Tuesday, August 9th, 2016
নাগাসাকি হামলা: ইতিহাসের কালো অধ্যায়
August 9th, 2016 at 5:07 pm
নাগাসাকি হামলা: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

শাকিরা তাসনিম ইরা, ঢাকা: ৯ আগস্ট, ১৯৪৫। স্থানীয় সময় রাত ৩ টা ৪৭ মিনিট।জাপানের নাগাসাকি শহরের ঘুমন্ত মানুষের ওপর হয় পৃথিবীর জঘন্যতম বোমা হামলা। ‘ফ্যাটম্যান’ নামক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে জাপানের নাগাসাকি অঞ্চল চোখের পলকে পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। মানব বিধ্বংসী মরণাস্ত্রের আঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হয় সভ্যতার পাদপীঠ জাপান।

‘লিটল বয়’ এর মত ‘ফ্যাটম্যান’ বোমাটিকে কোন বাণিজ্যিক এলাকায় বিস্ফোরিত না করে একটি উপত্যকায় বিস্ফোরিত করা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সমানই ছিল। তবে নাগাসাকিতে হামলা করা হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল না। হামলা চালানোর সময় মূল লক্ষ্যবস্তু কোকুরা শহর ছিল মেঘে ঢাকা। তাই বিকল্প হিসেবে হামলা করা হয় নাগাসাকিতে।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে যুক্ত্রাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার মাধ্যমে। হিটলার পারমাণবিক বোমা তৈরী করছেন এমন খবরের ভিত্তিতে ১৯৩৯ সালের ২ আগস্ট কয়েকজন পদার্থ বিজ্ঞানী মিলে আইনস্টাইনকে দিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেলেটের কাছে একটি চিঠি পাঠান আণবিক হামলার ব্যাপারে সতর্ক করতে এবং পারমাণবিক বোমা তৈরীর উদ্যেগ নিতে। যদিও এই বোমা মানুষের উপর ফেলা হবে এমনটা তিনি কখনো ভাবেননি। পরবরতীতে এই চিঠির জন্যে সারাজীবন অনুতাপ করে গেছেন আইনস্টাইন।

হিটলারকে উচিত জবাব দেয়ার জন্যেই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পারমাণবিক বোমা তৈরীর নির্দেশ দেন। শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মরণাস্ত্র তৈরীর কাজ। কিন্তু ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে জার্মানি আত্মসমর্পণ করলে বিজ্ঞানীদের কর্মোদ্যমে ভাটা পরে। অনেকেই প্রজেক্ট বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়ে প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখেন।তবে চিঠি রুজভেল্টের হাতে পৌঁছানোর মাত্র দু তিন ঘণ্টা আগেই মারা যান তিনি। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বিজ্ঞানীদের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ  দেন। ১৯৪৫ সালের ১২ জুলাই সফল ভাবে সম্পন্ন হয় পারমাণবিক বোমা তৈরীর কাজ।

Nagasaki

হিরোশিমা নাগাসাকি হামলার সত্তর দশক পরে এসেও কেউ ভুলতে পারেনি সেই বীভৎস স্মৃতি। সেদিনের হামলার এক প্রত্যক্ষ্যদর্শী জানান, ‘প্রথমে মনে হলো আকাশ থেকে যেন একটা কালো প্যারাসুট নেমে আসছে। পরমুহূর্তেই আকাশ যেন জ্বলে উঠল। আলোর সেই ঝিলিক যে কি রকম তা বলার সাধ্য কারো নেই। সেই সঙ্গে প্রচন্ড শব্দ। বিস্ফোরণের পরমুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলো শত শত ভবন ও হাজার হাজার মানুষ। সেই সঙ্গে আশপাশের জিনিস-পত্র এদিক-ওদিক পড়ে জমা হ’তে থাকল। চারিদিকে আলো ও অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। হামাগুড়ি দিয়ে বের হ’তে হ’ল। বাতাসে উৎকট গন্ধ। মানুষের মুখের চামড়া যেন ঝুলে পড়েছে। কনু্ই থেকে আঙ্গুল অবধি হাতের চামড়া ঝুলে পড়েছে। কাতরাতে কাতরাতে ঝর্ণা ও নদীর দিকে ছুটে চলছে অসংখ্য মানুষ। সারা দেহে অসহ্য যন্ত্রণা। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। নদীর তীরের কাছে একজন নারী আকাশের দিকে মুখ করে পড়ে আছে। বুকদু’টা তার উপড়ানো, সেখান থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। ঘণ্টা দুয়েক পর আকাশ একটু ফিকে হয়ে গেল। ঝলসে যাওয়া হাত দু’টি থেকেও হলুদ কষ পড়ছে। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা কাতরাচ্ছে আর চিৎকার দিয়ে কাঁদছে, মাগো! মাগো! বলে। ভয়ংকরভাবে পুড়ে গেছে তারা। সারা শরীরে রক্ত গড়াচ্ছে। একে একে দেহগুলো নিথর হয়ে যাচ্ছে।’

অষ্ট্রেলিয়ার সাংবাদিক উইলফ্রেড গ্রাহাম বুর্চেট ঘটনার চার সপ্তাহ পর হিরোশিমায় পৌঁছে পত্রিকার জন্য একটি নিউজ তৈরী করেন। তিনি লিখেছেন, ‘ত্রিশতম দিনে হিরোশিমা থেকে যারা পালাতে পেরেছিলেন তারা মরতে শুরু করেছেন। চিকিৎসকরা কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছেন। বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়ার ভয়ে মুখোশ পরে আছেন সকলেই’। তিনি আরো লিখেছেন, ‘হিরোশিমাকে বোমার বিধ্বস্ত শহর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, দৈত্যাকৃতির একটি রোলার যেন শহরটিকে পিষে দিয়ে গেছে’। বোমায় অক্ষত থাকা মানুষগুলো দিন কয়েকপর অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে ও হাসপাতালে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা তাদের শরীরে ভিটামিন-এ ইনজেকশন দেয়। দেখা যায় যে, ইনজেকশনের জায়গায় গোশত পচতে শুরু করেছে। এমন মানুষদের একজনও বাঁচেনি। ৫ সেপ্টেম্বর বুর্চেটের ডেসপ্যাচটি (নিউজ) ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় ছাপা হয়। দুর্ভাগ্য হলো, সাহসী সাংবাদিক নিজেই তেজস্ক্রিয়ার বিকিরণে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৩ সালে ক্যান্সারে মারা যান। সে বছরই তার লেখা ‘শ্যাডো অফ হিরোশিমা’ বইটি প্রকাশিত হয়।

Nagasaki Survive

নাগাসাকি হামলার মাত্র দুদিন আগেই রাজধানী টোকিও থেকে মাত্র ৫০০ মাইল দূরে হিরোশিমা শহরে আঘাত হানে পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, অনুমান করা হয় এই পারমাণবিক বোমা হামালায় তাৎক্ষণিক ভাবে হিরোশিমায় প্রায় ১৪০,০০০ এবং নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যায়।এবং পরবর্তীতে বোমার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ২১৪,০০০ জাপানী অধিবাসী।

তবে জাপানের আসাহি শিমবুন এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়া সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ এবং নাগাসাকিতে ১৩৫,০০০। জাপানের অধিবাসীরা এই তেজস্ক্রিয়তার মাশুল এখনো দিয়ে যাচ্ছেন।এখনো দেখা যায় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে পঙ্গুত্ব, বিকলাঙ্গতাসহ নানা প্রকার রোগব্যাধী। হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক হামলা দেখে আঁতকে উঠেছিল বিশ্ববাসী। কিন্তু অনুশোচনার চিহ্ন দেখা যায় নি সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি দুইশহরেই এই দুইদিনকে স্মরন করে শহরের মানুষেরা উপসনালয় হাজির হয়। ফুল দিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে নানা উপায়ে নিহতদের স্মরন করে স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে শ্রদ্ধা জানায়। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি পঙ্গুত্ব বরনকারীদের প্রতি জানানো হয় সমবেদনা। সারা বিশ্ববাসীও এই দিনকে স্মরন করে বিভিন্ন ভাবে।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসটিই/টিএস


সর্বশেষ

আরও খবর

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ  ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা

করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড জরমিানা


ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা

মুজিববর্র্ষে লন্ডনে জয় বাংলা ব্যান্ডের রঙ্গিন ভালবাসা


অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা

অস্ট্রিয়ায় চালু হলো করোনাভাইরাস ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা


কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!

কটন টপ ট্যামারিন, খোঁজা বানর!


প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা

প্রকৃতির স্থিতি আর আমাদের অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী ভাবনা


রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি

রানীর ভাষণ: খুঁটিনাটি


মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর

মুজিব বর্ষঃ স্মৃতিচারন করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দুই সহচর


মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন

মুজিব বর্ষঃ আওরঙ্গজেব’র বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন