Thursday, September 29th, 2016
বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্ত
September 29th, 2016 at 9:33 pm
বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্ত

ঢাকা: একটু একটু করে কলঙ্কের টিকা মুছছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৩৮ বছরের মাথায় জাতীয় সংসদে আওয়াজ তোলা হয় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রমের। আর ঠিক একই কায়দায় এবার সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী ও মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্ত।

বৃহস্পতিবার সংসদের বেসরকারি দিবসে আওয়ামী লীগের বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির আনীত সিদ্ধান্ত প্রস্তাব ও বেশ কয়েক জন সদস্যের সংশোধনীসহ গ্রহণ করা হয়।

এর আগে ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পেশ করেন আওয়ামী লীগের এক সাংসদ। পরে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক সিদ্ধান্ত প্রস্তাব ও সংশোধনীর ওপর দেয়া বক্তব্যে বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের সকল স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আজ যে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ ব্যাপারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি এই টাস্কফোর্সের এক সভায় হত্যাকারীদের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনীদের কোনো স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে থাকার অধিকার নেই। বঙ্গবন্ধু আইন মেনে রাজনীতি করেছেন। তার সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আইন মাফিক চলতে চান। তাই তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সাধারণ আইনে করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে শিগগিরই একটি আইন সংসদে পাস করার জন্য উত্থাপন করা হবে। এছাড়া একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হবে। এ ব্যাপারেও ইতোমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করা হবে।’ আইন মন্ত্রী সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেন। পরে কন্ঠভোটে তা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় খুনিকে আজও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। পলাতক খুনিদের মধ্যে একজন জার্মানিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্য পাঁচ জন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সেনেগাল ও জিম্বাবুয়েতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনি সাবেক রিসালদার মোসলেউদ্দিন খান জার্মানিতে পালিয়ে আছেন বলেও জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলার পলাতক খুনি মোসলেউদ্দিন জার্মানিতে বসবাস করছেন। তবে জার্মানির কোথায় মোসলেউদ্দিন বসবাস করছেন, এ ব্যাপারে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।’

এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের মধ্যে সাবেক লে. কর্নেল এসএইচএমবি নূর চৌধুরী কানাডায়, লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন বলেও জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার বিবরণ মতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নূর চৌধুরী ও মেজর বজলুল হুদা সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বজলুল হুদার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে। নূর চৌধুরী এখনো পলাতক রয়েছেন। অপর পলাতক আসামিদের মধ্যে সাবেক সেনা ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ ভারতে পলাতক রয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে কোনো সঠিক সরকারি তথ্য নেই।

অপর পলাতক আসামিরা হলেন‒ বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ এবং শরিফুল হক ডালিম। ঢাকায় পররাষ্ট্র দফতর এর আগে পলাতক আসামিদের মধ্যে জিম্বাবুয়ে একজন বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল আজিজ পাশার স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করে।

১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ী হবার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার শুরু করে। এই কালো আইনের জন্য এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। সর্বোচ্চ আদালত আপিল ডিভিশনের রায়ের পর ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তারা হলো- সাবেক লে. কর্নেল ফারুকুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি) শাহরিয়ার রশীদ খান এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) ও সাবেক মেজর বজলুল হুদা।

ঢাকা ও ব্যাংককের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরের পর হুদাকে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে প্রত্যাবাসন চুক্তি না হলেও সাবেক সামরিক সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র ফিরিয়ে দেয়।

১৯৭৫ পরবর্তী সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে বিভিন্ন মিশনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তারা নানা ষড়যন্ত্র ও দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে কালো আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারের পথ প্রশস্ত হয়।

খুনি লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় কনস্যুলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সর্বশেষ বদলি হয় টোকিওতে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করে।

রিসালদার মোসলেউদ্দিনকে তেহরান ও জেদ্দায় পোস্টিং দেয়া হয়। ক্যাপ্টেন মো. কিসমত হাসেম অটোয়ায় এবং লে. আব্দুল মজিদ ত্রিপোলিতে কূটনীতিক হিসেবে চাকরি পান।

লে. কর্নেল মো. আব্দুল আজিজ পাশা রোমে বাংলাদেশ মিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান। আজিজ পাশা ১৯৮০ সালের ১৭ জুন অভ্যুত্থান ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকায় গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে তিনি অভ্যুত্থান সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হওয়ায় সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয় তার। তাকে রোমে কূটনীতিকের চাকরি দেয়া হয়। আজিজ পাশা নাইরোবিতেও দায়িত্ব পালন করেন। তার সর্বশেষ পোস্টিং ছিল জিম্বাবুয়েতে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পাশা জিম্বাবুয়েতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ২০০১ সালের দুই জুন তিনি মারা যান।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর পাশাকে মরণোত্তর চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয় এবং তার পরিবারকে পেনশনসহ সকল সরকারি সুবিধা দেয়া হয়। তাকে চাকরি থেকে অবসর দেখানো হয়।

অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইবুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। এর পরই শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এ পর্যন্ত ২২ জনের রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এদের মধ্যে কাদেরর মোল্লা, কামারুজ্জাম, মুজাহিদ, নিজামি ও সাকা চৌধুরী ও কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল-১ এদের মধ্যে ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণসহ ৬টি অভিযোগ দোষি সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে গণজাগরণ মঞ্চে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইন পরিবর্তন করা হয়। একই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল-২ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।২০১৩ সালে ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্কর হয়।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মৃত্যুদণ্ড দেয়। সাঈদী আপিল করলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।

২০১৩ সালের ৯ মে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আপিল এবং রিভিউতে রায় বহাল থাকে।২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্কর হয়।

২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।পরে তিনি কারাগারে মারা যান।

২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতে ইসলামীর সেতক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

২০১৫ সালের ১৬ জুন আপিল আবেদন খারিজ, একই বছর ১৮ নভেম্বর রিভিউ খারিজ। ২২ নভেম্বর ফাঁসি কার্কর।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মৃত্যুদণ্ড দেয়।২০১৫ সালের ২৯ জুলাই আপিল খারিজ, একই বছর ১৮ নভেম্বর রিভিউ খারিজ হয়।২২ নভেম্বর রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্কর হয়।

গ্রন্থনা: সজিব ঘোষ, সম্পাদনা: জাহিদুল ইসলাম


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু

করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু


শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে যাত্রী ও গাড়ির প্রচণ্ড চাপ, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি


দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির

দাম বাড়ল মুরগি ও চিনির


ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০

ভারতে আবার সংক্রমণের রেকর্ড, একদিনে মৃত্যু প্রায় ৪০০০


দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২

দেশে করোনায় আরও ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৮২২


খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: আইনমন্ত্রী


যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

যে যেখানে আছেন সেখানেই সবাইকে ঈদ উদযাপন করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নারীর মৃত্যু

ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নারীর মৃত্যু


করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২

করোনায় কমলো মৃত্যু ও শনাক্তের হার; মৃত্যু ৫০ আর শনাক্ত ১ হাজার ৭৪২


১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি

১৬ মে পর্যন্ত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি