Sunday, September 18th, 2016
বরিশালের নগর পরিকল্পনা ও আমাদের জয়যাত্রা
September 18th, 2016 at 2:05 pm
বরিশালের নগর পরিকল্পনা ও আমাদের জয়যাত্রা

অপূর্ব অহম, বরিশাল: ৩রা অক্টোবর, ২০১২। একটি সবুজ দিন। মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক, জীবিকাকে কেন্দ্র করে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, উৎপাদনের প্রযুক্তি ও উপকারণ- এই সামগ্রিকতা বিবেচনায় নিয়ে প্রথমবারের মত কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি হল বরিশালে। এই পরিকল্পনা তৈরির অন্যতম লক্ষ্য ছিলো মানুষের সাথে মানুষের আর প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের নাগরিকদের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির মৈলিক পরিবর্তন আনা। মাত্র চার বছরে কি পরিবর্তন দেখা দিলো একটা নতুন প্রজন্মের মধ্যে তারই এক বর্নণা দিবো আজকে।

সেদিন আমি এবং আমার মত আরও ৩৯ জন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা মিলে বরিশালের একটি খালকে কেন্দ্র করে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে তুলেছিলাম। এটা এমন এক ঘটনা যা হয়তো ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে না। কিন্তু আমি মনে করি ঐদিন এমন একটা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল যা হয়তো আমাদের নাগরিক জীবনধারার আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের কর্মপরিকল্পনাটি তৈরি করার একটি উদ্দ্যেশ্য ছিল মানুষের চিন্তার ও কর্মপদ্ধতির পরিবর্তন আনা। ৪ বছর পর এই পরিবর্তন আমি দেখতে পাই বরিশালের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। সম্প্রতি ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখে বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী সাইফুজ্জামানের উদ্যোগে জেল খাল পরিচ্ছন্ন অভিযান চালানো হয়। সে অভিযানে অংশ নেয় স্কুল কলেজের কয়েকশ শিক্ষার্থী। তারো এক মাস আগে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছিলেন আমাদের জেলা প্রশাসক। সে অভিযানে সামিল হয়েছিল বরিশালের আপামর জনসাধারণ।

উন্নয়ন হচ্ছে একটি সমাজ বা জনগোষ্ঠীর পরিকল্পিত অগ্রগতি। আর এ অগ্রগতি হবে একটি পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে পরিকল্পনার ধাপগুলো হল লক্ষ্য নির্ধারন, তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, কৌশল নির্ধারণ, কর্ম-পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন। পুরো পরিকল্পনাটি তৈরি হয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা। প্রথাগত উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই ‘বিশেষজ্ঞ’ ব্যক্তিবর্গ বলতে মূলত দেশী- বিদেশী সুবিধাভোগী বিশেষ একটি শ্রেণিকে বোঝায় যারা পর্যাপ্ত পারিশ্রমিকের বিনিময় একটি এলাকার মানুষদের জীবনযাত্রা কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করে দেয়।

৩রা অক্টোবর আমরা বরিশাল শহরের জন্য যে উন্নয়ন পরিকল্পনাটি করেছিলাম সেটি ছিল প্রথাগত নগর পরিকল্পনা থেকে আলাদা। সেখানে পরিকল্পনাকারী হিসেবে কোন আমলাতন্ত্র নির্ভর, দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ ছিলেন না, ছিল আমার মত স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষজ্ঞ থাকতে আমরা, ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসি কেন তৈরি করলাম এই পরিকল্পনা?

  • প্রথমত, তরুণ প্রজন্ম একটা জনগোষ্ঠীর খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমরাও চাইলে আমাদের মেধা, মনন দিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি। আমরাও পরিকল্পনায় অংশ নিতে পারি এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
  • দ্বিতীয়ত, আজকের পৃথিবীতে আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরা নিচ্ছি না। নিচ্ছে কোন এক পরিকল্পনাকারী দল। আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা কেন নিচ্ছি না? কারণ আমাদের বুঝানো হয়েছে যে আমরা সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তাই বিশেষজ্ঞ এনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
  • তৃতীয়, পরিকল্পনাটি তৈরি করার সময় দৃষ্টি রাখা হয়েছে যে বিষয়গুলোর উপর তা হচ্ছে; মানুষের সাথে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক, প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির উপর মানুষের কর্মকান্ডের প্রভাব, ব্যবহৃত প্রযুক্তির কার্যকারীতা ও সামগ্রীক কল্যাণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব।

একটু ভেবে দেখি। প্রথাগত উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দেখা যায় একদল পরিকল্পনাকারী আমাদের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন করে দিচ্ছেন যাচ্ছেন। কিন্তু কোন মানুষের পক্ষেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয় যা দৃষ্টিভঙ্গি নিরপেক্ষ। ফলে এ ধরনের পরিকল্পনায় বৈষম্য থেকেই যায়। প্রথাগত পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেশি গুরুত্ব পায়, পরিবেশ আর প্রকৃতি হয়ে যায় সম্পদের উৎস এবং মানুষ হয়ে পরে ভোক্তা। ফলে এ ধরনের পরিকল্পনায় পরিবেশের ক্ষতি হয় ব্যাপক ভাবে। এর স্পষ্ট নিদর্শন ছিল বরিশালের সেই সাগরদী খাল এবং তার আশেপাশের এলাকা। প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা অসংখ্য খালের মধ্যে সাগরদী খাল একটি। এই খালকে ঘিরেই আমরা একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করি ২০১২ সালে। আমাদের পরিকল্পনার শুরুতেই আমরা সাগরদী খাল দিয়ে নৌকায় করে খাল এবং তার আশেপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। খালটির দুরবস্থা দেখে আঁতকে উঠতে হয়।

প্রবীন দেলোয়ার হোসেনের কাছে শুনেছিলাম ঐ খাল দিয়ে নাকি একসময় বড় বড় নৌকা যাতায়ত করতো, সেটা বেশিদিন আগের কথা নয়। কিন্তু এখন খালটি নাব্যতা হারিয়ে নালার আকার ধারণ করেছে। খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।খালের দু পাশে যেন বৈষম্য স্পষ্ট। খালের এক পাশে উঁচু ভবন, আরেক পাশে কুঁড়ে ঘর। এক পাশ থেকে খালে ময়লা আবর্জনা পড়ছে আর অপর পাশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সেই ময়লা পানি ব্যবহার করছে। খালেই ফেলা হচ্ছে বাজারের ময়লা। নেই কোন সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। খালের উপরে তৈরি হওয়া সেতুটিও যেন আরেক প্রহসন! এমনভাবে সেতুটি বানানো যে তার নিচ দিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় করে গেলেও মাথা নিচু করে যেতে হয়! অথচ এটি কিন্তু প্রথাগত নগর পরিকল্পনারই একটি অংশ। এই সাগরদী খাল সংলগ্ন এলাকাটি ‘পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকা’ বলে চিহ্নিত।প্রথাগত পরিকল্পনায় এধরনের ছোট খাটো ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না।হয়তো একটি বড় এলাকার প্রেক্ষিতে এটা খুব সামান্য একটা বিষয়। কিন্তু ঐ এলাকার মানুষদের জন্য এই সামান্য ভুল একটি মারাত্মক অভিশাপের রূপ নিয়েছে।

অথচ এই একটি মাত্র খালকে কেন্দ্র করে কতকিছু করা সম্ভব! আমরা দেখলাম খালটির নাব্যতা বাড়িয়ে সাগরদী খালকে নৌপথ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। খালের দুপাশে হাঁটার রাস্তা তৈরি করা যায়, সুষ্ঠু বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থার এবং রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে জৈব জ্বালানী তৈরি করা যায়। তাছাড়া ঐ খালের সাথে যাদের পেশা জড়িত তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায়। এভাবে অনেকগুলো মতামত নিয়ে আমরা দিনশেষে একটি পূর্ণাংগ পরিকল্পনা তৈরি করলাম। এক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য, বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়েই আমরা এটা করেছিলাম। কিন্তু পরিকল্পনার লক্ষ্য নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মপরিকল্পনা আমরাই করেছিলাম।

প্রথমেই বলেছিলাম এই একটা ঘটনা আমাদের নাগরিক জীবনধারার আমূল পরিবর্তন আনতে পারে যদি একটি মৌলিক উপলব্ধি তৈরি করা যায়। আমরা যে কর্মপরিকল্পনাটি করেছিলাম তা শুধু একটি খালকে কেন্দ্র করে করা হলেও মূলত এর উদ্দ্যেশ্য ছিল প্রথাগত নগর পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নৈতিকভাবে এবং পদ্ধতিগতভাবে। আগেই বলেছি প্রথাগত পরিকল্পনায় পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্ক হচ্ছে বিরূপ। তাই এমন এক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার যা হবে পরিবেশবান্ধব এবং জনবান্ধব। এ ধরনের পরিকল্পনাকে আমরা বলতে পারি সবুজ উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা। যেমনটা আমরা করেছিলাম। এ ধরনের পরিকল্পনায় সম্পদ উন্নয়নই মুখ্য বিষয় নয়। সম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, পর্যাপ্ত জীবিকার সুযোগ, সামাজিক বৈষম্য দূর করা এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করাও এ পরিকল্পনার একটি উদ্দেশ্য। ফলে সম্পদ এবং জীবিকার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হবে, ঐ এলাকার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষিত হবে।

পদ্ধতিগতভাবে সবুজ উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা প্রথাগত কর্মপরিকল্পনা থেকে বেশি আধুনিক এবং টেকসই। প্রথাগত কর্মপরিকল্পনায় দায়বদ্ধতার জায়গাটি নড়বড়ে। কিন্তু সবুজ উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেহেতু একটি এলাকার বা শহরের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায় তাই সকলের দায়বদ্ধতার একটা জায়গা থাকে। সবাই তখন চায় তারা যে পরিকল্পনাটি প্রনয়ন করেছে তা যেন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। অন্তত এই একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে হলেও তখন সবাই, একজন সাধারন নাগরিক থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পর্যন্ত এগিয়ে আসেন।

কোন এলাকার উন্নয়নে সেই এলাকার বাসিন্দারাই হতে পারেন বিশেষজ্ঞ। তাই কোন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়নের সময় স্থানীয়দের মতামতের প্রতিফলন ঘটা অনেক জরুরী। যদি সঠিকভাবে তাদেরকে উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দেয়া যায় এবং সচেতন করা যায় তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের নাগরিক জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। হ্যাঁ, তাই বলে এই না যে আমাদের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন নেই। কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ শুধুই পরিকল্পনায় সাহায্যকারী হিসেবে থাকবে, সিদ্ধান্তগ্রহনকারী হিসেবে নয়।

পরিবর্তনের জন্য চাই উদ্যোগ। আরও চাই জনগণের সচেতনতা। ৪ বছর আগে আমরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলাম তা এই ৪ বছরে বরিশালের সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিখ্যাত লেখক, দার্শনিক জর্জ বার্নার্ড শ এর একটি উক্তি রয়েছেঃ ‘Progress is impossible without change, and those who cannot change their minds cannot change anything.’

২০১২ সালের ৩রা অক্টোবরের সেই ছোট্ট ঘটনাটি বরিশালের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে একটি সচেতনতার বীজ বপন করতে পেরেছিল। সে বীজ আজ মহীরুহে পরিণত না হলেও ডালপালা গজিয়েছে। এই সবুজ উন্নয়নের ধারণাটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশ জুড়ে। পরিবর্তনের শুরুটা তাহলে বরিশাল থেকেই হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী, অমৃত লাল দে কলেজ, বরিশাল; সম্পাদনা: তুসা


সর্বশেষ

আরও খবর

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ


করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত

করোনায় আরও ৩০ জনের মৃত্যু, ৭৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত


ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড


মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী


আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার

আনিসুল হত্যা: মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার


পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি

পাওয়ার গ্রিডের আগুনে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন পুরো সিলেট, ব্যাপক ক্ষতি


দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে

বাস পোড়ানোর মামলায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মী রিমান্ডে


অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ

অবশেষে পাঁচ বছর পর নেপালকে হারালো বাংলাদেশ


মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার

মাইন্ড এইড হাসপাতালে তালা, মালিক গ্রেপ্তার