Saturday, May 2nd, 2020
“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”
May 2nd, 2020 at 11:02 pm
“পার্টি পোয়েট রেপিড টেস্টিং কিট”

মাসকাওয়াথ আহসান: 

সম্প্রতি আমার খুব প্রিয় একজন কবি নিজেকে ‘আওয়ামী লীগের কবি’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে আমার প্রিয় আরেকজন কবি জামায়াতের কবি হিসেবে নিন্দিত হয়েছিলেন। কবির একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হয়তো থাকতে পারে; কিন্তু ‘দলীয় কবি’ কখনো সমগ্রের কবি নন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেইকালে গান্ধীজীর দেয়া ‘কংগ্রেসের কবি’ হবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি তার ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে দেশপ্রেমের নামে মানুষ ঠকানোর এই রাজনীতি ব্যবসার স্বরূপ উদঘাটন করেছেন। আজ এতোকাল পরে সমসাময়িক চিন্তক ইউভাল নোয়াহ হারারি জাতীয়তাবাদের যে ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কত আগে এ সম্পর্কে আলোচনা করে গেছেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই রাজ কবি ও অরাজ কবি, রাজ সুফি ও অরাজ সুফির উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই। তারমানে দলীয় কবি ও মানুষের কবি দু’রকম কবির উপস্থিতি এ সমাজে আবহমানকাল ধরেই রয়েছে।

কবি একজন চিন্তক; শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সে চিন্তক। একজন চিন্তকের পক্ষে কায়িক পরিশ্রম করা কঠিন। ফলে জীবন নির্বাহের জন্য ন’টা-পাঁচটা কাজ করা কঠিন। কারণ কবিতা নিজেই একটি ফুল টাইম জব।

ভারতীয় উপমহাদেশের বাস্তবতায় রাজকবি আর সামাজিক মাধুকরীতে অরাজ কবির বিকাশ আমরা দেখতে পাই। ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ গভীরভাবে কবির অনুরাগী। ফলে রাজা-বাদশাহ’র পক্ষে প্রচার চালিয়ে বেড়ানো সুফিদের বিপরীতে বিদ্রোহী অরাজ সুফিদের সমাজ লালন করেছে গভীর স্নেহে।

যারা রাজকবি ও রাজসুফি হয়েছেন; তাদের কিছু কবিতা হয়তো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজো বেঁচে আছে; কিন্তু আমাদের পাঠ অভিজ্ঞতায় অরাজ কবিদের কবিতাগুলোকেই বেঁচে থাকতে দেখি।

কবি চিন্তার রাজা; ফলে যে কোন রকম চিন্তার দাসত্ব তার জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ গানের দেশ; কবিতার দেশ; ফলে এখানে কবিতার গুরুত্ব অক্সিজেনের মতো।

বাংলাদেশ রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী-প্রশাসন-সেনা সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক রাজকীয় গণতন্ত্র। এইখানে ধর্মীয় বিভাজনের অনুরূপ এক রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। এইখানে হিন্দুধর্মের কুসংস্কার “তুই অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করেছিস; তুই অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছিস”; কিংবা ইসলাম ধর্মের প্রচলিত কুসংস্কার “তুই মহানবীর বিরুদ্ধাচরণ করেছিস; তুই কাফের হয়ে গেলি”; ঠিক এরকম কট্টর রক্ষণশীলতা কাজ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে। ফলে কবিকে ডেকে পার্টির ক্যাডাররা কলার ঝাঁকিয়ে বলতে পারে, আপনি আপনার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করুন। হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার মতো “দলীয় কবি” হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে বেড়াতে হয় কবিকে। মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে যেমন মসজিদে যেতে হয়; দলীয় কবি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে কবিকে “রাজনীতির মাজারে” যেতে হয়।

রাজনীতির মিডলম্যান হিসেবে যারা “ফইন্নি থেকে ফড়িয়া হয়ে অবশেষে ফন্ত্রী” হয়; তাদের জীবন সাদা অথবা কালো; টাকা আছে অথবা টাকা নাই; এরকম মোটাদাগে পরিচালিত।

কিন্তু কবির জীবন তো সাদা-কালো, টাকা আছে-টাকা নাই; এরকম হিসেবে চলেনা; কবির জীবনে আসল কথা, কবিতা আছে কীনা!

বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের সবচেয়ে বিকশিত শাখা। ষাটের ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশে কবিতার নবজাগরণ ঘটে। বাংলাদেশের কবিতা মানুষের মুক্তির সোপান রচনা করে। সেই সময়ের দীর্ঘকায় কবিদের খর্বকায় বানানোর যে দ্বি-দলীয় প্রক্রিয়া চলেছে; আল-মাহমুদ ও নির্মলেন্দু গুণ সেই অকাব্যিক কবি হত্যার দুটো ট্র্যাজিক উদাহরণ মাত্র।

কবি সে রাজকবি হোক কিংবা অরাজকবি হোক; পাঠকের কাছে বিবেচ্য তার কবিতা। যেসব সাদা-কালো দলীয় কীটেরা “পার্টি পোয়েট র‍্যাপিড টেস্টিং কিট” হাতে নিয়ে ঘুরে; তারা মিডলম্যান বা ফড়িয়া। এরা পঙ্গপাল হিসেবে কবিতার শস্যক্ষেত্রটি তছনছ করার চেষ্টা করে অবশেষে বঙ্গপাল হিসেবে বিদায় নেবে।

কিন্তু কবিতার শস্যক্ষেত্রে আল-মাহমুদ ও নির্মলেন্দু গুণ যে ফসল ফলিয়েছেন; তা নিঃশেষ করার ক্ষমতা যে রাজনীতি ও ধর্ম-ব্যবসার ফড়িয়াদের নেই।

বিদ্যমান বাস্তবতায় যে তরুণেরা কবিতা বা শিল্পের অন্যান্য শাখায় বিচরণে আগ্রহী; তাদেরকে দলীয় রাজনীতির প্রতি “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের” সুস্পষ্ট প্রত্যাখানটিকে আমলে নিতে হবে বলে মনে হয়। নিরাপোষ কবি জীবনানন্দ দাশ, আবুল হাসান, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কবিতাকে মৃত্যুপথের যাত্রী করেছেন; কিন্তু ভুল করে একবারও রাজকবি হবার কথা ভাবেননি। পদ-পদবী-পদকের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহবোধ তারা করেননি।

“উদিত দুঃখের দেশ”-এর কবি আবুল হাসান কবিতাকে ভালোবেসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন; বলেছেন, “মিলনই মৌলিক”। আবুল হাসান মৃত্যুকে মিলন বলেছেন; অথচ আবুল হাসানের কবিতার মৃত্যু হয়নি। কবিতা তৃষ্ণা নিয়ে ছুটে আসা পাঠকের সম্মিলনী হয়ে উঠেছে যেন।

Bangladesh writer
লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ

আরও খবর

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ

পররাষ্ট্রনীতিতে, ম্যারেজ ইজ দ্য এন্ড অফ লাভ


নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা

নিউ নরমাল: শহরজুড়ে শ্রাবণ ধারা


তূর্ণা নিশীথা

তূর্ণা নিশীথা


‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’

‘গণতন্ত্রের ঊষর মরুতে ক্যাকটাস’


ফিরে দেখাঃ এরশাদ

ফিরে দেখাঃ এরশাদ


এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে


গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!


করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন

করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন


ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ

ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ


বাংলাভাষীর আপোষের খনি

বাংলাভাষীর আপোষের খনি