Monday, August 31st, 2020
দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন
August 31st, 2020 at 1:27 pm
দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য;

প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টি, তাদের সাথে দেনদরবার চালানো এবং অনেক ক্ষেত্রে দাবী আদায়ে পারঙ্গমতার জন্যে বাংলাদেশে প্রায় সব সেক্টরের মানুষের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীগত সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কাগজে-কলমে দেশটির সম্মিলিত মালিক যে দেশবাসি, তাদের হয়ে তাদের একান্ত জরুরী প্রয়োজন দেখা দিলেও ওই কাজগুলো করতে বা করিয়ে নেয়ার মতো সার্বজনীন সাংগঠনিক শক্তি তাদের নেই। ফলে দেশের সংবিধানে দেশটির মালিকানা যতো আন্তরিকতার সাথেই দেশের মানুষের হাতে বলে উল্লেখ করা থাকুক না কেন, আদতে বাস্তবের সাথে তার মিল দেখতে পাওয়া খুব, খুবই কঠিন।

বাংলাদেশে এবারের ঈদুল আযহার আগের রাতে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার অন্তর্গত বাহারছড়া তল্লাশী চৌকিতে কর্মরত পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার মৃত্যুর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রের কাগুজে মালিকদের অসহায়ত্বের কথাটি আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।

পুলিশ বা র‌্যাবের হাতে কোন মানুষের এ রকম প্রাণহাণির পরবর্তীতে তাদের পক্ষ থেকে প্রথামাফিক একটি ভাষ্য প্রচার করা হয়, তার সারাংশ: আটক সন্দেহভাজনকে (প্রায় সব সময়েই বলা হয়, অপরাধী, তাকে) সাথে নিয়ে অস্ত্র, ইয়াবা অথবা যে কোন একটা কিছু উদ্ধারে যে কোন একটা স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর আটক ব্যক্তির সহযোগিরা পুলিশ /র‌্যাবের ওপর হামলা করে আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ফলে পুলিশ /র‌্যাব আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে পাল্টা গুলি চালায় আর মাঝখানে পড়ে আটক লোকটি বেঘোরে অক্কা পায়।

র‌্যাব, পুলিশের পক্ষ থেকে এই কাহিনীর শিরোনাম এক সময় ছিলো ‘গানফাইট‘, পরে হলো ‘ক্রসফায়ার‘, হালে মাঝে-মধ্যে এটিকে ‘এনগেজমেন্ট‘ নামেও বর্ণনা করা হচ্ছে।

টেকনাফের সংশ্লিষ্ট পুলিশ দলটি প্রথমে এই বলে চালাতে চেয়েছিলো যে, মেজর সিনহা তাঁর পিস্তল দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করতে যাচ্ছেন দেখে তারা ‘আত্মরক্ষার্থে‘ গুলি করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং এতে মেজর সিনহার মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় ধারণা করা যাচ্ছে, পুলিশের এই দলটি এই কাহিনী ফেঁদে এগোতে চাইলেও সম্ভবত এই দফা ‘আত্মরক্ষা‘ করতে পারছে না।

৩১ জুলাই রাতে মেজর সিনহার মৃত্যু ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মূল অংশগুলো যদি আমরা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে দেখতে পাবো:

এক. টেকনাফের বাহারছড়া তল্লাশী চৌকির পুলিশদের ক্ষমতা ছিলো, যে কারও গাড়ি থামিয়ে সেটি থেকে যে কাউকে নামিয়ে নিয়ে গুলি করার। ৩১ জুলাই রাতে তারা সেই ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ করেছে। কিন্তু হয়তো ওদের দুর্ভাগ্য, সে রাতে যিনি তাদের হাতে ভিকটিম হলেন, তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান

দুই. শুধু তাই নয়, মাত্র দু‘ বছর আগেও তিনি শুধুই সেনাবাহিনীর মেজর পদে কর্মরত ছিলেন না, এসএসএফ-এর অফিসার হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রির নিরাপত্তা দলের একজন চৌকস কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিন. অতএব, এই কিছুদিন আগেও সিনহা যাঁদের একজন ছিলেন, তাঁরা তাঁদের এই সদ্য সাবেক সহকর্মীর এমন নৃশংস মৃত্যু মোটেই মানলেন না। মানলেন না সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত – কেউই। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ বললেন: যা ঘটেছে, তাতে সেনাবাহিনীতে আমরা শোকাচ্ছন্ন।

চার. প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা নিজে মেজর সিনহার পরিবারকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, এই মৃত্যুর যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই আশ্বাসের পরই সিনহার বোন শারমিন সংশ্লিষ্ট পুলিশদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন।

পাঁচ. যেদিন মামলা হলো সেদিনই টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার সাহাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হলো আর তার পর দিনই তাকেসহ অন্যান্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে পাঠানো হলো জেল হাজতে।

ছয়. সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ৫ আগস্ট কক্সবাজার জেলা সদরে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করলেন। বললেন, তাঁরা মনে করেন, মেজর সিনহার মৃত্যুর ঘটনাটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা‘ এবং এতে করে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সম্পর্কে কোন ফাটল ধরবে না। তাঁরা আরও বললেন, তাঁদের দুই বাহিনী এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিবিশেষের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। ঘটনাটির তদন্তের জন্যে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির ওপর দুই বাহিনীরই আস্থা রয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।

সাত. ওসিসহ অভিযুক্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে দু‘ দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব।

আমরা এখন এ লেখার মূল প্রতিপাদ্যের দিকে নজর ফেরাই।

ওসি প্রদীপ কুমার দাশ
ওসি প্রদীপ কুমার দাশ

মেজর সিনহার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনার ৫ দিনের মধ্যেই খোদ্ সেনাবাহিনী প্রধানকে ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছে। তাঁকে সাথে নিয়ে যেতে হয়েছে পুলিশের প্রধানকেও। দু‘জনকে যৌথভাবে তদন্ত ও দোষিদের বিচার নিশ্চিত করার কথা বলতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রিকে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিতে হয়েছে আর এর পরই মেজর সিনহার বোনের মামলা দায়ের এবং ওসিসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশদের গ্রেফতার, জেলযাত্রা ইত্যাদি ঘটেছে।

ক্রসফায়ার, গানফাইট, এনগেজমেন্ট ইত্যাদি হরেক নামের মোড়কে দীর্ঘ দিন ধরে চলমান বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যার দিকে তাকালে এই ভেবে হতবাক হতে হয় যে, রাষ্ট্রীয় শক্তির আধার এতোগুলো পক্ষকে এসব হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে এবং সে বিচার শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকাশ্যে এভাবে এক কাতারে দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ ২০০৪ সালে বিএনপির শাসনামলে র‌্যাব গঠিত হওয়ার পর থেকে যেভাবে বিনা বিচারে কথিত অপরাধীদের হত্যার পর্ব শুরু হয়েছিলো, সে থেকে এ পর্যন্ত এর শিকার তো কম মানুষ হননি।

কিন্তু শক্তিধর কাউকে এ পর্যন্ত সোচ্চার হতে দেখা গেলো না বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে। কোন অবসরপ্রাপ্ত কাউকেও না। আজ মেজর সিনহার নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদে বক্তব্য রাখছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠনও। এটা কি তাঁদের একজনের এমন অভাবনীয় মৃত্যুর কারণে?

সেনাপ্রধানকেও মাঠে নামতে হলো পুলিশ প্রধানকে সাথে নিয়ে। সেটাও তো নিশ্চয় সেনা-শক্তির একজন মেজর সিনহার এমন নির্মম-নৃশংস মৃত্যুর কারণেই।  ওদিকে, সেনা পরিবারের এক সদস্য মেজর সিনহার বোনকে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দিতে হলো খোদ্ প্রধানমন্ত্রিকে।

এ পরিস্থিতিতে এই চিন্তা অবান্তর না যে, দেশের কাগুজে মালিকদের আসলে অবস্থাটি কি? দেশের মালিক বলে সংবিধানে যাঁদের স্থান সর্ব্বোচ্চে তাঁদের কাউকে যখন ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হতে হয়, তখন রাষ্ট্রের কোন শক্তিধর সংস্থা কেন তাদের পক্ষ নিয়ে সব কিছু আমূল পাল্টে দেয় না, যেমনটা এখন ঘটছে মেজর সিনহার মৃত্যু নিয়ে?

পুলিশ বা র‌্যাব কাউকে মেরে ফেলে বলে দিলো সে অপরাধী, তাতেই ওই নিহত ব্যক্তি অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে যান না। সে রায় দেয়ার জন্যে আছে আদালত। মানব-সভ্যতা এই মানবিক সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করেছে বহু, বহু কাল আগেই।

Crossfire

আর ২০০৪ থেকে ২০২০, এই ১৬ বছরে বিপুল মানুষকে ক্রসফায়ার করে আমরা কতো শতাংশ অপরাধ কমাতে পারলাম? কমলো, না-কি অপরাধের সূচক আরও উর্ধ্বগামী?

অপরাধ কমাতে বা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্রসফায়ার খুব কার্যকরী কিছু একটা হলে এদ্দিনে তার ফলাফল পাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু ক্রসফায়ার বেড়ে চলেছে, সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ-কর্মও। তাহলে ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতা আর কি থাকলো?

‘ক্রসফায়ার বিশেষজ্ঞরা‘ সাধারণত যেমনটি করে থাকে, সে কায়দায় প্রধানমন্ত্রির নিরাপত্তা দলে দায়িত্ব পালনকারী চৌকস কমান্ডো মেজর সিনহাকে এখন মাদক-কারকারী বা জঙ্গী বলে চালানোর চেষ্টার সুযোগ টেকনাফ পুলিশের হাতে আর নেই। কিন্তু এমন উজ্জ্বল সুপরিচিতি যার নেই, তার কি হবে? অকালে, অবেলায়, অবহেলায় তাকে মরে যেতে হবে? শক্তিমান দুরাচারীদের ষড়যন্ত্রে, রাষ্ট্রীয় উর্দি পরার সুযোগধারী দুর্বৃত্তের অর্থলিপ্সা আর স্বার্থচিন্তার বলি হয়ে?

পুলিশের শক্তি আছে বলে তারা ক্রসফায়ার করবে, সেনাবাহিনীর শক্তি তার চাইতে বেশি বলে তারা পুলিশের ক্রসফায়ার-ওয়ালাদের গারদে ঢোকাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? কোন্্ শক্তিমান এসে পাশে দাঁড়াবে তাদের জীবন রক্ষায়? 

এই কাজটুকু আমাদের রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে, বিশেষ করে যাঁরা ক্ষমতাসীন, এ বিষয়ে তাঁদের দায়িত্ব কতো বেশি, সেটা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন রাখে না।

কথায় আছে, দশজন অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাক, কিন্তু একজন নিরপরাধীকেও যেন শাস্তি পেতে না হয়। এতো হচ্ছে শাস্তির কথা। আর আমরা বলছি, মানুষের বাঁচা আর মরে যাওয়া নিয়ে কথা। একজন নিরপরাধীকেও যেন হত্যার শিকার হতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদেরই। এ কথাটি নিশ্চয়ই বোধগম্য না হওয়ার মতো কিছু নয়।

কোন শক্তিমানের শক্তির কাছে অবদমিত হয়ে নয়, এর আগেই সম্পূর্ণ মানবিকতায় ভাস্বর হয়ে এই মানবিক দায়িত্বটি সম্পন্ন করা খুব জরুরী। দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন। 

লন্ডন, ২৭ আগষ্ট ২০২

লেখাটি মূলত: দৈনিক জনমত পত্রিকায় গত ২৭ অগাস্ট প্রকাশিত হয়েছিল:


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’

‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’