Wednesday, June 12th, 2019
পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ
June 12th, 2019 at 4:58 pm
পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ

মাসকাওয়াথ আহসান:

জনক্রোধ খুবই বাড়ছে। এই ক্রোধ প্রশমনের জন্য নগরে একটি গোস্বা নিবারণী পার্ক স্থাপন করেও আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় নি।

যারা দিনমান পরিশ্রম করে তাদের রাগ শরীরে জমা হওয়ার অবকাশ থাকে না। যাদের পরিশ্রম কম, কথায় কথায় ধন্যবাদ ভাই, সহমত ভাই, ইনশাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে বেশ টাকা-পয়সা উপার্জন করে; তাদের কায়িক পরিশ্রম না থাকায় ঘুম ভালো হয় না। সারাদিন ঠুনকো বিষয়ে তাদের মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাথা ঠুকে ঠুকে ক্রোধ প্রকাশ করে।

ধন্যবাদ ভাই, সহমত ভাই, ইনশাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ’র ম্যানেজারদের বাদ দিয়ে গোটা দুনিয়ার ওপর রাগ তাদের। রাগ করার সময় শুধু দেখে নেয় , এই রাগে উপার্জনের পেটে লাথি পড়বে কীনা। সুতরাং যেসব জায়গা থেকে উপার্জন আসে সেই সব সফট স্পট বাদ দিয়ে দুনিয়ার নানা বিষয়ে গোস্বা হয় তাদের।

মনোবিদ পরামর্শ দিয়েছেন, শহরের স্থানে স্থানে পাঞ্চিং ব্যাগ স্থাপন করলে ক্রোধান্ধ সহমত ভাই ও ভক্তরা তাদের ক্রোধ প্রশমনের সুযোগ পাবে।

প্রশ্ন ওঠে, ক্রোধপ্রশমনের জন্য গণপিটুনিতে হত্যা ও ক্রসফায়ারের মতো বড় বড় পাঞ্চিং ব্যাগ তো রয়েছে ঐতিহ্যগত ভাবেই; তাতে রাগ কমছে না কেন!

মনোবিদ স্পষ্ট করেন, কায়িক পরিশ্রম না থাকায় শুধু তেলের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পে খেয়ে খেয়ে শরীরে চর্বি জমে যাওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ‘অনুভূতি বিলাস’ হয়েছে। যেহেতু ভাতের চিন্তা নাই ফলে আঁতে ঘা লাগার চিন্তা তাদের মাথার মধ্যে কিলবিল করে। অলস মস্তিষ্ক অনুভূতির কারখানা। তাদের কাছে জীবনের চেয়ে অনুভূতির মূল্য বেশি। এই অনুভূতির বাড়াবাড়ি প্রশমনে পাঞ্চিং ব্যাগ প্রয়োজন।

সহমত ভাই আর আলহামদুলিল্লাহ’র ম্যানেজারের দপ্তরগুলো বাদে বাকি সব দপ্তরের সামনে পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ ঝুলিয়ে দেয়া হয়। সহমত ভাইয়ের সমালোচনা শুনে ক্রোধে উন্মত্ত ভক্তের রাগ প্রশমনের জন্য দু’চারটি মিডিয়া হাউজের সামনে পাঞ্চিং ব্যাগ স্থাপন করা হয়।

আলহামদুলিল্লাহ’র ম্যানেজারদের সমালোচনা শুনে ক্রোধে উন্মত্ত আশেকানদের জন্য পাঞ্চিং ব্যাগ স্থাপন করা হয় শহরের ভাস্কর্যগুলোর আশেপাশে।

সহমত ভাই-এর ভক্তেরা শিক্ষা-সংস্কৃতি একেবারে সহ্য করতে পারে না। সহমত ভাই প্যাটার্নের ছা-ছপ-ছমুছা ভিত্তিক শিক্ষা ও ভক্তিগীতি নির্ভর সংস্কৃতির বাইরে শিক্ষা-সংস্কৃতির আলো তাদের অসহ্য লাগে। কারণ আলোতে আলু থাকে না; ফলে আলো দিয়ে ছপ বা ছমুছা বানানোর সুযোগ নেই। তাই আলো অর্থহীন ব্যাপার তাদের কাছে। ফলে কোথাও আলো দেখলেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

তাই আজো প্রায় নিভু নিভু যে কজন আলোর দিশারি আছেন; সারাজীবন যারা শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোর পরশমনি ছড়িয়েছেন; তাদের বক্তব্যের পান থেকে চুন খসার অপেক্ষায় থাকে সহমত ভাইয়ের ভক্তেরা। জায়গামত চুপ করে থেকে এরকম জায়গায় এসে রেগে উঠে প্রবীন শিক্ষাবিদদের গলায় গামছা দিয়ে নিয়ে আসার হুংকার ছাড়ে সহমত ভাই। সেই হুংকার ছেড়ে হা রে রে করে তেড়ে আসে শিল্প-সাহিত্যের লাইনে বহু ঘষাঘষি করেও একটি ক্লাসিক লিখতে না পারা সংস্কৃতি-শিল্পের মামুরা। শীতাতপ যন্ত্র চালিয়ে বিছানায় শুয়ে টাইপ করে বিপ্লবী স্টেটাস। মুহূর্তে নিজেকে ‘আমি তোমাদেরি লোক’ বলে ‘অশিক্ষিত’ অনুভূতিতে বাতাস দেয়। প্রথিতযশা শিক্ষাবিদেরা যারা রাজপ্রাসাদে গিয়ে হাত কচলাননি; নিজের মতো করে পাঠশালা চালিয়েছেন; তাদের পাঠশালা ও গৃহের সামনে বেঁধে দেয়া হয় পাবলিক পাঞ্চিং ব্যাগ।

আলহামদুলিল্লাহ’র ম্যানেজারেরা আগে থেকেই ক্ষিপ্ত শিক্ষা-সংস্কৃতির ওপর। ফলে কোন প্রবীন শিক্ষাবিদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হবার ঈদে তারাও এসে পড়ে ঈদ মোবারক বলে। তাদের আশা ‘অশিক্ষিত অনুভূতি’-র বিজয় মানেই শ্রেণী সংগ্রাম সম্পন্ন হওয়া। অবশ্য এটা অন্যরকম শ্রেণী সংগ্রাম। এর সঙ্গে টেকাটুকার সম্পর্ক নাই। টেকাটুকার শ্রেণী সংগ্রাম দুর্নীতি বিপ্লবের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। চোর-ডাকাত-খুনি সংগঠিত হয়ে ‘উন্নয়নের ঠিকাদার’ সংস্কৃতি বিকশিত করেছে। বাড়ি-গাড়ি-ভুড়ি-সেকেন্ড হোম-ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া থলথলে সন্তান সবই হয়েছে। এখন ‘অশিক্ষিত অনুভূতি’র বাম্পার ফলন করে জনপদের শেষ শিক্ষাবিদদের চুপ করিয়ে দিলেই কাম হইয়া যাবে।

সহমত ভাই-এর ভক্ত ও আলহামদুলিল্লাহ’র আশেকানদের রাগারাগি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়; তাদের বাসায় বাসায় পাঞ্চিং ব্যাগ পৌঁছে দেয়া হবে। কারণ শরীরে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে তারা আজকাল শীতাতপ সুবিধা বিহীন কোথাও যায় না।

Bangladesh writer
লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

মিডিয়ার যুগে শোক প্রকাশের উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি! 

মিডিয়ার যুগে শোক প্রকাশের উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি! 


চাটা লিমিটেড কোম্পানি

চাটা লিমিটেড কোম্পানি


ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ

ধর্ম: প্রশ্নই জগতের প্রাণপ্রবাহ


যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের

যাপনে নয়, জীবন উদযাপনের


যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই

যে গল্পের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই


কাশ্মীর: দক্ষিণ এশিয়ার কাইজ্জার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!

কাশ্মীর: দক্ষিণ এশিয়ার কাইজ্জার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!


পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯:  তুমি কী আমার বন্ধু!

পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯: তুমি কী আমার বন্ধু!


বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য

বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য


তোমার সুরে সুর মেলাতে

তোমার সুরে সুর মেলাতে


চীনের চাঁদ আর শ্রীখণ্ডের ঈশ্বর

চীনের চাঁদ আর শ্রীখণ্ডের ঈশ্বর