Friday, November 4th, 2016
পদ্মা-যমুনায় ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ধরার মহোৎসব
November 4th, 2016 at 4:55 pm
পদ্মা-যমুনায় ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ধরার মহোৎসব

শাহজাহান বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জের পদ্মায়-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। এতে একদিকে সরকারের ইলিশ রক্ষার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে ইলিশের বংশ বিস্তার বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার সময় আরো বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তারা।

hisha-p-7জানা যায়, বর্তমানে চলছে ইলিশ প্রজননের ভরা মৌসুম। এসময় ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। স্রোতের বিপরীতে চলতে থাকে এবং ডিম ছেড়ে বংশ বৃদ্ধি করে। প্রজনন মৌসুম হিসেবে ইলিশের বংশ বৃদ্ধির লক্ষে গত ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্ত ওই সময়ের মধ্যে ইলিশ ডিম ছেড়ে সাড়তে পারেনি। ফলে এ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর মানিকগঞ্জের শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে ।

স্থানীয় জেলেরা জানান, সরকার যদিও ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুম হিসাবে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্ত এ সময়ে মা ইলিশ তেমন একটা ডিম ছেড়ে সারতে পারেনি। মুলত ইলিশের ডিম ছাড়ার সঠিক সময় হচ্ছে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের পুরো মাস। যারা নদীতে মাছ ধরে তারাই একমাত্র ভাল বলতে পারবে কখন ইলিশ ডিম ছাড়বে।

জেলেরা আরো জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুম নির্ধারণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন যদি জেলেদের সঙ্গে আলাপ করে নিতো তাহলে ভাল হতো। এতে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপও ভেস্তে যেত না বলে তারা মনে করেন তারা। ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ করা না হলে আগামীতে এ দেশ থেকে ইলিশ মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

fishin-boat-2শিবালয়ের ছোট আনুলিয়া গ্রামের জেলে রবি হালদার বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরি। মাছ ধরাই আমাদের একমাত্র কাজ। মাছ ধরে বিক্রি করে সারা বছর সংসার চালাই। আমরা বুঝতে পারি ইলিশ মাছ কখন ডিম ছাড়বে। সরকার ইলিশের ডিম ছাড়ার যে সময় মনে করেছিল তা আসলে সঠিক ছিল না। তাই নদীতে ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ছে। মুলত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাস মা ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রকৃত সময়। এসময় যদি ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতো তাহলে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতো। আমরাও ওই সময় ইলিশ মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতাম এবং সারা বছর নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেতো।

জাফরগঞ্জের নাঠু হলদার জনান, সরকার নির্ধারিত প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক অসাধু জেলেরা প্রশসনকে ফাকি দিয়ে নদীতে মাছ ধরেছে। আমরা নদীতে যাইনি। ফলে অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্ত এখন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে ডিমওয়ালা মাছ ধরতে আপত্তি নেই। তাই মা ইলিশ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি।

কৃষ্ণপুর গ্রামের নিরঞ্জন হালদার জনান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানেও থামাতে পারেনি জেলেদের ইলিশ ধরা। এবার নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ ধরে গোপনে বিক্রি আর বরফ দিয়ে গুদামজাত করাই ছিল মৌসুমী জেলেদের প্রধান কাজ। ফলে নিষেধাজ্ঞার পরের দিন আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাটের মাছের আড়তে ওঠে শত শত মন ডিময়ালা মা ইলিশ। মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর একদিনে হঠাৎ করে এত মাছ আসলো কোথা থেকে এটাই সচেতন মহলের প্রশ্ন? তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরে গুদামজাত করার কারণেই অল্প সময়ে এত মাছের আমদানি হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

fisher-man-2এদিকে ক্রেতারা একটু কম দামে কেনার আশায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন মাছের আড়তে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সকালে আরিচা মাছের আড়তে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে ঢাকা, সাভার ও নবীনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাইভেটকার নিয়ে মাছ কিনতে আরিচা এসেছে ক্রেতারা। মাছের আরতে শুধু মানুষ আর মানুষ।

এদিকে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সুযোগে পয়সা কামানোর আশায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিল কতিপয় সরকার দলীয় নেতাকর্মী, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধ ও এক শ্রেণীর সাংবাদিক। এদের ছত্রছায়ায় মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনা থেকে নির্বিচারে প্রচুর পরিমাণে ডিময়ালা মা ইলিশ ধরে বিক্রি করে কয়েকদিনে লাখ লাখ টাকা আয় করেছে মৌসুমী জেলেরা।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কামাল মোহাম্মদ রাশেদের নেতৃত্বে মৎস্য অধিদফতর মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে জেলেদের আটক করে জেল জরিমাও করেছে। এরপরও মাছ ধরা বন্ধ রাখেনি জেলেরা।

hisha-p-4
নাম প্রকাশে অনৈচ্ছুক জৈনক এক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় যে সব জেলেরা সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও পুলিশকে টাকা  দিয়ে নদীতে নেমেছে তারা ধরা পরেনি। আর যারা টাকা দেয়নি তারাই ধরা পড়েছে। এর মধ্যে অনেকেই দালাল ধরে তদবির করে জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। আর যারা টাকা দিতে পারেনি তাদের জেল হয়েছে। জেলেদের ছাড়ানোর জন্য তদবির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্থানীয় বিশেষ কিছু ব্যক্তি। এরমধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও সাংবাদিক। জেলেদের ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় জোর তদবির। অভিযানের কয়েকদিন তদবিরকারী ওইসব সাংবাদিক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে দেখা গেছে।

এ ব্যাপারে শিবালয় উপজেলার মৎস কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল আলম বলেন, এ বছর ২৮টি মোবাইল কোর্ট এবং ৪২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে ১ দশমিক ৩১ মেট্রিক টন মাছ উদ্ধার করা হয়, যার মূল্য প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। মামলা হয়েছে ২৬৮টি, জরিমানা করা হয়েছে ৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা, মোট ৫৪ জনকে জেল দেয়া হয়েছে।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামাল মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার মেয়াদ আরো কিছু দিন বাড়িয়ে এক মাস করলে ভাল হতো। মা ইলিশ মাছগুলো আরো বেশি ডিম ছাড়তে পারতো। আগামী বছর নদীতে আরো বেশি মাছ পাওয়া যেতো।

সম্পাদনা: জাহিদ


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০ হাজার

করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০ হাজার


জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই জরিমানা

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই জরিমানা


লকডাউনের নামে সরকার ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে: ফখরুল

লকডাউনের নামে সরকার ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে: ফখরুল


আসামে বন্দী রোহিঙ্গা কিশোরীকে কক্সবাজারে চায় পরিবার

আসামে বন্দী রোহিঙ্গা কিশোরীকে কক্সবাজারে চায় পরিবার


ছয় দিনে নির্যাতিত অর্ধশত সাংবাদিক: মামলা নেই, কাটেনি আতঙ্ক

ছয় দিনে নির্যাতিত অর্ধশত সাংবাদিক: মামলা নেই, কাটেনি আতঙ্ক


ঢাকা-দিল্লি ৫ সমঝোতা স্মারক সই

ঢাকা-দিল্লি ৫ সমঝোতা স্মারক সই


করোনায় আরও ৩৯ মৃত্যু

করোনায় আরও ৩৯ মৃত্যু


করোনায় আক্রান্ত শচীন

করোনায় আক্রান্ত শচীন


নাশকতা ঠেকাতে র‍্যাব-পুলিশের কঠোর অবস্থান

নাশকতা ঠেকাতে র‍্যাব-পুলিশের কঠোর অবস্থান


শুক্র ও শনিবার যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে

শুক্র ও শনিবার যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে