Sunday, August 21st, 2016
পারাপার
August 21st, 2016 at 9:51 pm
পারাপার

শরীফ আবদুল্লাহ:

নদীর ক্ষাণিকটা দূরেই জেলেপাড়া। আগের মত জেলেরা মাছ মারায় আয়েশ পাচ্ছে না— কেউ বদলা হয়ে যাচ্ছে, ইটের ভাঁটায় কামলা খাটছে, শহর জুড়ে রিক্সাওয়ালা সাজছে। জাউল্লা শ্রেণী বিভক্ত হয়ে খোঁড়াক জুটাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিজেকে বিলিয়ে। জীর্ণ খাঁ নদী মাছ হারিয়ে জেলেদের শৌচ আর গোসলের জল হয়ে উঠছে। দূর্গা মায়ের উলঙ্গ-ন্যাংটো গঠন যেখানে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে সেখানেই স্থির, কোন তীব্র জোয়ার আসে নি তাকে ভাসিয়ে নেবার জন্যে। খাঁ নদী বৃদ্ধ হয়ে একটি সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছে ধ্বংস হবে বলে।

মতিন জাউল্লা খাঁ নদীতে মাছের উচ্ছ্বাস দেখেছিল একদিন। বয়স তখন পাঁচ অথবা ছয়। এখন তিন সন্তানের জনক। তিন সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে ‘বলো হরি হরি বোল’ সংসার তার। এমনটি হতো না যদি লুড়ুর নেশায় না ধরত। সাপে সকল অর্থ খেয়ে ফেলেছে। কার্য করে চলেছে সংসার ঘোড়াটি বহুদিন, এখন সংসার আর কঙ্কাল এই দুয়ে কোন তফাৎ নেই। স্ত্রী, ছোট ছেলের মাথায় হাত তুলে হলফনামা পাঠ করিয়েছে, আর জুয়া খেলব না। মতিন নাফরমানী করে নি, দুটি কন্যার পরে একমাত্র ছেলের মাথায় হাত রাখা নিয়ে কথা। সরকারের ঋণ খেলাফি করা যায়, আল্লাহর ওয়াদা খেলাফি নয়।

কয়েক মাস হলো প্রভাতে বেড়িয়ে যাচ্ছে সে, নিশিতে উদয় হচ্ছে চাল নিয়ে, কচু নিয়ে, ক্ষুধার্ত মুখের খাদ্য হয়ে। চুলায় হাঁড়ি উঠছে তখনই যখন মতিন ঘরে ফিরছে। সে ফিরলেই রাতের খাদ্য পেটে পৌঁছায় সন্তানদের। পরদিন সকাল আর দুপুরের জন্যেও চিন্তায় থাকতে হয় না। আবার রাত হলেই অপেক্ষা করতে হয়, মতিন কখন বাড়ি ফিরবে। বারকতক ফিরতে রাত হলে কন্যাদের একজন বলে— বাপজান আইজ কহন আইবো মা? আইজকে যে খুব খিদা লাগছে।

ওদের মা তখন কাঁথা সেলাই করছে হেরিকেনের নিভু আলোয়। বিদ্যুৎ কাটা হয়েছে বিল খেলাফির জন্যে, উত্তর দেয়— এত খিদা খিদা করস ক্যান, প্যাডটারে ছোড রাখতে পারস না অ্যা।

অন্যজন বলে— মা, ছোড রাখলে কি অয়?
— বেহস্ত পাওন যায়। 

মতিন যানে, বাজার নিয়ে না ফিরলে চারটি মুখ একটি রাত উপোস থাকবে। পরদিন সকালেও খাদ্য জুটবে না মুখে, দুপুরেও না। তাই মতিন চট-জলদিই কুঠিতে ফিরে আসে। কোন জুয়ার আসর আর তাকে আকর্ষণ করে না। কার্য চুকাতে হবে, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে, ছেলে-মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে হবে। জগতের নিয়মে বাঁধা না পড়লে, লোকে যে প্রতিবন্ধী ভাববে, ছেলে-মেয়েরাও। 

মতিন মাছ মারা বন্ধ করে দিলেও মাছের তরতাজা আঁশের গন্ধটাকে প্রত্যাহার করতে পারে নি। প্রত্যহ প্রভাতেই আড়ৎতে চলে আসে, বৃহৎ পাতিল, ধারাল বটি, পোঁটলা ভর্তি মুড়ির সমর্থনে। মহাজনের পসার থেকে মাছ কিনে এ গ্রাম ও গ্রাম ঘুরে বিক্রি করে সেগুলো। বিক্রির লভ্যাংশ দুটি ভাগে বিন্যাস করে, একটি অংশে বাজার সাড়ে আরেকটি অংশ দিলু বানুর হাতে তুলে দেয় কার্য পরিশোধের নিমিত্তে। দিলু বানুও অলস বসে নেই, কাথায় নকশা তৈরিতে লেগেছে কিছুদিন হলো। বিধাতার সৃষ্ট পৃথিবীতে নারীর সখ-আল্লাদ বলে দুটি শব্দ থাকলেও দিলু বানু তার হদিস রাখে নি কখনো। রাখলেও মুখ ফুটে কিছু চায় নি, মতিনও অনুশোচনায় পীড়িত হয় নি। তবে বুকটা পীড়িত হয়ে উঠে বাড়ির উঠোনে নিশিতে দাঁড়াতেই, দুই কন্যা দৌড়ে এসে মতিনকে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করলে— আইজ কিছু আনছ বাজান আমাগো লাইগ্যা? মতিন প্রত্যহ হাওয়ায় আওয়াজ তুলে— হ আনছি তো বাজান, তোমাগো জইন্যে আনছি এক বুক ভালোবাসা। 

সন্তানরা এতেই খুশি হয়ে উঠে। হৈ-চৈ করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার তুলে— মা, বাজান আইজকেও ভালোবাসা আনছে আমাগো লাইগ্যা। বাজান আমাগো ছোটকার চাইতেও বেশি ভালোবাসে।

মতিনের মুখ ক্ষরিত হয় অন্ধকারে, অবুঝ কন্যাদের আনন্দে।

আজ মতিন বেড়িয়ে পড়েছে প্রভাতেই। বদহজমে পড়েছিল কিছুদিন। পীঠ ঠেকে গিয়েছিল বিছানার তোষকে। এখন অনেকটা সুস্থ, খাদ্য সঙ্কটে পড়লে যেমন সুস্থতা নিয়ে খাদ্য সংগ্রহে নামা যায় তেমন সুস্থ। লুঙ্গিতে গুঁজে নিয়েছে পনেরশো পঞ্চাশ টাকার প্যাঁচানো একটি রোল। গামোছা দিয়ে কষে বেঁধে নিয়েছে কোমড়। টাকা হারানোর ভয় নেই। লুঙ্গি খুলে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হবারও ভয় নেই। সম্পূর্ণ নিরাপদ।

নদীর ঘাটলায় আসতেই কমুউদ্দিন মাঝি চেঁচিয়ে উঠল— মতিন মিয়া হুনছ নি, কইল্লা মালায়োনের বেটি কালকা রাইতে যে ভাগছে? আরে শালির বেটি, ফসটিনসটি করবি কর। ভাগবি ভাগ, মালায়োনের লগেই ভাগ। ভাগলি হাবিবুইল্লার লগে। মাউল্লার বেটি মাউল্লা। কইল্লা মালায়োনের আরে কি জেদ, বউডারে পিডাইয়া আধমরাই কইরা হালাইলো।

মতিন নৌকায় উঠতে উঠতে উত্তর দিল— কি কও কমু ভাই, কইল্লার বউতো হুনছি পোয়াতি।
মুরগির ঝাঁকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আইজুল প্রশ্ন করল— কোন হাবিবুইল্লা? উত্তরপাড়ার নি কমু ভাই!
— হ। ঐ-যে যাত্রাফাত্রা করে পোলাডা।
বউডার এহন কি অবস্থা কমু ভাই? মতিন বিনয়ের সঙ্গে অনুসন্ধান করে।
— আর অবস্থা মিয়া। সদর হাসপাতালে কালকা রাইতেই তো নিয়া গেছে। আমার নাও দিয়াই রাইতে পাড় হইল। গোঁ গোঁ করতাছিল ব্যাতায় বেডিডা। আহারে! তহনই হুনলাম মালায়োন গো কিচ্ছাকালাপ। আল্লাই জানে বাইচ্চা আছে নি। বউ বাইচ্চা থাকলেও প্যাডের ছাওয়াল মইরা গ্যাছে এইডা নিশ্চিত মিয়া। আল্লার একটা নেয়ামতরে কইল্লা হালারপুতে জগতেই আসতে দিল না। দাজ্জাল আইসা গেছে পিথীবিতে, বুঝছ মিয়া, আর রক্ষা নাই। লও বিড়ি টানো মতিন।

মতিন হাত বাড়িয়ে কমুউদ্দিনের বিড়ি নিয়ে নেয়। টানটে টানটে শেষ করে দেয় সেটি। কেমন অস্বস্তি উপস্থিত হয় শরীরের রক্তে। মতিন বুঝতে পারে না, অসুস্থতা নাকি নারীর অবিচারের বিরুদ্ধে সহানুভবতা। আর কোন কথা হয় না তাদের। একটি বিষণ্ণ-বিপন্ন শরীর ভেসে উঠে খাঁ নদীর দর্পণে। মতিনের চোখের উঠোনে। মুখ দেখে মনে হয়, দিলু বানু। তার গৃহিণী। তীব্র আর্তচিৎকারে কেঁদে উঠছে সন্তান হারানোর বেদনায়। রক্তে শোভিত হয়ে আছে দুটো পায়ের মাংস। লোম। মনে হয় আলতা দিয়ে সজ্জিক করার অভিপ্রায় সমস্ত আতলা অবাধ্যের মত পায়ের আঙ্গুলে লেপটে গেছে। বিশ্রী সৌন্দর্যে রাঙা হয়ে উঠেছে চরণ। ভেসে উঠেছে মুখের দিকটায় নিদারুণ যন্ত্রণার প্রপাত, যেখানে সান্ত্বনা দেবার সাহস হবে না কারো। মতিনের বুকে কিঞ্চিৎ ব্যথা উদিত হয়। আরো অস্বস্থিবোধ। অনুতাপে-অপমানে মাথা নত হয়ে যায়। একজন স্বামীর যতটুকু হওয়া উচিত। কইল্লা মালায়োনের যতটুকু হওয়া উচিত ছিল।

নৌকা পাড়ে পৌঁছাতেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল যাত্রীদের। অবাধ্য মহিষের মত একত্রে লাফিয়ে পড়ল জমিনে। সকলকে ব্যস্ত মনে হলো। যে লোকটি চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘন্টা ঝিমানোর অভিজ্ঞতায় নিজেকে অলস করে তুলেছে, সেও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। বৃক্ষছায়ায় কটনবারে কান চুলকাতে চুলকাতে প্রায় অকপটে ঘুমিয়ে যাওয়া মানুষটির হাতেও সময় রইল না কোন। অধৈর্য ব্যাপারটি অনুকরণের ফসল, একজন অধৈর্য হয়ে পড়লে সকলেই অধৈর্য হয়ে উঠে। মতিনও অনুকরণপ্রিয় ছিল, আজকের দৃশ্যপট ব্যতিক্রম। স্থির হয়ে কিয়ৎক্ষণ বসে রইল। উদরাময় তাকে দুর্বল করে দিয়েছে। বসা থেকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠলে কেমন চক্কর দেয় মাথা। ঝিমঝিম করে শরীর। হাত-পা অকেজ হয়ে আসে। মতিন দাঁড়িয়ে রইল নৌকায়।

কমুউদ্দিন আওয়াজ দিল— মতিন মিয়া শরীরডা এহন কেমন অ্যা? হুনছিলাম তো, বদহজম হইছিল।
— হ, ঐআর কি! এহন আছি ভালাই, ম্যালাখন বইয়া থাকলে একটু চক্কর দেয় মাতা। স্যালাইন ট্যালাইন খাইলেই ঠিক হইয়া যামু কমু ভাই। ও, তোমার নাও ভাড়া পরে দিমু নি। মনে রাইখ।
— তুমিই মনে রাইখ। আর সময় পাইলে রাইতে আইয়ো লুড়ু খেলতে, তুমি তো মিয়া লাট সাহেব হইয়া গেছ।
— না কমু ভাই, শরীর সাস্ত খারাপ। আর জানোই তো, আমার অবস্তা। দুইবেয়ান খাইতেই কষ্ট হইয়া যাইতাছে। তার উপার বেরামে পড়লাম। দেহি আইজকা আমু নে একবার। কইল্লার বউডার কতা হুইনা মনডা খারাপ হইছে!
— হ মিয়া। যাও, রাইতে দেহা হইবো।
— ঠিক আছে কমু ভাই।

মাথায় পাতিল চেপে মতিন হাঁটছে। ঘাট থেকে বেশি দূরের পথ নয়। সকাল সকালই ভিড় জমে উঠে আড়তে। কত রকমের মাছ এসে জমা হয়। কত জেলের পরিশ্রম একত্রিত হয়ে থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি করে, তার খোঁজ রাখে না কেউ। সবাই ব্যস্ত নিজের চাহিদায়। পছন্দ মত মাছ নেবার উদ্দেশ্য পূরণে। সকলের প্রয়োজন মিটে গেলে মহাজনের পসারে স্বস্তি ফিরে আসে। কোলাহল মুক্ত হয়ে যায়। মহাজন তখন ব্যস্ত হয়ে পরে টাকা গণনায়। টাকায় আর কথায় মহাজন পাকাপোক্ত। সে-ই তার কলিজার জিগার যে এই দুই বিষয়ে পরিষ্কার। ভ্যাজালমুক্ত। বাকিরা মহাজনের কাছে আবর্জনা।

মতিনকে দেখতে পেয়েই গলা খাকারি দেয় মহাজন আরে মইত্তা নি, এমনে আয়, এমনে। নাটকির পো দুইদিন আহোছ নাই ক্যা? হেদিন যে কইয়া গেলি বাকির টাহা কালকাই দিবি, কই তারপর থিকা তো তুই হাওয়াই। চোদানীর পো, তোর কাইল আর অয় না। মহাজনের লগে দুনম্বরী করো। তিন হাজার ট্যাকা পরিশোধ করতে তো আখিরাত চইলা আইবো রে।

মজাহনের পাশে বসে থাকা সার্গিত হেসে উঠে নেতা, মতিন্না মনে কয় হাশরের ময়দানেই ট্যাকাটা দিব। হালায় তো মিনমিনা শয়তান।
মতিন কাছে এসে উত্তর দেয় না মহাজন, কি কন, আপনার ট্যাকা কি মাইরা খামু আমি কন? আপনার লগে কি আমার আইজকের সম্পর্ক। দিয়া দিমু ট্যাকা। বিছনায় পইরা ছিলাম এইকয়দিন, পীঠ একেবারে লাইগা গেছিল। বদহজম হইছিল।
 অ, বদহজম হইছিল। খাইবা তো উল্টাপাল্টা আর হাগবা সন্দেশ, হেইডা কি অয় অ্যা। ট্যাকা আনছস আমার?

‘জে, মানে, আনছি মহাজন। তয়…’ মতিন কার্পন্য স্বরে উত্তর দেয়। ভেবেছিল মহাজনকে বলে আরেকটু সময় চেয়ে নিবে আজ। তিন হাজার টাকা কার্য করেছিল গত মাসে, এক হাজার পরিশোধ করেছে।

‘মাশাল্লাহ, দে ট্যাকা দে। আবার তয়ফয় কস ক্যা?’ মহাজন চোখ বিটলা করে তাকায় মতিনের দিকে। ‘এক মাস লাগে নি দুই হাজার টাহা দিতে অ্যা? দে ট্যাকা দে বাপ, তারপর কি মাছ নিবি নিয়া ভাগ এইহান থিকা। আইজকে মেজাজ চওড়া আছে, মাছের ট্রাক আটকাই রাখছিল ঠোলার পুতেরা। ঠোলার ঘরে ঠোলা, ঘুষখোরের নাতিরা, চোদানীর পোঁরা। ম্যালা টাহা লাগছে, বিপাকের সময় পাওনা ট্যাকা মস্ত ব্যাপার। দে টাহা দে।’

মহাজনের কাছে তিন হাজার টাকা তেমন কিছু নয়, তবুও এভাবে চাইল যেন মতিন আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পাড়ল না। দাঁড়িয়ে রইল নিশ্চুপে, মাছের চোখের মতন নিথর চোখে। দুর্ভিক্ষে জীবিত পুরুষের মত, অসহায় দল হারিয়ে ফেলা হাঁসের মত, ঝরে পড়া পাতার মত। বুঝতে পাড়ল আজ মহাজন নাছোড়বান্দা টাকা হাসিলের নিমিত্তে। ভাঙ্গা হাতে কোমড় হতে পনেরশো পঞ্চাশ টাকা বেড় করে মহাজনের হাতে তুলে দিল সে। চোখ তুলল না মহাজন, টাকা হাতে নিয়ে দেখল পনেরশো পঞ্চাশ টাকা তুই দেহি ভালো খেইল শুরু করছস রে মইত্তা। পনেরশো পঞ্চাশ দেছ ক্যান? কত পাই?
মতিন সহজ কণ্ঠেই উত্তর দেয় আর নাই মহাজন, বাকিডা কাইলকে দিয়া দিমু।
মহাজন গালি দেয় হালারপুত, ট্যাকা নিলে আর দিবার চাও না। কালকা নিয়া আসবা। যা সামনে থিকা!

মহাজন কাজে মন দেয়। মতিন দাঁড়িয়ে থাকে, সরে যায় না। কিছু বলার সাহস হয় না। দাঁড়িয়ে থাকে। অপেক্ষা করে মহাজন কখন লক্ষ করবে তাকে। কখন জিজ্ঞেস করে উঠবে, কি চাই তোর আবার? হালারপুত, এহনো খারাই আসোছ ক্যা? করে না। কাগজে কলমে মিলবন্ধন হয় না। মহাজন পান খায়, মাছ বিক্রির টাকা নেয়, উঠে দাঁড়িয়ে কর্মচারীদের তদারকি করে। মতিনের দিকে চোখ রাখে না। মতিনের মনে হয়, সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র হয়ে গেছে বোধহয়। কেউ তাকে দেখছে না। অথবা আবর্জনা হয়ে গেছে। ফেলে দিতেই স্বস্তি পাচ্ছে মহাজন। হাহাকার করে মতিনের বুক। মাঝে মধ্যে ঝাপসা হয়ে আসে চোখের আলো। বুক ফুলিয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নেয় যখন, তখন ভাবে, সব মাছ যেন ফুঁড়িয়ে না যায়। মহাজনের পসার যেন খালি না হয়। তার জন্যে যেন কিছু মাছ অবশিষ্ট থাকে। নইলে বাড়ি ফিরবে কি নিয়ে!

উদ্দেশ্য সফল করে চলে যায় পরিশ্রমী শ্রমিক। স্বস্তি নেমে আসে পসারে। উটকো ঝামেলা নেই এখন। শান্ত হয়ে এসেছে আড়ৎ। হাসি ফুটে উঠেছে মহাজনের অবয়বে। ছ্যাপ দিয়ে টাকা গুনছে তর্জনি আর বুড়ো আঙ্গুলের ঘর্ষনে। এখন সময় বারোটা। মতিন মহাজনের কাছে এসে দাঁড়ায়। মহাজন টাকা গোনা শেষ করে পরিতৃপ্তির হাসি দেয় মতিনের দিকে চোখ রেখে। না মতিন অদৃশ্য হয় নি- কিরে মইত্তা, ব্যাবাক মাছ তো শ্যাষ হইয়া গেছে। মাছ দি কিনলি না অ্যা? যা যা, বাড়িত যা। কালকা ব্যায়ানে আইয়া চারশো পঞ্চাশ ট্যাকা দিবি আগে, তারপর অন্য কতা কবি আমার লগে। যা, খাড়ায় থাকিছ না।

মতিনের ইচ্ছা হয় ছুটে গিয়ে মহাজনের পা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে। হয় না, বাঁধা বোধ করে। লজ্জাবোধ জন্মায়। অযথা গৌরববোধ হন্মায়। আবর্জনারও তো মূল্য আছে হে। ‘মহাজন, আইজা একটু দয়া করেন।’ একটা ক্ষীণ কণ্ঠে আওয়াজ তুলে মতিন। ‘কাইলকে ট্যাকা দিয়া দিমু আফনেরে। আমারে কয়ডা মাছ দ্যান। বাড়িত পোলাপাইন না খাইয়া থাকবো। ট্যাকা তো আফনে নিয়া নিছেন। ট্যাকা নাই আর!’

মহাজন খিটখিটে কণ্ঠে বলে উঠে- ট্যাকা নিয়া নিলাম কই অ্যা, পাওনা ট্যাকা দিছস। পরিশোধ করছস। মাছ তো নাই, তুই আইজকা বাড়িত যা গা মইত্তা।

মতিন দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় কেউ তাকে স্টপ্‌ বলেছে, ঘন্টা দিতে ভুলে গেছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিয়ৎক্ষণ নীরবতা বয়ে যায় এখানে। স্বাধীনতাহীন নীরবতা। মহাজন আওয়াজ তুলে- দ্যাখ গিয়া, ঐযে ওই জায়গায় কয়ডা রুইয়ের পোনা আছে। পইচা গ্যাছে মনে কয়। তয় ভালোই আছে। নিয়া যা। আঠারোডা আছে, দাম কিন্তু দিতে হইবো মইত্তা।

‘হ্ দিমু মহাজন। কাইলকাই দিমু।’ মতিন রত্ন পায়। ছুটে যায় রত্নের দিকে। রত্নে পচা গন্ধ। রত্নগুলো বাধ্যের মত বেড়িয়ে পরে পসার থেকে মতিনের পাতিলে। মহাজন তাকিয়ে থাকে ভাবলেশহীন মুখে। তবে ক্ষাণিকবাদে হাসি দেয়, বদ হাসি। যেন একটি বিজয় হয়েছে তার। জুয়ায় জিতে গেছে।

রাত হয়ে এসেছে। আষাঢ়ের রাত। ব্যাঙের শব্দ ঝিঁঝিঁর শব্দে মিশে শব্দ দূষণ করছে। ক্ষাণিকবাদে মতিন ব্যথায় কাতরিয়ে উঠছে- আমারে ছাইরে দ্যান, ব্যাবাগ গুলান না খাইয়া থাকবো।

এখানেই বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। গ্রামের মানুষ যা করার করে দিয়েছে। নাকে-মুখে রক্ত জমাট বেঁধেছে। অপরাধ ছিল, পচা রত্নগুলোকে রক্ত দিয়ে লাল করতে চাওয়া। তাজা করতে চেয়েছিল হাতের রক্তে। শরীরের রক্তে। আঠেরোটি রত্ন যখন বাজারে চলল না। যখন সে ব্যর্থ হলো। বিকেল নেমে আসবে বলে তৈরি হলো। হিতাহিত জ্ঞান লুণ্ঠিত হলো। তখনই মতিন হাত কাটতে শুরু করল। নিজের টকটকে লাল রক্ত পচা মাছগুলোর গায়ে লেপটে দিতে কুণ্ঠিত হলো না। পাপেপুণ্যে মিলেমিশে হিজিবিজি হয়ে উঠল। ধরা খেল, হাতেনাতে ধরা। গাছে বেঁধে কোনটা পাপ কোনটা পুণ্য তার তফাৎ বুঝিয়ে দিল গ্রামের সাহসীরা। বুঝতে চাইল না, মাটিতে কখন মিশে যায় দরিদ্র। তলিয়ে যায় ব্যাঘাতময় নলখাগড়ায়, বিবেকের জাহান্নামে। নিজের হাত কেটে পচা মাছগুলোর ব্যর্থ সৌন্দর্য বর্ধনে উঠেপড়ে লেগে যায়, নির্বোধের মত রক্ত খাওয়াতে চায় মাছগুলোকে। পিতার মনে জেগে উঠে কখন সন্তানের ক্ষুধার্ত মুখ, তেলেঝোলে মিশ্রিত মুখচিত্র। কিছুই বুঝল না, কিছু না!

মতিন আবার কাতরিয়ে উঠে যাইবার দ্যান আমারে। ব্যাবাগ গুলান না খাইয়া থাকবো, আমি ঠকবাজ না! বিশ্বাস করেন আমারে। যাইবার দ্যান, যাইবার দ্যান।

কেউ আসে না। কেউ শুনে না। কেউ না।

  • ৩ 

মতিন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। চাঁদ নেই। জ্যোৎস্না নেই। তারা নেই। দূরে তাকালে দেখা যায় ওপাড়ের জ্বলে থাকা সংখ্যালঘু আলো। একটি আলো মতিনের বাড়িরও হতে পারত। হ্যারিকেনের আলো। মিশে যেত বিদ্যুতের হলুদ আলোয়। আলাদা বলতে কিছুই থাকত না। কিছুই না। অথবা নিভে যেত। মেয়েরা ঘুমিয়ে যেত কলা পোড়া খেয়ে। মুড়ি খেয়ে। শুধু দিলু বানু জেগে থাকত। জেগে থাকত, চিন্তা নিয়ে বুকে। শব্দ শুনে বারবার কান তুলে ধরত। তন্দ্রা চলে যেত। বাতাসের শব্দকে মনে হতো, মতিনের নিশ্বাস। প্যাঁচার পাখা ঝাপটানো শব্দে মনে হতো, পরিচিত পুরুষের পা।

মতিন দাঁড়িয়ে আছে নদীর প্রান্তরে। কমুউদ্দিনের নৌকা বন্ধ গিয়েছে দশটায়। ওপাড়ে যেতে হলে সকাল হতে হবে আবার। মতিন দাঁড়িয়ে থাকে চালের পুঁটলি হাতে। বুড়িমা ধরিয়ে দিয়েছে যেটি। মাথায় হাত রেখে বলেছে- ক্ষিধার কষ্ঠ সগলে কি বোঝে বাপজান, আমি বুঝি। খরাত কইরা পাইছি চাইলগুন, নে, নিয়া যা। ছাওয়াল গুনের মুহে খাওন দে। আহারে বাপধন আমার, কি মাইরটাই না মারছে!

দরিদ্র দরিদ্রকে বুঝে। সম্মান বুঝে। সাহায্য বুঝে কিংবা বুঝে না, ক্ষুধা কি জিনিস তাতো বুঝে!

হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মতিন। বুড়ির পায়ে পড়েই কাঁদে। এবার লজ্জাবোধ থাকে না কোন। দীনতা-অহংকার থাকে না। কাপন্য থাকে না। বুড়ি মুক্ত করে দিয়েছে তাকে, পাড় করে দিয়েছে ভয়ঙ্কর পরিণতিকে। ভয়কে। বিশ্রী সময়কে।

মতিন দাঁড়িয়ে আছে নদীর জলে বুক ডুবিয়ে। আষাঢ়ের রাত, জলের শীতলতায় শরীরে কিয়ৎক্ষণ জ্বালাতন তারপর স্থিরতা। অন্ধকারের অন্ধকারে মতিনের যাত্রা। বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা। চালের পুঁটলি বাঁ হাতে তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। ঐযে দেখা যায়, এই হাতটি বটি দিয়ে কেটেছিল রক্তের প্রয়োজনে। খাদ্য জোগাড়ের প্রয়োজনে। সন্তানের ক্ষুধা মিটানোর প্রয়োজনে। আদর্শ বাপ হয়ে উঠবার আশায়।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


দ্য লাস্ট খন্দকার

দ্য লাস্ট খন্দকার


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা