Monday, August 29th, 2016
পুন্ড্রনগরীর জিউতকূপকান্ড
August 29th, 2016 at 12:06 pm
এটি একটি কাল্পনিক গল্প। কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের ও ভৌগলিক অবস্থানের নাম ব্যবহার করা হলেও এই বিনির্মিত গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের ও ভূগোলের কোন সম্পর্ক নেই।
পুন্ড্রনগরীর জিউতকূপকান্ড

মাসকাওয়াথ আহসান:

পুন্ড্র সুরম্য এক নগরী; জীবনের কোলাহল সেখানে প্রতিদিন। কিন্তু রাজা নল আর তার সেনাপতি নীলের রেষারেষিতে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকে। অবশেষে পরশুরাম এলেন ত্রাতা হিসেবে। নল নিহত হন নীলের অনুগত বিদ্রোহী সেনাদের হাতে। নল নিষ্ঠুর মানুষ; তিনি প্রতিরাতে বিদ্রোহী সেনাদের শূলে চড়াতেন। নীল ছিলেন স্বভাব কবি; তার সারাক্ষণ লোলুপ নজর থাকতো প্রজাদের সুন্দরী স্ত্রী-কন্যাদের দিকে। অবশ্য তার ধর্মে মতি ছিলো। প্রায়ই বিভিন্ন উপাসনালয়ে গিয়ে কাঁদতো, রাতে স্বপ্ন দেখেছি বাহে এই উপাসনালয়। তারপর ভোররাতের দিকে যখন বৃষ্টি হলো; বুঝলাম, এ শুভ লক্ষণ। এ রাজ্যে এখন একশো বছরের শান্তি বাহিত হবে। সাধু উপাসকেরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো।

pundra x

ওদিকে প্রয়াত রাজা নলের বিধবা স্ত্রী খল দেবী প্রতিদিন দেখা করতে যেতেন পরশুরামের সঙ্গে। বোঝাতে চেষ্টা করতেন, নীল সুবিধার লোক নয়; নারী লোলুপতা ঢাকতে কবিতা লেখে, উপাসনালয়ে যায়।

পরশুরাম বলেন, সে আসলে এইভাবে স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে যাবার কুবুদ্ধি করেছে। এর আগে কখনো পুন্ড্রনগরে ধর্ম নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি ছিলো না। আর আজকাল দেখেন ধর্ম নিয়ে কী মাতামাতি চলছে।

Parshuram jiyat kunda

খল দেবী পরশুরামকে বলেন, নীলের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।

প্রজাদের প্রবল প্রতিবাদ বিক্ষোভের মুখে নীলের শাসনের অবসান ঘটে। নীলকে কারাগারে বন্দী করে রাণী হয়ে বসেন খল দেবী।

খলদেবীর স্বামী রাজা নলের বলখির নামে এক ধার্মিক গোষ্ঠী নেতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো। সেইসূত্রে বলখিরের কিছু অনুসারী খলদেবীর মন্ত্রীসভার সদস্য হয়ে পড়ে। অকস্মাত পুন্ড্রনগরীতে বলখিরের একটা অশুভ বাতাস বইতে শুরু করে। আর খলদেবীর বড় মেয়ে কণিকা দেবী বলখিরের মেয়ে তামান্না খিরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে; উপাসনালয়গুলোর মূর্তি ভাঙ্গার শলা-পরামর্শ করে। আর পুন্ড্রনগরীতে কণিকা কর নামে একটি নতুন কর ধার্য্য হয় প্রজাদের কাঁধে। চীন থেকে জ্ঞানান্বষণে আসা বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে তৈরী করে নতুন ধরনের অস্ত্র; গোলাকৃতির পিন্ড ছুঁড়ে মারলেই যাতে আগুন জ্বলে ওঠে।

catapult

পরশুরাম চিন্তায় পড়ে যান। উনার সাহায্য নিয়ে যে খলদেবী রাণী হলেন; তার মেয়ে কণিকা এরকম হিংস্র হয়ে উঠেছে। পুন্ড্রনগরীর সেই আলোকপ্রভা সংস্কৃতি আজ কোথায়; চারিদিকে কপালে কালো ফেটি বাঁধা নারী আর জিকিরে ফিকিরে বলখির।

পুন্ড্রনগরীর কিছু পন্ডিত পুরবাসী পরশুরামের সঙ্গে দেখা করেন। পুন্ড্রনগরীকে কীভাবে বলখিরের হাত থেকে বাঁচানো যায় তার পরামর্শ করেন। পরশুরাম পরদিন সকাল থেকে মাথায় বলখিরের কালো পাগড়ি বেঁধে ঘুরতে থাকেন।

এতে করে নগরীর বলখির হাওয়ায় মাতোয়ারা মানুষেরা পরশুরামের ভক্ত হয়ে পড়ে। পরশুরাম পুন্ড্রনগরীতে খল দেবী ও তার মেয়ে কণিকার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেই জনসভাস্থলে নতুন অস্ত্র অগ্নি পিন্ড ছুঁড়ে মারে বলখির সন্ত্রাসীরা। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান পরশুরাম। পুন্ড্রনগরীতে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়।

porshuram

কারাগার থেকে ফেরা সাবেক স্বৈররাজ নীল পরশুরামের পাশে দাঁড়ান বড় ভাইয়ের মতো। খলদেবীকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার মেয়ে কনিকাকে লালমাইনগরীতে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরশুরাম রাজা হলেন ঠিকই; কিন্তু এরই মাঝে পুন্ড্রনগরীর ব্যবসা-বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে বলখিরের ব্যবসায়ীরা। দরবেশ নামে এক বলখির ব্যবসায়ী পুন্ড্রনগরীর অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে ফেলে।

balkhi

কৌশলে ব্যবসায়ীদের হাতে রাজদন্ড চলে যেতে থাকে। পরশুরাম সারাদিন আদর্শের কথা বলেন, স্বপ্নের কথা বলেন। পুন্ড্রনগরীর রুপ-জৌলুস ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকারের কথা বলেন। খলদেবীর খলকন্যা কনিকার ষড়যন্ত্রের দিকে সবাইকে চোখ রাখতে বলেন।

এসময় বলখির সংস্কৃতি এতোই মাথাচাড়া দেয় যে পরশুরামের পাশে বসে যারা অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র বলে; আসলে তারা বলখিরের ভাবনার লোক। এদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি ভীষণ ঈর্ষা; একপর্যায়ে সেটা হিংস্রতায় রুপান্তরিত হয়। পুন্ড্রনগরীর মানুষ যাতে বিদ্যালাভ করতে আগ্রহী না হয়; তাই কোন পন্ডিত দেখলেই সুশীল বলে গালি দিতে শুরু করে। এরা নানারকম গুপ্ত বাহিনী তৈরী করে যারা পুন্ড্রচেতনার বিপক্ষ শক্তি অপবাদ দিয়ে রাজ্যত্যাগে বাধ্য করে অনেককে। পন্ডিতেরা লালমাইনগরী, মহেঞ্জোদারো নানা স্থানে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যায়।

pundra y

আর ওদিকে বলখিরের সন্ত্রাসীরা তরবারি দিয়ে একে একে হত্যা করতে থাকে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের। অনেক চিন্তক পালিয়ে যায় পুন্ড্রনগরীর বাইরে। নগরীর কেন্দ্রে কনিষ্কের একটি মুন্ডুবিহীন মূর্তি স্থাপন করা হয়। এ রাজ্যে যারা থাকবে তাদের মুন্ডুগুলো হয় পরশুরাম কিংবা খলদেবীর মুন্ডুশালে জমা দিয়ে দিতে হবে।

পরশুরাম বলখিরের ক্রোধ উপশমে রাজ্যের ভূমি বরাদ্দ দেন। রাজ্যে শান্তি থাকলেই ব্যবসাবৃদ্ধি। রাতারাতি পুন্ড্রচেতনার করের বোঝা চেপে যায় প্রজাদের কাঁধে।

মুন্ডুবিহীন পন্ডিতেরা পরশুরামের সুবাতাস সভা আলো করে বসে থাকে। সবাই আশ্বাস দেয় পুন্ড্রচেতনার অধিষ্ঠান এ রাজ্যে হবেই।

ওদিকে মূর্তিভাঙ্গা থেমে নেই। বলখিরের আদর্শের লোকেরাই কখনো খলদেবীর লোক হয়ে ঘুরছে তো কখনো পরশুরামের লোক হয়ে ঘুরছে। প্রজারা বুঝতে পারে না; এসব হচ্ছেটা কী!

pundro

হঠাত পরশুরাম ঘোষণা করেন, রাজ্যের জলসংকট নিরসনে জিউতকুন্ড কুপ খনন করা হবে। এটাই হতে যাচ্ছে যুগান্তকারী এক উন্নয়ন পদক্ষেপ। রাজ্যের তরুণেরা প্রতিবাদ করে। এই কূপ খননে নিকটবর্তী বনভূমির ক্ষতি হবে।

পরশুরামের মুন্ডুবিহীন পন্ডিতেরা বলেন, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, লালমাই সর্বত্রই কূপ আছে। পুন্ড্রনগরীতে কূপ থাকলে সমস্যা কী! প্রতিবাদী তরুণেরা জানায়, কূপ খননে সব নগরীর নিকটবর্তী বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সবাই এখন নিকটবর্তী নদীর জল ব্যবহারের আগে ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে তারা আর কিছুই করছে না। পরশুরামের মুন্ডুবিহীন পন্ডিতেরা ঘোষণা দিয়ে দেয়, জিউতকূপের বিরোধিতা যারা করবে তারা পুন্ড্রচেতনার বিপক্ষের শক্তি।

well 3

এদিকে হাওয়া বুঝে খলদেবীও জিউতকূপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অমনি পরশুরাম পেয়ে যান মোক্ষম যুক্তি, খলদেবী যেহেতু পুন্ড্রনগরের চেতনার বিপক্ষের শক্তি; কাজেই বোঝাই যাচ্ছে এসব জিউতকূপবিরোধী প্রজা বিক্ষোভের মোহর আসছে তক্ষশীলা থেকে। যারাই এই কূপের বিরোধিতা করবে তারাই বালখিরের জঙ্গী এ আর বুঝতে বাকী নেই। বলখিরের মেয়ে তামান্না খিরকে অভিযান “আঘাত করো শক্তিমত্তা”য় পরশুরামের সেনারা হত্যা করে ঘোষণা দেয়, পুন্ড্রনগরী জঙ্গীবাদমুক্ত। ঐদিন একটি রুপোর থালায় প্রজাদের সামনে “তামান্না”-র খন্ডিত মস্তক দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের বান ডাকে পুন্ড্রনগরীর সুধীসমাজে। সুশীল সমাজ নিশ্চিত হতে পারে না; বলখিরের শেষ খেলাটা এখনো বাকী কীনা! তামান্নার মৃত্যুতে তার লালমাই নির্বাসিত সই কণিকা মন খারাপ করে বসে থাকে।

এরপর পুন্ড্রনগরীর কেন্দ্রে সুধীজনদের নিয়ে জিউতকুন্ড কূপ খনন নিয়ে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন পরশুরাম। পরশুরাম বলেন, এই জিউতকূপের বিশুদ্ধ জল পান করা যায়, মুখে দিলে সৌন্দর্য্য বাড়ে আর সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয়; এই কূপের জল দিয়ে স্নান করালে মৃতদেহ জেগে ওঠে। অযথা এই কূপ খননের সমালোচনা করলে, পুন্ড্রনগরীর জলসরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবো। নেন এইবার আপনারা প্রশ্ন করেন।

well digging

বাবুরাম নামে একজন পন্ডিত ব্যক্তি বলেন, লালমাই ভ্রমণে গিয়ে দেখেছি ওখানে নালার পানি বিশুদ্ধ করে কণিকা দেবীকে খেতে হয়। তার তুলনায় আপনি তো অনেক মহানুভব হে রাজাধিরাজ।

আমরাম নামে আরেক কূপবিদ বলেন, হে পুন্ড্রনগরের ভাগ্যবিধাতা; আমার আপনার ওপরে অগাধ বিশ্বাস আছে; সুতরাং আমার জিউতকুন্ড কূপের ওপর বিশ্বাস আছে। বিশ্বাসে মেলায় জল, তর্কে ক্ষরা।

সররাম নামে এক মহান বুদ্ধিবিদ বলেন, যারা জিউতকূপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও প্রচারণা চালাচ্ছে; এদের রুখতে হবে; পুন্ড্রচেতনার সুফল আমরা পেয়েছি; এখন মৃত্যু হলেও আমার কোন দুঃখ থাকবে না।

পরশুরাম বলেন, এখনি মরবেন কেন, জিউতকূপের জলে স্নান করে অমর হবেন, অপেক্ষা করুন।

পুন্ড্রচেতনার সওদাগর ফাতরাম সভায় বসে আনন্দে পৃথুল শরীর কাঁপিয়ে হাসে। পরশুরামের অনুসারী হবার পর থেকেই তার সুচিন্তক সুবাতাসে পুন্ড্রনগরীতে চেতনার খই ফুটছে। গুপ্তদলগুলোকে পাঠিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজকে অপদস্থ করছে। দম্ভের মেদে ফাতরাম ফুলছে তো ফুলছেই।

জিউতকুন্ড কূপ খননের সিদ্ধান্ত সর্বনামসম্মতিতে চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর আপ্যায়ন পর্বের সময় আমরাম পরশুরামকে জিজ্ঞেস করেন, হে জগতাধিরাজ আপনি যে বললেন জিউতকূপের জলে মুখ ধুলে সৌন্দর্য্য বাড়ে, তার প্রমাণ কিন্তু আমি নিজেই। আমি নানা সভ্যতার নানা-কূপের জলে মুখ ধুয়ে পরীক্ষা করেছি হে রাজাধিরাজ।

পরশুরাম কূপবিদ আমরামের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন, পুরো মুখমন্ডল জুড়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ।

maskaoath 2লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও ব্লগার


সর্বশেষ

আরও খবর

দেশে করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু

দেশে করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু


পুলিশ সদস্যরা জনতার পুলিশে পরিণত হবে: প্রধানমন্ত্রী

পুলিশ সদস্যরা জনতার পুলিশে পরিণত হবে: প্রধানমন্ত্রী


মানুষের মন থেকে পুলিশভীতি দূর করতে হবে

মানুষের মন থেকে পুলিশভীতি দূর করতে হবে


ফ্রান্সে ছুরি হামলায় ৩ জন নিহত

ফ্রান্সে ছুরি হামলায় ৩ জন নিহত


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ল ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ল ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত


কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত হচ্ছেন ইরফান সেলিম

কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত হচ্ছেন ইরফান সেলিম


বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ছাড়াল সাড়ে ১১ লাখ

বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ছাড়াল সাড়ে ১১ লাখ


করোনা: আরও ২৩ মৃত্যু, শনাক্ত ১৩০৮

করোনা: আরও ২৩ মৃত্যু, শনাক্ত ১৩০৮


সেনাপ্রধান ফেইসবুকে নেই: আইএসপিআর

সেনাপ্রধান ফেইসবুকে নেই: আইএসপিআর


ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন

ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন