Thursday, December 15th, 2016
পতাকা আর পোশাকে মিলেমিশে একাকার
December 15th, 2016 at 7:11 pm
পতাকা আর পোশাকে মিলেমিশে একাকার

রিজাউল করিম, ঢাকা: বাঙালির অহংকার, বিজয় গাঁথা ১৬ ডিসেম্বর। আজন্ম সৃজনশীল বাঙালির এই গৌরব উদযাপন কেবল গল্প, গান কিংবা কবিতায় সীমাবধ্য নয়, বরং বসনেও ঘটছে তার প্রকাশ। প্রতিবারের মতো এবারও দেশজুড়ে বিজয়ের উল্লাসে চলছে লাল-সবুজের পতাকা আর পোশাকের যত আয়োজন।

ফ্যাশান হাউজে শোভা পাচ্ছে লাল-সবুজের-ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের বিজয় নিশান আর শাড়ি, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, কুর্তা, টি-শার্ট ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের নানা স্লোগান সংবলিত পতাকা আর পোশাক কিনতে ছুটছে বাঙালি ফুটপাত থেকে বিভিন্ন বিপনী-বিতানে। বিজয়ের ৪৫ তম বছরে শ্রদ্ধা নিবেদনে প্রস্তুতের শেষ মুহূর্তে বাঙালির এই ব্যস্ততায় ধুম লেগেছে তাই পতাকা আর পোশাকের বেচাকেনায়।

বাঙালির জাতীয় জীবনে বিজয় নিশান এক ঐক্যের প্রতীক, আবেগের বহিঃপ্রকাশ। আর এই জাতীয় পতাকা মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দিতে কেউ কেউ পরিভ্রমণ করেন মাইলের পর মাইল। এ যেন আত্মার টান। দেশের এক প্রান্ত থেকে হেঁটে অন্য প্রান্তের নানা পেশা, নানা বয়সী মানুষের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন লাল-সবুজের পতাকা। চারদিকে লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের পথচলায় উড়ছে বিজয়ের নিশান। রাজধানীতে ডিসেম্বরের শুরু থেকে পতাকা বিক্রির উৎসব শুরু হয়েছে অনেক আগেই। চলবে বিজয় দিবস পর্যন্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পতাকা বিক্রি করছেন একশ্রেণির মৌসুমী বিক্রেতা।

ঢাকার নবীনগর হেমায়েতপুর থেকে রাজধানীতে আসা আরিফুল ইসলাম জানান, বিজয় দিবস উপলক্ষে এমনিতেই ছোট-বড়, মাঝারি সাইজের জাতীয় পতাকা প্রচুর বিক্রি হয়। তারা নিজেরাই এ পতাকা তৈরি করেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসের আগে বিভিন্ন মাপের পতাকা তৈরি করেন। জাতীয় পতাকা বিক্রি করে তারা যেমন আত্মতৃপ্তি পান, তেমনি এই পতাকা তাদের সংসারের ভরণপোষণের খরচ যোগায়। লাল-সবুজের ওই ফেরিওয়ালারা জানান, ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জের পথে-ঘাটে নানা আকারের লাল-সবুজের পতাকা ফেরি করে বিক্রির পর তারা ফিরে যাবেন নিজ নিজ এলাকায়। আবার ২১ ফেব্রুয়ারি আর ২৬ মার্চ এলে তারা ফের বেরিয়ে পড়বেন লাল-সবুজের চেতনা ছড়িয়ে দিতে।

লাল-সবুজের এমন আর একজন ফেরিওয়ালা রুস্তম। বয়স ১৫ পেরিয়ে ১৬ তে ঠেকেছে। গত পাঁচ বছর ধরে সে এই মৌসুমী ব্যবসায় জড়িত। বছরের অন্য সময় রেস্তোরাঁয় কাজ করলেও এ সময়টা পতাকা বিক্রি করেন। কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, ‘এইডা বিজয়ের মাস, হগলে পতাকা কেনে তাই ব্যবসা ভালা হয়। আর পতাকা বেচনের কামডাও সোজা।’

বুধবার বিকেলে আজিজ সুপার মার্কেট থেকে যাত্রী নিয়ে সেগুন বাগিচায় এলেন সিএনজি চালক ভুট্টু মিয়া। সিএনজির সামনে বাঁধা ছোট্ট একটি জাতীয় পতাকা। ১৫ টাকা দিয়ে কিনেছেন। ভুট্টু বললেন, ‘হারা দিন কত মাইনসে ভাড়া নিয়ে যে রকম ব্যবহার করে আমাগো লগে, মনডা খারাপই থাকে। তার মধ্যে একটু আনন্দ খোঁজার লাইগ্যা এই পতাকা কিনছি। হেইডা দেইখ্যা হগ্গলে বালাই কয়। মনডায় কয়, এ পতাকার লাইগ্যা অয়লেও হগ্গলে বালা ব্যবহার কইত্তাছে। হব্বায় এইডা পছন্দ করে।’

পতাকা ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদনে আবাল-বৃদ্ধ বনিতা কারোই আগ্রহের কমতি নেই। রিকশা চালক সমির হোসেন। পল্টনে দেখা গেল তার রিকশার হ্যান্ডেলে ছোট একটি কাঠি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে পতাকা। পতাকা বাঁধার কারণ জানতে চাইলে খুব উৎফুল্ল চিত্তেই জবাব দিলেন সমির।

তিনি বলেন, ‘দুই দিন পরই ১৬ ডিসেম্বর। হেই দিন আর আইবো এক বছর পর। হেয়দিন আমাগো দেশ পাইক্যা হারামিগো থেইক্যা বিজয় লাভ করে। তই আমরাও হেয়দিনে একটু বিজয় কইল্লাম আরকি। সবাই করলে আমাগোতে দোষের কি?’

এদিকে চাহিদা অনুযায়ী পতাকার সরবরাহ দিতে ব্যস্ততা বেড়েছে দর্জির দোকানেও। বঙ্গবাজারে একটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানায় একের পর এক পতাকা বানিয়ে যাচ্ছিলেন রহমান। মোট আটজন কারিগর কাজ করেন ওই কারখানায়। যত বেশি সংখ্যায় বানানো যাবে, তত বেশি টাকা মালিকের সঙ্গে এটাই কারিগরদের চুক্তি। পতাকা শ্রমিক কিরণ জানালেন, ‘ডিসেম্বর মাসে বেশি কাজ হয়, দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেও শেষ করা যায় না। প্রতিটি পতাকার জন্য কমপক্ষে তিন থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত মজুরি মেলে।’

পতাকার পাশাপাশি বিজয়ের লাল সবুজ পোশাকের বিকিকিনিতেও দেখা গেছে এক উৎসবের আমেজ। ফ্যাশান হাউজ ছাড়াও ক্রেতার ভিড় জমেছে বিভিন্ন মার্কেটে। মার্কেট গুলোতে পসরা সাজানো বিজয়ের বিভিন্ন পোশাকেও দেখা মিলছে মুক্তির গানের জলছাপ। প্রচলিত পোশাকেই সাজানো হয়েছে বিজয় দিবসের সংগ্রহ। বিশেষ করে স্ক্রিনপ্রিন্ট করা শাড়ি আর পাঞ্জাবি বিজয় দিবসের ফ্যাশনের মূল আকর্ষণ।

বড়দের পোশাকের পাশাপাশি ছোটদের পোশাকেও একই ধরনের ডিজাইন করা হয়েছে। ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পতাকার রং। ব্যবহার করা হয়েছে একটু ভারী কাপড়। শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, টি-শার্ট, শার্ট প্রভৃতি পোশাকে কাজ করা হয়েছে এমব্রয়ডারি, অ্যাপলিক, ব্লক, হাতের কাজ, স্প্রে, হ্যান্ডপেইন্ট, টাইডাই প্রভৃতি। লাল-সবুজের পাশাপাশি পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছে আকাশি, মেরুন, ধূসর প্রভৃতি রং। কাপড়ের পোশাকে তুলে ধরা হয়েছে দেশাত্মবোধক নানা পঙক্তি। কাজের মাধ্যম হিসেবে টাইডাই, ব্লক, বাটিক, অ্যাপলিক, ক্যাটওয়াক, স্ক্রিনপ্রিন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে।

শীত শীত আবহাওয়ার জন্য একটু মোটা কাপড়ে পোশাকগুলো তৈরি করা হয়েছে এবং পোশাকে রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজয়ের প্রচলিত লাল-সবুজের পাশাপাশি অন্যান্য রংগুলো এসেছে পোশাক ও বিজয় দিবসের মর্যাদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে। ফ্যাশন হাউজগুলোতে বিজয়ের স্মারক হিসেবে উপহার সামগ্রীর আয়োজন রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে জেনুইন লেদারের ওয়ালেট, কার্ড হোল্ডার এবং সুতি কাপড়ের ব্যানডেনা, রিস্টব্যান্ড, মগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ১০ ফ্যাশন হাউজের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম দেশীদশ এ শুরু হয়েছে বিজয় উৎসব। অংশীদার ১০ ফ্যাশন ঘরগুলো হল- নিপুণ, কে ক্র্যাফট, অঞ্জনস, রঙ বাংলাদেশ, বাংলার মেলা, সাদাকালো, বিবিআনা, দেশাল, নগরদোলা ও সৃষ্টি।

দর-দাম:  সুতরাং দেশীদশ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন আপনার পছন্দের বিজয় পোশাকটি আর বসনে প্রকাশ করতে পারেন আপনার বিজয়ের উল্লাস। ফ্যাশান হাউজ ছাড়াও বিজয়ের লাল সবুজ পোশাক কিনতে যেতে পারেন রাজধানীর নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, বেইলী স্টার মার্কেট, বসুন্ধরা শপিং মলসহ বিভিন্ন মার্কেটে। এসব মার্কেট থেকে পোশাকগুলো পাওয়া যাবে ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। আর নানা ধরনের ব্যান্ডানা পাওয়া যাবে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা এবং ব্রেসলেট পাওয়া যাবে ২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। আর অনলাইনে কিনতে চাইলে আজকেরডিল হচ্ছে বেস্ট মার্কেটপ্লেস।

নারীদের ফ্যাশন: এই দিনে নারীরা সাধারণত লাল সবুজ শাড়ি পরে থাকেন। শীত ও ফ্যাশন মাথায় রেখে ব্লাউজ পরতে পারেন লম্বা হাতার। অথবা একটি রঙের শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে জড়িয়ে নিতে পারেন পছন্দের লাল সবুজ শাল দিয়ে। যারা শাড়ি পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তারা সালোয়ার কামিজ অথবা লম্বা ধরণের কুর্তা পরে নিন নিজের পছন্দের ডিজাইনের। কামিজ বা কুর্তার সঙ্গে গায়ে জড়াতে পারেন শাল। মেকআপের মাঝেও ধরে রাখুন বিজয়ের রঙ। শাড়ির সঙ্গে কপালে বড় লাল টিপ, লাল, সবুজ পুঁথির মালা, হাত ভর্তি চুড়ি এবং লিপস্টিকের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিন বিজয়ের রঙে।

পুরুষের ফ্যাশন: যে কোনো বড় ফ্যাশন হাউজ থেকে শুরু করে ছোটোখাটো দোকান সবগুলোতেই বিজয় দিবসের জন্য ছেলেদের নানা পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। টি শার্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবিতে থাকে লাল সবুজ রঙের ছোঁয়া, বিজয়ের ডিজাইন। পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিন নিজের পোশাকটি। সঙ্গে রাখতে পারেন লাল-সবুজ শাল।

শিশুদের ফ্যাশন: বিজয়ের উল্লাসে সবচাইতে বেশি উল্লাসিত হয় শিশুরা। তাদের জন্য তো একটি পোশাক চাই-ই চাই। শিশুদের ফ্যাশনে আধিক্য পায় লালের ব্যবহার। নিজের সন্তানকে রাঙিয়ে তুলুন লাল বা লাল সবুজের মিশ্রণের ভালোবাসায়। এর সঙ্গে হাতে দিতে পারেন আমাদের পতাকার প্রতিকৃতি। ছোট হাতে বেশ সুন্দর মানিয়ে যাবে। এছাড়া বিজয় দিবসের দিন কিছু শিল্পী গালে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পতাকা এঁকে দেন রঙ দিয়ে। ইচ্ছে করলে একটি পতাকাও আঁকিয়ে নিতে পারেন নিজের ও নিজের সোনামণির গালে।

সম্পাদনা: জাহিদ

 


সর্বশেষ

আরও খবর

সব মহাসড়কে টোল আদায়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সব মহাসড়কে টোল আদায়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর


স্বর্ণের দাম কমল ভরিতে ১৯৮৩ টাকা, অপরিবর্তিত রুপার দাম

স্বর্ণের দাম কমল ভরিতে ১৯৮৩ টাকা, অপরিবর্তিত রুপার দাম


দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়াল ৪৩ বিলিয়ন ডলার

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়াল ৪৩ বিলিয়ন ডলার


আড়তদার-মিলারদের কারসাজিতেই চালের দাম বৃদ্ধি: কৃষিমন্ত্রী

আড়তদার-মিলারদের কারসাজিতেই চালের দাম বৃদ্ধি: কৃষিমন্ত্রী


বড়দিনের আনন্দ আয়োজন: উদ্যোক্তা হাট ২০২০

বড়দিনের আনন্দ আয়োজন: উদ্যোক্তা হাট ২০২০


৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বাংলাদেশের রিজার্ভ

৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বাংলাদেশের রিজার্ভ


ঢাকার ১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী

ঢাকার ১৫ মাইলের মধ্যে মিত্রবাহিনী


যুক্তরাষ্ট্রের হুমকীর মুখেও অটল ভারত

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকীর মুখেও অটল ভারত


টিকার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ৯০০ কোটি ডলার দেবে এডিবি

টিকার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ৯০০ কোটি ডলার দেবে এডিবি


বেসামাল প্রেসিডেন্ট, গভর্নর দিশেহারা

বেসামাল প্রেসিডেন্ট, গভর্নর দিশেহারা