Thursday, August 18th, 2022
ফেব্রুয়ারিতেই সীমাবদ্ধ ভাষার টান
February 20th, 2017 at 10:29 pm
ফেব্রুয়ারিতেই সীমাবদ্ধ ভাষার টান

শেখ রিয়াল, ঢাকা:

ভাষার মাস বলতে আমরা বুঝি ফেব্রুয়ারি মাসকেই। বছরের অন্য মাসগুলোতে ভাষার জন্য, ভাষা শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গুলোর প্রতি তেমন ভালোবাসা বা শ্রদ্ধাবোধ থাকে না বলে অভিযোগ ভাষা শহীদদের পরিবারের সদস্যদের। তারা অনেকেই মনে করেন, যে স্বার্থ নিয়ে ভাষার জন্য এদেশের দামাল ছেলেরা বন্দুকের গুলির সামনে নিজেদের বুক এগিয়ে দিয়েছিল, সেই স্বার্থ এখনো এদেশে পূরণ হয়নি। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা এবং ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভগুলো আজও অবহেলিত।

২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। যার ফলশ্রতিতে যে সকল ভাষা শহীদ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের কথা এবং শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর কথা মনে পড়ে যায় সরকার এবং ভাষা প্রেমি মানুষদের বলেও অভিযোগ করেন শহীদদের স্বজনেরা।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারির কয়েক দিন আগে থেকেই চলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারা দেশের শহীদ মিনার এবং ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। জোরদার করা হয় নিরাপত্তা। নিয়ম মেনে শহীদ মিনারে চলাচল করতে হয়।

বাকি এগারো মাস শহীদ মিনার থাকে নিজের মত করে। তাকে দেখার কেউ যেন নেই। শহীদ মিনারে চলাচলে নেই কোনো নিয়ম-কানুন, থাকেনা কোনো নিরাপত্তাও। ২১ ফেব্রুয়ারির কয়েক দিন আগে বা বাকী ১১ মাসে শহীদ মিনারে দৃশ্যপট থাকে খোলামেলা।

শহীদদের সম্মান জানানোর জন্য নির্মিত হয় শহীদ মিনার। তবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ২১ ফেব্রুয়ারি বাদে অন্য দিনগুলোতে যেমনটি থাকে সরজমিনে একদিন পরযবেক্ষণ করে দেখা যায়, তরুণদের আড্ডাস্থল সঙ্গে সিগারেট, আশপাশে অনেক দর্শনার্থী চোখে পড়ে যাদের সবাই জুতা পায়ে মূল বেদিতে ঘোরাফেরা করছেন। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে ছোট একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, মূল বেদিতে জুতা পায়ে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু তার তোয়াক্কা না করে সেই সাইনবোর্ডের পাশে বসে কয়েকজন তরুণ দিব্যি আড্ডা দিচ্ছেন। মিনারের উত্তর পাশ পরিণত হয়েছে খেলার মাঠে। কয়েকজন শিশু এখানে ক্রিকেট খেলছে। পাশে তাদের অভিভাবক দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। এদিকের ঘাসের উপর দলে দলে বিভক্ত হয়ে আড্ডা দিচ্ছেন কয়েকজন। মিনারের দক্ষিণ পাশে মধ্যবয়স্ক কয়েকজন খোশগল্পে মত্ত। তারাও জুতা পায়ে অবস্থান করছেন।

মিনারের নিচের অংশটা দেখে মনে হয়, এই জায়গাটা প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য বরাদ্দ। কয়েকজন প্রেমিক-প্রেমিকাকে চোখে পড়ে যারা আপত্তিকর অবস্থায় বসে আছে। মিনারের উত্তর পাশের গেট দিয়ে দুই মোটরসাইকেলযোগে ছয় তরুণ প্রবেশ করে। মিনারের সিঁড়ির কাছে মোটরসাইকেল পার্ক করে জুতা পায়ে ভেতরে চলে যায়। পাশের দেয়ালের ওপর এক ভবঘুরে ঘুমাচ্ছে। কয়েকটা কুকুর ঘোরাফেরা করছে। মিনারে কোনো নিরাপত্তা প্রহরী চোখে পড়েনি। তবে উত্তর দিকের রাস্তায় একটি পুলিশ ভ্যান ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য চোখে পড়ে।

পুরো শহীদ মিনার এলাকা নোংরা আর অপরিচ্ছন্ন। এত মানুষের জুতার ধুলো আর নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মাটির পুরো স্তর জমে গেছে। গাছের পাতা আর মাটি মিশে একাকার। বেদির দু’পাশে বাদামের খোসা, সিগারেট, চিপস, বিস্কিটের পরিত্যক্ত প্যাকেট, চা-কফির কাপসহ বিভিন্ন খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মূল বেদির নিচের জায়গাটুকুও বাদামের উচ্ছিষ্টাংশ ফেলে নোংরা করে ফেলা হয়েছে।

এসময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ জানান, শহীদ মিনার শ্রদ্ধা জানানো জায়গা ঠিক। কিন্তু শহরের অন্য কোনো জায়গা এমন উন্মুক্ত না থাকায় বন্ধুরা মিলে তারা এখানে এসেই আড্ডা দেয়।

শহীদ মিনারে বসে চলে মাদক সেবনও। মিনারের আসে-পাশেই পাওয়া যায় মাদক। মাদকের ব্যাপারে কথা হয় এখানকার চা বিক্রেতা আবদুল মালেকের সঙ্গে। এই বিক্রেতা জানান, সারা দিনই এখানে মাদকসেবীদের দেখা যায়। তারা সাধারণত বেদির পেছনের অংশে বসে গাঁজা সেবন করে। গাঁজা আসে কোথা থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, শহীদ মিনারের পেছনের যে মাজার রয়েছে সেখানে কাজ করে, এমন কয়েকজন লোক এখানে নিয়মিত গাঁজা বিক্রি করে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দৃশ্যই যে এমন তা নয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভাষা শহীদ এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো বিশেষ দিন ছাড়া এমন অবহেলাতেই পড়ে থাকে।

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা পরিষদের ফটকের সামনের শহীদ মিনারটি এক যুগ ধরে অবহেলিত। এটি কখনো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। এ দীর্ঘ সময়ে কোনো সংস্কারও হয়নি শহীদ মিনারটির।

বানিয়াচংয়ের একমাত্র শহীদ মিনারটি সারাবছরই অযত্ন, অবহেলায় পড়ে থাকে। শুধুমাত্র ২১ ফেব্রুয়ারি মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস এলেই চোখে পড়ে এটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কাজের।

এদিকে সংবিধানের ১০২ নং অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনায় শহীদ মিনারের আশেপাশে ভবঘুরেদের অবস্থান, অসামাজিক কার্যকলাপ, মিটিং মিছিল ও পদচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং শহীদ মিনারের একপাশে এসব নিয়ম কানুন সম্বলিত নোটিশ বোর্ড আছে। তবে সেদিকে কারও নজর নেই।

শহীদ মিনারের সামগ্রিক বিষয়গুলো দেখভালের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী ও তিন জন পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দিলেও স্থানীয়দের অভিযোগ শহীদ মিনারে দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের দেখামেলে কালেভাদ্রেই। সরেজমিনে গিয়েও শহীদ মিনার এলাকায় তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এছাড়া সুপ্রিমকোর্টের স্পেশাল অরিজিনাল জুরিশডিকশন (রিট পিটিশন নং-১০৭৯/১০১০)-এ ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরি ও ভাষা জাদুঘর নির্মাণের নির্দেশ দেয়া থাকলেও এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি প্রশাসন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, ‘শহীদ মিনারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি মিনারের পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনেরও এগিয়ে আসা উচিৎ।’

সম্পাদনা: সজিব ঘোষ

 


সর্বশেষ

আরও খবর

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

সংসদে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব


আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন

আ’লীগ নেতা বিএম ডিপোর একক মালিক নন


চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ

চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় বাংলাদেশ


ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার

ভোজ্যতেল ও খাদ্য নিয়ে যা ভাবছে সরকার


তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন

তৎপর মন্ত্রীগণ, সীতাকুণ্ডে থামেনি দহন


অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?

অত আগুন, এত মৃত্যু, দায় কার?


যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার

যে গল্প এক অদম্য যোদ্ধার


আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০

আফগান ও ভারতীয় অনুপ্রবেশ: মে মাসে আটক ১০


সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি

সীমান্ত কাঁটাতারে বিদ্যুৎ: আলোচনায় বিজিবি-বিজিপি


চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার