Wednesday, June 29th, 2016
‘দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব বঙ্গে’
June 29th, 2016 at 6:14 pm
‘দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব বঙ্গে’

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়: নিজের ‘এপিটাফ’ বা সমাধি লিপি তিনি নিজেই রচনা করে গিয়েছিলেন। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পিতৃপুরুষ (১৮২৪–১৮৭৩)। আজ ২৯শে জুন, মধুসূদন দত্তর মৃত্যুদিন। মৃত্যুর পনেরো বছর পরেতাঁর সমাধিক্ষেত্রে সেই সমাধিলিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল।

‘দাঁড়াও পথিক-বর

জন্ম যদি তব বঙ্গে ! এ সমাধি স্থলে

(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি

বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত

দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন !

যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ তীরে

জন্মভূমি ; জন্মদাতা দত্ত মহামতি

রাজনারায়ন নামে, জননী জাহ্নবী !’

মাত্র ৪৯ বছরের জীবনের শেষ প্রান্তে, চরম অনাদর, অবহেলা, নিঃসঙ্গতা পেয়েছিলেন বঙ্গজননীর এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। উনিশ শতকের নবজাগৃতির গর্ব করা বাঙালির সেই কলঙ্ক দূর হবার নয়। মধুসূদনের জীবনীকার যোগীন্দ্রনাথ বসু তার ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন “তাহারাযদি, কোনরূপে মধুসূদনের দাতব্য চিকিৎসালয়ে মৃত্যু নিবারণ করিতে সক্ষম হইতেন, তাহাহইলে বঙ্গসমাজ একটি গুরুতর লজ্জা হইতে রক্ষা পাইত। বঙ্গদেশের আধুনিকসময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি যে অনাথ ও ভিক্ষুকদিগের সঙ্গে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, পরে কবিরস্বর্ণময় প্রতিমূর্তি স্থাপন করিলেও এ কলঙ্ক মোচন হইবে না।

সম্পন্ন পিতার সন্তান হয়েও আর্থিক অনটন কখনোই মধুসূদনের সঙ্গ ছাড়েনি। ১৯ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হওয়ায় আত্মীয় পরিজনেরা তাকে নিঃসঙ্গ করে দেন। ইংরাজি সাহিত্যে যশোলাভ, মহাকবি মিলটন, বায়রনের দেশে যাওয়ার বাসনামধুসূদনকে অনেক কিছুই ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৫ দীর্ঘ আট বছর মাদ্রাজ প্রবাসকালে তার পৈত্রিক বাসভনটিও বেদখল হয়ে গিয়েছিল। পিতা-মাতার মৃত্যুসংবাদও তাকে জানানো হয়নি। ১৮৫৬ তে কলকাতা ফিরে এসে সামান্য পুলিশ কোর্টে কেরাণীর চাকুরিগ্রহণ করেন পেটের দায়ে। ১৮৫৮ থেকে ১৮৬২ এই পাঁচ বছরেই মধুসূদনের যাবতীয় সাহিত্যরচনা। নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’/…, ১৮৫৮, এপ্রিল– ‘পদ্মাবতী’ নাটক, ‘তিলোত্তমা সম্ভব’কাব্য, ১৮৬১ জানুয়ারি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য, মার্চ– ছদ্ম নামে ‘নীলদর্পণ’ অনুবাদ, জুলাই ১৮৬১ -জুলাইএ ব্রজাঙ্গনা’কাব্য ও ‘আত্মবিলাপ’কবিতা, আগস্ট’এ ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক এবং ওই বছরের ৪ঠা জুন ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতা রচনা। শুধু রোগ শয্যায় শায়িত অবস্থায় ১৮৭৩ এ শেষ নাটক ‘মায়া কানন’ রচনা করেন কিছু অর্থ প্রাপ্তির আশায়।

১৮৬২র ৯ই জুন পৈত্রিক সম্পত্তি জনৈক ব্যক্তিকে পত্তনি দিয়ে হেনরিয়েটাকে কলকাতায় রেখে অনটনকে সঙ্গী করেই ইংল্যান্ডে রওনা দিলেন মধুসূদন। পত্তনি দেওয়ার শর্ত ছিল যে ঐ পত্তনিদার মাসে মাসে হেনরিয়েটাকে সংসার খরচের অর্থ দেবেন। কিন্তু মধুসূদন প্রতারিত হন। দুমাস টাকা দেওয়ার পর ঐ ব্যক্তি অর্থ দেওয়াবন্ধ করে দেয়। হেনরিয়েটা বাধ্য হয়ে লন্ডনে মধুসূদনের কাছে চলে গেলেন। মধুসূদনের আর্থিক অনটন অসহনীয় হয়ে গেল। ঐ সময় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আর্থিক সাহায্য না পেলে হয়তো তাকে কারান্তরালে থাকতে হ’ত। ১৮৬৭তে ব্যারিষ্টারি পাশ করে কলকাতায় ফিরে এলেন ও কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করার অনুমতি পেলেন। কিন্তু সফল হলেন না ওকালতি ব্যবসায়ে। ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্যের স্রষ্টা ওকালতির কূট-কচালিতে পারদর্শি হবেন কি করে? ব্যারিস্টারি করে অর্থ রোজগারের রাস্তা খুললো না। ওকালতি ছেড়ে দিলেন।

১৮৭২এর সেপ্টেম্বর মাস থেকে মধুসূদন গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তীব্র আর্থিক অনটন, অন্নসংস্থানের চিন্তা, অমিতব্যয়িতা, অসংযমী জীবন যাপন ও নিঃসঙ্গতায় মধুসূদনের স্বাস্থ ভেঙ্গে পড়লো, নানা ব্যাধি বাসা বাঁধল তার শরীরে। মধুসূদন তখন হিন্দু সমাজে পরিত্যক্ত, খৃষ্টানরাও আপনজন মনে করতেন না তাকে, কারণ তিনি কোন গীর্জায় যেতেন না। ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্য প্রণেতা তখন ইন্টালিরবেনে পুকুরে এক অপরিসর গৃহকোণে মলিন শয্যায়চিকিৎসা, পথ্যহীন শায়িত। হেনরিয়েটাও অসুখে চিকিৎসাহীন শয্যাশায়ী। চিকিৎসা দূরের কথা, দুবেলা অন্নের জোগাড়ও অনিশ্চিত। কোন সঞ্চয় নেই, কোন রোজগার নেই। শুভানুধ্যায়ী দু একজনের সামান্য অর্থ সাহায্যে কতটুকু জীবন যুদ্ধ করা যায়!

এইসময় উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দয়াপরবশ হয়ে মধুসূদনকে স্ত্রী, দুই সন্তান সহ উত্তরপাড়া লাইব্রেরীতে নিয়ে আসেন। গঙ্গাতীরে লাইব্রেরি গৃহে নির্বান্ধব মধুসূদন গুরুতর ব্যাধি আক্রান্ত হয়ে শায়িত। হেনরিয়েটাও গুরুতর পীড়ায় আক্রান্ত, শয্যাশায়ীনি। বাল্যবন্ধু গৌরদাস বসাক একদিন উত্তর পাড়ায় মধুসূদনকে দেখতে এসেছিলেন। গৌরদাস তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন ‘আমি সেই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের কথা কোনদিন ভুলবো না। দেখলাম, বিছানায় শায়িতমধু রক্তবমন করছেন আর মেঝেতে শুয়ে হেনরিয়েটা রোগ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তার সন্তান দুটি খিদের জ্বালায় পচা পান্তাভাত খেয়ে ঘরের এক কোণে শুয়ে আছে আর তাদের ভুক্তাবশেষ সেই পান্তাভাতের ওপরে শতশত মাছি পড়েছে। আমি হেনরিয়েটার কাছে গেলাম, তিনি তার স্বামীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে অস্ফুট শব্দে বললেন, আমাকে নয় ওকে দেখুন’। গৌরদাসকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মধুসূদন । [ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যসাধক চরিত মালা মধুসূদন দত্ত’ গ্রন্থে গৌরদাস বসাকের ইংরাজিতে লেখাস্মৃতিকথার অংশটি উদ্ধৃত আছে]

গৌরদাস বাবুরা মধুসূদনকে আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। ওদিকে বেনিয়া পুকুরে হেনরিয়েটাও মৃত্যুপথ যাত্রী। ২৬শে জুন হেনরিয়েটার মৃত্যু হ’ল। মৃত্যুপথযাত্রী মধুসূদন পত্নী বিয়োগের কথা জানলেন। হাসপাতালে উপস্থিত ব্যারিষ্টার মনমোহন ঘোষকে বললেন ‘তুমি তো সেক্সপীয়র পড়েছো, সেই ক’টি পংক্তি তোমারস্মরণ হয়’? মনমোহন জিজ্ঞাসা করলেন ‘কোন কয়টি পংক্তি’? মধুসূদন তখন লেডিম্যাকেথের মৃত্যুতে ম্যাকবেথ যা বলেছিলেন তাসুস্পষ্ট রুপে আবৃত্তি করলেন–

‘Tomorrow and tomorrow and tomorrow,

Creeps in this petty pace from day to day,

To the last syllable of recorded time;

And all our yesterdays have lighted fools The way to duty death…….’

মধুসূদন বুঝেছিলেন মৃত্যুর ছায়া দীর্ঘতর হয়েছে। অন্যান্যরাও বুঝেছিলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্রষ্টার বিদায় আসন্ন। মনমোহন ঘোষের হাত ধরে প্রার্থনা করলেন তার দুই সন্তান কে যেন তিনি দেখেন। মনমোহন সম্মতি জানালেন। মৃত্যুশয্যায় মধুসূদন জেনেছিলেন তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে খৃস্টান মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয় যেহেতু মধুসূদন কোন গীর্জার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় বিশপের অনুমতি প্রার্থনার কথা জানালে তেজস্বী মধুসূদন বলেছিলেন ‘আমি মনুষ্য নির্মিত গীর্জার সংস্রব গ্রাহ্য করি না। আমি ঈশ্বরে বিশ্রাম করতে যাচ্ছি, তিনি আমাকে তার সর্বোৎকৃষ্ট বিশ্রামাগারে লুকিয়ে রাখবেন’।(ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় / সাহিত্যসাধক চরিতমালা ) । 

২৯ শে জুন ১৮৭৩, রবিবার অপরাহ্ন দুইটায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলা সাহিত্যের অমর কীর্তিমান মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মৃত্যুকালে তার শয্যাপার্শ্বে হাসপাতালের নার্স এবং দু’একজন ওয়ার্ডবয় ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। এর পরের ঘটনা আরো মর্মবিদারি। মধুসূদনের মরদেহকে কপর্দকহীন খ্রীষ্টানের মৃতদেহের মত লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরখানায় সমাধিস্থ করাহয় ২৪ ঘন্টা মৃতদেহ ফেলে রাখার পর। স্মৃতিস্তম্ভ দূরের কথা, কোন পাকা গাঁথুনিও নির্মাণকরা হল না। মৃত্যুর ১৫ বছরপরে চাঁদা তুলে তার সমাধিস্থলে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ।

‘সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় মধুসূদনের স্মৃতিতর্পণ করেছিলেন এই ভাবে ‘…এই প্রাচীন দেশে, দুই সহস্র বৎসর মধ্যে কবি একা জয়দেব গোস্বামী …। জয়দেব গোস্বামীর পর শ্রী মধুসূদন।’

সমকালীন ‘সমাজ দর্পণ’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল এই রকম – ‘…আমরা মাইকেলের অশৌচ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। কারণ এরূপ করিলে তৎক্ষণাৎ জাত্যান্তরও সমাজচ্যুত হইতে হইবে। হা মাইকেল! তোমার অন্তেষ্টির সময়তোমার আত্মীয়গণ রোদন করিতে পারিল না। তুমি পরের মত বিদেশী ও ম্লেচ্ছগণের হস্তে মস্তক প্রদান করিয়াপ্রাণত্যাগ করিয়াছ! …নিকটে যাইতে ইচ্ছা করিলেও যাইতে পারিলাম না। হিন্দুধর্মের পারে গমন করিয়া তুমি যেন সমুদ্র পারবর্তী জনের ন্যায় বহু দূরবর্তীহইয়া পড়িলে। যাহা হউক, আমরা তোমার নিমিত্ত গোপনে রোদন করিব। বঙ্গভাষা তোমাকে বহুদিন স্মরণ করিয়া রাখিবেন। …’

Falguni Mukhupadhyayলেখকঃ সাহিত্যকর্মী


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা