Sunday, August 16th, 2020
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা
August 16th, 2020 at 1:13 am
সপরিবারে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিলো একুশ বছর।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা

রুদ্র সাইফুলঃ ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের যানবাহনগুলো সচল হয়ে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণে অবস্থিত ইউনিট থেকে ১০৫ এমএম কামানগুলোকে ভারি ট্রাক দিয়ে টেনে নির্মাণাধীন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় নিয়মিত নৈশ প্রশিক্ষণের জন্য। রাত ১০টার দিকে সেনানিবাসের উত্তর প্রান্ত থেকে বেঙ্গল ল্যান্সারের টি-৫৪ ট্যাংকগুলো ইউনিট থেকে বেরিয়ে পড়ে। এয়ারপোর্টে ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক একত্রিত হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর পাশা, মেজর রাশেদ প্রমুখ সেখানে জড় হন।

১৫ আগস্ট রাতের প্রথম প্রহরে মেজর ফারুক অফিসারদের নির্দেশ দেন বিমান বন্দরের কাছে হেড কোয়ার্টারে স্কোয়াড্রন অফিসে মিলিত হতে। অফিসারদের আপারেশনের পরিকল্পনা জানায় মেজর ফারুক। তিনিই ছিলেন এই অপারেশনের দায়িত্বে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই বাড়িকে ঘিরে দু’টো বৃত্ত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ভেতরের বৃত্তের সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করবে। বাইরে থেকে রক্ষীবাহিনী কিংবা ভেতর থেকে পুলিশের কোনো আক্রমণ এলে তা ঠেকানোর দায়িত্বে দেওয়া হয় বাইরের বৃত্তের সদস্যদের। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর নূর ও মেজর বজলুল হুদাকে।

ছবি এঁকেছেনঃ বিপদভন্জন সেন
ছবি এঁকেছেনঃ বিপদভন্জন সেন

ঠিক হয়, তারা ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোড, সোবাহানবাগ মসজিদ এবং ৩২ নম্বর ব্রিজ রোড ব্লক করবে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ধানমন্ডিতেই শেখ ফজলুল হক মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতেও আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। মেজর ডালিমকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণের সময় উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেন মেজর ফারুক। কিন্তু পূর্ব সম্পর্কের অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণে উপস্থিত না থেকে স্বেচ্ছায় সেরনিয়াবাতের বাড়িতে আক্রমণের দায়িত্ব নেয় ডালিম। ভারি মেশিনগান সংযোজিত দ্রুতগতির একটি জিপে রওনা দেয় ডালিম। সঙ্গে এক প্লাটুন ল্যান্সারসহ একটি বড় ট্রাক। শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয় রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনকে। তার সঙ্গে দেওয়া হয় দুই প্লাটুন সৈন্য। এক কোম্পানি সেনাসহ রেডিও স্টেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউমার্কেট এলাকার দায়িত্বে থাকে মেজর শাহরিয়ার। একই সঙ্গে ওই গ্রুপকে বিডিআর থেকে কোনো ধরনের আক্রমণ আসলে তা প্রতিহত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়।

২৮টি গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে শের-ই বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নেন মেজর ফারুক নিজে, ট্যাংকের মেশিনগানগুলোয় প্রচুর গুলি ছিলো। মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের জন্য ১২টি ট্রাকে কর্নেল তাহেরের অনুসারী সাড়ে তিন’শ সাধারণ সৈনিককে তৈরি করা হয়। সরাসরি আক্রমণে মেজর রশিদের কোনো দায়িত্ব ছিলো না। তার দায়িত্ব ছিলো হত্যাকাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমন্বয় করা। তার নেতৃত্বে থাকা ১৮টি কামানে গোলা ভর্তি করে যুদ্ধাবস্থার জন্য তৈরি রাখা হয়। কামানগুলো রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে তাক করা হয়। একটি ১০৫ এমএম হাউইটজার কামান রাখা হয় আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উল্টো দিকে লেকের পাড়ে। দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর সবাইকে তাজা বুলেট দেওয়া হয়। ঘাতকের দল বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভোররাত ৪টার দিকে ধানমন্ডির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

মেজর ফারুকের নেতৃত্বে ২৮টি ট্যাংক বিমানবন্দর সড়কে বনানীর এমপি চেকপোস্ট দিয়ে সেনানিবাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে ফজরের আজান পড়ে যায়। ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে ৪৬ ব্রিগেড ইউনিটের লাইনের একেবারে ভেতর দিয়ে বাইপাস সড়ক ধরে সেনানিবাসের প্রধান সড়কে চলে আসে। ঢাকা সেনানিবাসে সেই সময়ে বিমানবাহিনীর যে হেলিপ্যাড ছিলো, তার ঠিক উল্টো দিকের একটি গেইট দিয়ে ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে বিমানবন্দরের (পুরনো বিমানবন্দর) ভেতর ঢুকে পড়ে। এই সময় ফারুককে অনুসরণ করছিলো দুটি ট্যাংক। বাকি ট্যাংকগুলো পথ হারিয়ে জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ফার্মগেটের দিকে আগাতে থাকে। ফারুক এয়ারপোর্টের পশ্চিম দিকের দেয়াল ভেঙে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের সামনে উপস্থিত হয়।

ছবি এঁকেছেনঃ বিপদভন্জন সেন
ছবি এঁকেছেনঃ বিপদভন্জন সেন

রাত সোয়া ৫টার দিকে মেজর ডালিম ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মণির বাড়িতে আক্রমণ হয়। শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা করে ঘাতকেরা। প্রাণে বেঁচে যান শেখ ফজলুল হক মণির দুই ছেলে শেখ ফজলে শামস্ পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস। মেজর ডালিমের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি সুকান্ত বাবু (আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ছেলে), ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে আবদুল নঈম খান রিন্টু, তিনজন অতিথি এবং চারজন কাজের লোককে।

পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট, ভোররাতে ধানমন্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মীয় ও মন্ত্রীসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে যান। যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিলো মো. সেলিম (আবদুল) ও আবদুর রহমান শেখ (রমা)। উপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলামকে টেলিফোন করে বলেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতিকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ফোন করতে হবে। পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ফোন করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মহিতুল গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে চেষ্টা করতে থাকেন।

ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করা মাত্রই বাড়িটির দিকে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়। একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ঘুম থেকে ওঠেন গৃহকর্মী আবদুল আর রমা। বেগম মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখেন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে আগাচ্ছে। রমা বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখেন, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন, বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা আর দোতলায় দাঁড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তাঁর স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে তোলেন। ঘটনা শুনে শার্টপ্যান্ট পড়ে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত। রমা দোতালায় শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রীকেও ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। শেখ জামাল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান। ওদিকে গোলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল।

পুলিশ কন্ট্রোলরুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি…।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা শেষ করতে পারেননি। একঝাঁক গুলি জানালার কাঁচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাঁচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই জখম হয়। ওই জানালা দিয়ে গুলি আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলের হাত ধরে কাছে টেনে শুইয়ে দেন। এর মধ্যেই গৃহকর্মী আবদুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আবদুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পড়েন। নিচতলার এই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘এতো গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছো?’ এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান।

বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আর্মি আর পুলিশ ভাইরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।’ এই সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডিভিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম খান। ঠিক তখনই মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা ‘হ্যান্ডস্-আপ’ বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান। কোনো কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। আপনি ওদেরকে বলেন।’ মহিতুল ঘাতকদের বলেন, ‘উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ্য করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাঁটুতে আরেকটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে। এই অবস্থাতেই মহিতুলকে টেনে নুরুল ইসলাম তার কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তারা দেখেন, পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্য দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। অস্ত্রটা তার পায়ের কাছে পড়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়।

নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দোতলায় তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ফোনে তাঁর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে পান। তিনি তাঁকে বলেন, ‘জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’

তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েও শফিউল্লাহ কোনো পদক্ষেপ নেননি। বঙ্গবন্ধু শফিউল্লাহকে বলেন, ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) বোধহয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ জবাবে শফিউল্লাহ বলেন, ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্যা হাউজ?’

বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েই কর্নেল জামিল তাঁর ব্যক্তিগত লাল রঙের গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর গাড়িচালক আয়েনউদ্দিন মোল্লা। কিন্তু পথেই সোবাহানবাগ মসজিদের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকেরা। পালিয়ে বেঁচে যান আয়েনউদ্দিন।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল, নুরুল ইসলাম, আবদুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানো হয়। এর মধ্যে ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে যান। এরপর ঘাতকেরা গুলি করতে করতে ওপরে চলে যায়। তারা শেখ জামালের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া গৃহকর্মী আবদুলকে গুলি করে, হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতে তিনি সিঁড়ির পাশে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে থাকেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল। ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসলেই ঘাতকেরা তাঁকে ঘিরে ধরে। মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। ঘাতকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’ বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি, বেয়াদবি করছিস কেনো?’ এই সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝিতে অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহটা সিঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকে। পুরো সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে। বঙ্গবন্ধুর পেছন পেছন রমাও যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঘাতকেরা তাকে ঘরের মধ্যে চলে যেতে বলে। এর মধ্যে দোতলায় শেখ রেহানার ঘরে থাকা তাঁর চাচা শেখ নাসের ওই কক্ষে যান। তাঁর হাতে গুলি লাগার ক্ষত ছিলো। রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানান, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে। এসময় ওই ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও রমা। ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এর পরপরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেয় এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন। ঘাতকেরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমি যাবো না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’

বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ঘাতকেরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর, বেগম মুজিবকে তাঁর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ।

শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের সবাইকে একসঙ্গে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এসময় শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না। কোনোরকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই।’ এসময় ঘাতকেরা একে অপরকে বলে, ‘শেখ মুজিব বেটার দ্যান শেখ নাসের।’ এরপর তারা শেখ নাসেরকে বলে, ‘ঠিক আছে। আপনাকে কিছু বলবো না। আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসেন।’ এই বলে শেখ নাসেরকে অফিসের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে নিয়ে গুলি করে। এরপর শেখ নাসের ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। তখন শেখ নাসেরের ওপর আরেকবার গুলিবর্ষণ করা হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ মহিতুল জবাব দেয়, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।’ এসময় শেখ রাসেল তাঁর মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে তাঁকে দোতলায় নিয়ে যেতে বলে। আজিজ পাশার কথা মতো ক্যাপ্টেন মাজেদ শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে। এই হত্যাযজ্ঞে ঘরের মেঝেতে রক্তের মোটা স্তর পড়ে যায়। এর মাঝেই লুটপাট চালায় ঘাতকের দল। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তাঁর দুই মেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন; ছোট মেয়ে শেখ রেহানাকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার আবদুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর লাশ ছাড়া ১৫ আগস্টে নিহত অন্যান্যদের লাশ দাফন করেন। আবদুল হামিদ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে কফিনে নিহতদের লাশ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে শেখ ফজলুল হক মণি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যদের লাশ সংগ্রহ করে বনানী কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন। বনানী কবরস্থানে সারিবদ্ধ কবরের মধ্যে প্রথমটি বেগম মুজিবের, দ্বিতীয়টি শেখ নাসেরের, এরপর শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল, ১৩ নম্বরটি শেখ মণির, ১৪ নম্বরটি আরজু মণির, ১৭ নম্বরটি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের। আর বাকি কবরগুলো সেদিন এই তিন বাড়িতে যারা নিহত হন, তাঁদের। ১৬ আগস্ট সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে তাঁকে দাফন করা হয় তাঁর বাবার কবরের পাশে। ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে কমদামী মার্কিন কাপড়ে মুড়িয়ে দাফন করা হয় বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেনাবাহিনীর ওই হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শমশের আলী।

সপরিবারে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিলো একুশ বছর। আর এই দীর্ঘ সময়ে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন, এরশাদের সামরিক শাসন এবং খালেদা জিয়ার বিএনপি-জামাত জোট সরকার ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে দেয়নি; বরং তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সহযোগিতা করেছে।

সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকারীদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে চাকুরি এবং পদোন্নতির ব্যবস্থা করেছিলো। দেশের বিপক্ষে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এরশাদ সরকারের আমলেও খুনিদের পদোন্নতি অব্যাহত থাকে। এমনকি খুনিদের কেউ কেউ দেশে ফিরে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ জাতীয় সংসদের সদস্যও হয়েছে; খালেদা জিয়ার আমলেও এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে নিম্নোক্ত ১২জনকে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকুরি দেওয়া হয়েছিলোঃ

১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল শরিফুল হক ডালিম (মেজর ডালিম), চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব।
২. লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা, আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব।
৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, আলজেরিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব।
৪. মেজর বজলুল হুদা, পাকিস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব।
৫. মেজর শাহরিয়ার রশীদ, ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব।
৬. মেজর রাশেদ চৌধুরী, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয়।
৭. মেজর নূর চৌধুরী, ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব।
৮. মেজর শরিফুল হোসেন, কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব।
৯. কর্নেল কিসমত হাশেম, আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৃতীয় সচিব।
১০. লেফটেন্যান্ট খায়রুজ্জামান, মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৃতীয় সচিব।
১১. লেফটেন্যান্ট নাজমুল হোসেন আনসার, কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসের তৃতীয় সচিব।
১২. ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, সেনেগালে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৃতীয় সচিব।

উল্লেখিত খুনিদের নিয়োগপত্র ঢাকা থেকে লিবিয়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী। এর আগে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে তাদের সঙ্গে আলোচনা-সমঝোতার জন্য তৎকালীন মেজর জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। তবে উল্লেখিত ১২জন সেনাকর্মকর্তা ফরেন সার্ভিসে যোগ দিতে রাজি হলেও প্রধান দুই হোতা ফারুক ও রশীদ জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে চাকুরি না নিয়ে ব্যবসা করার মনস্থির করেন, জিয়াউর রহমান তাদের ব্যবসার মূলধন হিসেবে আর্থিক সহযোগিতা করে। ফারুক ও রশীদ লিবিয়া সরকারের বিশেষ অনুকম্পা লাভ করে।

এরশাদের শাসনামলেও এই খুনিদের প্রতি বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। এদের অনেকেই এরশাদ আমলেই পদোন্নতি পেয়ে রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত হয়েছে। পদোন্নতি পেয়ে মেজর নূর ব্রাজিলে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। শরিফুল হক ডালিমকে কানাডায় নিয়োগ দেওয়ার পূর্বে সমাজতান্ত্রিক দেশ পোল্যান্ডে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু পোল্যান্ডের জেরুজালেস্কি সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিজ দেশে বর্তমানে নিঃসঙ্গ এবং একাকী জীবন জীবনযাপন করলেও আশির দশকে দোর্দণ্ড প্রভাবশালী এই পোলিশ একনায়কের সিদ্ধান্তকে বাঙালি আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

খুনিদের স্বার্থরক্ষার জন্য জিয়া-এরশাদ-খালেদা সরকার রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মত্ত থেকেছে। বেনজির ভুট্টো সরকার পাকিস্তানে খুনি মহিউদ্দিন আহমেদকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেও সৌদি সরকার এই খুনিকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশন উপ-প্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকুরি ছেড়ে কানাডার নাগরিকত্ব নিয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রথম আমলে (১৯৯৬-২০০১) খায়রুজ্জামান জেল খাটলেও বিএনপি-জামাত জোট আমলে জেল থেকে বের হয়ে মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই খায়রুজ্জামান পলাতক। এই খায়রুজ্জামান মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন সময়েই মালয়েশিয়া বাঙালিদের জন্য কলিং ভিসা বন্ধ করে দেয়, এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে হাজার হাজার বাঙালি অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রম অসন্তোষের পেছনে এই খুনি সেনাকর্মকর্তার হাত রয়েছে। এছাড়া খুনি আজিজ পাশার মৃত্যুর পর তার পরিবারকে যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে বিএনপি-জামাত জোট সরকার।

যে খুনিদের জিয়া-এরশাদ-খালেদা প্রতিপালন করেছে পরম মমতায়, সেই খুনিদেরই একটি অংশ ১৯৮০ সালের ১৭ জুন সেনানিবাসের অভ্যন্তরে একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালায়; সেই সময়ে মেজর ডালিম-নূর-হুদা-আজিজ পাশাদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো। পরে আবার মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উগ্র বামপন্থিরা কখনোই পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার ঘটনা মেনে নিতে পারেনি। Sranly Wolpert-এর ‘Zulfi Bhutto of Pakistan’ বইতে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও তথাকথিত বামপন্থি বিপ্লবী আবদুল হক-এর একটি চিঠি মুদ্রিত হয়েছিলো, ওই চিঠিতে আবদুল হক এবং তথাকথিত ভাষা সংগ্রামী ও যুদ্ধাপরাধী আবদুল মতিন বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করে পুনরায় পাকিস্তান কায়েমের জন্য ভুট্টোর কাছে অস্ত্র ও অর্থের যোগান চেয়েছিলো।

মেহনাজ এবং বিগ্রেডিয়ার বারি’র বদৌলতে সরকারের বিশেষ সংস্থার আসল চরিত্র উন্মোচিত হলেও, এ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ১৯৮৩ সালে আরো একবার উন্মোচিত হয়েছিলো। আশির দশকে খুনি ফারুক-রশীদ ‘মুক্তির পথ’ নামে একটি চটি বই লিখেছিলো, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বিনে পয়সায় সেই বই বিতরণ করা হয়। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আদর্শিক কায়দায় পুনর্বাসিত করার অপচেষ্টা নিয়েছিলো রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। এরপরের ইতিহাস আরো করুণ।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে খুনি ফারুক রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো। বলতে গেলে সেটাই ছিলো বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের প্রথম এক্সপোজার। বস্তুত আওয়ামী লীগকে দমন করার জন্য এই অপশক্তিকে রাজনীতিতে সক্রিয় করা হয়েছিলো। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে খুনি বজলুল হুদাকে মেহেরপুর থেকে এমপি বানানো হয়েছিলো। এই কলঙ্ক বাংলাদেশের। ১৯৯৬ সালের সাদেক আলী নির্বাচনে খুনি রশীদকে বিরোধী দলীয় নেতা মনোনীত করা হয়েছিলো। আর এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত লাল-সবুজের বাংলাদেশকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিলো স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র।


সর্বশেষ

আরও খবর

করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু

করোনায় আরও ১৯ জনের মৃত্যু


বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত ব্যারিস্টার রফিক-উল হক


সাগরে ৪ নম্বর সংকেত, বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে আরও দুই দিন

সাগরে ৪ নম্বর সংকেত, বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে আরও দুই দিন


দু-তিন দিনের মধ্যে আলুর দাম কমবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

দু-তিন দিনের মধ্যে আলুর দাম কমবে: বাণিজ্যমন্ত্রী


সারা দেশের নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার

সারা দেশের নৌ ধর্মঘট প্রত্যাহার


করোনায় প্রাণ গেল আরও ২১ জনের

করোনায় প্রাণ গেল আরও ২১ জনের


শিশু ধর্ষণের মামলায় দ্রুততম রায়ে আসামির যাবজ্জীবন

শিশু ধর্ষণের মামলায় দ্রুততম রায়ে আসামির যাবজ্জীবন


মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে নির্দেশ মন্ত্রিসভার

মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে নির্দেশ মন্ত্রিসভার


দেশে করোনায় আরও ২৩ জনের মৃত্যু

দেশে করোনায় আরও ২৩ জনের মৃত্যু


ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের

ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের