Sunday, August 28th, 2016
নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশি সমাজ
August 28th, 2016 at 7:20 pm
নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশি সমাজ

কাজি ফৌজিয়া:

‘প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস– 

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ ’

প্রিয় বন্ধু,

অনেক দিন পর তোমাকে লিখছি। এতদিনে আটলান্টিকের পানি যেমন থেমে থাকেনি; নিউ ইয়র্কে আমাদের জীবন ও ঠিক তেমনি। কত কী হয়ে গেল, কত কী বলারও রয়ে গেল। বাংলাদেশে ও কত কী ঘটে গেল-ভাবনার অতীত সব ঘটনা! এখানে কিছু ঘটলে তোমাকে বলতে ইচ্ছা করে; আর বাংলাদেশে কিছু ঘটলে ও তোমার কাছে শুনতে ইচ্ছা করে। তোমাকে না লেখার কারণে সব কিছু অসম্পূর্ণ লাগে।

বলতো, কেমন ছিলে তুমি এতো দিন? আচ্ছা বলতো আমার চিঠি না পাওয়ায় তোমার মনে কোন শূন্যতা সৃষ্টি করে নি ? না করলে ও অসুবিধা নাই,আমি আমার মত ছিলাম; আমি থাকবো যতদিন বেঁচে থাকি।

এত দিন না লেখার কারণে অনেক কথা জমে গেছে মনের ভেতর। তোমাকে কোনটা রেখে কোনটা বলববো বুঝে উঠতে পাচ্ছি না। সব ঘটনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তোমার মনে আছে , তোমাকে লিখেছিলাম ব্রন্কসে এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক কে মেরে ছিলো কাল সমাজের এক এক ছেলে। এই ধরনের ঘৃণার কারণে অপরাধ ব্রন্কসে বেড়েই চলছে। গত কয়েক মাসে বেশ কিছু বাংলাদেশি ভাই এই রকম মারপিটের শিকার হয়। যখনি কোন ঘটনা ঘটে প্রতিবারই বাংলাদেশি সমাজ বিক্ষোভ করে, সংবাদ সম্মেলন করে ও কয়দিন পর ভুলে যায়। যতবার ঘটনা ঘটে সংবাদ মাধ্যমে খবর আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্ণবাদী মন্তব্যের কারণে ঘৃণা বেড়েই চলছে। যার পরিণতি মুসলিম সমাজ কে বেশি ভুগতে হচ্ছে।

সেদিনটি ছিলো শনিবার। ছায়া সিডিসি নামক একটি সংগঠনের চটপটি মেলায় অংশগ্রহন করে ছিলাম। বেলা ৩ টার দিকে বজ্রপাতের মত আমার বসের পাঠানো মুঠোফোন ম্যাসেজ, ‘ওজন পার্কে আল ফোরকান মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আকুঞ্জি ও মুসল্লি তারা মিয়াকে কে বা কাহারা গুলি করে পালিয়ে গেছে’। সাথে সাথে সংবাদ পেলাম দুইজনই মারা গেছেন। রাতে বাসায় ফিরে সারাক্ষণ সংবাদ দেখছিলাম। মনের মাঝে একটাই প্রশ্ন কী কারণে এমন বয়স্ক দুইজন মানুষকে খুন করা হলো? ঘুম যেন দূরে কোথাও পালিয়ে গেছে। পরের দিন ২ থেকে ৩ হাজার লোক জমা হল ওজন পার্কে। বাংলাদেশি সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়লো, সবার একটাই কথা, এটা হেইট ক্রাইম! আর ডোনাল্ড ট্রাম্পই এসবের জন্য দায়ী। সাধারণ মানুষের ভীড়, সাথে স্পিকার, পাবলিক এডভোকেট, কাউন্সিল মেম্বার,ডেমোক্রেট মেম্বার কেউ বাদ যায়নি। বেশির ভাগ মানুষ মনের আবেগ অনুভূতি থেকে ছুটে গেলেও কিছু মানুষের আচরণে মনে হচ্ছিলো কেউ ডেমোক্রেটের ঘরে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে, আবার কেউ কেউ নিজে কত বড় নেতা তাই প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।

আমাদের মত মানুষ শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম কখন সব সত্যি জানব এই নির্মমতার কারণ কী? পুলিশ ব্রুকলিন থেকে অস্কার মুরেল নামক এক ৩৫ বছর বয়স্ক এক লাতিন যুবককে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ ঐ লোকের উপর প্রথম ডিগ্রি খুনের অভিযোগ আনে। পরে গ্র্যান্ড জুরি মুরেল এর উপর প্রথম ডিগ্রি খুন, মানে ঠান্ডা মাথায় খুন, সেকেন্ড ডিগ্রি খুন মানে সম্ভাব্য হেইট ক্রাইম ও বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনে। হয়ত মুরেল এর যাবত জীবন সাজা হবে। কিন্তু অবাক করা বিষয় মুরেল সব অভিযোগ অস্বীকার করছিল। কিন্তু পরীক্ষা নিরীক্ষায় সব আনিত অভিযোগ প্রমাণের পক্ষে যায়। মুরেলের যাই সাজা হোক এ ঘটনায় বাংলাদেশি সমাজ নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। ভবিষ্যতের চিন্তায় শন্কিত দিন যাপন করছে,আর এই চিন্তা থেকে অনেক মানুষ বেশি পুলিশ বেশি গোয়েন্দা ক্যামেরা লাগানোর দাবী জানাচ্ছে। এই অবস্হায় এই দাবীর হয়ত যুক্তি আছে, কিন্তু একটা দুর্ঘটনার কারণে পুলিশ কে দাওয়াত দেওয়া মানে খাল কেটে কুমির আনার সামিল।

বন্ধু, তুমি হয়ত ভাবছো এ কেমন কথা কিন্তু এটাই সত্য আমাদের বর্ণের মানুষের জন্য। দিনের পর দিন পুলিশ মুসলিমদের পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে,বর্ণবাদি আচরণ করেছে, গুলি করে কাল মানুষ হত্যা করেছে, মুসলিমদের ট্র্যাপে ফেলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এই সব ইতিহাস আজ ভুলে গেলে চলবে না।

বন্ধু আমার, তোমার কাজি নাফিস কে মনে আছে? ষড়যন্ত্র করে মানে স্ট্রিং অপারেশন এর মাধ্যমে ফাঁসানো হয় ছেলেটাকে। তারপর ২২ বছরের সাজা হয়। আমরা বলি কেউ খুন হয়নি, কেউ জখম হয়নি, কোন সম্পদ হানি ও হয়নি তবুও সাজা হয়েছে ২২ বছর। কোন কোন ঘটনায় আরও বেশি সাজা হয়। আমাদের সংগঠনের সদস্য শাহিনা আপার ছেলে মতিনের ৩০ বছর সাজা হয়েছে। মতিনের কথা অন্য চিঠিতে লিখবো।আজ আমাদের ভাবতে হবে পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না, আমাদের সমাজ কে আমাদেরই নিরাপদ রাখতে হবে।

অস্কার মুরেল পুলিশের ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। আমাদের মত সাধারণ জনগণের বাড়ীর সামনে লাগানো ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। আর একজন সাইকেল চালককে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে গাড়ির নাম্বার মনে রেখেছে আর পুলিশ কে বলেছে। আমরা প্রতিটি বাড়ীর সামনে আরও ক্যামেরা লাগাতে পারি, তাতে করে পুলিশ ও অপরাধী উভয় পক্ষের উপর নজর রাখা যাবে।আর আমাদের সমাজের দরকার সাইকেল চালকের মত দক্ষ সদস্য যে সমাজকে পাহারা দিবে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা ও সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্হায় অংশগ্রহণ করতে পারে। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান নইলে আমার মত পুরো সমাজকে বলতে হবে পুলিশের চোখে লুকিয়ে ছিল সমাজের সর্বনাশ।

বন্ধু, বহু কথা ছিলো লেখার। সংগঠনের পিকনিক দুইদিন পর; তাই ব্যস্ততায় সময় বেশি দিতে পারছি না। পরের চিঠিতে লিখবো অনেক কথা। ততক্ষণ ভাল থাকো। ভালো থাকুক দেশ আমার।

ইতি
তোমার সেই বন্ধু, যাকে তুমি কোন নামেই ডাকো না।

গ্রন্থনা: তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি