওয়াথ আহসান:

দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্র নীতিতে রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-ভাই, রক্তের অক্ষরে লেখা সম্পর্ক, রাখী পরানো; ইত্যাদি শব্দবন্ধগুলোর ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের “স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্ক এর রসায়ন বদলে ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়েছে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী ভাই-বোনের মতো হয়ে যায়; প্রাজ্ঞজনেরা এমন বলতেন। সম্প্রতি ভূ-রাজনৈতিক সোপ অপেরাতে এরকম একটা ব্যাপার ঘটতে দেখা গেলো।

সম্প্রতি চীন পাকিস্তানের ভাই বলে নিজের পরিচয় দেবার পর বোঝা গেলো; একতা কাপুরের স্টার প্লাস নাটকের আঁচড় চীনের সমাজেও লেগেছে। অন্যকে আপন করে নিতে ভাই-বোন বানানো; স্বামী-স্ত্রী হওয়া; এগুলো কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়; দূর প্রাচ্যেও আছে।

সাধারণত পররাষ্ট্রনীতিতে এরকম আত্মীয়তার ভাষা ব্যবহৃত হতো না। “নট সো ফার; নট সো নিয়ার” এই পদ্ধতিটি যাপিত জীবনের নিরাপদসূত্র। পররাষ্ট্রনীতিতেও ঠিক তাই। কিন্তু দক্ষিণ এশীয় ও দূরপ্রাচ্যের সমাজের চিন্তার জগত যেহেতু “ফ্যামিলি ড্রামা কেন্দ্রিক”; সপরিবারে নাটক দেখার আকাংক্ষা নিয়ে টিভির সামনে এখনো বসে মানুষ। স্বামী-শ্বাশুড়ি-স্ত্রী কিংবা ভাইয়ে-ভাইয়ে দ্বন্দ্ব; এগুলোই নাটকের প্রতিপাদ্য। মানে এই পারিবারিক কোন্দল ব্যবস্থাপনাটা শিখে উঠতে পারেনি দক্ষিণ এশীয় সমাজ। তাই পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে ফ্যামিলি মেলোড্রামা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা চলছে যেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমস্যা আসলে পারিবারিক সমস্যার শাখা-প্রশাখার গল্প। ৭৪ বছরের দুই বৃদ্ধ; ভারত ও পাকিস্তান; এরা জন্ম থেকে বাপের রেখে যাওয়া জমির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারি করছে। এরা এতো আদিম পর্যায়ের দুই বৃদ্ধ যে; জাতিসংঘ বা সভ্য কোন আইনি প্রতিষ্ঠানের টেবিলে এদের কোন সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্ট বর্তমানের সংকটের আলোচনায়; কে কবে কোথায় কার সঙ্গে কী করেছিলো; এইসব আলাপ ঠেলে আসে বুড়োদের মাথায়। বুড়ো দুটোর যন্ত্র একটাই “ষড়যন্ত্র”। এরকম প্যারানয়াগ্রস্ত বৃদ্ধ ভারত-পাকিস্তান; চিন্তার জগতে জাঢ্য জরদগব স্থবির আর তামাদি। এরা একরকমের উত্তর কোরিয়াই; নেহাত নিজেদের ছেলেমেয়েদের বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে দাস হিসেবে পাঠিয়ে দিয়ে বসে খায় ভারত-পাকিস্তান বৃদ্ধ দ্বয়। তাই বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতে হয়। তাই একটু যেন “করোনা সভ্যতার মুখোশ” থুতনিতে রেখে দেয়; এইটুকুই পার্থক্য এদের মুখোশহীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে।

বাংলাদেশ এই মেলোড্রামার মাঝ বয়েসী ভাই; সামান্য জমিজমা দিয়ে সলিম বুঝ দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। বাংলাদেশের বিকাশ ব্যাহত করেছে প্রথমে বৃদ্ধ পাকিস্তান ও এরপরে বৃদ্ধ ভারত। বড় ভাইদের দেখে বাংলাদেশও সন্তানদের বিভিন্ন ধনী দেশে দাস হিসেবে পাঠিয়েছে; বসে বসে খাওয়ার জন্য।

এদের দেখলে ট্রাফিক সড়ক দ্বীপে বসে লুডু খেলা ভিক্ষুক পিতা-মাতার কথা মনে হয়; যারা বাচ্চাদের গাড়িতে গাড়িতে ভিক্ষা করতে পাঠিয়ে নিজেরা ছায়ায় বেশ আয়েশ করে বসে থাকে; আর টাকা গুনে।

ভিক্ষুক পরিবারের মেলোড্রামাটাতে একটু রঙ চড়িয়ে বেশ একটা গাল ফুলিয়ে রাষ্ট্র দাদা হয়ে বসে আছে এরা। এদেরকে সন্তানেরা কোন সমস্যার কথা বললে, এরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐ আকাশে তাদের স্বপ্নের নায়ক ঈশ্বর বসে থাকে। রাষ্ট্র তাই মসজিদে যায়-মন্দিরে যায়; স্বনির্মিত দেশীয় রাজনীতির ঈশ্বরের কবরে যায়। এরা দশকের পর দশক লালসালুর মাজার গুলো ভিজিয়ে রাখে দুই নয়নের জলে।

বিরাটও শিশু বিশ্ব নিয়ে খেলিতে ফুটবল দলের মতো হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃস্টান এরকম বৈচিত্র্য এনেছিলেন; নানা রঙের ফুলের বাগান তৈরির অভিপ্রায়ে। সেই বৈচিত্র্যকে দক্ষিণ এশিয়া নরমুন্ডু নিয়ে ফুটবল খেলার ক্লাব বানিয়েছে। আর নানাদেশে সন্তানেরা দাসত্ব করে যে টাকা পাঠায়; তা লুট করার জন্য রয়েছে জুয়ার টেবিলে নানান রঙের কার্ডের মতো রাজনৈতিক দল। দক্ষিণ এশিয়ার সুসন্তানেরা নরমুন্ডু দিয়ে ফুটবল খেলা, কিংবা নরবলি সংস্কৃতি চর্চা করে; ভিক্ষুক থেকে দ্রুত ধনী হয়।

দুর্নীতি মুছে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বিভাজন রেখা। দুর্নীতি বিপ্লবের বসন্তে এ যেন সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন ফর করাপশান। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যতে ফটোকপি কেস দেখে বোঝা যায়; জীনগত ঐক্যে এদের শ্রেষ্ঠত্ব এখন দ্রুত ধনী হবার ঠগী সমাজ হিসেবে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলেরা হচ্ছে জনপ্রতিনিধিত্বশীল জনগোষ্ঠী। এরা শুধু দুটো বিষয় সম্পর্কে জানে। ধর্ম সম্পর্কে মসজিদে-মন্দিরে শোনা ফতোয়া আর রাজনৈতিক জনসভায় শোনা ফতোয়াই এদের জ্ঞান বিকাশের একমাত্র পথ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলে কিছু জায়গা আছে; সেখানে ভিক্ষা-তেলদেয়া-মিথ্যা বলা-দুর্নীতির কলাকৈবল্য শেখানো হয় খুব যত্ন করে।

একারণে দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবসময় ধর্ম-রাজনীতির ভাটের আলাপ চলে। বাকিটা সেই সোপ-অপেরার মান-অভিমান-দলাদলি-গলাগলি আর লা গোবরিনা ফেস্ট। ৭৪ বছরের দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র উদ্ভাবিত যন্ত্র “ষড়যন্ত্র”। ভূত-প্রেতে বিশ্বাসী কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে; মানুষের পেট গুড় গুড় করলেও তা ভূতের আছর কীনা তা পরীক্ষা করে দেখে ধর্ম-রাজনীতির ‘তিতাস মলম” বিক্রেতারা।

ইন্টারনেট মিডিয়ার আগমনে আর জনসংখ্যার বেশিরভাগ তরুণ হওয়ায়; বৃদ্ধ ও মাঝ বয়েসী রাষ্ট্রগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে তরুণদের জীবনে। যে তারুণ্য ধরিত্রী বাঁচাতে পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে ভাবছে; যার সামনে গোটা পৃথিবী ঝলমল করছে অহোরাত্র; সেখানে জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মের মতো ব্যাপারগুলো একেবারেই ব্যক্তিচর্চার বিষয়। রাষ্ট্রকে মসজিদে-মন্দিরে দেখে; কিংবা জাতীয়তাবাদের দোকান খুলে শ্রমিকের শ্রমে ও ঘামে অর্জিত সম্পদ লুন্ঠন করতে দেখে; তরুণরা আস্থা হারিয়েছে স্বার্থপর বৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। রাষ্ট্রের নিসর্গ-প্রকৃতি-পরিবেশ ছাড়া আর কেউ আপন নয় তাদের।

ফ্যামিলি মেলোড্রামার ছোট ছোট স্বার্থের টানাপোড়েন দেখে ক্লান্ত তারুণ্য। নৈশভোজে বসে, কত সালে দাদু বাঘ মেরেছিলেন; কত সালে অমুক দাদু তাকে চিঠি লিখেছিলো, “তুমি আমার সম্পত্তির দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছো;” সুতরাং এখন তার প্রতিশোধ নিতে হবে। এই যে কুঁচ কুঁচ করে চোখের বদলে চোখের প্রতিশোধের গল্প; এগুলোই হচ্ছে দক্ষিণ এশীয় নরভোজি বিনোদন নির্ভর ইতিহাস ও রাজনীতি আলোচনা। তোমার ছেলেমেয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছে; দাসের জীবন যাপন করছে; উপার্জনের লক্ষ্যে অবৈধপথে ইউরোপে যেতে গিয়ে নৌকা ডুবিতে মরছে; আর তুমি দাদু সেই কষ্টের পয়সায় বজরা ভাসিয়ে উন্নয়নের রোড শো করছো; আর ভাটের শ্রেষ্ঠত্বের আলাপ তোমার সারাদিন।

এইকারণে তারুণ্য এখন এলিয়েনেশান বা বিচ্ছিন্নতাকে উপভোগ করছে। বৃদ্ধ ও মাঝবয়েসী প্যারানয়াগ্রস্ত রাষ্ট্রের অচলায়তন থেকে ব্যক্তি চিন্তার বিচ্ছিন্নতাতেই এখন মুক্তি।

চিন্তার ক্ষেত্রে দরিদ্র যারা; রাষ্ট্রের অনাদরে অপুষ্টিতে মস্তিষ্ক বিকশিত হয়নি যাদের; তারা ভিক্ষুক শিশুর মতো ফুটসোলজার হয়ে আজো ধর্ম-রাজনীতির চাঁদা তুলে বেড়াচ্ছে। আর ছায়ায় বসে বৃদ্ধ আত্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় অভিভাবকেরা লুডু খেলছে; ঝগড়া করছে; গোমূত্র আর উটের মূত্রের তৈরি ভ্যাকসিন বিনিময় করছে। করোনাকাল; গোটা বিশ্বের বিজ্ঞান চর্চাকারী রাষ্ট্রগুলো করোনাভাইরাস উদ্ভাবনে ব্যস্ত। এখন নিয়ত জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম গবেষণাকারী দক্ষিণ এশিয়ার তামাদি রাষ্ট্রগুলো তাই যেন পানের দোকানদারকে পিপিই পরিয়ে বসিয়ে দিয়েছে; করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে। তারুণ্য এই পাগলাটে বুড়ো রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে কেবল হাসতেই পারে। সীমান্তবিহীন করোনা আর সীমান্তবিহীন দুর্নীতি বিপ্লবের যুগে সীমান্তবিহীন হাসাহাসি চলবেই। স্বৈরাচার যদি অপ্রতিরোধ্য ও নিষ্ঠুর হয়; তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপে জর্জরিত করাই মোক্ষম অহিংস প্রতিশোধ।

মাসকাওয়াথ আহসান

সর্বশেষ

আরও খবর

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?


আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!