Monday, May 11th, 2020
নারীর শত রূপে পুনরুজ্জীবন
May 11th, 2020 at 1:54 pm
নারীর শত রূপে পুনরুজ্জীবন

নাভিদ সালেহ;

তিনি যে রূপের আধার; বাহ্যিক আর অন্তর্গত রূপের। কখনও চিত্তহারী সৌন্দর্য্যে মাতাল করেন বিশ্বকে, কখনও বা সমবেদী হয়ে পাশে দাঁড়ান নিরাবলম্বনের, আর কখনও বীর যোদ্ধা-রূপে শামিল হন রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্রে। তিনি যে দৃষ্টিহরা, মনোহরা রমণী। তিনি যে নারী। তাঁর অসংখ্য রূপের শাখা-নদী গুলো যখন এক হয়ে যায় গর্বিত এক স্রোতস্বীনিতে, তিনি রূপ নেন জননীর। আজ বিশ্ব মা দিবসে, মহিয়সী নারীকূলকে তাই প্রণাম। এ নিবন্ধটি নারীর ইতিহাসগত ক্ষমতায়ন এবং তাঁকে ক্ষমতাশূন্য করে দেবার চক্রাকার উপাখ্যানটি তুলে ধরছে।

মানবজন্মের সূত্র খুঁজতে গেলে, নিদেনপক্ষে আধেক ভার তাঁকে দিতেই হবে। প্রাক-ইতিহাসের নারী, ছিলেন অমূল্য। সন্তান প্রতিপালনের একনিষ্ঠতা থেকে খাবারের যোগান, কোথায় ছিল না তাঁর আধিপত্য। তিনি একাধারে ছিলেন গোত্রের ধারক আবার ভবিষ্যতের কারিগর। ১২,০০০ বছর আগে, যখন যাযাবর জীবন থেকে গৃহস্থালির দিকে মন দেয় মানুষ, নারীর ভূমিকা বদলে যেতে ধরে। পরিবারের কেন্দ্র থেকে ক্রমশঃ বিচ্যুত করা হয় তাঁকে। শারীরিক বলের প্রভাব খাটিয়ে নারীকে বেঁধে ফেলা হয় গৃহকার্যে। তাঁর অবদানের বিন্দুমাত্র ঘাটতি না ঘটলেও কুশলী নরকুল তাঁকে অকিঞ্চিৎকর করে তোলে। সামাজিক বিচারে তিনি কেবল জননী কিংবা সম্ভোগ-সঞ্চারিণী হয়ে দাঁড়ান। খ্রিষ্টপূর্ব সতের শতকে হাম্মুরাবির নীতিমালায় (যাকে প্রথম লিখিত আইনী দলিল বলে ধরা হয়), নারীর ক্ষমতাশূন্য হবার নজির স্পষ্ট।

ক্ষমতার বিস্তারকে সরলরৈখিক সমীকরণে ফেলাটা দুষ্কর। ইতিহাসের পরিক্রমায় নারীর সংগঠন-নৈপুণ্য আর কুশলী ধীশক্তির ব্যবহার আবারও আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। ঘরের বাইরে তাঁর প্রয়োজন বাড়ে।তাঁর রাশ হেঁশেলের উনুন থেকে পৌঁছে যায় যুদ্ধশিবিরে। রণকৌশলে দক্ষ নারী বিজয় এনে ডায়েট থাকেন সংখ্যাতীত সমরে; যেমনটি ঘটেছিল খ্রিষ্টপূর্ব সতেরো শতকে মিশরের রানী আহোটেপ-এর সময়ে কিংবা খ্রিষ্টপূর্ব তেরো শতকের নারী-ট্রোজান-যোদ্ধাদের নিযুক্তিতে। কেবল রণকৌশলই নয়, সম্মুখ সমরের নেতৃত্বে ছিলেন মহিয়সী নারী। মহান আলেক্সান্ডারকে পর্যন্ত বিপর্যস্ত করেছিলেন নুবিয়ার (আজকের উত্তর সুদান) রানী, ক্যান্ডিস অব মিরও, খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতকে। তাঁর রণকৌশলের সামনে অপ্রস্তুত হয়ে নুবিয়াকে পাশ কাটাতে বাধ্য হন আলেক্সান্ডার।

কেবল গৃহকার্য আর যুদ্ধে সহাবস্থান কেন, ইতিহাসের তিন মহান সন্তের পেছনে নারীর অবদান অনস্বীকাৰ্য—তাঁরা হলেন গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিষ্ট, এবং মুহাম্মাদ । খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শতকের কথা। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম, পিতা শুদ্ধধন আর স্ত্রী যশোধারার সাথে ঘোড়ার রথে প্রজা দর্শনে বেরিয়েছেন। পথপাশে এক মৃতপ্রায় দুস্থ প্রজাকে দেখতে পান যশোধরা। রথ থামিয়ে, সিদ্ধার্থকে নিয়ে তিনি ছুটে যান সেই প্রজার কাছে। সুশ্রুষা করবার চেষ্টা করেন। সিদ্ধার্থ বোধি লাভের পর তাঁর ভক্তদের কাছে বারবার এই ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন। যশোধরাই বুদ্ধকে মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

যীশুর জীবনেও ম্যারী ম্যাগডালেনের অবদান অনস্বীকার্য। ম্যাগডালেন ছিলেন যীশুর ঘনিষ্টতম সহচরী এবং প্রথম দিককারভক্ত। যীশুর খ্রিষ্টধর্ম প্রচারকালীন জীবনে তাঁর লক্ষণীয় ভূমিকা ছিল। একথা মানতে হবে যে বাইবেলে ম্যাগডালেনকে কুলটা হিসেবেই উপস্হাপন করা হয়েছে। এটি হয়তো নারীর ক্ষমতাহরণের আরেকটি ঐতিহাসিক নজির। এবার আসছি মুহাম্মাদ -এঁর কথায়। তাঁর জীবনে একাধিক নারীর বিশিষ্ট প্রভাব ছিল। নবুয়্যত প্রাপ্তির পূর্বে মুহাম্মদ যে মানসিক যন্ত্রনা দিয়ে সময় জ্ঞাপন করেছেন, তাতে তাঁর একান্ত সঙ্গী ছিলেন বিবি খাদিজা । মুহাম্মদ নিজস্ব আর্থিক স্বাচ্ছন্দের সাথে আপামর মানুষের অর্থকষ্টের যে বৈষম্য, তাতে ভীষণ পীড়া অনুভব করতেন। এ মানসিক পীড়ন থেকে মুক্তি তিনি পেয়েছিলেন হেরা গুহায় নবুয়্যত প্রাপ্তির মাঝ দিয়ে। তবে তার আগ পর্যন্ত, বিবি খাদিজা  তাঁর পাশে ছায়াসঙ্গীর মত অবলম্বন হয়ে ছিলেন।

একই সাথে ইতিহাসের অসংখ্য নারী দুস্থের সেবা করেছেন, যুদ্ধে গেছেন, জননী হয়েছেন। হু মুলানের বীরত্ব গাঁথা, কিংবা ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈয়ের আত্মত্যাগ, নাড়া দিয়েছে এ বিশ্বের মানচিত্রকে। স্মরণীয় আর বিশ্ববরেণ্য হয়েছেন ওয়ারশ’র তরুণী বিজ্ঞান-ছাত্রী স্ক্লোদোওস্কা ওরফে ম্যাডাম কুরি, যিনি পরবর্তীতে দু’বার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তবে নারীকে হেঁশেলের দিকে ঠেলে দেয়ার প্রচেষ্টা আবার মাথাচাড়া দিতে থাকে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ জেঁকে বসে। সমাজ ক্রমশঃ তাঁকে কোনঠাসা করে। আজও, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও, কর্মক্ষেত্রে অসমতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। মি টু আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এ যুদ্ধেও পিছিয়ে নেই তাঁরা।

আজকের মা দিবসে তাই আমরা আশাবাদী। আজও অ্যান ফ্রাঙ্করা ডায়েরি লেখেন। আজও পুনর্জীবিত ট্রয়ের হেলেনের মোহপাশে আবিষ্ট হবার বাসনা ফুরোয়নি অনেকের। আজকের ফ্লোরেন্সে নাইটিঙ্গল, আকর্ণবিস্তৃত হাসিতে জনসেবা করে চলেন। জোয়ান অব আর্ক আজও বীরত্বগাঁথায় লংকাস্টরিয়ান পর্যায়ের ফরাসিদের মতো বিমোহিত করেন বিশ্ববাসীকে। যতবার শ্বাসরুদ্ধ হবে তাঁর, ততবার তিনি ফিরবেন একজন বিজ্ঞানী, লেখিকা, দুঃসাহসী বীর, আত্মত্যাগী পরিষেবিকা হিসেবে; একজন জননী হয়ে।

নাভিদ সালেহ, সহযোগী অধ্যাপক
সিভিল, আর্কিটেকচারাল, এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এট অস্টিন


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর

করোনায় মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো কবরস্থানে দাফন করা যাবে: স্বাস্থ্য অধিদফতর


সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের

সচেতন না হলে সরকার আবারও কঠোর হবে: কাদের


বর্ণবাদ নিপাত যাক

বর্ণবাদ নিপাত যাক


পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা

পুরোনো চেহারায় ফিরছে ঢাকা


দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী

দিল্লির সীমান্ত সাত দিনের জন্য বন্ধ: নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী


এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%

এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮২.৮৭%


এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী

এই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না: শিক্ষামন্ত্রী


এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!

এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!


বাস ভাড়া ৮০% বাড়ানোর সুপারিশ বিআরটিএ’র

বাস ভাড়া ৮০% বাড়ানোর সুপারিশ বিআরটিএ’র


ট্রেনের ভাড়া বাড়বে না, টিকিট অনলাইনে: রেলমন্ত্রী

ট্রেনের ভাড়া বাড়বে না, টিকিট অনলাইনে: রেলমন্ত্রী