Sunday, July 3rd, 2016
ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিনে
July 3rd, 2016 at 3:16 am
ফ্রানৎস কাফকার জন্মদিনে

ডেস্কঃ পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিতান্তই ব্যক্তিগত মনোদৈহিক অস্তিত্বের সংকটময় বিষয়বস্তুপূর্ণ সাহিত্য রচনার মাধ্যমে একটি দার্শনিক তত্ত্বের রূপায়ন দেয়ার পাশাপাশি পাঠকের তোয়াক্কা না করে নিভৃতে নিঃসঙ্গ ও ৪১ বছরের ছোট নির্ভেজাল জীবন যাপন করে গেছেন ফ্রানৎস কাফকা।

আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বের আসন্ন মানবিক সংকটগুলো সম্পর্কে আগাম ধারণা ছিল তার গল্প ও উপন্যাসে। তাই হয়তো ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত পঞ্চাশেরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার সাহিত্য কর্ম। অনেক সমালোচকের মতে, কাফকাসৃষ্ট চরিত্রগুলো তারই আত্ম বিশ্লেষণ। আইন বিভাগে পড়াশোনা করে বীমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন তিনি জীবিকার তাগিদে।

স্বেচ্ছাচারী ও শিল্পের প্রতি উদাসীন পিতার কর্তৃত্বাধীনতার শিকার কাফকার চরিত্রগুলো তার মতই ভোগে অস্তিত্বের সংকটে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়, মানসিক বিপর্যস্ততায়, যক্ষার চেয়েও তীব্রতর শারীরিক যন্ত্রণায়; যৌনতার অবদমন ও পারিবারিক টানাপোড়েন ছাড়েনি তার চরিত্রগুলোকেও।

এছাড়াও রয়েছে রাষ্ট্র, সরকার, মানচিত্রের সীমানা, ভাষা ও ধর্মসংক্রান্ত জটিলতা। তাইতো তার লেখা বিশ্লেষায়িত হয় নানা দৃষ্টিকোণ থেকে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্ররা খোঁজে কাফকার ক্লিনিকাল ব্যাখ্যা, সমাজতন্ত্রীর চোখে কাফকার মার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যা, মনোবিজ্ঞানীর জন্য রয়েছে কাফকার লেখার ফ্রয়েডিক বিশ্লেষণ। বিশ্লেষিত হয়েছে তার লেখা চিঠিগুলোও। নিজ সাহিত্য প্রকাশে খুব একটা আগ্রহ ছিল না তার, মৃত্যুর কিছুদিন আগে বন্ধু ম্যাক্স ব্রোডকে তিনি তার সব লেখা দিয়ে গিয়েছিলেন পুড়িয়ে ফেলার জন্য, কিন্তু বন্ধু তার অনুরোধ রাখেন নি বলেই আজ আমরা তার সাহিত্যরসের স্বাদ গ্রহণ করতে পারি।

জন্ম ও পরিবার

১৮৮৩ সালের এই দিনে (০৩ জুলাই) ফ্রানৎস কাফকার জন্ম হয় তখনকার অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগে। এই প্রাচীন শহরটির ওল্ড টাউন স্কোয়ারের একদম কাছে। প্রাগ তখন বোহেমিয়ার রাজধানী। তার বাবা হারমান কাফকা (১৮৫২-১৯৩১) ছিলেন ইয়াকব কাফকার চতুর্থ সন্তান। ইয়াকব পেশায় ছিলেন ধর্মীয় অনুশাসন-মানা কসাই। কাফকার মা ছিলেন ইয়ুলি কাফকা (১৮৫৬-১৯৩৪) ইয়াকব লোউভি নামের এক প্রতিষ্ঠিত রিটেল ব্যবসায়ীর মেয়ে; শিক্ষার দিক থেকে তাঁর স্বামীর ওপরে।

শিক্ষা

১৮৮৯ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত কাফকা প্রাগের মাসনা স্ট্রিটে ‘জার্মান বয়েজ এলিমেন্টারি স্কুলে’ পড়াশোনা করেন। ১৮৯৩-এ এলিমেন্টারি স্কুল ছেড়ে কাফকা প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারের ওপর অবস্থিত কিন্স্কি প্যালেসে কড়া শাসনের ও ক্ল্যাসিক্যাল শিক্ষাদান রীতিতে চালানো জার্মান মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০১-এ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে কাফকা প্রাগের জার্মান কার্ল-ফার্দিনান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

শুরু করেন রসায়নে, কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে আইনের ছাত্র হয়ে যান। আইন নিয়ে পড়াশোনা তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ ছিল না, কিন্তু তার বাবা খুশি হয়েছিলেন, কারণ আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। এখানে কাফকার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক ফেলিক্স ভেলটস, লেখক অস্কার বাউম, ফ্রানৎস ভেরফেল্ প্রমুখ।

প্রথম বছরের পড়া শেষ হতেই কাফকার সঙ্গে পরিচয় হয় ম্যাক্স ব্রডের। ম্যাক্সও ছিলেন আইনের ছাত্র। শুরু হয় কিংবদন্তিতে রূপ নেওয়া এক আজীবন বন্ধুত্বের।

ম্যাক্স ব্রডই প্রথম খেয়াল করেন খুব কম কথা বলা, লাজুক ধরনের এই ছেলেটির মেধা ও প্রজ্ঞা গভীর ও অগাধ। জীবনভর কাফকা খুব উৎসুক পাঠক ছিলেন। ১৯০৬ সালের ১৮ জুলাই কাফকা আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি পান এবং এর পরে এক বছর আদালতে বাধ্যতামূলক বেতনহীন ক্লার্কের চাকরি করেন। ১৯১৭ সালের পরে তিনি পাস্কাল, শোপেনহাউয়ার, সাধু অগাস্তিনের কনফেশন্স, শেষ দিককার টলস্টয়ের খ্রিষ্টীয় ডায়েরিগুলো– এসব পড়েন। এঁদের মধ্যে অস্তিত্ববাদী দার্শনিক সোরেন কির্য়েকেগার্ড কাফকার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেন বলে ধারণা করা হয়।

কর্মজীবন

কাফকা মোট দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং একটি বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগে মাথা ঘামান। প্রথম চাকরিটি ছিল এক ইতালিয়ান বিমা কোম্পানিতে। ১৯০৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯০৮-এর ১৫ জুলাই পর্যন্ত ইতালিয়ান এই কোম্পানির প্রাগের অফিসে খুব অসুখী এক সময় কাটে তার। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তাঁকে বিষর্ম করে তোলে; বেতনও কম আর সেই সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকা লেখালেখির জন্য সময় দেওয়া যাচ্ছে না, এ দুটো সত্যই পীড়া দিতে থাকে তাকে। তার অনেক চিঠিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৫ জুলাই ১৯০৮-এ চাকরি থেকে পদত্যাগ করার দুই সপ্তাহ পরে তিনি একটি সরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। অফিসে তার দায়িত্ব ছিল মিল-কারখানার শ্রমিকেরা কাজ করতে গিয়ে আহত হলে, সেসব দুর্ঘটনার তদন্ত করা ও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করা। নিজের ব্যাপারে উদাসীন কাফকা অফিসে কাজের বেলায় ছিলেন খুঁতখুঁতে, যত্নশীল, সৃজনশীল এবং নিবেদিত প্রাণ। এরই ফলস্বরূপ দ্রুত অনেকগুলো পদোন্নতি হয় তারএবং নভেম্বর ১৯১৫ নাগাদ তাঁর বেতন গিয়ে দাঁড়ায় বছরে ৫ হাজার ৭৯৬ ক্রাউন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যখন প্রাগের যুবকদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগ দিতে হচ্ছে, তখন অফিসের ঊর্ধ্বতনেরা কাফকাকে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘জরুরি প্রয়োজন’ ঘোষণা করার কারণেই তার আর যুদ্ধে যাওয়া লাগেনি। শুধু সেবারই নয়, পরে তিনি অসুস্থ হলে যেভাবে বারবার তার অফিস তার জন্য দীর্ঘ সব ছুটি মঞ্জুর করেছে এবং শেষে অতি অল্প বয়সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পূর্ণ পেনশন নিয়েই কাফকাকে যেভাবে চাকরিতে ইস্তফা দিতে দেওয়া হয়েছে — এর সবই দানবীয় এক অফিসে আমলাতান্ত্রিক অন্ধকারে হাতড়াতে থাকা ফ্রানৎস কাফকা মিথের বিপরীতে আমাদের নতুন করে তাকে নিয়ে ভাবতে উৎসাহ জোগায়।

১৯১৮ সালে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার পেনশন মঞ্জুর করা হয়। এর পরের ছয়টি বছর মোটামুটি নানা স্যানাটোরিয়াম(হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যনিবাস) ঘুরে ঘুরেই জীবন কাটে তার।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

দি ফ্যারভান্ডলুং (দ্য মেটামরফোসিস)

ডাস উয়রটাইল (দ্য জাজমেন্ট)

ডেয়ার প্রোৎসেস (দ্য ট্রায়াল)

ডি বেত্রাখটুং (কন্টেমপ্লেশন)

মৃত্যু

যক্ষা রোগের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯২৪ সালের ৩রা জুন অস্ট্রিয়ার কিয়ারলিং-এর একটি হাসপাতালে ফ্রানৎস কাফকা যন্ত্রণাপূর্ণ মৃত্যুর মুখোমুখি হন।

নিউজনেক্সটবিডিডটকম/এসকেএস


সর্বশেষ

আরও খবর

প্রধানমন্ত্রীপরিচয়ে তাজউদ্দীন ইন্দিরার সমর্থন আদায় করেন যেভাবে!

প্রধানমন্ত্রীপরিচয়ে তাজউদ্দীন ইন্দিরার সমর্থন আদায় করেন যেভাবে!


প্রকৃতির নিয়ম রেখেছিল ঢেকে রাতের কালো, বিধাতার ডাকে বঙ্গবন্ধু এলো

প্রকৃতির নিয়ম রেখেছিল ঢেকে রাতের কালো, বিধাতার ডাকে বঙ্গবন্ধু এলো


সৈয়দ আবুল মকসুদঃ মৃত জোনাকির থমথমে চোখ

সৈয়দ আবুল মকসুদঃ মৃত জোনাকির থমথমে চোখ


বঙ্গবন্ধুর মুক্তির নেপথ্যে

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির নেপথ্যে


প্রয়াণের ২১ বছর…

প্রয়াণের ২১ বছর…


বীর উত্তম সি আর দত্ত আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক

বীর উত্তম সি আর দত্ত আর নেই, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক


সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন

সংগীতের ভিনসেন্ট নার্গিস পারভীন


সিরাজগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে কামাল লোহানীকে

সিরাজগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে কামাল লোহানীকে


জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আর নেই

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আর নেই


ওয়াজেদ মিয়ার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ওয়াজেদ মিয়ার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ