Tuesday, February 28th, 2017
দেশভাগ
February 28th, 2017 at 6:00 pm
দেশভাগ

আসানুর রহমান খান:

(১) নারান হালদার। পদ্মার জলে মাছ শিকারই তার জীবিকা। একদিন কাজে না বাহির হইলে সেদিন গোটা পরিবারকেই উপোষ থাকিতে হয়। প্রত্যেহ সূর্য উঠিবার পূর্বে তিনি বাড়ি হইতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রায় দুই ক্রোশ দূরের পথ। ফেরেন সন্ধ্যায়, মাছ বিক্রির টাকায় চাউল ডাউল ক্রয় করিয়া।

বাড়ি বলিতে তাহার দুইচালা দুইটা ঝনের ঘর সামনা সামনি। শরিক বেশী হওয়ায় ছোট ছোট ঘর একেকটা আরেকটার গায়ের সাথে লাগানো। একখানা ঘরে তিনি ও তাহার বউ ননিবালা থাকেন। আরেকঘরে তাহার বিধবা মা শান্তিবালা নারান হালদারের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে গাদাগাদি করে থাকেন।

নারান হালদারের পিতা গত হইয়াছেন পাঁচ বৎসর হইল। সেই বৎসরই তাহার শেষ সন্তান অমেয়বালার জন্ম। মেয়েটা দেখিতে যেন সাক্ষাৎ দুর্গা। বাইরের দুনিয়া হইতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্যুত নারান হালদারের দুনিয়া বলিতে এই হরিকিশান গ্রামের ছোট্ট জেলে পাড়া এবং পদ্মার পাড়ে দুবলার চর।

(২)  এই জগত সংসার সম্পর্কে তিনি কোনরুপ জ্ঞান না রাখিলেও মোল্লা বাড়ির কছিমুদ্দিন মোল্লার ছেলেরা ভোটের দুইদিন পূর্বে মাঝরাতে আসিয়া তাহাকে শাসাইয়া গিয়াছে।

-এই যে মেছুয়া। সকাল সকাল বউ বাচ্চা লইয়া মই মার্কায় ভোট দিবা কইলাম। নইলে তোমার লাশ এই ভিটায় শিয়াল কুকুরে খাইবে।

নারান হালদারের অবশ্য এইসব লইয়া কোন প্রকার ভ্রূক্ষেপই নাই। ঠিকই তিনি ভোর হইবার পূর্বে সেইদিন ভোট প্রদান না করিয়া মাছ ধরিতে চলিয়া যান। ভোট শেষে লোকেমুখে শুনিতে পান সে নির্বাচনে মুসলমানরা জিতিয়াছে। ফলে মনে মনে তিনি হাসেন ও ভাবিতে থাকেন, যাক, এ যাত্রায়ও বাঁচিয়া গেলাম।

ভোটের পরে দুইদিন যদিওবা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করিতেছিল। সময়ের সাথে তাহা মিলিয়া যায়। কিন্তু গত কয়েকসপ্তাহ মনে হইতেছে চায়ের দোকানে আবার ঝড় উঠিয়াছে। পরিস্থিতি আর তাহাদের অনুকুলে নাই।

(৩) লেঙটির উপরে ধুতি মাজায় গুঁজিয়া নারান হালদার দুবলার চরের দিকে রওনা দিয়াছেন। আজ বড্ড দেরি হইয়া গেল। মাঝরাতে বউয়ের যন্ত্রণায় ঘুমটাও ঠিকমত হয় নাই। সামনেই মুসলমান পাড়া। বাজারের মসজিদ হইতে মুসল্লিরা সাদা শুভ্র পাঞ্জাবী ও টুপী মাথায় দিয়া একেএকে বাহির হইতেছে। এমন দৃশ্য সচরাচর তাহার চোখে পরে না।

ধাই ধাই করিয়া পাশ কাটিয়া চলিয়া যাইতেছিল। এমন সময় কছিমুদ্দিন মোল্লা খিলখিল করিয়া হাসিয়া কহিল-

-কি গো নারান, দেশের খবর কিছু রাখো মিয়া?

-না, দাদা। আমি সময় পাই না।

-তোমাদের মনে হয় এইবার ঐ পারে যাইতেই হইব গো। পরিস্থিতি ভালা না। এককাজ করো, রাতে আমার লগে দেখা কইর সবাইরে লইয়া।

-আইচ্ছা দাদা। বড্ড তাড়া আমার। যাই তাইলে।

-আইচ্ছা যাও।

সেদিন কাজে তাহার কোনপ্রকার মনই বসিল না। পৈতৃক এই ভিটা ছাড়িয়া তাহারা কোথায় যাইয়া উঠিবে? মাছ বলিতে পাইয়াছে এক খাচি খলশে ও তিত পুঁটি। তাই কালক্ষেপণ না করিয়া বৈকাল হইবার পূর্বেই জোরে পা চালাইয়া বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হইলেন।

(৪) সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরিয়া তাহার ঠিক অস্থির লাগিতেছিল। মনে মনে ভয় হইতেছিল কিছু একটা হইবে। মাঘ মাসের ভরা পূর্ণিমায় গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষই জাগিয়া কীর্তন শোনে। এইবছর ঘোষেদের পালা। তারাই আয়োজন করিয়াছে। শাঁখের শব্দে চারদিক মাঝেমধ্যে কাঁপিয়া উঠিতেছে।

রাত্রির প্রথম প্রহর। কীর্তনে অবশ্য নারান হালদারের মন বসে না। বউ বাচ্চা লইয়া চুপিচুপি কাটিয়া পরিল। তাছাড়া ভোর হইতেই তাহাকে কাজে বাহির হইতে হইবে।

হটাত শাঁখারিপাড়া হইতে মেয়েছেলের প্রচণ্ড চিৎকারে চারিপাশ বিদীর্ণ হইয়া উঠিল। ঢাকের বাজনা বন্ধ করিয়া সবাই তাহা বুঝিয়া উঠিবার চেষ্টা করিতেছে আসলেই কি ঘটিয়াছে? একপা দুইপা করিয়া কয়েকজন সেদিকে আগাইয়াও গেল। কিন্তু নারান হালদারের মনে তাহা কোন প্রকার দাগ কাটিতে পারিল না।

(৫)  সেদিন রাতেই খবর ছড়াইয়া পরিল নিতেশ কুমারের ষোড়শী কন্যাকে কে বা কাহারা মাটির ঘরে সিঁধ কাটিয়া তুলিয়া লইয়া গিয়াছে। মা লক্ষ্মীর মতোন দেখিতে মেয়েটি এ গ্রামের সর্বাপেক্ষা সুন্দরি মেয়েই ছিল। যেন দুধে আলতা রঙ।

পরদিন সকালে কছিমুদ্দিনের ছেলেরা আসিয়া বাড়ি বাড়ি বলিয়া গেল, আপনারা কোন প্রকার চিন্তা করিবেন না। আমাদের মাওলানা সাহেব থাকিতে আপনাদের কোন প্রকার সমস্যা নাই। শুনিয়াছি কলিকাতা ও নোয়াখালিতে অতিমাত্রায় গণ্ডগোল চলিতেছে। গতরাতে শাঁখারি পাড়ায় যে ঘটনাটা ঘটিয়াছে তাহা নিতান্তই অনভিপ্রেত। সুতরাং সন্ধ্যার পর আপনারা সকলেই আমাদের মাওলানা সাবের বাড়িতে আশ্রয় লইবেন।

সন্ধ্যা হইবার পূর্বেই যেন মানুষের ঢল নামিয়া আসিয়াছে কছিমুদ্দিনের বাড়িতে। শাঁখারিপাড়ার সবাই আগে আসিয়াছেন। তাহাদের পিছনে পিছ্নে আসিয়াছে ঘোষ, বিশ্বাস, কামার, কুমার সবাই।

(৬) অষ্টাদশীর চাঁদ সেইদিন পশ্চিমে হেলে পড়িয়াছে। সবার মনে এক চাপা কান্না। হটাত কছিমুদ্দিন সাব সবার মাঝে হাজির হইলেন। কিছু সময় চুপ করিয়া থাকিয়া বলিতে লাগিলেন-

 “কলিকাতায় আমাদের অনেক মুসলমান ভাইকে হত্যা করা হইয়াছে গতকাল। আমি পার্টি অফিস হইতে টেলিগ্রাফ পাইয়াছি। আমার উপরে নির্দেশ আছে ঠিক তেমনই প্রতিশোধ লইতে। তবে আমি রক্তারক্তিতে বিশ্বাস করিনা বলিয়া আপনাদের ওপারে যাইবার ব্যবস্থা করিয়াছি। যদিও কাফের হত্যায় আমার জন্য পরকালের বেহেস্তের দরোজা খুলিয়া যাইত।”

সবাই যেন উদ্গ্রীব হইয়াছিল কছিমুদ্দিন সাবের প্রস্তাবখানা শুনিবার লক্ষ্যে। তিনি কিছু সময় চুপ করিয়া থাকিয়া আবার শুরু করিলেন, “আপনাদেরকে কিছু দিনের জন্য ওপারে যাইতে হইবে। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইয়া আসিলে আবার ফিরিয়া আসিবেন। আপনাদের সম্পদের চাইতে জানমালের মূল্য বেশী। হয়তো মালের রক্ষা আমি আমার লোক দিয়া করিতে পারিব, কিন্তু জানের রক্ষা আমার পক্ষে কস্যিকালেও সম্ভবপর নহে।”

(৭) আপনাদের ওপারে যাইবার নিমিত্তে আমি কয়েকখানা গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করিয়াছি। সাথে আমার লোকবল যাইবে। ঈশ্বরদী ট্রেন ষ্টেশন পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেবে। সবাইকে বোরখা পড়িয়া লইতে হইবে। সে ব্যবস্থাও আমি করিয়াছি। ছেলেদের জন্য রহিয়াছে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবীর ব্যবস্থা। সাথে একখানা করিয়া টুপী।

কছিমুদ্দিনের কথা শুনিয়া অতিথি পুরুষরা যেন তৎক্ষণাৎ ধুতির গোছা টান মাড়িয়া খুলিয়া ফেলেন। কিছু সময় দম লইয়া কছিমুদ্দিন গলা সজোরে খেঁকানি দিয়া কহিলেন, তবে বাপুরা আমার একখানা কথা আছে। রুপালী চাঁদের আলোয় তার দাঁত চিকচিক করিয়া উঠিল। পাটির ঠিক কোনায় ভিতরের দিকে সোনাদিয়ে বাঁধানো দাঁতখানা ঝিলিক মাড়িয়া উঠিল, সবাই বিস্ময়ের সহিত কহিল কি?

তোমাদিগের সবাইকে এই কাগজে টিপসই দিতে হইবে। যারা যারা করিবে তাহারাই কেবল মাত্র গোয়ালের পাশে রাখা গরুর গাড়িতে উঠিতে পারিবে। বাঁকিদের দায়িত্ব আমরা লইতে পারিব না। তবে তোমাদেরকে কথা দিতেছি যখন তোমরা দেশে ফিরিয়া আসিবে তখন যার যার সম্পত্তি তাহাদিগকে ফেরত দেওয়া হইবে।

(৮) কছিমুদ্দিনের কথা শুনিয়া নারান হালদারের পায়ের তল হইতে মাটি সরিয়া গেল। কি করিবে ভাবিয়া পাইতেছে না। হাজার বৎসর ধরিয়া যে জল খচিয়া জীবিকা নির্বাহ করিয়াছে সেই জল আজ রাত হইতে তাহাদের জন্য ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলিয়া যাইবে।

কি করিয়া খাইবে কলিকাতা শহরে? কছিমুদ্দিন বলিতেছে সেই শহরের নাকি তাহাদের জন্য সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা তৈয়ার করা হইয়াছে। কিন্তু মানুষটা বাপ-দাদার সহিত কাঁচা ঘরে রাত কাটাইয়া শীত গ্রীষ্ম মাছ ধরিয়াছে পদ্মার বুকে তাহার জন্য কলিকাতা শহর নিতান্তই বিলাসিতা।

তবুও নিজের চোখের কোনা বাহিয়া গড়াইয়া পরা নোনাজলকে আগলে রাখিয়া কাগজে টিপসই দেয় নারান। কাপড়ের পুটলাটা বগল দাবা করিয়া গরুর গাড়িতে চড়িয়া বসে। সাথে বৃদ্ধ মা, বউ ননিবালা ও পাঁচ সন্তান।

লেখক: লেখক ও ব্লগার


সর্বশেষ

আরও খবর

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সংবিধান এবং আশাজাগানিয়া মুরাদ হাসান


গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার


মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ

মহামারী, পাকস্থলির লকডাউন ও সহমতযন্ত্রের নরভোজ


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করুন


নাচ ধারাপাত নাচ!

নাচ ধারাপাত নাচ!


মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে!


তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!

তারুণ্যের ইচ্ছার স্বাধীনতা কোথায়!


সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?

সমাজ ব্যর্থ হয়েছে; নাকি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে?


যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে

যুদ্ধ এবং প্রার্থনায় যে এসেছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা থাকবে


বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?

বঙ্গবন্ধু কেন টার্গেট ?