Friday, July 31st, 2020
নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কে চীন-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক!
July 31st, 2020 at 1:24 am
নতুন ভূ-রাজনৈতিক  বিতর্কে চীন-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক!

শরীফ খিয়াম;

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে ভারতীয় প্রকল্পগুলোর গতি কমে গেছে এবং একই সময়ে দেশটিতে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সরকারের বেশি সহায়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশি পত্রিকা দৈনিক ভোরের কাগজের বরাত দিয়ে গত ২৫ জুলাই এমনটা লিখেছে ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু।

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের লেখা প্রবন্ধের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও সিলেটে বিমানবন্দরের টার্মিনাল তৈরির কাজ একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার অফিসের একটি অংশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছে।

চীনের মিত্র পাকিস্তানের সঙ্গে গত ১০ মাসে সম্পর্কের দ্রুত উন্নয়নের মাধ্যমে বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে আলোচিত লেখাটিতে। ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাস চার মাস চেষ্টা করেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি।

এ নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছে ঠিক তখন (২৮ জুলাই) বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার রীভা রীভা গাঙ্গুলী দাশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরই মধ্যে জনগণ যে যার মতো করে পরিস্থিতিটি বুঝে নিয়েছেন।

এই বোঝাপড়াটা আরেকটু পোক্ত করতে আজ এমন এক ঘটনার কথা শোনাবো, যা সবিস্তারে প্রকাশের সুযোগ হয়নি কখনো। এতে আর কিছু না হোক, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বা বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব এখন কোন মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে তা সহজেই বোধগম্য হবে বলে আশা করছি।

অনেকেই হয়ত জেনে অবাক হবেন, নেপাল, মালয়শিয়া বা ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশেও সুবিশাল ‘ওয়ার্কস্টেশন’ (আস্তানা) বানিয়ে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ (সামাজিক প্রকৌশল) জালিয়াতি ও হ্যাকিংয়ের (অবৈধ অনুপ্রবেশ) মাধ্যমে চীনা নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে।

আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই কাণ্ডে জড়িত ২৮ জনকে ঢাকা থেকে ধরে নিয়ে গেছে চীন। যার মধ্যে ২৬ জন চীনের এবং দুইজন তাইওয়ানের নাগরিক। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে, বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহায়তায় গুলশান এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ এই চক্রটিকে আটক করে চীনা পুলিশ।

দুই দেশই ঘটনাটি গোপন রাখলেও গত বছর এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত হাতে আসে। এর মধ্যে ২৭ ডিসেম্বরের কয়েকটি ছবি ও ভিডিওতে ওই ২৮ জনকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। তাদের সবার মুখ ঢেকে রেখেছিল চীনা পুলিশ। হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল প্লাস্টিকের বন্ধনী দিয়ে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ঢাকার এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “এই প্রথম এভাবে বাংলাদেশ থেকে অপরাধী আটক করে নিয়ে গেছে চীন।”

তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত লি জিমিং-কে পাঠানো ই-বার্তার জবাবে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস জানায়, “এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমরা অবগত নই।” বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকও বলেন, “এমন ঘটনা আমার জানা নেই।”

এ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারি, চীন দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে জালিয়াত চক্রটির অবস্থান নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। পরে এসবির একটি দলকে সাথে নিয়ে সেখানে অভিযান চালায় চীনা পুলিশ। বাংলাদেশে এসে এভাবে কাউকে গ্রেপ্তারের সুযোগ তাদের আছি কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারবো না।”

পরে বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক সময় দুটি দেশ গোয়েন্দা তৎপরতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘ইনফরমাল প্রসেসে’ (অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়) কাজ করে। সারা পৃথিবীতেই এ চর্চা আছে, সব সময়ই ছিল।”

“দুটি দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে সম্পর্ক ভালো থাকলে, এই পদ্ধতিতে অনেক কিছু হয়। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই এই সুবিধা নিয়ে অন্য রাষ্ট্র থেকে অপরাধী ধরে নিয়ে গেছে। যদিও এখানে তেমন কিছু হয়েছে কি-না তা আমি জানি না,” বলেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম বলেন, “চীনা জালিয়াত চক্র ধরা পরেছিল, এটা সঠিক। তবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আমার জানা নেই।”

“সম্ভবত তাদের চীনা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, কারণ সেদেশেই অভিযোগ গঠন ও বিচারের মুখোমুখি করা সহজ হবে,” প্রশ্নের জবাবে যোগ করেছিলেন তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের গণসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানার দাবি ছিল, এক্ষেত্রে বেআইনি কিছু করা হয়নি। “বাংলা‌দে‌শে অবস্থানকারী বি‌দেশী নাগ‌রিকদের অপরাধ তৎপরতা আমরা নজরে রাখি। বি‌ভিন্ন সময়ে তাদের অনেকের সাইবার অপরাধ সনাক্ত ক‌রে তাদের বিরু‌দ্ধে আই‌ন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে,” বলেন তিনি।

ইন্টারপোলে ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, একই ধরণের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ৬৮০ জন এবং ২৪ ডিসেম্বর নেপালের কাঠমাণ্ডুতে ১২২ চীনা নাগরিককে আটক করা হয়েছে।

ফিলিপাইনে ২০১৮ সালে ডিসেম্বর মাসে ৩০০ জন, নভেম্বরে ৩১২ জন, অক্টোবরে মাসেই ৪৪২ জন, সেপ্টেম্বরে ৬০১ জন এবং ২০১৬ সালের নভেম্বরে আরো এক হাজার ৩১৬ জন চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে।

 ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে স্পেন থেকেও দুই শতাধিক চীনাকে আটক করা হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২৪৫ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক এবং কম্বোডিয়া থেকে আরো ১৬৮ জন চীনা গ্রেপ্তার হয়েছে।

যে কারণে এই গোপনীয়তা : বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে উল্লেখিত ঘটনাগুলো প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশে আটক হওয়া সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রকে চীনের হাতে তুলে দেওয়ার খবরটি আসেনি কোথাও। “কারণ ‘ইনফরমাল প্রসেস’ মানেই গোপন,” উল্লেখ করে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ড. দেলোয়ার বলেন, “অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে এই অপরাধীদের নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রলম্বিত হয়।”

‘ওয়ার্কস্টেশন’ তৈরী করতে মাসিক চার লাখ টাকা (চার হাজার ৭৩৯ ইউএসডি) ভাড়া দিয়ে চারতলা একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল চীনা চক্রটি।

গুলাশান-২ এলাকার ৬৮ নম্বর রোডের ১৪/বি নম্বরের ‘রশীদ নিবাস’ নামের ওই বাড়ির মালিক রাজিব হাসান বলেন, “চীনারাই পুরো বিষয়টি গোপনই রাখতে চেয়েছে, যাতে তাদের বদনাম না হয়। সরাসরি চীনা সরকার জড়িত থাকার কারণে এটা জানাজানি হয়নি।”

পররাষ্ট্র বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সরকার প্রধান পর্যায়ের সমঝোতার মাধ্যমে ওই ২৮ জনকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জানিয়ে রাজিব বলেন, “তখন যেমন গোপনীয়তা দেখেছি আর বিষয়টি এত উচ্চ পর্যায়ের ছিল যে এনিয়ে ঘাঁটাতে সাহস হয়নি।”

কোনো দেশ বাংলাদেশ থেকে অপরাধী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে চাইলে কি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়? -এমন প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন সচিব বলেন, “এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।”

“বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলে বিষয়টি খুবই কঠিন,” জানিয়ে ড. দেলোয়ার বলেন, “তারপরও দুই দেশের মধ্যে সেই ধরণের সম্পর্ক থাকলে সরকারি পর্যায়ে সাময়িক কোনো সমঝোতা স্মারক সাক্ষর বা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটা হতে পারে।”

উল্লেখ্য, ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়া আর কারো সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই।

শিকার ছিলেন চীনের ধনীরা : ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ জালিয়াতি বলতে অর্থ-আত্মসাতের উদ্দেশ্যে টেলিফোন, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন গোপনীয় বা ব্যক্তিগত তথ্য আদায়কে বোঝায়। ঢাকায় তৈরী আস্তানায় প্রায় এক বছর নির্বিঘ্নে এই কাজ চালিয়েছে আটক হওয়া জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।

চীনা পুলিশের বরাত গিয়ে বাংলাদেশী গোয়েন্দারা জানান, চক্রটির প্রধান শিকার ছিল চীন, জাপানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়ার দেশগুলোর ধনীরা। তবে চীনের একটি ব্যাংকের গ্রাহকরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

কমপক্ষে এক মিলিয়ন ডলারের মালিক না হলে কাউকে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ জালিয়াতি বা হ্যাকিংয়ের শিকার বানানো হয়না বলে এই চক্রের নথিতে উল্লেখ ছিল। আটক হওয়া ২৮ বছর বয়সী এক চীনা তরুণীকে চক্রটির প্রধান বলেও জানান সেদেশের কর্মকর্তারা।

তাদের ডেরা থেকে চার শতাধিক রাউটার, আড়াই শতাধিক ল্যাপটপ ও কম্পিউটার, সার্ভারসহ নানা সরঞ্জাম পাওয়া যায়, যা জব্দ করে নিয়ে গেছে চীনা পুলিশ।

গোয়েন্দারা জানায়, চক্রটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশী কারো অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রত্যেকের ভিসাও নবায়িত ছিল। যে কারণে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি বাংলাদেশ। চীনের অনুরোধেই তাদের প্রত্যর্পণ করা হয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসার অপব্যবহার করে বাংলাদেশের মাটিতে বসে অপরাধমূলক কাজ করার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল।

২০১৮ সালের প্রথম দিকেই বাংলাদেশে আসে ওই চক্রের সদস্যরা। তাদের সবাই পর্যটক হিসেবে ‘অন এ্যারাইভাল’ ভিসা নিয়েছিলেন। প্রথমে বিচ্ছিন্নভাবে থাকলেও আটক হওয়ার সাত মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়ে একসাথে থাকা শুরু করে।

যদি ভবন মালিকের দাবি, চীন দূতাবাসের ‘লোকজন’ ছিল তাঁর মূল ভাড়াটিয়া। যাদের কোনো অপরাধ ছিল না। তাদের সব কাগজপত্র তিনি গুলশান থানায় জমা দিয়েছিলেন। তারা ভবনটি ছেড়ে যাওয়ার আগে কিছু বহিরাগত এসে আশ্রয় নিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল।

অভিযান পরবর্তী সাতদিন তাঁর বাড়িটিই ‘সাবজেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কতটা ঝূঁকিতে বাংলাদেশ?: বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মনে উঁকি দেয় উপ-শিরোনামের প্রশ্নটি। এ নিয়ে আলাপে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)প্রধান কর্মকর্তা আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, “যেসব বিদেশী স্থানীয় ব্যাকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করেন, তাদের লেনদেন নজরদারি করার সুযোগ আমাদের আছে।”

“এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সামগ্রিক লেনদেনের গতিবিধি নজরে রাখে,” জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাবেক ডেপুটি গভর্নর বলেন, “আর্থিক খাতের ‘সাইবার ক্রাইম’ বা ‘ডিজিটাল’ জালিয়াতি প্রতিরোধের সক্ষমতাও তাদের রয়েছে।”

পুলিশের এডিসি নাজমুল বলেন, “বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশীরা অনলাইন আর্থিক জালিয়াতির করলে তা ধরা পরে যাবে। এমনকী দেশের বাইরে বসেও যদি কেউ আমাদের স্বার্থবিরোধী কিছু করে, সেটাও এখান থেকে চিহ্নিত করা সম্ভব।”

এআইজি রানাও দাবি করেন, “সাইবার অপরাধ মনিটরিংয়ে আমাদের সক্ষমতা ক্রমশই বৃ‌দ্ধি পা‌চ্ছে।”

২০১৮ সালের ১ জুন ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পরে দুই বিদেশী। পরে আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং পালিয়ে যায় তিনজন। ইউক্রেনের নাগরিক হলেও তারা উত্তর কোরিয় হ্যাকার গ্রুপ হিডেন কোবরার হয়ে কাজ করতে এসেছিল বলে জানায় পুলিশ।

এর আগে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে  থাকা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার (৮০৮ কোটি টাকা) ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় পাচারের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে ‘হ্যাকিংয়ের’ মাধ্যমে চুরির ঘটনা এদেশে আলোচনায় আসে।

ধান ভানতে শিবের গীত: ধান ভানার সময় শিবের গীত গাওয়া নিঃসন্দেহে অদরকারী। তবুও কখনো কখনো তা কাউকে না কাউকে গাইতে হয়। এই যেমন কী নিয়ে লিখতে শুরু করে, কিসের গল্প শোনাচ্ছি। বছর দুয়েক আগেই বিশ্লেষকদের মুখে শুনেছিলাম, বাংলাদেশে চীন-ভারত প্রতিযোগীতার প্রভাব ক্রমাগত বাড়বে।

“তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশের সঙ্কট চীন বা ভারতকে খুব বেশী উদ্বিগ্ন করে না,” বলছিলেন বাংলাদেশী উন্নয়ন গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক নয়, বরং কৌশলগত কারণে চীনের চেয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশ অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আবার এই কারণে মিয়ানমারকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করে চীন।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, “চীন-ভারত এই অঞ্চলে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে নিজেদের প্রভাব চূড়ান্ত করতে তৎপর। তার প্রভাব সরাসরি আমাদের (বাংলাদেশ) রাজনীতিতে, পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও পড়েছে।” তাঁর দাবি, মূলত বাংলাদেশ একটা বড় বাজার। যে কারণে চীন-ভারতের মতো দেশে এখানে প্রভাব রাখতে চায়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বাড়তি সুবিধা পেতেই তারা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়।

অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ বলেছিলেন, “বাংলাদেশে চীনের রাজনৈতিক ‘এজেন্ডা’ তূলনামূলকভাবে কম। তারা অর্থনৈতিক প্রভাবটাকে-ই বড় করে দেখে। যদিও সব অর্থনৈতিক তৎপরতার সাথেই রাজনীতি থাকে।”

বাংলাদেশে আলোচ্য দুই দেশেরই প্রভাব অনেক বেশী, আর তাদের মধ্যে প্রতিযোগীতাও তীব্র, উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ প্রতিযোগীতার একটা সহজ ক্ষেত্র। যেহেতু দুর্নীত বা ‘পলিটিক্যাল ব্ল্যাকমেইলিং’ এর মাধ্যমে এখানে প্রভাব বিস্তার করা অন্য যে কোনো দেশের তূলণামূলক ভাবে সহজ, সেহেতু এখানে তাদের ‘এ্যাম্বিসন’-ও অনেক বেশী।”

তবে চীন-ভারতের প্রতিযোগীতাকে বাংলাদেশের জন্য ‘মঙ্গলকর’ আখ্যা দিয়ে অর্থনীতিবিদ এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছিলেন, “এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা নয়। বরং কিছুটা ইতিবাচক প্রভাবই পড়বে।”

বৈশ্বিক বা আঞ্চলিকভাবে ভারত ও চীনের মধ্যে রাইভালিটি যাই থাক, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই উল্লেখ করে মির্জা আজিজুল বলেন, “প্রভাবশালী ওই দুই দেশেরই আমাদের এখানে বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। আমরাও তাদের বিশাল মার্কেটে এক্সপোর্ট বাড়াতে পারি।”

“দুই পক্ষের সাথেই একটা ‘ব্যালেন্সড’, ‘মিচুয়ালি বেনেফিসিয়ারি’  সম্পর্ক রাখা উচিত। কারণ চীন বিনিয়োগ বাড়ালে ভারতও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী হবে,”যোগ করেন তিনি। বিগত সাত অর্থবছরের হিসাবে দেখা গেছে বাংলাদেশে বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাবেও ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে চীন।

তবে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির  সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদের মতে, যেসব খাতে মুনাফা বেশী এবং বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা কম, সেসব খাতেই চীন-ভারতের আগ্রহ বেশী।

রাজনীতিতে এগিয়ে কে?: বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে ভারতচীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে বলে মনে করেন আফসান চৌধুরী। “বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রধানরা নির্বাচনের আগে চীনে নয় ভারতে যায়,” বলেন তিনি। তার ধারণা, বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। যে কারণে চীন ও ভারত পরস্পরের আগ্রাসনের বাঁধা হচ্ছে না।

তবে আলতাফ পারভেজ মনে করেন, চীন আসলে দুটো (বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক) ক্ষেত্রেই আগ্রহী। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসরে তারা ভারতের চেয়ে পিছিয়ে। “বাংলাদেশে সবাই দেখছে কীভাবে অপর একটি দেশ সরাসরি তাদের রাজনীতি প্রভাবিত করছে। বর্তমান বিশ্বে ছোট দেশগুলোর ক্ষেত্রে এরকম হবেই,” যোগ করেন তিনি।

আনু মুহাম্মদ বলেন,  “ভারত মনে করে চীনের আধিপাত্য বাড়লে এ অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আধিপাত্য দুর্বল হয়ে পড়বে।”

বিশ্লেষকদের দাবি, যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল, যে কারণে অর্থনীতিতে তাদের প্রতিযোগীতার প্রভাব থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে “এসব প্রতিদ্বন্দ্বিতা সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ভালো নয়,” বলেন আলতাফ।

“নিজেদের পায়ের ওপর না দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর থেকে চীন-ভারতের প্রভাব এড়ানো সম্ভব নয়,” জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, “এক্ষেত্রে বাংলাদেশেন মূল সমস্যা জাতীয় স্বার্থ সবার উর্ধ্বে রাখা পরিকল্পনার ঘাটতি।” আলতাফ পারভেজও মনে করেন, চীন-ভারতের কাছ থেকে ফায়দা নিতে পারছে না বাংলাদেশ।

শরীফ খিয়াম

সর্বশেষ

আরও খবর

চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ  উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে

চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!

লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!


তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?

তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?


সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী

সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা


বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, কথা বলছে ইতিহাস!

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, কথা বলছে ইতিহাস!