Thursday, June 30th, 2016
ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ইতিকথা
June 30th, 2016 at 3:06 am
ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ইতিকথা

সৈয়দা নীলিমা দোলা, ঢাকা: বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির শাসনের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। ১৭৬০ সালের ৩০ জুন, অর্থাৎ আজকের এই দিনে রংপুর অঞ্চল থেকে শুরু হয়েছিলো ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।  ফকির মজনু শাহ্ ছিলেন এই বিদ্রোহের প্রাণপুরুষ ছিলেন। পরবর্তীতে নাটোরের জমিদার দেবী চৌধুরাণীর সেনাপতি সন্ন্যাসব্রতধারী  ভবানী পাঠক এই বিদ্রোহে যুক্ত হয়ে হিন্দু বিদ্রোহীদের প্রেরণা ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে রংপুর অঞ্চলের সাধারন কৃষক নূরুল উদ্দীনও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আপামর কৃষিজীবীদের সংগঠিত করে এই বিদ্রোহে অংশ নেন।

গবেষকরা মনে করেন, এই ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বস্তুত এক অভূতপূর্ব জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূচনা করেছিল। সুদীর্ঘ ৪০ বৎসর যাবত পরিচালিত এই বিদ্রোহ ১৮০০ সালে শেষ পর্যন্ত কার্যত স্তিমিত হয়ে পড়ে। আবহমান বাংলায় মরমিধারার অনুরাগ ও আধিপত্যই মূলত এই বিদ্রোহের সারসত্ব ছিলো বলেও গবেষকরা দাবি করেন।

ফকির ও সন্ন্যাসীদের এই সুদীর্ঘ প্রতিরোধের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে লেখা হয়েছে, সম্ভবত কোম্পানি প্রবর্তিত রেগুলেশন দ্বারা মুসলিম ফকির ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের জীবনযাত্রা বিভিন্নভাবে ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হয় এবং এরই ফলে তারা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ফকির ও সন্ন্যাসীরা প্রধানত গ্রামাঞ্চলে তাদের অনুসারী ও সহমর্মী জনগণের নিকট থেকে দান গ্রহণ করে তার উপর ভিত্তি করেই জীবনধারণ করতেন।কখনো গান গেয়ে ভিক্ষা সংগ্রহও করতেন। আন্দোলনের শুরুর কথা কোম্পানি শাসকরা দেশের ধর্মীয় রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে মোটেও অবগত ছিল না; আর সে কারণেই ফকির-সন্ন্যাসীদের দান গ্রহণকে তারা জনসাধারণের নিকট থেকে অননুমোদিত অর্থ আদায় বলে মনে করত। কাজেই কোম্পানি ফকির-সন্ন্যাসীদের সংগঠিত দল কর্তৃক দান গ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে ফকির-সন্ন্যাসীরা ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে।

এই প্রতিরোধ আন্দোলন দেশের কৃষকশ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন লাভ করে। কারণ তারাও কোম্পানি কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন ভূমি রাজস্ব নীতির অধীনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আন্দোলনকারী ফকির-সন্ন্যাসীগণ ছিলেন মাদারিয়া সুফি তরিকার অনুসারী। এই সুফি তরিকা সতেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শাহ সুলতান সুরীয়া বুরহানার নেতৃত্বে বাংলায় প্রসার লাভ করে। সন্ন্যাসীগণ ছিলেন বেদান্তীয় হিন্দু যোগী এবং একদন্ডী সন্ন্যাসবাদের গিরি ও পুরী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ফকির ও সন্ন্যাসীগণ যথাক্রমে খানকাহ ও আখড়ায় বাস করতেন। সুফি ফকির ও যোগী সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মাচরণে যথেষ্ট সাদৃশ্য ছিল। এই সাদৃশ্য ও একাত্মতা কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মুল কারণ ছিলো অনেকটাই।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সংগঠক ও নেতা ছিলেন মাদারিয়া তরিকার সুফিসাধক মজনু শাহ্‌। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিহার ভিত্তিক মাদারিয়া সুফি তরিকার নেতা হিসেবে শাহ সুলতান হাসান সুরীয়া বুরহানার স্থলাভিষিক্ত হন। বিদ্রোহের নেতৃত্ব দানে তার খলিফা ছিলেন সুফিসাধক মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরাগল শাহ, সোবহান শাহ, করিম শাহ প্রমুখ। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহে সম্পৃক্ত জনৈক ভোজপুরী ব্রাহ্মণ ভবানী পাঠক তখন মজনু শাহর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। জমিদার দেবী চৌধুরানীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। তিনি বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দেন বলেও ধারণা করা হয়। ১৭৬০ সালে বিচ্ছিন্নভাবে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়।

১৭৬৩ সালে বিদ্রোহ পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহের রূপ নেয় এবং জোরদার হয়ে ওঠে। বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যস্থল ছিল কোম্পানির কুঠি, ইংরেজ শাসকের অনুগত জমিদারদের কাচারি এবং জমিদারি আমলাদের আবাসস্থল। বিদ্রোহীরা যুদ্ধে তরবারি, বর্শা, বল্লম, বন্দুক, অগ্নি নিক্ষেপক যন্ত্র, হাওয়াই ও ঘুর্ণায়মান কামান ব্যবহার করত। সমর সাজ ফকিরদের মধ্যে শুধু মজনু শাহ ও তার কয়েকজন খলিফা ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতেন। যুদ্ধের সময় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিবহণের জন্য উট ব্যবহার করা হতো।

বিদ্রোহীদের আক্রমণের গেরিলা রণ-পদ্ধতি কোম্পানির কর্মকর্তাদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা কোম্পানির লোকজন এবং তাদের দপ্তর ও আবাসনের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাত। সুপরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা ও নির্ধারিত যুদ্ধে কখনও কখনও পাঁচ থেকে ছয় হাজার ফকির-সন্ন্যাসীর সমাবেশ ঘটত। আঠারো শতকের সত্তরের দশকে ফকির ও সন্ন্যাসীদের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারে উপনীত হয়। গ্রামের সাধারণ লোকেরা বিদ্রোহীদের গুপ্তচররূপে কাজ করত এবং তারা কোম্পানসেনাবাহিনীর গতিবিধি আগে থেকেই বিদ্রোহীদের জানিয়ে দিত।

বিদ্রোহীরা ১৭৬৩ সালে বাকেরগঞ্জে কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি আক্রমণ করে। তারা সেখানকার কুঠিয়াল মি. ক্যালীকে কয়েকদিন আটক রাখে এবং কুঠি লুণ্ঠন করে। ঐ বছর অতর্কিত আক্রমণ করে তারা ঢাকা কুঠি দখল করে নেয়। কুঠির ইংরেজ সুপারভাইজার র‌্যালফ লেস্টার পালিয়ে যান। অবশ্য পরে ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট কুঠি পুনরুদ্ধার করেন। ঐ একই বছর বিদ্রোহীরা রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করে কুঠিয়াল বেনেটকে আটক করে। বন্দি অবস্থায় বেনেটকে পাটনায় পাঠানো হলে সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়। ১৭৬৭ সালের দিকে রংপুর, রাজশাহী, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও কুমিল্লা জেলায় বিদ্রোহীদের আক্রমণ তীব্রতর হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গে বিদ্রোহীদের তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য ১৭৬৭ সালে ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেঞ্জির অধীনে রংপুরে ইংরেজ বাহিনী প্রেরিত হয়।

এ সময় মালদহের ইংরেজ রেসিডেন্ট বারওয়েল কর্তৃক মার্টলের নেতৃত্বে প্রেরিত একটি ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের নিকট পরাজিত হয় এবং সেনাপতি মার্টল নিহত হন। ম্যাকেঞ্জির বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে বিদ্রোহীরা নেপালের দিকে পশ্চাদপসরণ করে। ১৭৬৮ থেকে ১৭৭০ সালে প্রধানত শরণ (বিহার), বেনারস, পুর্নিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ অব্যাহত ছিল। ফেলথামের অধীনে ইংরেজ বাহিনী ১৭৭১ সালে ঘোড়াঘাট ও রংপুরের গোবিন্দগঞ্জের পথে ফকির-সন্ন্যাসীদের উপর আক্রমণ চালায়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে যায়। মজনু শাহ শতাধিক আহত অনুসারী নিয়ে মহাস্থানে ফিরে যান।

১৭৭২ সালে মজনু শাহ রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলায় কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র ও আবাসন আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন। এক সময় তিনি কয়েকশ’ সশস্ত্র অনুসারী নিয়ে রাজশাহীতে কোম্পানির রাজস্ব-অফিস কিছুকাল দখল করে রাখেন। সেখানকার সংগৃহীত সমুদয় অর্থ তার হস্তগত হয়। ১৭৭৩ সালে বিদ্রোহীরা পূর্ণিয়া, বর্ধমান, কুমারখালি, যশোর, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, মেদিনীপুর, বীরভূম, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও জলপাইগুড়ি এলাকায় ব্যাপক আক্রমণ পরিচালনা করে। ১৭৭৬ সালে বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর ও চট্টগ্রাম জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে। ১৭৭৭ থেকে ১৭৮১ সালের মধ্যে ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ প্রধানত বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকায় পরিচালিত হয়। ১৭৮২ সালে ময়মনসিংহের আলপ্সিং পরগনার বিদ্রোহীদের তৎপরতা প্রকট আকার ধারণ করে।

পুখুরিয়ায় এক তীব্র সংঘর্ষের পর মজনু শাহ তার অনুসারীদের নিয়ে মধুপুর জঙ্গলে পশ্চাদপসরণ করেন। ১৭৮৫ সালে তিনি মহাস্থাঙ্গড় অভিমুখে অগ্রসর হন এবং সেখানে এক যুদ্ধে পরাজিত হন। পরের বছর মজনু শাহ পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে যুগপৎ আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি নিজে পূর্ববঙ্গে আক্রমণ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং উত্তরবঙ্গে অভিযানের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তার খলিফা মুসা শাহের উপর। কালেশ্বর এলাকায় লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের বাহিনীর সঙ্গে এক যুদ্ধে (৮ ডিসেম্বর ১৭৮৬) মজনু শাহের বিপুল সংখ্যক অনুসারী নিহত হন। এরপর থেকে মজনু শাহকে আর কোনো যুদ্ধ পরিচালনা করতে দেখা যায় নি। সম্ভবত কালেশ্বরের যুদ্ধে তিনি নিজে আহত হন এবং ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়।

মজনু শাহের মৃত্যুর পর তার যোগ্য প্রতিনিধি মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরাগল শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বখ্শ, জরিশাহ, করিম শাহ, কৃপানাথ, রওশন শাহ, অনুপ নারায়ণ ও শ্রীনিবাস প্রমুখ ১৮১২ সাল পর্যন্ত ফকির-সন্ন্যাসদের বিদ্রোহ অব্যাহত রাখেন। তবে মজনু শাহের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন ক্রমশ তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও গতিশীলতা হারাতে থাকে। আঠারো শতকের নববইয়ের দশকের শেষদিকে বিদ্রোহ অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী দশকে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়।

এ আন্দোলন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ড: সিরাজুল ইসলাম ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ নামক সংকলিত গ্রন্থে বলেন: “দেশ, জাতি, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির বিষয়ে জনগণ তখন সজাগ ছিলনা ও ধর্মভিত্তিক আচার অনুষ্ঠানই ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তা ধারার ভিত্তি। এই সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করিলে যে কোন দেশী বা বিদেশী কেন্দ্রীয় সরকারকে মানিয়া নিতে তাহাদের আপত্তি ছিলনা। সরকারী নীতির সমালোচনা ও প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিত তাহারা তখনই যখন সরকার স্থানীয় শাসনে, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করিত।”

ড: সিরাজুল ইসলাম জানান, সম্রাট আকবরের আমল হতে সমাজের ভিক্ষুক সম্প্রদায়টি রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেতে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ‘নাগা’ ও ‘গিরি’ সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। অযোধ্যার নবাবের সৈন্য বাহিনীতে ‘গোসাই’ বাহিনী গঠিত হয় মূলত: ঐ সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে। কোম্পানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মীর কাশিম ফকির সন্ন্যাসীদের সাহায্য নিয়েছিলেন। কোম্পানী বিজয়ী হয়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে দিঊয়ানী লাভের মাধ্যমে। এই সময়ই কোম্পানী ফকির ও সন্ন্যাসীদেরকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং তাদেরকে ‘দস্যু’ বলে আখ্যায়িত করে। তাই তাদের গতিবিধির ওপর সরকার নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শুধু তাই নয় ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ হলো এবং তাদের ওপর তীর্থকর আরোপ করা হলো যা ইতোপূর্বে কোন সরকার বা কর্তৃপক্ষ করেনি। তাই বাংলা অঞ্চলে ১৭৬০-১৮০০ খৃস্টাব্দের মধ্যে অসংখ্য ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।

ড: সিরাজুল আরো জানান, ফকির সম্প্রদায়ের ওপর উপরোক্ত বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়ার ফলে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত হয় কোম্পানী রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের নির্যাতন প্রসূত সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। সাধারণ মানুষেরাও ফকির সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ করে। কোম্পানীর রাজস্ব আদায়কে কেন্দ্র করে কৃষকরা যে ভীতিকর অবস্থায় পড়ে তা হতে মুক্তি পাবার জন্যে তারা চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ এবং ফকির সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগদান করে। একদিকে চাষাবাদ বাধাগ্রস্থ অন্যদিকে ১৭৬৯-১৭৭০ খৃস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে (বাংলা ১১৭৬) নামে পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে ফকির ও সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সাধারণ কৃষকেরাও ইংরেজ কোম্পানী ও তাদের সহায়ক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেয়।

ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আরো তিনজন নেতার পরিচয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরা হলেন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী ও নুরুলউদ্দীন। ভবানী পাঠক ১৭৬০ সাল থেকে কর আদায়কারী, উৎপীড়ক শ্রেণীটির নিকট থেকে টাকা পয়সা লুট করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্টন করতেন এবং গভীর জঙ্গলে তার ডেরা গড়ে তোলেন। ভবানী পাঠক পরবর্তীকালে বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলাধীন রাজারহাট থানায় চাকিরপাশা গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তার নামানুসারে ঐ গ্রামের নাম পাঠকপাড়া হয়েছে বলে জানা যায়। তার উত্তরসূরীরা আজও পাঠক পাড়াতে বসবাস করছেন। ভবানী পাঠক বৃহত্তর রংপুর জেলার বিভিন্ন গভীর অরণ্যে দেবী চৌধুরানীর সহযোগীতায় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন। পীরগাছা মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরানী ভবানী পাঠকের আদর্শে দীক্ষা গ্রহণ করে এই আন্দোলনকে শক্তিশালী রূপ দান করেন। এভাবে তিস্তা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন গভীর জঙ্গল, ধরলা ও পয়রাডাঙ্গা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান, মীরবাগ ভূতছাড়ার গভীর অরণ্যে সন্নাসীদের আস্তানা তথা দুর্গ গড়ে ওঠে। এ ছাড়াও উলিপুর, মরাতিস্তা, পীরগাছা ও চৌমুহনীতেও সন্ন্যাসীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে।

দেবী চৌধুরানী ও ভবানীপাঠক ফকির সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে গোপন বৈঠকে মিলিত হতেন। এ সময় রাজস্ব আদায়কারী দেবী সিংহ ও তার কর্মচারী হরেরামের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষকে রক্ষার্থে এগিয়ে এলো সমাজের অবহেলিত প্রায় অংশটি ফকির সন্ন্যাসীরা।

কোম্পানী ও মীর জাফরের কাহিনীর সঙ্গে ১৭৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে মাসিমপুরে ভবানীপাঠক ও দেবী চৌধুরানীর ফকির সন্ন্যাসী বাহিনী প্রচন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কোম্পানীর বাহিনী সাঁড়াশী অভিযান চালায়। কিন্তু বিদ্রোহী ফকির সন্ন্যাসীরা প্রচন্ড সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে কোম্পানী ও মীরজাফরের বাহিনীকে পরাজিত করে। ইংরেজ ক্যাপ্টেন ক্রকেনসহ বেশ কিছু শত্রু সৈন্য নিহত হয় মাসিমপুরের এই যুদ্ধে। অন্যদিকে ফকির সন্ন্যাসীদের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে দলীব খাঁ ও আসালত খাঁ সহ অনেকেই নিহত হন। এরপর পীরগাছা মন্থনার একজন ছোট জমিদার হওয়া সত্ত্বেও দেবী চৌধুরানী তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারণে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ‘জয় দূর্গাদেবী’ বা ‘চন্ডী মা’ নামে জনসাধারণের নিকট শক্তির উৎস ও ভরসাস্থলে পরিণত হন। তার নামানুসারে দেবী চৌধুরানী নামক একটা এলাকা ও রেলস্টেশন আজও তার পূণ্যস্মৃতি বহন করে চলছে। কিন্তু চন্ডী মা দেবী চৌধুরানী শেষাবধি ১৭৮৩ খৃস্টাব্দে স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হন বলে জানা যায়। লড়াইটি হয় রংপুর জেলার পীরগাছা মৌজায় ১৭৮৩ সালের বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহের বৃহস্পতিবারে। পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র রংপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে এই ঘটনা জানতে পারেন এবং দেবী চৌধুরানী নামে উপন্যাস লেখেন।

পরবর্তীকালে আরো অনেক নারী নেত্রী ইংরেজ বিরোধীতায় অবতীর্ণ হন। পাঙ্গার রানী লক্ষ্মীপ্রিয়াও এ ধরণের একজন যোদ্ধা বলে জানা যায়। পাঙ্গার রাজা/ রাণীদের বীরত্বের প্রতীক হিসেবে কুড়িগ্রাম শহরে বি.ডি.আর. ব্যাটালিয়ন গেটের সামনে ‘কালু খাঁ’ ও ‘ফতে খাঁ’ নামক দুটো কামান শোভা পাচ্ছে। অবলা ও অবহেলিত নারী সমাজের একজন হওয়া সত্ত্বেও দেবী চৌধুরানী বীরত্ব ও সাহসিকতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তা বর্তমানকালেও নারী সমাজ তাদের সমস্যা সমাধানে অনুপ্রেরণা পেতে পারে।

অন্যদিকে ভবানী পাঠক তার সন্ন্যাসী দল নিয়ে কর্মকান্ড অব্যাহত রাখেন। এ জন্য রংপুর জেলা কালেক্টরেট গুডলাক সাহেব লে. ব্রেনানকে একদল সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। অকস্মাৎ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে আক্রমণ করে ভবানী পাঠকের বাহিনীকে ব্রেনান পরাভুত করেন। তার রিপোর্ট অনুযায়ী ঘটনাস্থলেই ভবানী পাঠকের মৃত্যু হয়। অন্য আর একটি সূত্র হতে জানা যায় ধৃত ভবানীপাঠকের বিচার হয় ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে এবং তাকে দ্বীপান্তরে প্রেরণ করা হয়। তবে অন্য একটি সূত্রের মতে তিনি পরাভুত হননি, তার শেষ জীবন পর্যন্ত সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি কুড়িগ্রাম, উলিপুর, কাঁঠালবাড়ী, নাগেশ্বরী, মাদারগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে অসংখ্য ভক্ত রেখে গেছেন। তার উত্তর মুরুষেরা রাজারহাটের পাঠকপাড়ায় অদ্যাবধি বসবাস করছেন।

অপর একজন কৃষক বিদ্রোহের নেতা নুরুলউদ্দীন। তবে ভোগবিলাসী ছিলেন বলে জানা যায় এবং সে সুযোগ গ্রহণ করেই ইংরেজ কোম্পানী গুপ্তচর মারফত তথ্য সংগ্রহ করে তাকে অকস্মাৎ আক্রমণের মাধ্যমে হত্যা করে। কাকিনার জমিদার অলকা কোম্পানীর সঙ্গে পরামর্শ করে পবিত্রা নামক একজন নারীকে ছদ্মবেশে দেবী চৌধুরানীর দরবারে প্রেরণ করে। দেবী চৌধুরানীর নিকট থেকে নুরুলউদ্দীন সম্পর্কিত তথ্য পবিত্রার মাধ্যমে সংগ্রহ করে অলকা কোম্পানীর নিকট প্রেরণ করেন। এরই ভিত্তিতে কোম্পানী ম্যাগডোনাল্ড নামক একজন সেনাপতিকে নুরুলউদ্দীনের বিরুদ্ধে প্রেরণ করে। মোগলহাট নামক স্থানে ম্যাগডোনাল্ড তাকে আক্রমণ করলে নুরুলউদ্দীন নিহত হয়। এটা উপকথা, এতে ইতিহাস কতটুকু আছে বিচার করা কঠিন কাজ। কথিত আছে, সফল গুপ্তচর বৃত্তির পুরস্কার হিসেবে অলকা ও পবিত্রা কোম্পানীর নিকট থেকে কাকিনা ও বামনডাঙ্গার জমিদারী লাভ করে এবং প্রজাপীড়ন অব্যাহত রাখে।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসএনডি/এসকে


সর্বশেষ

আরও খবর

লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!

লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন


করোনায় দৌলতপুর থানার ওসির মৃত্যু

করোনায় দৌলতপুর থানার ওসির মৃত্যু


সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব

সপরিবারে কোয়ারেন্টাইনে দেব


বিশ্বে মৃত্যু ৮ লাখ ১৭ হাজার, আক্রান্ত ২ কোটি ৩৮ লাখ

বিশ্বে মৃত্যু ৮ লাখ ১৭ হাজার, আক্রান্ত ২ কোটি ৩৮ লাখ


চট্টগ্রামে নিজ ঘরে মা-ছেলের রক্তাক্ত লাশ !

চট্টগ্রামে নিজ ঘরে মা-ছেলের রক্তাক্ত লাশ !


আবহাওয়ার বিপর্যয়ঃ দুর্বিপাকে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ!

আবহাওয়ার বিপর্যয়ঃ দুর্বিপাকে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ!


পটুয়াখালীর এমপি শাহাজাদাসহ সপরিবার করোনা পজিটিভ

পটুয়াখালীর এমপি শাহাজাদাসহ সপরিবার করোনা পজিটিভ


বাড্ডায় একজনকে কুপিয়ে হত্যা

বাড্ডায় একজনকে কুপিয়ে হত্যা


তরুণ ও যুবারা বেশি ছড়াচ্ছে করোনাঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

তরুণ ও যুবারা বেশি ছড়াচ্ছে করোনাঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা