Tuesday, August 9th, 2016
ফিরে এসো ‘মুষ্টিচাল’
August 9th, 2016 at 9:51 pm
ফিরে এসো ‘মুষ্টিচাল’

সানাউল কবির সিদ্দিকী, ঢাকা: সময়টা তখন একদম অন্যরকম; মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন বা তার উদ্ভাবনেরও বহু আগেকার কথা। শিকারি মানুষ সবে মাটির সাথে প্রেম করতে শিখেছে, চাষাবাদে উৎপাদন করতে শিখেছে শস্য। দূর্দিনের আশংকায় শিখেছে সঞ্চয় করতে। পচনশীল আমিষের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে নির্ভরতা বাড়িয়েছে শস্যদানার ওপর। ফলাফলে, সঞ্চিত খাদ্যের রুপান্তর ঘটে তা পরিণত হয়েছে সঞ্চিত সম্পদে।

সেই সঞ্চিত সম্পদ বা উদ্বৃত্ত ফসলের ছিল এক জাদুকরী ক্ষমতা! বিন্দু বিন্দু জলকনায় সিন্ধু আর বালুকনায় যেমন মহাদেশ গড়ে ওঠে, প্রতিদিনের সঞ্চয় তেমন একসময় পরিণত হয় পাহাড়ে। সমাজের সদস্যবৃন্দের সেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টিলাসম পাহাড় একত্রে সৃষ্টি করে সঞ্চয়ের বৃহৎ পর্বতমালা। তাই জনসমষ্টির সেই ‘অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতাধর’ সঞ্চিত ফসলের নিয়ন্ত্রণ সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণীর কাছে কুক্ষিগত রাখার জন্য যুগে যুগে জন্মেছে নানাবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বিবর্তিত হয়েছে সমাজব্যবস্থা।

সমাজ ব্যবস্থার বিবর্তনের সাথে সাথে বিবর্তন ঘটেছে সঞ্চয়ের ভঙ্গিমায়। তারপরও, কিছুদিন আগে পর্যন্তও দৈনিক শস্য সঞ্চয়ের একটি প্রচলন ছিল এ ভূ-খন্ডে; এই সঞ্চয়-ব্যবস্থার নাম ‘মুষ্টিচাল’। সংসারে প্রতিদিনের রান্নার জন্য বরাদ্দ চাল থেকে এক মুঠ পরিমান চাল সরিয়ে সঞ্চয় হিসেবে আলাদা করে রাখা হয় এ ব্যবস্থায়। যেকোন আকস্মিক প্রয়োজনে, সঞ্চিত সেই চাল বিক্রী বা বিনিময়ের মাধ্যমে পরিস্থিতির সার্বিক চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হয়। এই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম মুষ্টিচাল প্রথা প্রবর্তনের ইতিহাস নির্দিষ্ট না। তবে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনকারীদের সহায়তা করার জন্য অভিভক্ত ভারতবর্ষে গৃহিণীদের মাঝে মুষ্টিচাল সংরক্ষণের প্রচলন বেশ জনপ্রিয় হয়।

Baamboo Bridge

কিন্তু বর্তমানে, ‘মুষ্টিচাল’ প্রথা বিলুপ্ত প্রায় বললেই চলে। ব্যাংকে সঞ্চয় হিসাব খুলে, ইনস্যুরেন্স করিয়ে আর ঘরে মাটির ব্যাংকে মুদ্রা সঞ্চয় করার পর খাদ্যশস্য সঞ্চয়ের প্রয়োজন বা ফুসরৎ, কোনটাই হয়ে ওঠে না আমাদের। এমনকি এক মুঠ চালের জন্য গান গাওয়া ভিক্ষুকদের কাছেও খুঁজে পাওয়া যায় টাকাখেকো বিদেশী টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানির মালিকানাধীন মোবাইল সংযোগ। বিজাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সাবস্ক্রিপশন খরচ পুষিয়ে, চাকচিক্যময় সাজ পোশাক ও প্রসাধনী সামগ্রীর পেছনে খরচ করে, নির্মেদ শরীর অপরিবর্তিত রাখতে গিয়ে ছোট হয়ে এসেছে মধ্যবিত্তের দৈনিক খাদ্য তালিকা। তাছাড়াও বর্তমান বাজার দরে, প্রায় মূল্যহীন ধানজাত শস্য হারিয়েছে সঞ্চিত হবার যোগ্যতা। মুষ্টিচাল এখন শুধুই এক গল্প। একটা সময় ছিল, মাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে এলাকার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ঘরে ঘরে গিয়ে চাল, ডাল, নুন ও তেল সংগ্রহ করে খিচুড়ি রান্না করতো। সে প্রচলনও এখন খুব একটা দেখা যায় না।

তবে মুষ্টিচাল সংগ্রহের মাধ্যমে সমাজের নানাবিধ সমস্যা নিরসনের নিদর্শন কিন্তু এখনও বিদ্যমান! চলতি বছরের জুলাই মাসে জামালপুরের বকশীগঞ্জের টালিয়াপাড়ার নারীদের মুষ্টিচালের অর্থে ও পুরুষদের বিনামূল্য শ্রমে গড়ে উঠেছে ১০০ মিটার দীর্ঘ সাঁকো। দিনাজপুরের ফুলবাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর চার শতাধিক পরিবার তাদের দূর্দিনের মোকাবিলা করছে মুষ্টিচালের জোরে। তারা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মোট ৮,১৫৩ কেজি চাল জমা করেছে, যার মধ্যে প্রায় ছয় হাজার কেজি চাল বিক্রি করে বিক্রীত অর্থ জমা করা হয়েছে ব্যাংকের সঞ্চয় হিসাবে। ২০০২ সালে যাত্রাশুরু করে এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর ‘হাসান বেগপুর মহিলা মুষ্টি চাল সমিতি’ যার আওতায় মোট ৩৫টি আদিবাসী পরিবার রয়েছে। সমিতির সঞ্চয়ে জমাকৃত সম্পদ বিপদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায় তাদের। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের এক মুষ্টি চাল দিয়ে মিড-ডে মিল চালু করেছে জকিগঞ্জের গদাধর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে এখনো মুষ্টিচাল সংগ্রহ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, তবে তা নিতান্তই উপলক্ষ-কেন্দ্রিক এবং অনিয়মিত। নিতান্তই দুস্থ কোন পরিবারের কেউ আকস্মিক মৃত্যুর শিকার হলে গ্রামবাসী তৎক্ষণাৎ মুষ্টিচাল সংগ্রহ করে তার সৎকারের ব্যবস্থা নেয় বলে জানা যায় টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানার হাতিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে। হাতিয়া’র বাসিন্দা প্রকৌশলী ইবনে আবু সালেহ বলেন, এই ব্যবস্থা ‘একের বোঝা’ কে ‘দশের লাঠি’তে রুপান্তর করে। এছাড়াও বিশেষ ধর্মীয় দিনগুলোতে মসজিদের নানান আয়োজনে প্রতি ঘর থেকে মুষ্টিচাল সংগ্রহ করে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়। সমাজের সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সহমর্মিতা ও ভার্তৃত্ববোধ বৃদ্ধির এক অভিনব পন্থা মুষ্টিচাল প্রথা।

এদেশের ভূমিহারা বর্গা চাষী জন্ম থেকে জন্মান্তরে আটকে আছে জোতদারের ফাঁদে। নব্য পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি জোতদারের দেখা না মিললেও, হরহামেশাই দেখা যায় এনজিও প্রদত্ত ক্ষুদ্রঋণ নামক প্রলোভনের ফাঁদ। এমন কৃষক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যিনি কখনোই পা দেন নি এই চকচকে ফাঁদে। মহাজন জুলুমের ইতিহাস প্রবর্তিত পথে হাঁটা ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা কৃষকের সঞ্চয়ের সবটুকু শুষে তাকে ঋণ-জর্জরিত করে, ঠেলে দেয় মৃত্যুর মুখ পর্যন্ত; আর সেই মৃত্যু পরবর্তী সৎকারের জন্য ঋণগ্রস্থ পরিবারকে পুণরায় ঋণ গ্রহণে বাধ্য করাটাই যেন সুদ ব্যবসায়ীদের কাজ।

ধানের নিম্নমুখী দামের সাথে পাল্লা দিয়ে, খোরাকির ধান বিক্রী করে সে টাকায় দৈনিক চাল কিনে, সেই চাল থেকে কিছুটা সঞ্চয় করে কতটা পুঁজি গড়তে পারে একজন কৃষক, তা অজানা। তারপরো প্রশ্ন থেকে যায়, হাইব্রিড ধান প্রচলনের মাধ্যমে কৃষকের বীজ ভান্ডার লুন্ঠনকারী এসব ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে আমাদের সেই ঐতিহ্যবাহী মুষ্টিচাল প্রথার প্রত্যাবর্তন কি একান্তই জরুরী নয়?

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/এসকেএস/তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ  উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে

চীন-ভারত বৈরিতা নতুন করে জঙ্গিবাদ উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী করেছে


শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি

শেখ হাসিনার ৭৪ তম জন্মদিন: ‘পুতুল’ খেলার আঙিনায় বেজে উঠুক ‘জয়’র বাঁশি


২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আগেই পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে ?


লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!

লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!


তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?

তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?


সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী

সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী


১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা