Sunday, September 25th, 2022
দুর্নীতির দায়ে শ্রীঘরে সরকার দলীয় এমপি
May 22nd, 2022 at 7:27 pm
দুর্নীতির দায়ে শ্রীঘরে সরকার দলীয় এমপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিমকে রবিবার কারাগারে পাঠিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শহিদুল ইসলাম। সেলিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে তা নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। 

যে কোনো শর্তে জামিনের আবেদন করেছিলেন হাজী সেলিমের আইনজীবী প্রাণ নাথ। এছাড়া কারাগারে উন্নত চিকিৎসা ও প্রথম শ্রেণীর ডিভিশন চেয়ে তাঁর পক্ষে আরো দুটি আবেদন করা হয়।

উচ্চ আদালত আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেওয়ার পরও তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় সম্প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল সরকারি দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এবং একই প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনজীবী ও সুশীল সমাজের।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তখন বলেছিলেন, “দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সংসদ
সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম ব্যাংককে গেলেও সরকার দীর্ঘদিন ধরে শুধু রাজনৈতিক কারণে খালেদা জিয়াকে (সাবেক
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন) চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দিচ্ছে না।”

তিনি দাবি করেছিলেনন, হাজী সেলিমের বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা প্রমাণ করে খালেদাকে রাজনৈতিক কারণে মিথ্যা মামলায় কারাগারে
পাঠানো হয়েছে।

“দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির কখনো, কোনোভাবেই বিদেশ যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই,” উল্লেখ করে মঙ্গলবার দুদকের আইনজীবি
খুরশীদ আলম খান তখন জানান, তাঁর দেশত্যাগের বিষয়টি দেশত্যাগের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তিনি কীভাবে
যেতে পারলেন সেটা তাদেরও প্রশ্ন।

“খালেদা জিয়াকে -তো সরকারই অনুমতি দেয়নি। আমাদের সেখানে বক্তব্য ছিল– খালেদা জিয়া সরকারের কাছে বিদেশ
যাওয়ার অনুমতিই চাইতে পারবে না। কারণ বিষয়টি বিচারাধীন। সেখানে হাজী সেলিমের বিষয়টি কিন্তু আরো গুরুতর,”
বলেছিলেন তিনি।

“ওনাকে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সেটা করবেন বা বিদেশ যাওয়া দরকার তা আদালতে
বলতে পারতেন। তা না বলে কিছুই না জানিয়ে গোপনে এভাবে চলে যাওয়া মোটেও আইনসিদ্ধ না,” যোগ করেন দুদক
আইনজীবী।

দুদক কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেবে কিনা জানতে চাইলে খোরশেদ বলেছিলেণন, “হাজী সেলিমের আইনজীবী বলেছেন, তিনি ঈদের
পরে ‘সারেন্ডার’ করে আপিল বিভাগে নিয়মিত আপিল করবেন। তারা যদি সেটা করেন, তবে তখন আমরা তাঁর এভাবে
বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষন করবো।”

“আইনের শাসন নয়, এটা হলো আইনের দ্বারা শাসন। অর্থাৎ যেখানে একেকজনের জন্য আইন প্রয়োগ একেকভাবে,” বলেছিলেন বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তাঁর দাবি, “যারা ক্ষমতাসীনদের নিজের দলের লোক বা পছন্দের লোক তাদের জন্য আইন একভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, অন্যদের
জন্য আরেকভাবে। আমাদের সর্বস্তরে যে দলীয়করণ হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব বহুলাংশেই দুরীভূত
হয়ে গেছে, এটা তার প্রতিফলন। এ জাতীয় ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে দেশে সুশাসন নেই, যা দূর্ভাগ্যজনক।”

“আইন সবার জন্য সমান, সবাইকে সমভাবে দেখা উচিত,” উল্লেখ করে গবেষক ও উন্নয়নকর্মী ড. বদিউল বলেছিলেন, “আমার
মনে হয়, হাজী সেলিমের দেশত্যাগের জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে এ ভবিষ্যতে এমন ঘটনা
বন্ধ হবে। তবে আমি নিশ্চিত না, সেটা করা হবে কিনা।”

তবে আইন ও আদালত বিশেষজ্ঞ ড. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি আদালতের আদেশটি পড়েছেন। সেখানে
হাজী সেলিমের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই অধ্যাপক বলেছিলেন, “সেখানে তাঁকে আত্মসমর্পনের সময় দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশত্যাগ
করতে পারবেন না, বোনো এমন বিধিনিষেধ সেখানে নেই। তাই তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না, এমন কোনো
আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরী হয়নি।”

“হাজী সেলিম সাজাপ্রাপ্ত হলেও জামিনের ছিলন। হাইকোর্টের রায়ে ওনার সাজার একাংশ বহাল রাখা হলেও আত্মসমর্পনের
জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। তবুও দুদক আইনজীবী কেন এমনটা বলছেন, তা বুঝতে পারছি না,” বলেন তিনি।

ঘটনাটিকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাজেভাবে চাউড় করা হয়েছে দাবি করে হাজী সেলিমের অন্যতম আইনজীবী এম সাঈদ
আহমেদ রাজা বলেছিলেন, “তিনি পালিয়ে গেছেন এমন আজগুবি খবরও ছড়ানো হচ্ছে। অথচ উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ
অনুলিপি বিচারিক আদালতে এসেছে গত ২৫ এপ্রিল। ওই তারিখ থেকে একমাসের মধ্যে তাঁকে আত্মসমর্পন করতে হবে।”

“তার আগে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। কারণ আদালত ওনাকে এক মাসের
একটা সুযোগ দিয়েই ‘সারেন্ডার’ করতে বলেছেন। সহজভাবে বললে, এটা অনেকটা আগাম জামিনের মতো। এই এক মাস
শেষ হওয়ার আগে কোনো আদালত তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানাও জারি করতে পারবে না।”

“উনি আমার সাথে আলাপ করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে,” উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন, সেলিম ৬ তারিখ দেশে ফিরে আসবেন
এবং আগামী ১৭-১৮ তারিখে আত্মসমর্পণ করবেন।

সেলিমের ছোট ছেলে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইরফান সেলিমও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তার বাবা চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড গেছেন। দেশে ফিরেই আইনজীবীদের সাথে কথা বলে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।

উল্লেখ্য, ৩০ এপ্রিল ব্যাংকক যাওয়া এমপি সেলিম ৫ মে দেশে ফেরেন।

২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই মামলায় ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল তাকে দুই ধারায় ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক
আদালত।

২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর রায়টির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন হাজী সেলিম। যার প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২
জানুয়ারি তার সাজা বাতিল করে আদালত। পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে দুদক।

ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে পুনরায় শুনানির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৯ মার্চ বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের ভার্চ্যুয়াল
হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া রায়ে ১০ বছরের দণ্ড বহাল থাকলেও তিন বছরের দণ্ড থেকে খালাস পান তিনি।

বিচারিক আদালত যেদিন হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাবেন, সেদিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে
আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আত্মসমর্পণ না করলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে বলা
হয়েছে। আর যেসব সম্পত্তি নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয়েছে তা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে হবে।

আদালত খোলার পরে আপিল বিভাগে নিয়মিত আপিল করার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজী
সেলিম জামিনের দরখাস্ত করা হবে বলেও নিশ্চিত করেছিলেন তাঁর আইনজীবী।

সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন সাংসদ নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে
দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী তার সাজার
রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এমপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না।

তবে হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ এখনো বাতিল হয়নি।