Monday, June 22nd, 2020
প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট
June 22nd, 2020 at 4:34 pm
প্রসঙ্গঃ গ্রাম্যতার সংকট

মাসকাওয়াথ আহসান:

গ্রাম শব্দটা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুভূতির মতো আরেকটি অনুভূতি হিসেবে সমাজে চালু থাকায় “গ্রাম্যতা” শব্দটা ব্যবহার করাটা ব্লাসফেমাস অপরাধ যেন। কাউকে গ্রাম্য বললেই সে গাল ফুলিয়ে একটা অপরাধ বোধ দিতে চেষ্টা করে।

কিন্তু সমাজ প্রগতির জন্য গ্রাম্যতা ঝেড়ে ফেলতে তো হবেই। গ্রামের যে বিষয়টি সব সময় প্রশংসার; তা হচ্ছে এর নিসর্গ। তাই ফাঁপা উন্নয়নের বিজ্ঞাপনে “গ্রামগুলোকে শহরে রূপান্তরে”র বিপক্ষে আমি। পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে রাস্তাঘাট সংস্কার; প্রকৃতি বান্ধব এক-দুই তলা দালান তোলা যায়। কিন্তু গ্রামের মধ্যে উন্নয়নের বালিশ বসন্ত কিংবা কাছিম করোনাজনিত লুন্ঠিত টাকায় গড়ে তোলা সুউচ্চ দালানগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবার পক্ষপাতি আমি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। আর প্রবাসীরা সৌদি রাজবংশের শান-সৌকত দেখে এসে যে সুউচ্চ দালান তুলেছে; তার দুই তলা পর্যন্ত রেখে বাকিটা ভেঙ্গে দিতে হবে; পরিবেশের স্বার্থে; আমাদের পরের প্রজন্মের বেঁচে থাকার স্বার্থে।

গ্রাম্যতা কী? গ্রাম্যতা হচ্ছে নিজের চরকায় তেল না দিয়ে প্রতিবেশির শয়নকক্ষে ফুচকি দেয়া; তারপর পাতকূয়ায় জল নিতে এসে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সখিদের উকুন তুলতে তুলতে ফুসুর ফাসুর করা।

এই গ্রাম্যতা কেবল গ্রামেই আছে; তা কিন্তু নয়; দক্ষিণ এশিয়ার এই গ্রাম্যতা জিনের মধ্যে করে লন্ডন-নিউইয়র্কেও বহন করে নিয়ে যায়; নতুন টি শার্ট ও জিনস পরা; গ্রামের সবুজ লুঙ্গি ও মোটা ধুতির নিও নাগরিকেরা। এ কারণে ফেসবুকে দেখবেন, নিউইয়র্কে সামাজিক ভাতায় বেঁচে থাকা দক্ষিণ এশীয় লোকটি; এসে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে লিখছে, ইনুর সঙ্গে তিনুর কীসের সম্পর্ক। যেহেতু ছোট বেলায় মাকে দেখেছে; উকুন তোলার সময় অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আকথা-কুকথা বলছে; ঔ পরচর্চার নেশা নিউইয়র্কে জিনে করে এনেছে সামাজিক ভাতার বিশ্রামে হত সন্তানটি।

গ্রামে তার মায়ের জীবন ছিলো দিনমান হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের; জীবনে বিনোদন বলতে সন্তান উতপাদন ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। একঘেয়ে জীবন মানুষকে তিক্ত করে; তাই বৈচিত্র্য খুঁজতে অন্যের বাড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে ফুচকি দিতে হয়। কিন্তু নিউ ইয়র্কে তো নির্মল বিনোদনের অভাব নাই। কিন্তু ঐ যে জিনের কামড়; ফেসবুক খুললেই অন্যের টাইম লাইনে ফুচকি দিয়ে একটু হিংসা সঞ্চার হলেই; অন্যের বেড রুমের খবর নিতে তারায় তারায় রটিয়ে দেয়; ইনুর সঙ্গে তিনুর কীসের সম্পর্ক।

নিদারুণ দারিদ্র্যে বসবাস করায়; জীবনে সামাজিক ভাতার সচ্ছলতা আসার পরেও গ্রাম্যতার বিষ শরীরে চুলকানি তোলে। তখন সে সুখি মানুষের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে। এই গ্রামের লোকটি কিন্তু সাহিত্য টাহিত্যও করতে চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু গ্রামের প্রামাণিক হয়ে ওঠার ইচ্ছাটা থাকবে। ওটা যে শৈশবের স্বপ্ন। তাই সাহিত্য চর্চার গ্রাম্য ফরমেটে তখন কুঁচ কুঁচ করে বিভিন্ন লেখকের টেক্সট থুয়ে তার ব্যক্তিগত জীবনের পাঁচালী গাইবে; একই রকম শৈশবের প্রতিশোধ পরায়নেরা জার্মানি-সুইডেন-আম্রিকা থেকে এসে তার পোস্টে হুটোপুটি খাবে; কারণ শৈশবের পাতকূয়ার কাদায় গড়াগড়ি না খেলে তার জিনের চাহিদা পূরণ হয়না।

গ্রাম্যতা হচ্ছে বন্ধুকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। “অমুকরে যদি ফ্রেন্ডলিস্টে রাখেন; তাইলে আমারে আনফ্রেন্ড করুন” এটা গ্রাম্যতার আরেকটি চিহ্ন। পিএইচডি বা মাস্টার্স করে গ্রাম্য এই ঘোষক “এরিয়া অফ প্রাইভেসি”, “ফ্রিডম অফ চয়েস”, “মাইন্ড ইওর ওন বিজনেস” এই নাগরিক সোনালী সূত্রগুলো শিখতে পারেনি।

আরেকটা গ্রাম্যতার ধারা তৈরি হয় ঢাকা, কলকাতা, করাচির মতো শহরগুলোতে। বাপ বা দাদা বৃটিশ-পাকিস্তানী-ভারতীয় বা বাংলাদেশী শাসকের সহমত ভাই হয়ে; শহরে একটা প্লট বাগিয়েছে; ব্যস সঙ্গে সঙ্গে পোচন্ড এলিট হয়ে পড়েছে আধা খ্যাঁচড়া গ্রাম্য শহরগুলোর নিও এলিটেরা। এরা আবার শহুরে হিসেবে নিজের অবস্থান চিহ্নিত করতে সারাক্ষণ অন্যকে ক্ষ্যত বলে গালি দেয়। একান্ত বিরক্ত হয়ে অন্যকে ক্ষ্যত বলা লোকেদের অভিনেতা মোশাররফ করিম মাঝে মাঝে “ফইন্নির ঘরের ফইন্নি” হিসেবে অভিহিত করেন। কাউকে সুইমিংপুলে চিত হয়ে শুয়ে উন্নয়ন ও জিডিপি গর্বে গর্বিত কাতলা মাছের মতো মুখ করে শো অফ করতে দেখলে; এই বিশেষণ তার প্রাপ্য হয়ে যায় আপনা আপনি।

আনন্দবাজার পত্রিকার সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে, “খয়রাতি ” শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সেই “ফইন্নির ঘরের ফইন্নি”র প্রবণতা দৃশ্যমান। মিডিয়া হিসেবে গ্রামের প্রধান হবার উদগ্র বাসনাটিই আনন্দ বাজার। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০০৬ সালে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় এসেছিলেন। সেখানে প্রায় সাঁঝে উনার রুমে যেতাম লেখালেখির এই শিক্ষকের কাছে কিছু শিখতে। সাংবাদিক সুপ্রিয় বন্দোপাধ্যায় আমাকে নিয়ে যেতেন। সুপ্রিয়দা আনন্দ-আড্ডার কারিগর।

সুনীলদার ঘরে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতেন আনন্দবাজারের এক মিডিয়া ম্যানেজার। হাতে তার চামড়ার থলে। মনে হতো সুতানুটির পাটের ব্যবসায়ী ফ্রাংকফূর্টে এসেছেন বইয়ের ব্যবসার খোঁজে। ঐ লোকটির বসে থাকার মধ্যে থানার দারোগা টাইপের ভাব ছিলো।

সে যে সুনীলদার চাকরিদাতা; এটা সে সবার সামনে বলে গর্বভরে। কতটা গ্রাম্য হলে একটা লোক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষকে এভাবে বিড়ম্বিত করতে পারে। সুনীলদার কাছে অন্য যারা আসতো তারা শিল্প সাহিত্যের লোক। সেইখানে এই একটি গ্রাম্য মাতবর সুনীল- সন্ধ্যার মৌতাতটাই নষ্ট করে দেয়। এই লোকের পাশের চেয়ারে আমি গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতাম; আরেক গ্রাম্য মাতবরের মতো। কারণ শহরের সঙ্গে শহরের মতো করে মিশতে হয়; আর গ্রামের সঙ্গে গ্রামের মতো করে। এই লোক ধীরে ধীরে আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়; কারণ গ্রাম্য লোক আরেক গ্রাম্য লোক পেলে খুশি হয়; একটা সাইড লাইন গল্প করার সুযোগ পায়। লোকটি তার জীবনের সাফল্যের গল্প করে, কোন কোন লেখককে জনপ্রিয়তার চাঙ্গে তুলেছে, কাকে কাকে পুরস্কার দিয়েছে; তার বর্ণনা দেয়। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। কারণ চোখে মুগ্ধতা না থাকলে চোখ এক্সরে করতে পারেনা সামনের লোকটিকে।

লোকটি আমাকে ডেকে লিফটের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন, সুনীল তোমার লেখা বেশ পছন্দ করেন। আমাকে তোমার “অদ্ভুত আঁধার এক” উপন্যাস দিয়েছে। ঘচাং করে চামড়ার থলের চেইন খুলে বইটা দেখাতে গিয়ে উনি টলে গেলেন। সুনীল সাঁঝে যেহেতু খুশি জলের ফোয়ারা ছুটতো। তাই টলটলায়মান সিনিয়ার এই সিটিজেনকে ট্যাক্সি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। হাজার হোক বাপের বয়েসী একটি লোক। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি আমাকে পান্ডুলিপি পাঠাও; তোমাকে সুনীল বানাতে চাই। আমরা লেখক বানাই।

আমি উনাকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমি আসলে কিছুই হতে চাইনা; এটাই আমার এম্বিশান। আমি জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো উদযাপন করতে চাই। আপনার এই স্নেহভরা প্রস্তাব উদযাপন করলাম ওতেই আমি খুশি। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আশীর্বাদ করলেন। আমি উনাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এসে আবার যোগ দিলাম সুনীলদার আসরে।

আমি গ্রামের মানুষ; এখন ভার্চুয়াল বিশ্বগ্রামে থাকি। ইট-পাথরের সীমিত সবুজে শৈশবের আড়ানী গ্রামের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি। আড়ানী গ্রামে বিস্ময়করভাবে কোন গ্রাম্যতা নেই। শুরুতেই একটা অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বাতাবরণে জনপদটি গড়ে ওঠায়; ওখানকার মানুষ আড্ডা দিয়েই একটা জীবন পার করে দেয়। ঝগড়া-গালাগাল খুব অপছন্দ ওগ্রামে। রাজশাহী বা ঈশ্বরদী থেকে হাফ এন আওয়ার ড্রাইভে পৌঁছে যাওয়া যায় আড়ানীতে।

“গ্রাম্যতা” শব্দের ব্যবহারে আশা করছি কেউ আহত হবেন না। আমি সাধারণতঃ আত্মসমালোচনাই করি। আগামি প্রজন্মকে একটি সভ্য সমাজে দেখতে চাই বলেই; সমাজ সংস্কারের প্রবল আকাংক্ষা নিয়ে বাঁচি। আমাদের জীবন কলতলা আর পাতকূয়ার জটিল গ্রাম্যতাতে কাটলো ফুচকি ভাই-ঠিকুজি দাদার পরচর্চানন্দবাজারের লা গোবরিনা ফেস্টে”; আমাদের পরের প্রজন্মের জীবন কাটুক গ্রাম্যতার ক্লেশহীন বিশ্বগ্রামের জীবনানন্দে।

মাসকাওয়াথ আহসান


সর্বশেষ

আরও খবর

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে

এরকম ভীতিপ্রদ সমাজে নারী নির্ভয়া হবে কী করে


গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!

গুড বাই গোল্ডেন ফাইবার!


করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন

করোনাকালঃ ওল্ড নরমালে প্রত্যাবর্তন


ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ

ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের প্রয়াণ ও গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ


বাংলাভাষীর আপোষের খনি

বাংলাভাষীর আপোষের খনি


মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা

মুছে ফেলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বিভাজন রেখা


ভালোবাসার বাতিঘর

ভালোবাসার বাতিঘর


মানুষঃ অসীম ক্ষমায় আর সম্ভাবনায়

মানুষঃ অসীম ক্ষমায় আর সম্ভাবনায়


বর্ণবাদ নিপাত যাক

বর্ণবাদ নিপাত যাক


এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!

এ দেশে কেবল মানুষ বাস করে!