Friday, October 14th, 2016
নতুন উচ্চতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক
October 14th, 2016 at 10:12 pm
নতুন উচ্চতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক

কূটনৈতিক রিপোর্টার: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাক্ষাত প্রদান, ২৭ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত এবং রাষ্ট্রপতির নৈশভোজে অংশ নেয়ার মধ্যে দিয় সফরের প্রথম দিন পার করলেন চীনের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং।

সফর প্রসঙ্গে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়ই বলেছেন,ঐতিহাসিক এই সফরের মধ্যে দিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌছেছে।

বেলা ১১ টা ৪০ মিনিটে ঢাকা পৌছে বিকাল তিনটায় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে একান্তে বৈট্ক করেন। বৈঠকের পর পরই দু’দেশের কর্মকর্তারা ২৭ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থিত ছিলেন। নিজেদের মধ্যকার বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেছেন এই দুনেতা। চুক্তি স্বাক্ষরের পর গণমাধ্যমে দেয়া যৌথ বিবৃতিতে শেখ হাসিনা ও শি জিনপিং বলেন, ‘স্বাক্ষরিত হওয়া চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় উপনীত হয়েছে’। দুদেশের প্রতিনিধি দলও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। ২৭ চুক্তির মধ্যে ১২টি ঋণ ও বাণিজ্য চুক্তি। বাকি ১৫টি সমঝোতা স্মারক।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই মাত্র আমরা ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে দেখলাম। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, আমরা চীন বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের জায়গা থেকে কৌশলগত সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছি। শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি খুব খুশি ছয় বছর পর (ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ২০১০ সালে শি ঢাকা সফর করেন) বাংলাদেশের মতো একটা সুন্দর দেশ সফর করতে পেরেছি। চীন ও বাংলাদেশ ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং ভালো অংশীদার। আমি মনে করি, এই সফর সামগ্রিকভাবে দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে নানা চুক্তি সই হয়েছে। কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে আরো উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট আগে আমাদের উভয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। আমরা ‘একচীন নীতি’তে আমাদের জোরালো সমর্থন দিয়েছি। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যবসা ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ও কৃষি খাতে একযোগে কাজ করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছি।

তিনি বলেন, আজ আমরা এখানে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাক্ষী হলাম। এই চুক্তিগুলো হয়েছে ব্যবসা, বিনিয়োগ, সমুদ্র অর্থনীতি, বিসিআইএম-ইসি, সড়ক ও সেতু, রেলপথ, পাওয়ার, সমুদ্র, আইসিটি, শিল্প উৎপাদন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতার উন্নয়ন সংক্রান্ত। শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা ছয়টি প্রকল্পও উদ্বোধন করেছি। এই চুক্তি ও প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাবে। আজকে আমরা ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। এই কৌশলগত অংশীদারত্বের অধীনে আমরা দুই দেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে সম্মত হয়েছি। আমাদের এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক মধ্য আয়ের দেশ এবং পর্যায়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উপনীত হওয়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনামুক্ত হবে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব।

‘ওয়ান-বেল্ট, ওয়ান রোড’ নীতি ধরে এগিয়ে যাওয়া চীনের সহযোগিতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে শি জিনপিংয়ের এই ঢাকা সফর। ১৯৮৬ সালে লিশিয়ানইয়ানের পর বাংলাদেশে আসা প্রথম চীনা রাষ্ট্রপ্রধান তিনি। এমন এক সময় তিনি ঢাকায় এলেন, যখন বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের কাতার থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শিল্পায়ন আর বিনিয়োগের জন্য কাজ করছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের এ সফরকে সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা বলছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শি জিনপিংও দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশার কথা বলেছেন। সকালে ঢাকা পৌঁছানোর পর এক বিবৃতিতে শি জিনপিং বলেছেন, তার দেশ বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে মনে করে। বেইজিংয়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে’ যোগ দেয়ার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গাঢ় করেছে ঢাকা, যাকে বাংলাদেশের পূর্বমুখিতাও বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানো চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের দিকে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারতের নজর থাকবে।

শুক্রবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে শি জিনপিং এয়ার চায়নার একটি বিশেষ ফ্লাইটে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ঢাকায় পৌঁছান। তাকে বহনকারী চীনের বিশেষ বিমানটি বাংলাদেশের আকাশসীমায় এসে পৌঁছালে সেটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে বিমানবাহিনীর চারটি জেট বিমান। বিশেষ ফ্লাইট থেকে বিমানবন্দরে নেমে এলে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় একটি শিশু। এরপর চীনা প্রেসিডেন্ট অভিবাদন মঞ্চে গিয়ে গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন এবং গার্ড পরিদর্শন করেন। তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল চীনের প্রেসিডেন্টকে গার্ড অব অনার দেয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিম এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি সরাসরি চলে যান লা মেরিডিয়ান হোটেলে। সেখান থেকে বেলা তিনটায় চীনের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে পৌছান।

জিনপিং ঢাকায় ৭৯ সদস্যের চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর সদস্য ওয়াং হুনিং ও লি ঝানশু, স্টেট কাউন্সিলর ইয়াং জেইচি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের মন্ত্রী সু সাউসি, অর্থমন্ত্রী লাউ জিউই, বাণিজ্যমন্ত্রী গাউ হুচেং, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ঝাউ শিয়াওছুয়েন প্রমুখ।

চীনা প্রেসিডেন্টের আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি দিয়ে সাজানো হয়। বিমানবন্দর ও হোটেল লা মেরিডিয়ানের পথে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ব্যানারে দেখা যায় সম্ভাষণ- ‘স্বাগতম হে মহামান্য অতিথি’।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে জিনপিং হোটেল লা মেরিডিয়ানে যান। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আলাদাভাবে সাক্ষাত করেন। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে বৈঠক করেন শি জিনপিং। পরে সেখানে তার সম্মানে রাষ্ট্রপতির দেয়া নৈশভোজে যোগ দেন তিনি।

শনিবার সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার কথা রয়েছে শি জিনপিংয়ের। এরপর তিনি ভারতের গোয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন।

সম্পাদনা: জাহিদ


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু


শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি


দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির

দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির


ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০

ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০


দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২

দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২


খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী


যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২

করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২


১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি

১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি


২১ দিন পর বৃহস্পতিবার থেকে সড়কে গণপরিবহন

২১ দিন পর বৃহস্পতিবার থেকে সড়কে গণপরিবহন