Saturday, September 24th, 2016
নরেন্দ্র – নওয়াজ রাজনৈতিক জমজ ভাই
September 24th, 2016 at 1:18 pm
নরেন্দ্র – নওয়াজ রাজনৈতিক জমজ ভাই

মাসকাওয়াথ আহসান: নরেন্দ্র ও নওয়াজ রাজনৈতিক জমজ ভাই। তাদের দুজনের মাঝে সম্পর্ক গভীর এবং অটুট। এই দু’জনের গত কয়েক বছরের গতিবিধি লক্ষ্য করলে দেখা যায়; উভয়ে উভয়ের ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে একে-অপরকে যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছেন। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য জমজ ভাইয়ের মতোই। ক্ষমতায় আসার জন্য দুজনেই ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করেছেন একই আঙ্গিকে। নওয়াজের নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় ছিলো জামায়াতের পাকিস্তান শাখা। নরেন্দ্রর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছে জামায়াতের ভারত শাখা।

 দুজনেই প্রধানমন্ত্রী হবার পর যেখানেই তাদের দেখা হয়েছে; একান্তে বসে এমনভাবে শলা পরামর্শ করেছেন; এরকম অন্তরঙ্গ দৃশ্য ইতিহাসে বিরল। এমনো সময় গেছে; যখন প্রায় প্রতিদিনই তাদের টেলিফোনে কথা হয়েছে। এখন হয়তো ভাইবারে হয়। তাই মিডিয়াতে আসেনা। একবার তো নরেন্দ্র তার জমজ ভাইকে দেখতে এতো ব্যাকুল হয়ে পড়েন যে হঠাৎ বিমান ঘুরিয়ে লাহোরে নেমে পড়েন। এসব খুব বেশীদিন আগের কথা নয়।

ভালই যাচ্ছিলো দুই ভাইয়ের সুখের সংসার। কিন্তু প্রশ্রয় পেয়ে জামাতের সশস্ত্র উইংগুলো এতো বেশী বাড়াবাড়ি শুরু করলো যে পাকিস্তানে নওয়াজের জনসমর্থন তলানিতে গিয়েই ঠেকলো। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানে সেনাবাহিনী ছাড়া পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আর কোন বিকল্প ছিলো না। কারণ নওয়াজ ‘ভালো তালিবান-মন্দ তালিবান’ এরকম নানান কথার ছলে জামাতের মন রক্ষা করে চলছিলেন। পরিবর্তে নওয়াজের পাঞ্জাব প্রদেশ ছাড়া পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলোতে নিয়মিত সন্ত্রাসী বোমা হামলায় মানুষ মারা যেতে থাকে। ভারত থেকে নরেন্দ্র নওয়াজের পক্ষে কেঁদে কেঁদে নওয়াজের কাঁদতে না পারার ঘাটতি পূরণ করে দিতেন তখন। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনসমর্থনের চাপে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইটি জোরদার করলে; নওয়াজ পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারান। এরপর পানামা লিক্সে নওয়াজ’র দুর্নীতির স্বরুপ উন্মোচিত হলে তিনি হয়ে পড়েন নিত্য কৌতুকের বিষয়।

অন্যদিকে নরেন্দ্রর ক্যাডার বজরংওয়ালারা হিন্দুত্ববাদী কট্টরতার বাড়াবাড়ি শুরু করলে, ভারতের সচেতন নাগরিক সমাজ প্রতিবাদী হয়। আড়াইশোর মত রাষ্ট্রীয় পদক ফিরিয়ে দেন নাগরিক সমাজের নিরাপোষ আলোর মানুষেরা। ওদিকে আম আদমী নামের নতুন দলটি এক-অর্থে রাজধানী নতুন দিল্লী জয় করে নেন বিধান সভা নির্বাচনে। এইভাবে নানা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির জনপ্রিয়তা ধ্বসের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর নাগরিক সমাজ কাশ্মীরে মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে এতো সোচ্চার হন যে নিজ ঘরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন নরেন্দ্র। বিজেপির জোয়াল কাঁধে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে জেতা যাবে না এরকম এক ছবি তার সামনে প্রতিদিনই স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। নওয়াজও নিয়মিত ফোন করে নিজের দুঃখের কথা বলতে থাকেন। তাদের দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের একটা পথ তো খুঁজে বের করতে হবে।

narendra-nawaz-2

নরেন্দ্র অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-কে পাঠিয়ে দিলেন ইসলামাবাদে। নওয়াজের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসারও প্রস্তুত ছিলেন। সেই যে ৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় মুসলমান আর শিখেরা যেমন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো; তেমনি করে দুজন কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কট্টর বিজেপি শিখ ও কট্টর মুসলীম লীগ মুসলমান সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে একটি তিক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন। অথচ ঐ বৈঠকটি ছিলো দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ আঞ্চলিক প্রচেষ্টা তৈরীর অঙ্গীকার নিয়ে।

ইসলামাবাদের ঐ বৈঠকে ভারতীয় ও পাকিস্তানী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আক্রমণাত্মক ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ স্বাভাবিক ছিলো না; টিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ হচ্ছে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করার যাত্রাপালা।

এর পরপরই বেলুচিস্তানে আইনজীবীদের ওপরে বোমা হামলা হয়। বেলুচিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী দাবী করেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি। আর সাম্প্রতিক ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সেনা ছাউনিতে বোমা হামলার পর ভারতের পক্ষ থেকে দাবী করা হয় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা এ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি কেউ। একটি অনুমানভিত্তিক দোষারোপের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধের আয়োজন খুব বেশী বাস্তবসম্মত মনে হয় না।

এর আগে নিজের কাশ্মীর কেলেংকারী ঢাকতে নরেন্দ্র বেলুচিস্তানের মানবাধিকার নিয়ে উতলা হন। নিজের সকল কেলেংকারী ঢাকতে বেলুচিস্তানের মানবাধিকার নিয়ে কখনোই মাথা না ঘামানো নওয়াজ এখন কাশ্মীরের মানবাধিকারের জন্য খুবই উতলা। রাজনৈতিক জমজ ভাতৃদ্বয়ের এই উতলা হবার অর্কেস্ট্রাটি একে-অপরের সঙ্গে বসে কাটাকুটি খেলার ছলনা। কারণ তারা জানেন সমাজের অধিকাংশ মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে আদিম পর্যায়ে রয়ে গেছে। ঘৃণা আর বিভাজনই যাদের জীবনের বিনোদন উপাদান; তাদের জন্য যুদ্ধের দামামা রীতিমত তাদের ভেতরে কাবাডি-কুস্তি-বলি খেলা দেখার শিহরণ নিয়ে আসে।

যুদ্ধের বাজারে উগ্র জাতীয়তাবাদ বিকোয় যত্রতত্র। ফলে নরেন্দ্র-নওয়াজের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া ভারতীয় ও পাকিস্তানী মব আবার আস্থা ফিরে পায় তাদের হিন্দুত্ববাদী ও মুসলমানিত্ববাদী দুই যুদ্ধের নায়কের ওপর। এখন ভাইবারে যখন দুই ভাইয়ের কথা হয়; তখন তাদের চিত্ত প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। ক’টা দিন যুদ্ধের ঢ্যাডরা পিটিয়ে জনসমর্থন গুছিয়ে নিয়ে তারপর আবার না হয় সুযোগ বুঝে দুই ভাই একে-অপরকে জনসমক্ষে জড়িয়ে ধরে কাঁদাকাঁটি করা যাবে।

দক্ষিণ এশীয় কাইজ্জা সমাজের এই হাসি-এই কান্না, এই কোন্দল-এই জড়িয়ে ধরার এইসব দিনরাত্রির প্রতিনিধিত্বশীল নরেন্দ্র ও নওয়াজ। এই রাজনৈতিক জমজ ভাই ভারতীয় উপমহাদেশের ভিলেজ পলিটিক্সের যাত্রাপালার দুই সফল নায়ক নিঃসন্দেহে।

MASKAWATH

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও ব্লগার


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার


অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর

অবশেষে গ্রেফতার হলো এসআই আকবর