Wednesday, August 17th, 2016
নিঃসঙ্গ দালানচড়ুয়া
August 17th, 2016 at 5:07 pm
নিঃসঙ্গ দালানচড়ুয়া

মিম আরাফাত মানব:

শামসুর রাহমানের স্মরণে লেখা, ভাবছেন ঠেসে দেয়া থাকবে তার কবিতা, দুই চার লাইন অন্তর অন্তর? নাহ্‌, আমি বরং ভেবেছি এই যাত্রায় তাকে নিয়ে একটা গোটা লেখা লিখে ফেলবো, কিন্তু তার কবিতা আসবে না। কবিতা থাকবে, সে আমার মাথায়, আপনারা পড়তে পড়তে তার অন্য কোনো কবিতা ভেবে নিলে কেউ অপরাধ নিতে পারবে না।

তার কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই আমার মনে আসে টেলিভিশনের পর্দ্দায় মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার দেয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকার, সম্ভবত লাল গোলাপ বলে এক অনুষ্ঠানে। তখন তার বয়স সাতাত্তুর হলো বোধহয় সবে, বোধহয় জন্মদিন ছিলো তার সেটা, তখনো ছোটো আমি, কবিতা পড়ার চল হয় নাই সেই বাল্যকালে। কেনো মনে রয়ে গেছে সেই সাক্ষাৎকার? আরো মনে পড়ে, তার ঘরের দেয়ালে তার নিজেরই এক পোস্টার, তা এত সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক যিনি, যার আবার এত সুন্দর পোস্টার, টাঙাতেই পারেন তিনি। বাঙালীকে এত অল্পতেই ত আর নারসিসিস্ট আখ্যা দেয়া যায় না। আমার স্মৃতি ভুলও করতে পারে, আজকের কথা নয়। তিনি ভূধামে নেই দশ বছর হয়ে গেলো।

মনে পড়ে একাধিক জায়গায় তার ছাপার অক্ষরে সাক্ষাৎকারও, যেখানে টেলিভিশনের পর্দ্দার তুলনায় তাকে অনেক নিষ্প্রভ, অনেক বিব্রত মনে হয়। শুনেছি আর সব কবির চেয়ে তার জীবনও কম ঘটনাবহুল নয়, এদেশে লেখক আর শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা হবার চল থাকলে আমরা হয়ত শামসুর রাহমানকে ঘিরে একটা সিনেমাও পেতাম, যার নাম চরিত্রে থাকতেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। তা, সে কী আর এদেশে হবার জো আছে। 

তারুণ্য যখন আসবে আসবে করে, তখন শাহবাগ মোড় থেকে, দেবদারু নামে এক ভাঙা দোকান থেকে কিনেছিলাম আমি শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা। সেই শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোরই বা কয়টা পড়েছি আমি? দশ, পনেরো, সাতাশ? ছাইরঙা সেই বই আমার ঘরের এখানে সেখানে বসে আমাকে টিটকিরি দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কী করবো বলুন, উপন্যাস হলে না হয় টেনেটুনে শেষ করে ফেলতাম, ধর্মগ্রন্থ হলেও, পুণ্যের আশায়, কবিতার বই কি আর ঐভাবে পড়া হয়। হয়ত দেখা গেলো দুই পাতা ছয় পাতা করে জীবন পার হয়ে গেলো, ঐদিকে এখনও বাকী দুইশ পঁচিশ পাতার বই। পড়তেই হবে কসম খেয়েছি যখন, আমি কঞ্জুস মদখোরের মত প্রতি শনিবার দুই ফোঁটা গলায় ঢালতে চাই।

এক বন্ধুর কথা খুব করে মনে পড়ছে, যে কী না গায়ে পাঞ্জাবি গলিয়ে এরপর শামসুর রাহমান বা আর কারো গোটাদশেক কবিতা গলাধ করত, তারপর লিখতে বসত নিজের মত করে। সে কবিতা আদপে কার মত হত, বলতে পারি না। কিন্তু ঐ পাঞ্জাবি পোশাকটার সাথে কবিতার কী আঁতাত? কিংবা এই ধরুন, এই ঢাকা শহরে বসে কী করে এত এত কবিতা লিখে ফেলা যায় যে পঞ্চাশের উপর বই বের করতে হয় ওদের জায়গা দিতে? আমি যদি বসি সময় নিয়ে, যদি শ্রম দিই অনেক, আমার পক্ষেও কি গোটাকয়েক কবিতা লিখে ফেলা সম্ভব, এইখানে বসে বসেই? নাকী গান যেমন গলায়, কবিতাও তেমনি কোনোভাবে আসতে হয়?

এমনও ত হতে পারে, সবার গলায় যেমন সব স্কেল আঁটে না, তেমনি কারো হাতে আঁটে উপন্যাস, কারো হাতে আঁটে কবিতা। আমি ত জানি না, আমি নিশ্চিত যে আপনিও জানেন না, জানতেন হয়ত কবি শামসুর রাহমান। কিংবা হয়ত জানতেন না, নিজেই ত সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন,

শামসুর রাহমান ব’লে আছে একজন, যার
জন্যে মধ্যরাতে কোনো নদী,
মাছের মতন চকচকে কোনো স্বপ্নাবৃত প্রখর শরীর
বিছানায় একা
অপেক্ষা করছে কিনা, সে জানে না। 

এই রে, তার কবিতা দেবো না দেবো না করেও এক আনা দিয়ে ফেললাম। তা, তিনি কি জানেন না আমাদের এইসব অবিন্যস্ত প্রশ্নের উত্তর? শহরের সব কয়টা দরজা জানালা তার জন্য খোলা পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে, তা না হয় তিনি নাই জানলেন। একান্ত আপন দুঃখ কি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন? মাফ কি পেয়েছেন তিনি, বিষ্ণু দে’র? শুনেছি তাকে অনেকে নিঃসঙ্গ শেরপা বলে, এতবার শুনেছি এ কথা যে এভারেস্ট কি অন্নপূর্ণার প্রসঙ্গেও আমার ফাঁকেতালে তার কথা মনে পড়ে যায়। অথচ আমার মনে হয়েছে শামসুর রাহমান এই শহরের কবি, কোনো উঁচা পাহাড়ের নন, এই শহর বলতে পুরান ঢাকা, নতুন ঢাকা, উত্তর বা দক্ষিণ ঢাকা না, স্রেফ, স্রেফ ঢাকা শহরের কবি। ইংরেজি ছবির ব্যাটম্যানের মত তাকে গ্রামীণফোন টাওয়ার বা বসুন্ধরা সিটির কার্নিশ অথবা ঘুলঘুলিতে বসে থাকতে দেখা গেলে, অবাক হবার বদলে আমি নিজেকেই ভবিষ্যদ্রষ্টা মনে করতাম। যেইসব দালানের ঝামা ইটে ঘেরা মানুষের বয়ান তিনি দিয়ে গেছেন কবিতায়, সেইসব দালানের খাঁজে বসে শূণ্যতায় কাউকে যখন তিনি শোকসভার স্থান দিচ্ছেন, তখন পরনে কি তার থাকত সফেদ পাঞ্জাবি, নীল ট্রাউজার?

জানি না, জানতেন কবি, শামসুর রাহমান।

Meem Arafat Manab লেখক: লেখক

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা