Tuesday, June 21st, 2016
নজরুল সংগীত বিতর্ক সমাধানে করণীয়
June 21st, 2016 at 4:20 pm
নজরুল সংগীত বিতর্ক সমাধানে করণীয়

সুজিত মোস্তফা: নজরুল সংগীত শিল্পী এবং নেতা-কর্মীদের এক ছাতার তলে আনবার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করলাম। ইগো প্রবলেম এবং নেতৃত্ব খর্ব হওয়ার আশঙ্কাই মনে হয় আমাদের কাছে মূল বিষয়, নজরুল নয়। নজরুলের গান নিয়ে কী কী জটিলতা বর্তমানে বিদ্যমান সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাকে জ্ঞাণপাপী বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এমন কিছু অর্বাচীন যাদের সাংগীতিক বোধ এবং প্রজ্ঞা এত নিম্ন স্তরের যে এরা সংগীত বিষয়টির সাথে কেন নিজেদের যুক্ত রেখে নিজেদের জ্ঞাণ জাহির করার চেষ্টা করেন, সেটা বোধহয় যেকোন সুস্থ মস্তিষ্ক ব্যক্তির কাছেই প্রশ্ন। অতএব কয়েকটি বিষয় খোলাশা করে আমি নিজেই একটা ফর্মূলা দেবার চেষ্টা করছি।

প্রথমত, একটা ন্যাশনাল প্যানেল করতে হবে সিনিয়র প্রাজ্ঞ সংগীত ব্যক্তিত্বদের নিয়ে। এই প্যানেল নজরুল সংগীত শিল্পী এবং অন্য ঘরানার গুণী শিল্পী যারা নজরুলের গান ভালভাবে গাইতে সক্ষম তাদের নির্বাচিত করবেন নতুন করে গান রেকর্ড করার জন্য। এখানে কোন স্বজনপ্রীতি বা সিনিয়র কিন্তু যথেষ্ট সক্ষম নন এরকম শিল্পীদের রাখা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, রেকর্ডএ প্রাপ্ত সকল গান ভয়েস ফ্রি করে ন্যাশনাল প্যানেল ভালো করে শুনবে। যে গানগুলোর একাধিক ভার্সন আছে সেগুলোর মধ্যে কোন একটি নির্বাচন করতে হবে যুক্তিসিদ্ধভাবে (যেগুলো আলোচনার বিষয়) অথবা সবগুলো ভার্সনই রাখা হবে।

kazi 1

প্যানেলের সকল শিল্পীকে তাদের গাইবার ক্ষমতা ও ধরণ অনুযায়ী গানগুলো ভাগ করে দেয়া হবে পর্যায়ক্রমে। গানগুলো শিল্পীরা তুলে নেয়ার পর তারা শুধু হারমোনিয়াম এবং তবলায় রেকর্ড করে একটি কপি দেবেন প্যানেলের কাছে। প্যানেল একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় গানগুলো শুনে যেগুলো রেকর্ড করবার যোগ্য বলে রায় দেবেন সেগুলো অত্যন্ত ভালো অ্যাকুইস্টিক এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রানুষঙ্গের সাথে বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজের কাছে আকর্ষণীয় হয় সেরকমভাবে রেকর্ড করা হবে। (নজরুল ইন্সটিটিউট এরকম একটি প্রক্রিয়ার কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করেছিল কিন্ত স্বজন প্রীতি ও অর্থ অপচয় বা প্রকৃত সংস্থান না থাকায় সেটা আশানুরুপ কিছু হয়নি।)

এই গানগুলো হবে মডেল গান। গানগুলো সারাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি গান ইলেকট্রোনিক ডিভাইস (কি বোর্ড) ব্যবহার করে একটি করে নিখুঁত স্টাফ নোটেশনে প্রিন্ট আউট নিতে হবে। একটা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে স্টাফ নোটেশন লেখা ও পড়ার মত একদল বিশেষজ্ঞ তৈরী করতে হবে। সারাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর ট্রেনার এবং আগ্রহী অন্যান্যদের এরকম একটি কার্যক্রমের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে যে শুধু নজরুলের গানের নিখুঁত স্বরলিপি তৈরি হবে তাই নয় আন্তর্জাতিক এই সাংগীতিক ভাষার সাথে এদেশের সংগীত সমাজের পরিচয় ঘটবে যা সংগীত ক্ষেত্রে আমাদের প্রচণ্ডভাবে লাভবান করবে।

গানগুলোতে ইমপ্রোভাইজেশন কেউ যদি করতে চান সেটা মডেল রেকর্ড শুনে একটা পরিমিতির মধ্যে করতে হবে। তবে নতুন শিক্ষার্থীর জন্য মডেল সুরটিই বিবেচ্য হবে। ইমপ্রোভাইজেশন যারা করবেন তাদের আদৌ সেটি করার অধিকার আছে কিনা সেটি বিবেচনায় আনতে হবে এবং সেটি পরিমিতির মধ্যে রাখতে হবে যেন গানের রাগরুপ, কবিতা, ভাব ও রস বিঘ্নিত না হয়।

মডেল গানগুলো মডেল হলেও এগুলো মানগতভাবে যেহেতু উচ্চমার্গের হবে, এগুলোর ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বড় নজরুল সংগঠন ও স্কুলগুলোর সাথে কো-অরডিনেশন করে দেশব্যাপী নিয়মিত গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করে এই সুরগুলো শোনানোর ব্যবস্থার পাশাপাশি টিভি চ্যানেলগুলোতে রুচিশীল মিউজিক ভিডিও প্রচার এবং এফএম চ্যানেলগুলোতে ব্যাপকভাবে গানগুলো প্রচারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্পনসর জোগাড়ের জন্য সবরকম প্রচেষ্টা নিতে হবে। নজরুল সংগঠনগুলোকে প্রকৃত অর্থে সক্রিয় হতে হবে।

Nazrul 1

যে গানগুলোর প্রচলিত জনপ্রিয় সুর আছে সেগুলোর একটি তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলছে সেগুলোর যদি একাধিক ভার্সন থাকে সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যটি নির্বাচন করতে হবে। দ্বিতীয় সুরগুলোর মধ্যে যে সুরগুলো খুব বেশি জনপ্রিয় নয়, অথবা খুব বেশি মানসম্পন্ন নয় সেগুলো তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এই দ্বিতীয় কিন্তু প্রচলিত জনপ্রিয় সুরেরও একটি মডেল পূর্বাক্ত প্রক্রিয়ায় প্রণয়ন করতে হবে বা আগেই গীতগুলো থেকে সবচেয়ে ভালোটি মডেল হিসেবে নির্বাচিত করতে হবে। এই সুরগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণার একটি প্রজেক্ট চালু করতে হবে অর্থাৎ এগুলোর উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। হতে পারে এগুলোর মধ্যে নজরুলের সুর বা তার অনুমোদিত সুরকারদের সুর আছে।

এই ক্ষেত্রে রেকর্ড হতে প্রাপ্ত সুর এবং প্রচলিত সুর শিক্ষার্থী বা শ্রোতাকে যেন জটিলতায় না ফেলে তাদের কাছে তথ্যগুলো পৌঁছাতে হবে। সময় নির্ধারণ করে দেবে কোন সুরটি টিকে থাকবে। যদি একাধিক সুর টিকে থাকে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না কারণ নজরুল মানসের পরিচয়টাই এরকম। এছাড়াও আমরা জানি রবীন্দ্রনাথেরও অনেক গানের সুরান্তর আছে, একই বাণীর গজল ভিন্ন ভিন্ন সুরে বিখ্যাত হয়েছে বিভিন্ন বড় বড় কম্পোজার ও শিল্পীদের কল্যাণে। সংগীত একটি শিল্প, একে সামরিক দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করা যাবে না। আমার জানামতে নজরুলের সাড়ে তিন হাজার গানের মধ্যে মাত্র এক পঞ্চমাংশ বা তার কিছু বেশি গান কবির নিজস্ব সুরের। অতএব প্রচলিত অনধিক ২০০টি গানের যদি দুইটি করে সুর থাকেও তাতে কবির সৃষ্টিকে কোনরকম অমূল্যায়ন করা হয়না বলে আমি মনে করি।

নজরুল সংগীতের নতুন এ্যালবাম যদি কেউ বের করে প্রকাশের আগে মাষ্টার রেকর্ডটি নির্বাচিত প্যানেলের মাধ্যমে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। তাতে যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখা যাবে তা নয়, কারণ ওয়েবসাইট একটি স্বাধীন জগৎ এবং সংগীত পরিবেশনার ক্ষেত্রে কেউ প্রণীত নিয়ম ভাঙ্গলে তার যাবজ্জীবন বা ফাঁসিতো দেয়া যাবেনা। শিল্পীর সবচেয়ে বড় অধিকার তার শিল্পবোধের স্বাধীনতা। সেটাকেএকটা বলয়ের মধ্যে আনতে গেলে কোন কিছু জোর করে না চাপিয়ে বা গালমন্দ না করে মানসিকভাবে সবাইকে প্রস্তুত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সময়টি আসছে আর মাত্র ২০ বছর পর। নজরুল প্রয়াণের পর ৪০ বছর পার হয়েছে, অতএব ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রোপারটি অর্গানাইজেশন প্রণীত কপিরাইট আইন অনুযায়ী নজরুলের গান যে কেউ স্বাধীনভাবে সুর করতে পারবেন আর মাত্র ২০ বছর পর। তখন নজরুল ইন্সটিটিউট, সরকার বা কোন সংগঠনেরই সেই কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার থাকবে না। এখন যদি আমরা একত্রিত হয়ে একটা ফর্মূলা দিতে পারি, সেটা অনুসরণের একটা সংস্কৃতি তৈরি হলে তখন খুব বড় কোন সমস্যা হবে না বলে ধরে নেয়া যায়। যেমনটি এখন কপিরাইট সময় পার করার পর রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে অনেক নীরিক্ষণ শুরু হয়েছে সত্য, কিন্তু মূল ধারার জন্য সেটা কোন হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি।

এরপর আমাদের কাজ হবে পশ্চিমবঙ্গের নজরুল চর্চাকারীদের এই ফরম্যাটের মধ্যে নিয়ে আসা। ভারত একটি ভিন্ন দেশ। সেখানকার নিয়ম কানুনের সঙ্গে আমাদেরগুলো নাও মিলতে পারে, কিন্তু একটা কমন ফোরামের মাধ্যমে এটা করা খুবই সম্ভব। বিশেষ করে কবি পরিবারের উত্তরাধিকারীরা দুই দেশেই অবস্থান করছেন এবং তারা সবাই কবির সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দিতে খুবই আগ্রহী।

আমি মনে করি নজরুল প্রেমিকরা এক ছাদের নিচে বসলে আরো অনেক ইস্যু বেরিয়ে আসবে এবং সেগুলো সৌহার্দপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে ফেলা খুবই সম্ভব। সমস্যা হচ্ছে, যেহেতু আমি সুজিত মোস্তফা একটি ফর্মূলা দিয়ে ফেললাম সেই সংগীত অর্বাচিনরা আবার বলবেন যে উনি কেন সমাধানের সূত্র দেবেন? এই কারণেই আমি অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে প্রায়শই বলি, আমরা মুখে নজরুল বলতে অজ্ঞান অনেকেই, কিন্তু তার বড়ত্ব, মহত্ব, সাহস আসলেই কি আমরা অন্তরে ধারণ করতে পেরেছি?

sujit

লেখক: নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, গবেষক।


সর্বশেষ

আরও খবর

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…

আমি বাংলার, বাংলা আমার, ওতপ্রোত মেশামেশি…


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?

শেখ হাসিনা কতোখানি চ্যালেঞ্জিং এখনো?


প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ

প্রণব মুখোপাধ্যায় : বিশ্ব-রাজনীতির মহাপ্রাণ


দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন

দয়া করে ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্টটি ছিঁড়ে ফেলুন


দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন

দক্ষিণ এশিয়াঃ সীমান্তবিহীন এক অবিভাজিত অচলায়তন


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!

লেটস্ কল অ্যা স্পেড অ্যা স্পেড!


পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ